পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন: চরম ভোগান্তি যাত্রীদের, দেড়গুণ ভাড়ায় চলছে বিআরটিসি
গত বুধবার রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল থেকে ধর্মঘটের ডাক দেন বাস, ট্রাকসহ পণ্যবাহী যানবাহনের মালিকেরা। দ্বিতীয় দিন, শনিবারও ধর্মঘটের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
রাজধানীতে বিআরটিসির দ্বিতল বাসগুলো চালু থাকলেও দেড়গুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। শনিবার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ নানা প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া মানুষদের পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তি।
বাস না চলায় অফিসগামী লোকজনকে বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশা, সিএনজি কিংবা প্রাইভেট কারে চলাচল করতে হয়েছে। বাস না চলায় এবং অন্যান্য বাহনে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকানোয় হেঁটেই গন্তব্যে রওয়ানা দিয়েছেন অনেকে।
সাত কলেজসহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী ও চাকরী প্রত্যাশীরা।
আরিফুর রহমান, মিরপুরের বাসিন্দা। বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কয়েকদিন যাবত আমার অফিসের গাড়ি বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে বাসে আসা-যাওয়া করছি। আমার অফিস কাওরান বাজারে। মিরপুর থেকে বাসে করে চলে যাই। গতকাল শুক্রবার অফিস বন্ধ ছিল। আজ সমস্যা হচ্ছে। কোনো বাস চলছে না।
এদিকে সিএনজি ৪০০ টাকা ভাড়া যাচ্ছে। যা ২০০ টাকার ওপরে হওয়ার কথা নয়। মোটরসাইকেলের সাথে কথা বললাম, তারা আড়াইশো টাকার নিচে যাবে না।
'রিক্সার সাথে কথা বললাম, তারাও ২০০ টাকা দাবি করছে। আরো কিছুক্ষণ দেখব, হয়তো রিক্সা নিয়েই চলে যাব।'
ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে অফিস করতে যেতে ভোর ৮টা থেকেই অপেক্ষা করছিলেন সুস্মিতা পাল। এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও উঠতে পারেনি কোনো বিআরটিসি বাসে। শেষে একটা সিএনজি নিয়ে ৩০০ টাকা ভাড়ায় মতিঝিলে রওনা দেন।
সুস্মিতা টিবিএসকে বলেন, '১৫ টাকার ভাড়া আমাকে ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। সবসময় ভোগান্তিতে এই আমাদের মতো সাধারণ মানুষদেরই পড়তে হয়।'
রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাদের আসতে হচ্ছে, তারাও পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা সালমান টিবিএসকে বলেন, 'মিরপুর থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজে আসতে হয়েছে সকালে। গাড়ি না পেয়ে তিনগুণ ভাড়া দিয়ে রিক্সায় এসেছি।'
এছাড়া বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরাও। যানবাহনের অভাবে তারা ঠিকমতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছেন না।
গাইবান্ধা থেকে চাকরির পরীক্ষা দিতে আসা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, 'শুক্রবারে চাকরির পরীক্ষা ছিল; আজকেও পরীক্ষা আছে। তাই কল্যাণপুর থেকে গিয়েছিলাম। কল্যাণনপুর থেকে ১০টায় রওনা দিয়ে ১১টার দিকে ফার্মগেট আসি বিআরটিসিতে। এখন তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে পরীক্ষাকেন্দ্র, সেখানে হেঁটেই যেতে হবে। রিক্সায় ভাড়া চাচ্ছে ২০০ টাকা, যেটা দিয়ে যাওয়া সম্ভব না।'
সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা তিতাস খান টিবিএসকে বলেন, 'আজকে পরীক্ষা, তাই গতকাল ভেঙে ভেঙে গাজীপুর থেকে এসেছি। ভাড়া লেগেছে ৪০০ টাকা, যেখানে অন্য সময় ৫০ টাকার বেশি লাগে না। সকালে বের হয়ে কোনো গাড়ি না পেয়ে ফার্মগেট থেকে ঢাকা কলেজে হেঁটেই এসেছি।'
এছাড়াও আজ বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ খোলা থাকায় বিপদে পড়েছে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরাও।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া খুশবু বলেন, 'আজ জরুরি ভিত্তিতে আমার ভার্সিটিতে যেতেই হবে। বাস নাই, সিএনজি মোটরসাইকেলও অতিরিক্ত ভাড়া চাচ্ছে। বিপদে পড়ে গেছি আজ।'
তবে সকালে বিআরটিসি ছাড়া অন্য কোনো বাস চলতে দেখা না গেলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন সিটিং সার্ভিসের কয়েকটি বাস চলাচল করতে দেখা যায়।
বিআরটিসির সুপারভাইজার সাব্বির টিবিএসকে বলেন, 'বিআরটিসি চলতে কোনো বাধা নেই, তবে ভাড়া দেড়গুণ নেওয়া হচ্ছে।'
বিআরটিসি ভাড়া দেড়গুণ নেওয়ার কথা বললেও কোথাও কোথাও ভাড়া দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণও রাখতে দেখা যায়।
ফার্মগেট থেকে গুলিস্তান ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা, আবার কারও কারও কাছ থেকে ৩০ টাকা রাখার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। সিএনজি, রিক্সা ও রাইড শেয়ারিং বাইকগুলো নির্ধারিত ভাড়ার থেকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা।
সরকারের সমস্যা সমাধানে দেরি হওয়ায় যাত্রীদের পাশাপাশি সমস্যায় আছেন পরিবহন শ্রমিকরাও।
মোহাম্মদ মুকুল নামের একজন পরিবহন শ্রমিক বলেন, কাজ করলে প্রতিদিন ৫০০ টাকা পাই, যা দিয়ে বাজার করে খাই। গতকাল কাজ বন্ধ থাকায় কোনো আয় ছিল না। তারপরে জিনিসের দাম বেড়েছে। আজও কাজ বন্ধ। তার মানে আজও আমাদের কোনো আয় হচ্ছে না। সরকার মালিকদের একটা দাবি মানতে দুই দিন লাগে?
