বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের হিড়িক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপির অন্তত ৫০ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায় এসব মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, যা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক।
ইসির যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলছে আজ ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আগামী ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। আপিল দায়ের ও নিষ্পত্তি এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষে ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবে ইসি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও যুবদল নেতা মোহাম্মদ দুলালের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর যাচাই-বাছাইয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিমের হলফনামার তথ্য অসম্পূর্ণ থাকায় তার মনোনয়নও বাতিল করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী আবু জাফর আহমেদ বাবুল এবং মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
গাজীপুর-২ (সদর-টঙ্গী) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকারের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ (সিরাজদীখান-শ্রীনগর) আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানো কেন্দ্রীয় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মমিন আলীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মহিউদ্দিনের মনোনয়ন তথ্যের গরমিলের কারণে বাতিল করা হয়েছে।
টাঙ্গাইল-১ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে দলীয় মনোনয়নপত্র জমা না দেওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী শাহিদুল ইসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপ-কোষাধ্যক্ষ এস এম ফজলুল হক এবং সাবেক হুইপ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানার মনোনয়ন এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল পাওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এ কে এম আবু তাহেরের মনোনয়ন সিআইবি প্রতিবেদনে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় বাতিল করা হয়। তিনি নিজেকে বিএনপির প্রার্থী দাবি করলেও এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এদিকে, যশোর-১ (শার্শা উপজেলা) আসনে বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক এমপি মফিকুল হাসান তৃপ্তি এবং শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহিরের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নপত্র জমা না দেওয়ায় মফিকুল হাসান তৃপ্তির এবং এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি থাকায় আবুল হাসান জহিরের মনোনয়ন বাতিল হয়।
যশোর-২ আসনে দলীয় মনোনয়নপত্র না দেওয়ায় বিএনপির দুই নেতা মোহাম্মদ ইসহাক ও জহুরুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। একই আসনে স্বাক্ষর ও টিআইএন-সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতির কারণে বিএনপি মনোনীত শামসুল হকের মনোনয়নও বাতিল করা হয়।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর ও বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী টিএস আইয়ূব এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সৈয়দ এ এইচ সাবেরুল হক সাবুর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। টিএস আইয়ূব ঢাকা ব্যাংকে ঋণখেলাপি থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের মনোনয়ন এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে বাতিল করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনেও এক শতাংশ ভোটার স্বাক্ষরিত পত্রে ত্রুটি থাকায় বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল ওয়াহেদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
সিলেট-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়া বিএনপির ইলিয়াস আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াসের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
ঝালকাঠি-১ আসনে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায় বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম আজম সৈকতের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। একই আসনে মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকায় স্বতন্ত্র (বিএনপি) প্রার্থী মঈন আলম ফিরোজীর মনোনয়ন এবং এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল ও ঋণ পরিশোধ না করায় স্বতন্ত্র (বিএনপি নেতা) প্রার্থী কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে ভোটারের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ানো বিএনপি নেতা আব্দুল খালেকের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে হলফনামায় তথ্য গোপনের কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর মনোনয়ন স্থগিত রয়েছে।
সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিকের হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্বসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তার মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া সিলেট-৬ আসনে আয়করসংক্রান্ত কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় বিএনপির প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে শেরপুর-২ (নকলা–নালিতাবাড়ী) আসনে বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী খাইম চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
শুধু বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাই নয়, এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ বিএনপি থেকে মনোনয়ন নেওয়া কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা মহানগরের ২০টি সংসদীয় আসনে মোট ২৩৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৬১ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, ৮১ জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে এবং একজনের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, কোনো প্রার্থীর সঙ্গে অবিচার হয়ে থাকলে তা আপিল প্রক্রিয়ায় সংশোধন করা হবে।
তিনি বলেন, "রিটার্নিং কর্মকর্তারা যে কারণ দেখিয়ে মনোনয়ন বাতিল করেছেন, আপিলে সেগুলো পরীক্ষা করা হবে। যদি দেখা যায় বাতিলের কারণ আইনসম্মত নয়, তাহলে আইন অনুযায়ী মনোনয়ন গ্রহণ করা হবে।"
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে কারিগরি সমস্যার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ না থাকার কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে আপিল শুনানিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।"
নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান, লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বাক্ষরসংক্রান্ত জটিলতা, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা ঋণখেলাপি হলে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন।
