যেভাবে একজন নেতা তৈরি হয়

ড্যানিয়েল গোলম্যান বিশ্বের প্রথম সারির মনস্তত্ত্ববিদদের একজন। তিনিই প্রথম ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা'র ধারণাটি জনসমক্ষে নিয়ে আসেন।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-তে গোলম্যান 'হোয়াট মেইকস আ লিডার' (যেভাবে একজন নেতা তৈরি হন) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি নেতৃত্বের সাথে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন।
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার চারটি ক্ষেত্র রয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে আত্মসচেতনতা। এটিকে দক্ষতার একটি চমৎকার সেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন গোলম্যান। কারণ এটি মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে, এর ধারণাটি নিগূঢ়, এবং এটি খুব বেশি খাটো করে দেখা হয়। বাকি তিনটি ক্ষেত্রের জন্যও আত্মসচেতনতা ভীষণ জরুরি।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হচ্ছে আত্ম-ব্যবস্থাপনা বা সেলফ-ম্যানেজমেন্ট। আপনি যদি আপনার ভেতরে কী ঘটছে সেটা না জানেন, তাহলে অন্যদের দেখাশোনা করবেন কীভাবে? আত্ম-ব্যবস্থাপনা'র মানে হচ্ছে নিজের আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা, যাতে সেগুলো আপনার চলার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়াতে পারে।
এমপ্যাথি বা সমানুভূতি হচ্ছে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার তৃতীয় ক্ষেত্র। এটির জন্য আবার প্রয়োজন ভালো আত্মসচেতনতা। অনেক গবেষণাতেই জানা গেছে, যাদের মধ্যে আত্মসচেতনতা কম, তারা অন্য মানুষকে বুঝতে বা অনুভব করতে পারেন না।
বাকি ক্ষেত্রটি হচ্ছে সামাজিক দক্ষতা বা সোশ্যাল স্কিলস। এটি হচ্ছে মূলত সম্পর্কের ব্যবস্থাপনা। এর সাথে জড়িয়ে আছে প্রভাব, যোগাযোগ, ব্যাখ্যাকরণ, টিমওয়ার্ক ইত্যাদির মতো নেতৃত্বের গুণগুলোও।
সমানুভূতির তিন ধরন
গোলম্যান সমানুভূতির তিনটি ধরনের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে কগনিটিভ এমপ্যাথি। এটি দ্বারা মূলত অন্যরা কীভাবে চিন্তা করে তা বোঝার ক্ষমতা নির্দেশ করে। যেসব নেতার ভালো কগনিটিভ এমপ্যাথি আছে তারা কথাবার্তার মাধ্যমে সহজেই অন্যের ওপর প্রভাব বা রেশ রাখতে পারেন।
দ্বিতীয় ধরনের এমপ্যাথিকে বলা হয় আবেগজনিত সমানুভূতি বা ইমোশনাল এমপ্যাথি। নিজের মানসিক দক্ষতা বা উইট-কে অনুভব করতে পারাটাই ইমোশনাল এমপ্যাথি। এটির সাথে মস্তিষ্কের মিরর নিউরনস নামের একটি প্রক্রিয়া জড়িত। এই মিরর নিউরনের কারণে আমরা বুঝতে পারি অপর ব্যক্তির মনের মধ্যে কী চলছে, তারা কী করবেন ভাবছেন ইত্যাদি। এটির কারণেই মানুষের মধ্যে সম্পর্কের রসায়ন সৃষ্টি হয়।
তৃতীয় প্রকারের এমপ্যাথিকে বলা হচ্ছে এমপ্যাথিক কনসার্ন। গোলম্যান বলেন, 'এটি যে নেতার মধ্যে থাকবে, তিনি আপনার প্রতি যত্ন নেবেন, এমন একটা পরিবেশ আপনাকে তৈরি করে দেবেন যেটাতে আপনি আপনার সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা অনায়াসে প্রকাশ করতে পারবেন।'
মানুষ সাধারণত আইকিউ পাল্টাতে পারেনা। কিন্তু গোলম্যান জানিয়েছেন, একজন মানুষ চাইলেই তার আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার উন্নতি ঘটাতে পারেন। 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কোনো নির্দিষ্ট সামর্থ্যের স্তরে অবস্থান করে না, এটি নিয়ত বৃদ্ধি পেতে চায়,' বলেন গোলম্যান।
'আমরা যখন কাউকে ম্যাচিউর বলি, তখন আদতে আমরা ওই ব্যক্তির আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, নিজের ওপর ভালো নিয়ন্ত্রণ, অন্য লোকের সাথে তাদের নিজেদের যুক্ত করার ক্ষমতা ইত্যাদিকে বোঝাতে চাই। বিভিন্ন প্রমাণিত প্রক্রিয়া অবলম্বন করে কোনো ব্যক্তির আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা'র মাত্রা আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব,' গোলম্যান মন্তব্য করেন।
তবে সব ব্যবস্থাপকই যে তার দল বা অধীনস্থ অন্য নেতাদের মধ্যে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা উন্নতিকরণ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন, তা কিন্তু নয়। অনেকে কাজ ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর মধ্যে সহসম্পর্ক অনুধাবন করতে পারবেন না। তবে বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এটাই নির্দেশ করে যে যেসব নেতার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বেশি, কর্মক্ষেত্রে তারা অনেক ভালো ফলাফল অর্জন করেন।
সমালোচনার শিল্প
কারও সমালোচনা করা সহজ। কিন্তু সমালোচনা না করে কাউকে যদি তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ভুল করা ব্যক্তি নতুন কিছু শিখে নিজের উন্নতি ঘটাতে পারেন। আর তাছাড়া সমালোচনা মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে।
'আপনি একটুক্ষণ চুপ করে থাকতে পারেন, এরপর ভুল করা ব্যক্তিকে বলতে পারেন তার কোন কাজটি কী কারণে ভালো হয়নি। এর ফলে ওই ব্যক্তি মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনবেন। একজন বুদ্ধিমান সমালোচক ভুল শোধরানোর উপায়গুলোও বলে দিতে পারেন। নেতা হিসেবে এরকম পরিস্থিতিতে এভাবেই আচরণ করা শ্রেয়,' বলের গোলম্যান।
মানুষের মস্তিষ্কের আবেগীয় কেন্দ্রের সাথে চিন্তন কেন্দ্রের শক্তিশালী যোগ রয়েছে। বিশেষত মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর সাথে এ ব্যাপারসমূহের দারুণ যোগ রয়েছে। অতিমাত্রায় নেতিবাচক আবেগ মস্তিষ্কের এ অংশটির ভালোভাবে কাজ করার ক্ষমতক হ্রাস করে দেয়।
'আপনার মনে ঠিক এ মুহুর্তে কী চলছে, আপনি কোন বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন, কিসের মধ্যে আপনার মনোযোগ আটকে আছে; এ ব্যাপারগুলোকে ওয়ার্কিং মেমরি বলা হয়। এটির ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট। তাই আপনি যখন রাগান্বিত, বিষণ্ণ, ব্যাকুল, হতাশ ইত্যাদি চিন্তা করেন তখন ওয়ার্কিং মেমরির পরিসর আরও ছোট হয়ে যায়। ওয়ার্কিং মেমরির মাধ্যমে আমরা পরিষ্কারভাবে ভাবতে পারি, সঠিক সিদ্ধান্ত নেই, ভালো কোনো পরিকল্পনা করতে পারি, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে পারি,' বলেন গোলম্যান।
সুতরাং, নেতিবাচক মানসিক অবস্থা আপনার ভালো কর্মদক্ষতাকে হ্রাস করে দেয়। মানুষের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হলে উল্টোটা ঘটে। ভালো নেতারা এই ব্যাপারটি জানেন এবং তারা চান কর্মীদের মস্তিষ্কে এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি করে দিতে যাতে কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দিতে পারেন।
এ সময়ে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা
গোলম্যান তার বেস্টসেলার বই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স লিখেছেন প্রায় ২৫ বছর আগে। দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনার চিন্তাধারায় এতদিন পরে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়েছে এমন প্রশ্ন করলে এ মনস্তাত্ত্বিক বলেন, 'আমার মনে হয় এটি এখন বহুল প্রচলিত একটি ধারণা। অবশ্য সবার মধ্যে নয়। আজকার তরুণদের মধ্যে এ গুণটির অস্তিত্ব খুবই স্বাভাবিক হিসেবে বিচার করা হয়।'
যেসব গুণ একজন মানুষকে দক্ষ নেতায় পরিণত করে তা আরেকবার দেখে নেওয়া যাক।
১) তারা নিজেদের ভিশন অন্যের সাথে শেয়ার করেন। তাদের যোগাযোগ দক্ষতা ভালো।
২) তারা কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত তৈরি করেন।
৩) এ ধরনের নেতারা ন্যায়পরায়ণ হন। নিজেদের বিশ্বাসে অটল থাকেন তারা।
৪) দক্ষ নেতারা কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নিতে সক্ষম হন। কারণ নেতারা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলে তাতে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়।
৫) অন্যের সফলতাকে স্বীকৃতি দেন তারা। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ভালো কাজের প্রশংসা করলে তাদের কাজের উৎসাহ বেড়ে যায়।
৬) কারও একার পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না। তাই দক্ষ নেতারা অন্যের মধ্যে সম্ভাবনা দেখলে তা আরও বিকশিত করতে সহায়তা করেন। এছাড়া তারা অন্যদেরকে প্রেরণা যোগান, কাজে উৎসাহ প্রদান করেন।
সূত্র: হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ