আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের প্রভাবে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি পেলে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে?
আফগান মাটিতে আজ ইতিহাসের আর এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হতে যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান দখল করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দখলের পিছনে ছিল তাদের পুরনো তত্ত্ব, "দখল করো এবং সমাজতন্ত্র কায়েম করো"। ১৯১৭ সালে লেলিনের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তাদের এই রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথম লক্ষ্য ছিল- মধ্য এশিয়া। তারপর ক্রমান্বয়ে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের একটি বিশাল অংশ নিয়ে সোভিয়েতের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট (ওয়ারশ প্যাক্ট) গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে স্ট্যালিন আফগানিস্তানের মতো করেই বেশ কিছু ভূখণ্ড দখল করে নিয়ে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন বিপ্লব রপ্তানিতে ব্যস্ত, তখনও বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হয়ে উঠেনি। সেই সময় পর্যন্ত মূলত বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো সোভিয়েত ইউনিয়ন, সঙ্গে ছিল ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বিশ্ব রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মার্কিনীরা এগুতে থাকে। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত দখলদারিত্ব উচ্ছেদের লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানে জিহাদি ও পরবর্তীতে তালেবানের জন্ম হয়। আফগান জিহাদ বিন লাদেনকেও সৃষ্টি করে। আফগানেই সোভিয়েত বিরোধী শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও অস্ত্র দ্বারা তালেবান ও বিন লাদেনদের সংগঠিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত আর্থিক এবং অস্ত্র সহায়তায় কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয় না।
আফগানিস্তানে দীর্ঘ ১০ বছর মার্কিন সহায়তায় মুজাহেদিন বাহিনী ও বিন লাদেন সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ১০ বছরের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তালেবান এবং বিন লাদেন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং আফগান মাটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয় ঘটায়।
সময়টা মিখাইল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকার। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজে রুদ্ধতার পরিবর্তে 'মুক্ত চিন্তা' ও 'পুনর্গঠন' প্রবর্তনের চিন্তা করেছেলেন উদারপন্থী নেতা মিখাইল গর্বাচেভ। ১৯৮৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি গর্বাচেভ তার এই নতুন চিন্তা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় উত্থাপন করেন। পরিবর্তনের হাওয়া দ্রুত বইতে শুরু করে ইউরোপ- এশিয়ার সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোতে। বড় ধাক্কাটা লাগে নিজ দেশেই। সোভিয়েত কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৪টি দেশ স্বাধীন হয়। তারও আগেই আফগান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার তরান্বিত হয়। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যুগোস্লোভিয়া ভেঙে বেশ কয়েকটি নতুন দেশের জন্ম হয়।
আফগান বিদ্রোহীরা প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনে সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় আরব রাজ্যগুলো থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তা প্রাপ্ত হয়। ১৯৮৮ সালের ১৫ মে আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্তভাবে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয় এবং ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়। সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরও তালিবানী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলতে থাকে এবং ৭ বছর পর '৯৬ সালে তালেবান পরিপূর্ণভাবে আফগান শাসনের দায়িত্ব নেয়।
এরপর তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর ও আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা বিন লাদেন আফগানিস্তান তথা সমগ্র বিশ্বে খেলাফত প্রতিষ্ঠায় আমেরিকাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলাফল; ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ার আক্রমণ। প্রতিহিংসায় মত্ত আমেরিকা ও তার মিত্র ন্যাটো আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সামরিক অবস্থাননেয়। টুইন টাওয়ারের ঘটনা 'সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ' এর নামে পৃথিবীব্যাপী আমেরিকা ও তার মিত্রদের জোরপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয়।
টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর মোল্লা ওমরকে উচ্ছেদ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দখলে নেয় আফগানিস্তানকে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত অনুকরণে একটি তাবেদার সরকার গঠন করে। আড়াই লক্ষ কোটি ডলার খরচ করে আফগান সমাজে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে ২০ বছর ধরে। সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ আফগানিস্তান থেকে তাদের সর্বশেষ সৈন্য প্রত্যাহার করছে। এর আগেও পরাজিত শক্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনাম যুদ্ধে একই কাজ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘকাল সেখানে নিজেদের সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুদ্ধকে উৎসাহিত করে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে উত্তরের কাছে পরাজিত হয়ে সায়গন ত্যাগ করেছিল।
সেদিন দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যে সকল ভিয়েতনামী সহায়তা করেছিল তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করেছিল। মার্কিন সৈন্যদের জন্য অপেক্ষমান যুদ্ধ জাহাজে প্রাণভয়ে পলায়নরত ভিয়েতনামিদের ঠাঁই দিয়েছিল। প্রায় দুই লাখের অধিক ভিয়েতনামি আমেরিকায় অভিবাসন গ্রহণ করেছিল। কিন্তু, এখন কাবুলে কী হচ্ছে? প্রাণভয়ে ভীত আফগানদের পক্ষে আমেরিকা দাঁড়ায়নি। বিশ্ব বিবেকের উচিত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কিন্তু সেটা হবে না। কারণ, পশ্চিমারা এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাত মিলিয়েছিল।
ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ইতালির মতো দেশগুলো জড়িত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এই দেশগুলো ইরাকেও অভিযান পরিচালনা করেছিল। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিদ্ধংসী অস্ত্র মজুদের অভিযোগ তোলা হলেও পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। নিউওয়ার্ক টাইমসের মতো দৈনিকও ভূয়া প্রতিবেদন ছেপে ইরাক দখলের বৈধতা দিয়েছিল। বিশ্ববিবেক তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেনি।
আজ যে মুহূর্তে তারা আফগানিস্তান ত্যাগ করছে সেই মুহূর্তে আফগান রাষ্ট্রটির অবস্থা পৃথিবীর সবচেয়ে সংকটময়। দেশটির জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ পশতুভাষী তালেবানরা ক্ষমতায়। অন্যদিকে বিভিন্ন উপজাতি, গোষ্ঠী তালেবানদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তালেবানদের বিরুদ্ধে অনড় ও শক্ত অবস্থান নিয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত। এর বাইরে আছে আইএস নামক পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা বহুকাল যাবৎ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের হলি আর্টিজান কিংবা আরো দু'এক জায়গায় এদের দেখা গিয়েছিল। আজকের আফগানের ক্ষমতা দখল এই উপমহাদেশের সবকটি দেশেই ব্যাপকভাবে প্রভাব সৃষ্টি করবে।
মোকাবেলার কৌশল কী হবে আমাদের মতো দেশগুলোর? আমাদের অসুবিধা হলো, দেশের সরকার এবং সমাজ রাজনৈতিকভাবে ভীষণ বিভক্ত। প্রতিনিয়তিই নতুন-পুরাতন বিভিন্ন বিষয় সামনে এনে বিভক্তি আরো তীব্র করা হয় ।
দেশের বর্তমান সরকারের সমালোচক এক ডাক্তার বুদ্ধিজীবী আফগান তালেবানদের সেদেশের 'মুক্তিযোদ্ধা' হিসেবে বর্ণনা করছেন। একই সুর সুর মিলিয়েছেন কোন কোন ধর্মীয় মৌলবাদিী বুদ্ধিজীবী। অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিভাজন তালেবান মতাদর্শের শক্তি জোগাবে এখানে। বাংলাদেশের এই বিভাজিত রাজনীতির ফলেই হেফাজত ইসলামের জন্ম হয়েছিল। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তাদেরকে গুরুত্বসহকারে সামাজিক বিভাজনের রাস্তা থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কোন বিষয় ও ঘটনা সামনে এনে দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিণাম সামনে আরো ভয়ঙ্কর হতে পারে।
- লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
