সেই সব আশ্চর্য সন্ধ্যা—ঢাকার বিস্মৃত জাদুকরনামা

১৯২০ সালের এক জাদুর আসরে
যতীন্দ্রনাথের ঠিকা গাড়ি যখন গভর্নমেন্ট হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়ির কাঁটা বিকেল তিনটা পেরিয়েছে। চারদিকে সবুজ লন, মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ঝলমলে গভর্নমেন্ট হাউস। রমনার এই বিশালকায় দালানটা তৈরি হয়েছিল বাংলার লাটের থাকবার জন্য। তবে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যাওয়ায় শেষমেশ তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন মাঝেমধ্যে কিছু সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া এ দালানের আর তেমন ব্যবহার নেই। শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই একাডেমিক কাজের জন্য দালানটি ঢাকা কলেজকে হস্তান্তর করা হবে।
যতীনের জন্য আজকের দিনটি বড় আনন্দের। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে আজ বাংলার গভর্নর যে গার্ডেন পার্টি দিয়েছেন, সেখানে জাদু দেখাবার সুযোগ পেয়েছেন ঢাকার জাদুকর যতীন। এ যে অভাবনীয়! এর আগে বহু আসরে তিনি জাদু দেখিয়েছেন, কিন্তু এমন বড় আয়োজনে, এত সব কর্তাব্যক্তির সামনে জাদু দেখাবার সুযোগ এটাই প্রথম। গার্ডেন পার্টি হলেও লনের কোথাও কোনো মঞ্চ দেখা গেল না। দালানে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলসের সেনারা। জানা গেল, বর্ষাকাল, যেকোনো সময় বৃষ্টি নেমে সব আয়োজন পণ্ড হয়ে যেতে পারে; তাই আজকের আয়োজন দালানের ভেতরের নাচঘরে। বিশাল নাচঘরের মেঝে কাঠের তৈরি, তারই এক প্রান্তে চমৎকার মঞ্চ পাতা হয়েছে। যতীন তাঁর সহকারী নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে সব সরঞ্জাম গুছিয়ে খেলা দেখাবার অপেক্ষায় থাকলেন। দেখতে দেখতে পুরো নাচঘর সাহেব, মেম আর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গে ভরে উঠল। নানা রকম আনুষ্ঠানিকতা আর অন্য শিল্পীদের পরিবেশনা শেষে যখন যতীনের পালা এল, তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

মঞ্চের পর্দা উঠতেই যতীন দেখতে পেলেন সবার সামনের সারিতে সপারিষদ বসে আছেন স্বয়ং লর্ড রোনাল্ডশ, পাশে আসন নিয়েছেন ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পুরো নাচঘর আজ কানায় কানায় পরিপূর্ণ, সবাই উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছেন মঞ্চের দিকে। সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে যতীন শুরু করলেন তাঁর খেলা। একের পর দ্রুততার সাথে দেখিয়ে চললেন বিলিয়ার্ড বলের খেলা, চায়নিজ লিংকিং রিংস, শূন্যে ভাসমান বল, রাইজিং কার্ডস—এমন নানান জাদু। নিষ্পলক দর্শকের ব্যাপক আগ্রহে খেলা যখন পুরো জমে উঠেছে, সে সময় যতীন ঘোষণা করলেন তাঁর সেরা খেলাটির নাম—'ওয়াচ ইউর ওয়াচ প্লিজ' অর্থাৎ 'আপনার ঘড়িটির দিকে নজর রাখুন'। এ খেলাটি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন বিশ্বখ্যাত জাদুকর চুং লিং সুর শো দেখে। ১৯১৭ সালে কলকাতায় টানা বেশ কিছুদিন খেলা দেখিয়েছিলেন চুং লিং সু। সুর খেলা দেখে কখনো যতীনের মনে হয়নি যে তিনি জাদু দেখছেন, বরং মনে হয়েছে তিনি স্বপ্ন দেখছেন। সুর সার্থক অনুকরণে এবং পরিবেশনার গুণে নতুন শেখা সেই জাদুটাই এখন যতীনের শোর প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলা দেখাবার প্রয়োজনে তিনি দর্শকসারি থেকে একটি ঘড়ি চাইলেন, সাথে তাকে সহযোগিতার জন্য যেকোনো একজনকে মঞ্চে আহ্বান করলেন। সবাইকে অবাক করে লর্ড রোনাল্ডশ সোনার তৈরি নিজ পকেট ঘড়িটা যতীনের হাতে তুলে দিলেন। এদিকে খেলায় সহযোগিতার জন্য খোদ ঢাকার নবাব বাহাদুর মঞ্চে উঠে এলেন। ঘড়িটা হাতে নিয়ে যতীনের চোখ ছানাবড়া, ঘড়ির ব্যাস ২ ইঞ্চির কম হবে না, ওজনও ১০০ গ্রামের বেশি। এত বড় ঘড়িকে হাওয়ায় মিলিয়ে দেবেন কীভাবে! যতীন প্রমাদ গুনলেন।
নিজ মনের ভাব গোপন রেখে, সাহসে বুক বেঁধে যতীন ঘড়ির খেলাটা শুরু করলেন। নবাব বাহাদুরকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন একটা রুমাল দিয়ে সাহায্য করেন। পকেটে হাত দিয়ে সাদা একটা রুমাল বের করে আনলেন নবাব। কিন্তু একি! নবাবের রুমালে যে অসংখ্য ছিদ্র, এ রুমাল দিয়ে তো ঘড়ি লুকানো যাবে না। এত লোকের সামনে রুমালের অমন দশায় নবাব বড় বিব্রত বোধ করলেন। যতীন তখন দর্শকদের থেকে অন্য একটি রুমাল নিয়ে তাতে লাট সাহেবের ঘড়িটা ভালোভাবে বেঁধে একটা কাচের গ্লাসের ভেতর রেখে দিলেন। নবাব বাহাদুরকে ঘড়িটির দিকে নজর রাখতে বিনীত অনুরোধ করলেন তিনি। নবাব অপলক তাকিয়ে ছিলেন ওই রুমালের দিকে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন যতীন ঘড়িটি ফেরত চাইল, তখন দেখা গেল ঘড়িটি রুমাল থেকে উধাও! নবাব সাহেবের মুখ আবার শুকিয়ে গেল, দর্শকদের মধ্যেও চাঞ্চল্য দেখা দিল—সেকি! লাট সাহেবের ঘড়ি গায়েব!

নবাব হাবিবুল্লাহর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ঘড়িটার হদিস জানতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সবাই। মঞ্চে ছুটে এলেন লাট সাহেবের সহকারী স্টেফেনসন। অদূরে রাখা ফিতা বাঁধা একটা কাঠের বাক্স দেখিয়ে দিলেন যতীন। স্টেফেনসন ছুটে গেলেন সেই বাক্সের কাছে, হন্তদন্ত হয়ে সেই বাক্স খুলতে বেরোল আরেকটা বাক্স। এভাবে ৫-৬টা বাক্স খোলার পর দুটি ভাঁজ করা রেশমের রুমালের ভেতর পাওয়া গেল লাট সাহেবের উধাও হয়ে যাওয়া সোনার পকেট ঘড়ি। স্টেফেনসন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। হাতে তুলে ঘড়িটা তিনি সবাইকে দেখালেন। দর্শকের করতালিতে ফেটে পড়ল গোটা ঘর। সেদিনের পর থেকে জাদুকে পেশা হিসেবে চালিয়ে নিতে যতীনকে কখনো দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি। একের পর এক ম্যাজিক শোর প্রস্তাব আসতে থাকে যতীনের কাছে। ব্রিটিশ আমলের সংযুক্ত বাংলার প্রায় সকল লাট সাহেবকেই জাদুর খেলা দেখাবার সুযোগ পেয়েছিলেন যতীন। ভারতবর্ষের জাদুর ইতিহাসে তাঁর অবস্থান চির স্মরণীয় হয়ে যায় 'রয় দ্য মিস্টিক' নামে।
শুধু যতীন রায়ই নন, উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে গোটা বিশ শতকজুড়ে মঞ্চ মাতিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতার নির্ভেজাল মনোরঞ্জনের খোরাক জুগিয়েছেন এমন জাদুকরের সংখ্যা খুব কম না। দীর্ঘকাল ধরে লোকসমাজে অপ্রথাগত বিনোদন মাধ্যমরূপে টিকে থাকা জাদুকে যে জাদুকরেরা সমাজে উঁচু মর্যাদায়, শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাদের অনেকের কর্মপরিধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং এর প্রধান নগরী ঢাকা। অনেকে বেড়ে উঠেছেন এ শহরের আলো-হাওয়ায়, আবার কেউ কেউ জাদুকর জীবনের প্রাথমিক কালে কাজ করেছেন ঢাকায়। ঢাকাবাসী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপলক চেয়ে দেখেছে সেই জাদুর খেলা, কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়—
'বদলে যাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে অনেক কিছু—
পায়রাময় স্টেজ,
স্টিকের ডগায় টকটকে গোলাপ কখনোবা
মাটিতে কিশোরের
মুণ্ডু, কাঁধ থেকে বিচ্ছিন্ন, আবার লাগে জোড়া।
ম্যাজেশিয়ান
কী ম্যাজেস্টিক বলে দিচ্ছি হাততালি।'

সেসব জাদু হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেও তার রেশ রয়ে গেছে বাঙালির স্মৃতির খাতায়, সমসাময়িক পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায়। এই রচনা আশ্চর্য সেই জাদুকরি সন্ধ্যাগুলো খুঁজে দেখার এক ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
ভেলকিবাজ, বাজিওয়ালা এবং জাদুকরেরা
ভারতবর্ষে জাদুকে পেশা হিসেবে নেয়ার ইতিহাস বহু পুরাতন। জাদুবিদ্যা এবং সম্মোহনবিদ্যার চর্চা প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে চলে আসছে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীতেও এ অঞ্চলের জাদুকরদের পারদর্শিতার বয়ান মেলে। সাত জাদুকর মিলে আটাশটা খেলা দেখিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন মোগল দরবার। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য একটি খেলা ছিল এক বাঙালি জাদুকরের দেখানো অত্যাশ্চর্য দড়ির খেলা, যা পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের জাদুবিদ্যায় মিথ হয়ে দাঁড়ায়। বহু ভিনদেশি জাদুকর ভারতীয় জাদুর কৌশল শেখার জন্য এই ভূখণ্ডে ছুটে এসেছেন। পর্যাপ্ত চর্চা, সংরক্ষণ আর গবেষণার অভাবে সতেরো এবং আঠারো শতকে জাদুবিদ্যার স্রোতে কিছুটা ভাটা পড়ে; যে কারণে বাঁধাধরা কিছু খেলাই বংশপরম্পরায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে টিকে থাকে পথজাদু বা স্ট্রিট ম্যাজিক আকারে। এর মাঝে যে খেলাগুলোর নাম উল্লেখ করা যায়, সেগুলো হলো আমের আঁটি মাটিতে পুঁতে মুহূর্তে ফলসহ গাছ দেখানো, একটি বালককে ঝুড়িতে ভরে সবার সামনে অদৃশ্য করা, খালি পায়ে জ্বলন্ত কয়লার ওপর হেঁটে যাওয়া, আস্ত তলোয়ার গিলে খাওয়া ইত্যাদি। শহর থেকে গ্রামগঞ্জ, সর্বত্র মানুষের বিনোদনের এক অপরিহার্য উপকরণ ছিল এই পথজাদু আর ভোজবাজি। কখনো মেলায় তাঁবু ফেলে, কখনো সার্কাসের অংশ হিসেবে আবার কখনো হাটের দিনে লোক জমায়েত করে নির্মল আনন্দ জুগিয়ে গেছেন এই বাজিকরেরা। সমাজের ধনী ব্যক্তিদের পারিবারিক অনুষ্ঠানেও মাঝে মাঝে এদের ডাক পড়ত। কোনো রকম মঞ্চ ছাড়া, দর্শকের সাথে স্বল্পতম ব্যবধানে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন খেলায় জাদুকর বা বাজিকরেরা যে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা তুলনাহীন।

ইংরেজ শাসনকালে এ দেশের বাজিকরদের সুনাম সুদূর বিলেত পৌঁছাতে সময় লাগেনি। যে কারণে গোটা উনিশ শতক জুড়েই দেখা যায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাদুকর তাদের সহকারী নিয়ে জাদু প্রদর্শনের জন্য জাহাজে চেপে বিলেত এমনকি আমেরিকাও পৌঁছে গেছেন। এ অঞ্চলের জাদুকর, বাজিকর এবং ভেলকিবাজেরা ইংরেজদের কাছে সাধারণভাবে পরিচিত ছিলেন 'জাগলার' (Juggler) নামে। জাগলারের খেলায় তারা এতটাই বিমোহিত ছিল যে ১৮৯৯ সালে লন্ডনের স্ট্রান্ড ম্যাগাজিন দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দেয়, 'Ask the average man for what India is most celebrated, and chances are ten-to-one that he will ignore the glories of the Taj Mahal, the beneficence of British rule, even Mr Kipling, and will unhesitatingly reply in one word, "Jugglers".'
ভারতীয় জাদুর প্রতি পশ্চিমাদের ব্যাপক আগ্রহকে পুঁজি করে অনেক ইংরেজ ও মার্কিন জাদুকর নিজেদের খেলায় ভারতীয় আবহ আনবার চেষ্টা করেন। তাদের অনেকে জাদুর কৌশল শিখতে এবং ঔপনিবেশিকতার সুযোগে ভিনদেশি জাদুর প্রসারের জন্য ভিড় জমান ভারতবর্ষে। জাদুকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে এ দেশের যে তরুণেরা এগিয়ে এসেছিলেন, তারা বুঝতে পারেন যে বিলেতি জৌলুশের সামনে দেশীয় জাদুকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংস্কার অনিবার্য। পাশাপাশি উনিশ শতকে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারের ফলে বিজ্ঞান শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করা ছিল কঠিন। বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োগে আর পরিবেশনার কুশলতায় প্রান্তিক এই কলাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে বিনোদনজগতের উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠা করেন যে কজন বাঙালি জাদুকর, তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন গণপতি চক্রবর্তী, যতীন্দ্রনাথ রায় এবং প্রতুলচন্দ্র সরকার বা পি সি সরকার প্রমুখ। বাংলায় জাদু নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেজ শোর চলও আসে এদের হাত ধরেই। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তাঁরা মাতিয়ে রাখেন বাংলার আপামর জনতাকে। জীবনে প্রথম জাদু দেখে হতবাক হওয়ার স্মৃতি তাই উঠে এসেছে বহু লেখকের কলমে। জাদুর আসরের সেই মুগ্ধতা, মুহূর্তের সেই আবেশ জীবনের লক্ষ্য পাল্টে দিয়েছিল এমন উদাহরণও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে না।

ম্যাজিক শো—স্মৃতির পাতায়, রোজনামচায়
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জাদুকর পি সি সরকার (সিনিয়র), জাদুকর গণপতি চক্রবর্তীকে ভারতীয় জাদুবিদ্যার জনক মানতেন। গণপতি জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরের কাছে ছাতরা গ্রামে একটি জমিদার পরিবারে। লেখাপড়ায় তাঁর একেবারেই আগ্রহ ছিল না। বেশির ভাগ সময়ে তিনি গানবাজনা আর তবলা নিয়ে মেতে থাকতেন। পরিবারের শাসনে বিরক্ত হয়ে একসময়ে বাড়ি থেকে পালালেন গণপতি। গোটা ভারত ঘুরলেন সাধু-সন্ন্যাসীর দলের সাথে, শিখলেন নানান মন্ত্রতন্ত্র, ঝাড়ফুঁক। দু-একজন জাদুকরের সান্নিধ্যে এসে টুকটাক জাদুও তিনি শিখলেন। একসময়ে কলকাতা ফিরে এসে তিনি যোগ দিলেন প্রফেসর প্রিয়নাথ বোসের 'গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস' দলে। বোসের সার্কাস দলের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে, গোটা ভারতে শো করে বেড়াচ্ছে। সার্কাসে বিভিন্ন খেলার ফাঁকে ফাঁকে কৌতুকের সাথে মজাদার সব জাদু দেখিয়ে গণপতি দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিলেন। অচিরেই সার্কাসের অপরিহার্য শিল্পী হয়ে উঠলেন জাদুকর গণপতি। গণপতি যখন তাঁর বিখ্যাত ইলিউশন বক্স, ইলিউশন ট্রি আর বিশেষভাবে 'কংস কারাগার' নামের জাদুর খেলার জন্ম দিলেন, তখন তিনিই হয়ে উঠলেন বোসের সার্কাসের প্রধান আকর্ষণ। 'কংস কারাগার' খেলায় কারাগারের মতো দেখতে একটি খাঁচার ভেতর ডান্ডাবেড়ি, হাতকড়া এসব প্রচুর সংখ্যায় লাগিয়ে গণপতিকে আটকে রাখা হতো। কারও সাহায্য ছাড়া সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া ছিল অসম্ভব। অথচ গণপতি খুব অনায়াসে এবং দ্রুতবেগে খাঁচা শূন্য করে বেরিয়ে আসতেন এবং এরপর আবার ঠিক বন্দী অবস্থাতে ফিরেও যেতেন। পুরো বিষয়টা ছিল দর্শকদের জন্য ভৌতিক, অভাবনীয়! দর্শকদের মনে এই ধারণা দৃঢ়মূল হয়ে যায় যে তিনি ভৌতিক ক্ষমতাসিদ্ধ।
সার্কাসের অন্য সব খেলা নিষ্প্রভ হয়ে গেল গণপতির এই খেলার সামনে। সর্বত্র সার্কাসের প্রচারপত্রে দর্শক সমাগমের জন্য এই খেলার নামই বিজ্ঞাপিত হতো। সার্কাস দলের সাথে দেশের সব প্রান্তে ঘুরে ঘুরে খেলা দেখাতে লাগলেন গণপতি। বোসের সার্কাস দলের সঙ্গী হয়ে এবং পরবর্তীকালে এককভাবেও বহুবার ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার অনেক শহরে জাদু দেখিয়েছেন গণপতি চক্রবর্তী। গণপতি এই সার্কাস দলের সাথে প্রথম ঢাকা আসেন ১৮৮৯ সালের ডিসেম্বরে। ঢাকা প্রকাশের প্রকাশিত সংবাদমতে ১৮৮৯ সালে গোটা ডিসেম্বর মাসজুড়ে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস ঢাকাবাসীর জন্য 'ক্রীড়া প্রদর্শন' আয়োজন করে। বিশ শতকের প্রথম ভাগেও বেশ কয়েকবার ঢাকা আসেন জাদুকর গণপতি। জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের জ্যেষ্ঠ কন্যা যোবায়দা মির্যার স্মৃতিকথা 'সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি' থেকে—'আব্বু বেশ আমুদে-হুজুগে ছিলেন। ঢাকায় যত কার্নিভ্যাল সার্কাস এসেছে গণপতি/পি সি সরকারের ম্যাজিক; হামিদা পাহলওয়ানের দুই হাতে ফুল স্পিডে চলন্ত দুই মোটরকার থামিয়ে দেওয়া; কে এল সায়গল/পাহাড়ী স্যানালের গান; সংযুক্তা সেনের নাচ, ইত্যাদি সবই দেখা চাই আমাদের সক্কলকে নিয়ে।'

১৯১৫-১৬ সালের কথা, পাবনা টাউন হলে একদিন আয়োজন করা হয় গণপতি চক্রবর্তীর একক ম্যাজিক শো। লেখক পরিমল গোস্বামী তখন এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র। এ সময়ে তত দিন তিনি বোসের সার্কাস দল ত্যাগ করেছেন। 'স্মৃতিচিত্রণ' বইয়ে পরিমল গোস্বামী লিখেছেন সেই ম্যাজিক শোর কথা—'উচ্চাঙ্গের ম্যাজিক সম্পর্কে তৎপূর্বে কোনো ধারণা, ছিল না। বেদেনীদের ভোজবাজি দেখেছি শুধু। ম্যাজিকে আমার ভীষণ আকর্ষণ, অতএব গণপতির ম্যাজিকের টিকিট কিনে ঢুকে পড়লাম। ইলিউশন বক্সের খেলা দেখে বেশ ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। অলৌকিকত্বে কোনো বিশ্বাস ছিল না, অথচ নিজের বুদ্ধিতে কোনো লৌকিক ব্যাখ্যা নেই, এ বড়ই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা। জাদুকরের রসসৃষ্টির ক্ষমতায় পুলকিত হয়েছিলাম। পরপর তিন দিন দেখলাম, তবু রহস্য রহস্যই থেকে গেল। শুধু এই ভেবে সান্ত্বনা লাভ করলাম যে কৌশল একটা আছেই, শুধু আমার তা জানা নেই। যারা আত্মিক ব্যাপার বলে বোঝাতে এসেছিল, তদের সঙ্গে কিছু বিরোধ হয়েছিল মনে আছে। একটি খেলা খুব উপভোগ্য মনে হয়েছিল। জাদুকর ছোট টেবিলে ছোট্ট একটি কঠের বাক্স রেখে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে খুব খানিকটা বক্তৃতা দিয়ে নিলেন। বললেন, এর মধ্যে মারাত্মক এক সাপ আছে, এ খেলাটি তাই খুব বিপজ্জনক। দর্শকদের মধ্যে সাহসী যদি কেউ থাকেন তবে উঠে আসুন।'
একজন সাহসী ব্যক্তি মঞ্চে ওঠার পর গণপতি তার হাতে একটি লাঠি তুলে দিয়ে বাক্স খোলামাত্র সাপের মাথায় সজোরে আঘাত করতে বললেন। বারবার তিনি হুঁশিয়ারি দিলেন যে মুহূর্তের অসতর্কতায় অঘটন ঘটে যেতে পারে। গণপতির উপস্থাপনার গুণে সমস্ত দর্শক দম বন্ধ করে বসে ছিলেন কী ঘটে তা দেখবার জন্য। তবে সব উত্তেজনা শেষে বাক্স থেকে সাপের পরিবর্তে বেরিয়েছিল অনেক অনেক ফুলের তোড়া, তিন টেবিল উপচে পড়েছিল সেই ফুল। পুরো ব্যাপারটার উদ্দেশ্য ছিল দুটি খেলার বিরতিতে দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখা এবং বিশুদ্ধ বিনোদন দেওয়া।

জাদুর জগতের কিংবদন্তি যতীন্দ্রনাথ রায় জন্মেছিলেন ১৮৯১ সালে, ঢাকা শহরে এক বিশিষ্ট ব্রাহ্ম পরিবারে। যতীনের বাবা কালী ভৈরব রায় ধামরাইয়ের একটি জমিদারি এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় স্কুলের একটি নাটকে অভিনয়কালে দর্শকের হাস্যোস্পদ হয়েছিলেন। সেদিনই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে ভবিষ্যতে এমন অবস্থানে যাবেন, যাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে একাই আসর মাত করে এই অপমানের শোধ তুলতে পারেন। ১৯০৮ সালে ঢাকার ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটারের মঞ্চে কলকাতার বিশিষ্ট জাদুকর এমিন সোহরাওয়ার্দীর ম্যাজিক শো দেখে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ যতীন এতটাই মুগ্ধ হন যে জাদুকে তিনি পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তবে জাদুকর এমিন তাঁকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে রাজি ছিলেন না। যতীনকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এলেন তাঁর এক বন্ধু; যতীনের হাতে তুলে দিলেন হফম্যানের বিখ্যাত বই মডার্ন ম্যাজিক। সেই বইয়ের সাহায্য নিয়ে আর বিদেশ থেকে সরঞ্জাম আনিয়ে যতীন তাঁর জাদুচর্চা শুরু করলেন। এর কিছুদিন পর তিনি সরকারি চাকরি নিয়ে চলে গেলেন জলপাইগুড়ি, তবে জাদুর নেশা তাঁকে ছাড়ল না। জলপাইগুড়িতে গণপতি চক্রবর্তীর দর্শক মাতানো সফল প্রদর্শনীর পর যতীনের আর চাকরিতে মন টিকল না। সব ছেড়েছুড়ে ঢাকায় এসে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গণপতির অনুকরণে একটা জাদুর দল তৈরি করলেন। এই দল নিয়ে ১৯১২ সালে ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চে জনসাধারণের সামনে জাদু প্রদর্শন করলেন যতীন। দুর্ভাগ্যবশত উপযুক্ত প্রস্তুতির অভাবে তেমন সাফল্য তিনি অর্জন করতে পারলেন না। এরপর সবার আড়ালে নিভৃতে জাদুবিদ্যা চর্চা করবার জন্য গৃহশিক্ষকতার কাজ নিয়ে যতীন বিহারের এক গ্রামে চলে গেলেন। একাগ্র অনুশীলনের মাধ্যমে হাত সাফাই আর ভেন্ট্রিলোকুইজমে দক্ষ হয়ে উঠলেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯১৬ সালে বিহারের টি এন জুবিলী কলেজে একক জাদু প্রদর্শনী নিয়ে আবির্ভূত হলেন যতীন। এবারে তিনি ব্যাপক সফলতা পেলেন। এরপর 'রয় দ্য মিস্টিক' নামে বাংলা, বিহার, আসাম ও উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে জাদু প্রদর্শন করে বেশ আর্থিক সাফল্য লাভ করলেন যতীন। তাঁর জাদুর ক্ষমতা দেখে অধিকাংশ দর্শক তাকে অতিমানব ভাবতেন। যতীনের বেশভূষা, মঞ্চে বক্তৃতা ও জাদু প্রদর্শন সব ছিল ইংরেজ কায়দায়, তাই ইউরোপীয় মহলে জাদুকর হিসেবে তাঁর বিপুল সমাদর ছিল। জাদুর যে কোনো আয়োজনে ইউরোপীয় ক্লাব, বিশেষভাবে চা-বাগানে কর্মরত ইংরেজদের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন যতীন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের আন্দোলন, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, এ রকম বিবিধ ঘটনায় ইউরোপীয় মহলে বাঙালিদের যাতায়াত সীমিত হয়ে যায়। যতীন্দ্রনাথের শুভানুধ্যায়ী কয়েকজন ইংরেজ পুলিশের সন্দেহ থেকে বাঁচতে তাঁকে ইউরোপীয় মহলে চলাফেরা করতে নিষেধ করেন। ১৯৩২ সালে তিনি জাদুর পেশা ছেড়ে দার্জিলিংয়ে ইউনাইটেড টি সার্ভিস নামে চায়ের এক ব্যবসা গড়ে তোলেন।

অধ্যাপক অজিত কৃষ্ণ বসু যখন যতীনের ম্যাজিক শো দেখেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর। যতীনের জাদু অজিতকে এমনই মুগ্ধ করেছিল যে গোটা জীবন তিনি সেই মোহ থেকে বের হতে পারেননি। তারুণ্যে পি সি সরকারের সাথে একসাথে জাদুর চর্চা করেছেন অজিত। পরিণত বয়সে দেশ বিদেশের জাদুকরদের নিয়ে লিখেছিলেন 'জাদু-কাহিনী' নামে অসামান্য এক স্মৃতিকথা। 'জাদু-কাহিনী' থেকে যতীন প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণা—'আমার দেখা প্রথম জাদুকর "রয় দি মিস্টিক"—বাংলা তর্জমায় যার মানে "অতীন্দ্রিয়বাদী রায়"। তাকে প্রথম দেখলাম এক সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে রেলওয়ে ইনস্টিটিউট হলে। তিনি ঘণ্টা দুয়েক জাদু-খেলা দেখালেন পাশ্চাত্য পোশাকে পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে। বছরটা ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ, কিন্তু সেই সুদূর সন্ধ্যার স্মৃতি এমন মধুর স্বপ্নময় বিস্ময়ে ভরা যে এখনো মন থেকে মুছে যায়নি। নয়ন-মনোহারিণী রূপসী সহকারিণী ছিল না তাঁর, শুধু অপরূপ জাদু-প্রদর্শনের আকর্ষণে তিনি হলশুদ্ধ সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। মঞ্চের পর্দা ওঠার পর দর্শকদের অভিবাদন জানিয়ে একের পর এক মাল্টিপ্লায়িং বিলিয়ার্ড বল, চায়নিজ লিঙ্কিং রিং, রাইজিং কার্ডস, ফ্লোটিং লেডির খেলা দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন যতীন। অজিত লিখেছেন, মনে হতে লাগল এই মায়াবী লোকটি যা খুশি তাই অনায়াসে করতে পারেন, নাপোলেয়ঁর মতো এর অভিধানেও "অসম্ভব" শব্দটি অনুপস্থিত।'
পি সি সরকার জন্মেছিলেন ১৯১৩ সালে টাঙ্গাইলের আশেকপুর গ্রামে। পিতা ভগবানচন্দ্র জাদুর খেলা জানতেন, কিন্তু সমাজের ভ্রুকুটির ভয়ে প্রকাশ্যে জাদু দেখাতেন না। তিনি মনে করতেন জাদুকে আর্ট হিসেবে নেওয়ার মতো মানসিকতা তখনকার সমাজে তৈরি হয়নি; লোকেরা একে তুকতাক কারসাজি আর ভূত-প্রেতের চর্চা হিসেবেই মনে করে। সমাজে একঘরে করতে পারে, এই ভয়ে তিনি জাদুচর্চা করতেন আয়নার সামনে। ছেলেকে অল্প কয়েকটি খেলা শিখিয়েছিলেন। প্রতুল মূলত জাদু শেখেন জাদুকর গণপতি চক্রবর্তীর কাছে। প্রতুল যখন আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র, তখন ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস মাঠে জাদু দেখাতে এলেন গণপতি। বন্ধুদের নিয়ে জাদুর আসরে চলে গেলেন প্রতুল, গণপতির জাদু দেখে তিনি যারপরনাই মুগ্ধ। পরদিন গণপতির তাঁবুতে গিয়ে হাজির হলেন প্রতুল। কলেজপড়ুয়া ছাত্রের খামখেয়ালি ভেবে গণপতি তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে চেষ্টা করলেন। তাতে বিশেষ ফল হলো না, বরং গণপতির পিছু নিয়ে তিনি গৌরীপুর পর্যন্ত চলে গেলেন, তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। জাদুর জগতে জাদুকর প্রতুলচন্দ্র সরকার নিজের ইংরেজি নামের বানান ঝড়ৎপবৎবৎ-এর অনুকরণে করলেন চ ঈ ঝড়ৎপধৎ। জাদু পরিবেশনের পোশাকে আনলেন পরিবর্তন, গণপতি চক্রবর্তী এবং যতীন্দ্রনাথ রায় যেখানে ইংরেজদের অনুকরণে কোট, প্যান্ট পরে শো দেখাতেন, সেখানে সেসব ছেড়ে ঝলমলে ভারতীয় পোশাক আর পাগড়ি নিয়ে দর্শকের সামনে দাঁড়ালেন পি সি সরকার। পুত্র প্রদীপচন্দ্র সরকার বা পি সি সরকার (জুনিয়র) তাঁর আত্মজীবনী 'আমার জীবন আমার ম্যাজিক' বইতে পিতা প্রতুলকে নিয়ে লিখেছেন, 'ম্যাজিক দেখাবার অভিনবত্ব তো বটেই, সুশিক্ষিত, মার্জিত পরিবেশন পদ্ধতি এবং নতুন নামের রোম্যান্টিসিজমের জন্য প্রতুলচন্দ্রের নাম পি সি সরকার হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ল জেলায়। এবং জেলা থেকে ঢাকা শহরেও। ঢাকায় বেশ কয়েকটা শো করে ফেললেন। এবং তখনই বন্ধুবান্ধবের উৎসাহে ও পরামর্শে রওনা হলেন কলকাতার উদ্দেশে।'

প্রথম জীবনে পি সি সরকার গোটা বাংলাজুড়ে বিদ্যালয়ে, সার্কাসে, পাবলিক হলে, থিয়েটারে এমনকি পারিবারিক আয়োজনেও জাদু দেখিয়ে আসর মাত করেছেন। বাংলার প্রধান প্রধান প্রায় সব শহরে ছুটে গেছেন নিজের জাদুর দল নিয়ে। নাট্যব্যক্তিত্ব ওবায়দুল হক সরকারের শৈশব কেটেছে পশ্চিম বাংলার বাঁকুড়ায়। তিনি স্মরণ করেছেন বিশ শতকের প্রথমভাগের বাঁকুড়া শহরে পি সি সরকারের জাদু দেখাবার কথা, 'বাঁকুড়া শহরে দুটো সিনেমা হল ছিল। তিরিশের দশকে সিনেমা তেমন জনপ্রিয় হয়নি। হল দুটো প্রায়ই খালি পড়ে থাকত।...দর্শককে সিনেমামুখী করার উদ্দেশ্যে একটি সিনেমা হলের মালিক জাদুসম্রাট পি সি সরকারকে নিয়ে এলেন। সেই সিনেমা হলে দর্শক সমাগম হলো।
ভাষাসৈনিক ডা. সাঈদ হায়দার জীবনে প্রথম জাদু দেখেছিলেন পি সি সরকারের শোতে। তিনি তখন পাবনা জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র; ডা. সাঈদ স্মৃতিচারণা করেছেন, 'হঠাৎ ছেলেদের মধ্যে চাঞ্চল্য, বিখ্যাত জাদুকর পি সি সোরকার আসছেন পাবনায় এবং তার প্রথম প্রদর্শনী হবে আমাদের স্কুলে পরদিন সকাল দশটায়। পি সি সোরকার নামটার সাথে আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম, কাগজে প্রায়ই তার একটা বিজ্ঞাপন বের হতো বুকিংয়ের আহ্বান জানিয়ে। এই বিজ্ঞাপনের একটা বিশেষত্ব ছিল, চিঠিপত্র লেখার সময় সঠিকভাবে তার নামের বানান লিখতে বলতেন, তিনি সরকার না লিখে সোরকার লিখতে বলতেন এবং ঠিকানা থাকত টাঙ্গাইলের।
'পরদিন স্কুলের বড় হল ঘরটায় চেয়ার বেঞ্চিতে মানুষ ঠাসা, তিল ধারণের স্থান অবশিষ্ট নেই। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, ঘড়ির কাঁটা কখন দশটা ছাড়িয়ে গেছে, মিনিটের কাঁটাটা পুনরায় আরেক পাক ঘুরে আসা সমাপ্ত করবে করবে করছে, প্রায় এগারোটা বাজতে চলেছে, মানুষ যখন একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠেছে, তখনই হলে প্রবেশ করলেন সোরকার। উদ্যোক্তরা তার বিলম্বের জন্য অনুযোগ করলেন, সোরকার সরাসরি মঞ্চে উঠে এসে সবাইকে অভিবাদন করে তার বিলম্বিত উপস্থিতির জন্য ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু তারপরই দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, কিন্তু দেখুন তো আমি কি সত্যি বিলম্ব করেছি। আমার ঘড়িতে তো দশটা বাজতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি। সবাই তাদের হাতঘড়ি আর পকেটঘড়ির দিকে তাকালেন, কী আশ্চর্য সবার ঘড়িতেই দশটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের হাতে ঘড়ি, সে যুগে এটা ছিল কল্পনাতীত। দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি তখনো দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। একেই কি বলে গণসম্মোহন? এই গেল আমার দেখা পি সি সোরকারের সেদিনের প্রথম খেলা।

'আমি সেবারই প্রথম দেখি পি সি সোরকারের তৎকালীন বিখ্যাত ম্যাজিক এক্সরে আই; পরে অবশ্য অনেকেই এটা দেখিয়েছেন। প্রথমে ময়দার লেচি, তারপর কালো রুমাল দিয়ে চোখ বেঁধে ম্যাজিশিয়ান দর্শকদের মধ্য থেকে উঠে আসা লোকদের বলে বোর্ডে যা ইচ্ছে তাই লিখতে। এমনকি বীজগণিত, জ্যামিতি বা লগারিদমের কঠিন অঙ্কও। ম্যাজিশিয়ানের কাজ হলো ওরা যা লেখে তা বলে দেওয়া। ওরা যদি অঙ্ক বা কোনো অক্ষর না লিখে চক দিয়ে শুধু আঁকাজোকা করে, তবে ম্যাজিশিয়ান তারই সাথে আরও কিছু যোগ করে একটা কার্টুন বা ছবি এঁকে দিত। সায়েন্সের মাস্টার ডিগ্রিধারী পি সি সোরকার খুব ভালো ছবিও আঁকতে পারতেন। পরদিন সোরকার চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়িঘোড়া চলাচলে জনাকীর্ণ পাবনা স্ট্র্যান্ড রোড (পরে যার নাম আব্দুল হামিদ রোড) দিয়ে নিপুণতার সাথে সাইকেল চালিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এসব খেলা কিশোর বয়সে আমাকে ভীষণভাবে অভিভূত করে ফেলে এবং একবার আমি ম্যাজিকের বই সংগ্রহেও উদ্যোগী হয়ে পড়ি।'
ঢাকায় একবার দ্য ডিজলভিং কার্ড নামের খেলা দেখাতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েছিলেন পি সি সরকার। সে কথা এসেছে তাঁর 'হিন্দু ম্যাজিক' নামের বইতে। সেবার তিনি খেলায় ব্যবহৃত সেলুলয়েডের স্বচ্ছ কার্ডটি ম্যাজিক শো শেষ হওয়ার পর পানির জগ থেকে তুলতে ভুলে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘণ্টা পর যে বাড়িতে তিনি খেলা দেখাতে এসেছিলেন, সে বাড়ির ভৃত্য এসে মালিককে কার্ডটি ফেরত দিয়ে জানায় যে সে এটি পানির জগে পেয়েছে। এভাবে বাড়ির মালিকের সামনে খেলার কৌশল ফাঁস হয়ে যায়। পঞ্চাশের দশকে গোটা বিশ্বজুড়ে একের পর সফল জাদু প্রদর্শনী করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন পি সি সরকার।
বিশ শতকের প্রথম ভাগে ঢাকায় নিয়মিতভাবে জাদু প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো। ঢাকার নবাববাড়ির সদস্যদের লেখা ডায়েরিতেও এ প্রসঙ্গটি এসেছে। খাজা শামসুল হকের ডায়েরি থেকে ১৯১১ সালের ২২ মার্চে আহসান মঞ্জিলের একটি আনন্দ অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়, যেখানে নবাব সলিমুল্লাহ শহরের গণ্যমান্য হিন্দু ও মুসলমানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই সন্ধ্যায় গোটা প্রাসাদে আলোকসজ্জা করা হয়। রাতে বায়োস্কোপ এবং জাদু দেখানো হয়। খাজা মওদুদের ডায়েরিতে স্ত্রী আজিজুন নেসাকে নিয়ে ম্যাজিক শো দেখতে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তাঁর ডায়েরি থেকে আরও জানা যায় ১৯১৭ সালের ৭ আগস্টের এক ম্যাজিক শোর কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তহবিল সংগ্রহের জন্য রেলওয়ের মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে এই শোর আয়োজন করা হয়। খাজা আতিকুল্লাহকে নিয়ে তিনি সে আয়োজন উপভোগ করেন। এসব কোনো আয়োজনেরই জাদুকরদের নাম জানা যায় না। এ তো গেল বিশ শতকের কথা। উনিশ শতকের শেষ ভাগের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে হয়। নবাব পরিবারের খাজা আহসানউল্লাহ জাদু বিষয়ে এতটা উৎসুক ছিলেন যে ১৮৯৯ সালে বিখ্যাত ইংরেজ জাদুকর চার্লস বেরট্রামের জাদু দেখবার জন্য সপরিবারে কলকাতায় উপস্থিত হয়ে জাদুকরের প্রাইভেট শো আয়োজন করেছিলেন। চার্লস বেরট্রাম নিজ ভ্রমণকথা 'এ ম্যাজিশিয়ান ইন মেনি ল্যান্ডস' নামের বইতে সে কথা উল্লেখ করেছেন।

উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত যে কয়জন মঞ্চমাতানো ভিনদেশি জাদুকর ভারতবর্ষে এসেছেন, তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম চার্লস বেরট্রাম। চার্লস ছিলেন ইংরেজ রাজকীয় দরবারের জাদুকর। ১৮৯৯ সালে তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহর ভ্রমণের একপর্যায়ে তিনি কলকাতা আসেন এবং সেখানকার গভর্নমেন্ট হাউসে রাজকীয় ব্যক্তিদের জন্য জাদু প্রদর্শন করেন। লর্ড কার্জন এবং লেডি কার্জনের সামনে খেলা দেখিয়ে চার্লস ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। এরপর মার্চের এক সন্ধ্যায় ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ও তাঁর পরিবারের জন্য গভর্নমেন্ট হাউসেই ম্যাজিক শোর আয়োজন করা হয়। নবাবের স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা পর্দার আড়াল থেকে চার্লসের জাদু উপভোগ করেন। চার্লস জানিয়েছেন যে নবাব তাঁর জাদু দেখে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাকে নিজের একটি ফটোগ্রাফ, রুপার নকশা করা একটি পাত্র এবং বড় অঙ্কের একটি চেক উপহার দেন।
চার্লস বেরট্রাম ছাড়াও আরও যে সকল ভিনদেশি জাদুকর এ সময়ে ভারতবর্ষে আসেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হ্যারি কেলার, হিউজ সিমন্স লিন, হাওয়ার্ড থার্স্টন, চুং লিং সু প্রমুখ। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগে, এত সব ভিনদেশি জাদুকরের কেউ পূর্ব বাংলার প্রধান শহর ঢাকায় এসেছিলেন কি না!
প্রফেসর ক্যাম্পবেল—এক অমীমাংসিত রহস্য
১৮৮৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে প্রকাশিত বেঙ্গল টাইমস পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হলো—প্রফেসর ক্যাম্পবেল নামে এক মার্কিন জাদুকর সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকার রেলওয়ে ইনস্টিটিউটে জাদু দেখাবেন। পরদিন থেকে সপ্তাহজুড়ে সেই শো চলবে জগন্নাথ স্কুলের থিয়েটার হলে। প্রতি রাতেই নতুন নতুন খেলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছাপানো এ বিজ্ঞাপনে দর্শনীর যে তথ্য দেওয়া ছিল, তা হলো—সংরক্ষিত আসন ৩ টাকা, সামনের সারি ২ টাকা আর পেছনের সারি ১ টাকা। ঢাকায় এর আগে কোনো ভিনদেশি জাদুকরের শোর কথা জানা যায় না। তাহলে প্রশ্ন হলো, কে এই ক্যাম্পবেল? এই নামের কোনো মার্কিন জাদুকর কি আদৌ ছিল? যদি এই নামের জাদুকরের অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে তিনি কি ওই সময়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন?
সমসাময়িক মার্কিন পত্রিকাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রফেসর ক্যাম্পবেল নামের একজন জাদুকরের সন্ধান পাওয়া যায়, যার প্রকৃত নাম ছিল জেমস ক্যাম্পবেল রবিনসন। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৩৩ সালে, নিউইয়র্ক শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন ইংরেজ, মা ছিলেন স্কটিশ। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি নামের শেষ অংশ বাদ দিয়ে জিম ক্যাম্পবেল হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি প্রফেসর এইচ জে ক্যাম্পবেল অথবা শুধু প্রফেসর ক্যাম্পবেল নামে কাজ করেছেন। সেকালের জাদুকরদের অনেকে নিজেদের নামের আগে 'প্রফেসর' উপাধি বসিয়ে দিতেন। সমাজের লোকের কাছে নিজেদের বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপারটা প্রচারের উদ্দেশ্যে তারা এই উপাধি ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা যায়। প্রফেসর ক্যাম্পবেল জাদু দেখানো ছাড়াও ভেন্ট্রিলোকুইজম এবং ছদ্মবেশ ধারণে ছিলেন দক্ষ। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনর্গল কথা বলার দক্ষতা থাকার কারণে থিয়েটারে তাঁর আলাদা কদর ছিল। এ ছাড়া দীর্ঘকাল পাঞ্চ ও জুডি নামের পাপেট শো পরিচালনা করেছেন। বড় সন্তান উইলিয়াম রবিনসনের জাদুতে হাতে খড়ি হয়েছিল ক্যাম্পবেলের কাছে। পুত্র রবিনসন প্রথম দিকে বিভিন্ন শোতে নিজ নামেই খেলা দেখাতেন। পরবর্তীকালে সুপ্রতিষ্ঠিত এক চীনা জাদুকর চিং লিং ফুর নামের অনুকরণে রবিনসন নাম ধারণ করেন চুং লিং সু এবং ব্যাপক সফলতা অর্জন করেন।
ছদ্মবেশ ধারণ, সুপরিচিত কোনো ব্যক্তিত্বের নামের অনুকরণে নিজের নাম বদলে প্রসার লাভের আকাক্সক্ষা—এসব বৈশিষ্ট্য প্রফেসর ক্যাম্পবেল এবং তাঁর ছেলে দুজনের মাঝেই ছিল প্রবল। চুং লিং সু নতুন জাদু শেখার প্রয়োজনে বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। এ সময়ে তিনি সাধারণত নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতেন। কিন্তু তাঁর পিতা ক্যাম্পবেল দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এমন কোনো তথ্য আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাদুকর চুং লিং সুকে নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন লেখক জিম স্টেইনমেয়ার। স্টেইনমেয়ারের লেখা বই 'দ্য গ্লোরিয়াস ডিসেপশন'-এ চুং লিং সুর পিতা হিসেবে বেশ কয়েকবার ক্যাম্পবেলের নাম এসেছে। ক্যাম্পবেল কখনোই পুত্র রবিনসন বা চুং লিং সুর মতো বড় জাদুকর ছিলেন না। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সারির একজন জাদুকর, যিনি মূলত নিউইয়র্ক শহর বা এর আশেপাশের মফস্বল এলাকাগুলোতে ছোটখাটো শো করে বেড়াতেন। ক্যাম্পবেল বিদেশ সফর করেছেন কিংবা বড় কোনো শো করেছেন এমন কোনো তথ্য স্টেইনমেয়ারের জানা নেই। তাই ঢাকায় ম্যাজিক শো করা ব্যক্তি যে এই একই মার্কিন জাদুকর ক্যাম্পবেল, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। তা ছাড়া যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সে সময়ে দর্শক আকর্ষণের জন্য অতিরঞ্জিত প্রচার ছিল স্বাভাবিক একটি বিষয়। তাহলে সুদূর আমেরিকার জাদুকর 'প্রফেসর ক্যাম্পবেল'-এর নামটা ধার করে অন্য কোনো ভিনদেশি কি সেদিন জাদু দেখিয়ে ঢাকাবাসীকে তাক লাগিয়ে আর এরপর চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল? প্রশ্নটির উত্তর অজানাই রয়ে গেল; রহস্যময়ই থেকে গেলেন ঢাকায় আগত ভিনদেশি 'প্রফেসর ক্যাম্পবেল'।
কালের স্রোতে
শৈশবের কোনো এক সন্ধ্যায় পথজাদুকরের খেলা দেখবার স্মৃতি কবি শামসুর রাহমান কখনো ভুলে যাননি। স্মৃতিকাতর কবি লিখেছেন—
'চকবাজারের ঘিঞ্জি গলির কিনারে
ম্যাজিকঅলার খেলা দেখেছি মোহন সন্ধ্যেবেলা'
ঔপন্যাসিক অধ্যাপক হুমায়ূন আহমেদ সন্ধান পেয়েছিলেন এক পথজাদুকরের, যিনি নামমাত্র মূল্যে জাদুর খেলা শেখাতেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তাঁর স্মৃতিচারণা থেকে, 'ঢাকার পথেঘাটে হাঁটতে হাঁটতে একবার এক ম্যাজিশিয়ানের দেখা পেলাম। বেশির ভাগ সময়ই ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখাবার পর ওষুধ বিক্রি করে। এই ম্যাজিশিয়ান সে রকম না। তিনি ম্যাজিকের কৌশল টাকার বিনিময়ে শিখিয়ে দেন। কেউ যদি সেই আইটেম কিনতে চায়, তা-ও তিনি বিক্রি করেন। আমি তার ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ। চারটা তাস নিয়েছেন। চার বিবি। ফুঁ দেয়া মাত্র বিবিদের ছবি মুছে গেল। হয়ে গেল চারটা টেক্কা। এই ম্যাজিকটার দাম পাঁচ টাকা। আমি পাঁচ টাকা দিয়ে ম্যাজিকটা কিনলাম। ম্যাজিশিয়ান আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কৌশল ব্যাখ্যা করলেন এবং চারটা তাস আমাকে দিয়ে দিলেন।'
শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অতি সামান্য দর্শনীর বিনিময়ে যেসব জাদুকরেরা ছেলেবুড়াদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন, তাদের আর্থিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন শত বছরেও ঘটেনি। শিল্পীর মর্যাদা তারা কোনো দিন পাননি। পরনে শতছিন্ন কোট, মলিন বেশভূষা, জীবিকার তাগিদে এক শহর থেকে আরেক শহর, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে চলার যে অর্ধাহারী-অনাহারী জীবন, তা এই পথজাদুকরদের পরবর্তী প্রজন্মকে কখনো আকৃষ্ট করেনি। একের পর এক হারিয়ে গেছেন শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদের পথজাদুকরেরা, হারিয়ে গেছে তিন চার হাতের মাঝে নিতান্ত তুচ্ছ সরঞ্জামে দেখানো তাদের মনোমুগ্ধকর সব হাতের খেলা।
মঞ্চের জাদুকরদের মাঝে যতীন্দ্রনাথ রায় দেশভাগের আগেই দার্জিলিংয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁর শেষ জীবন কেটেছে কলকাতায়। দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় পি সি সরকারের জাদু প্রদর্শনী অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পঞ্চাশের দশকে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হাসপাতাল নির্মাণে তহবিল সংগ্রহের জন্য অল্প কিছু বড় আকারের শো করেন পি সি সরকার। তবে পি সি সরকারের মতো মঞ্চ মাতিয়ে নিজস্ব শোম্যানশিপের গুণে গোটা আয়োজনের ভার একা তুলে নিতে পারেন এমন একজনের জন্য এই ভূখণ্ডের মানুষকে অপেক্ষা করতে হয় দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে এ দেশের জাদুমঞ্চে আবির্ভূত হন জুয়েল আইচ।