জরুরি কাজ ফেলে রেখে গড়িমসির অভ্যাস দূর করবেন কীভাবে?

হাতে খুব জরুরি একটা কাজ আছে,কিন্তু সেটা না করে ঘর পরিষ্কার করতে লেগে যাওয়া। কিংবা পরে দেখবো বলে দিনের জরুরি সব ইমেইল রাতের জন্য ফেলে রাখা । এসব অভ্যাস কমবেশি পরিচিত মনে হচ্ছে কি? এই সমস্যাকেই বলা হয় 'প্রোক্রাস্টিনেশন' ,অর্থাৎ জরুরি কাজ ফেলে রেখে গড়িমসি করা।
কারও কাছে এটা সাময়িক বিষয়। কিন্তু কারও জন্য এটি আবার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এই গড়িমসির স্বভাব। শুধু সময়ের অপচয় নয়, এই অভ্যাসের ফলে মনে অনুশোচনা, অপরাধবোধ আর মানসিক চাপও সৃষ্টি হয়।
তবে কেন কেউ বারবার গড়িমসি করছেন তা যদি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তাহলে সেটি সামাল দেওয়া সহজ হয়ে যায়।
এই লেখায় তুলে ধরা হলো গড়িমসির পেছনের মানসিক কারণগুলো। সঙ্গে থাকছে এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার পাঁচটি ধাপ।
আপনি কি গড়িমসি করছেন?
কোনো কাজ শুরু করতে দেরি করা, মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া বা শেষ মুহূর্তে গিয়ে করা সবই গড়িমসির অংশ। 'পরে শুরু করব' বা 'দেরিতে করলেও ক্ষতি নেই' এমন ভাবনাগুলো এর লক্ষণ।
মাঝে মাঝে তো সময় যে নষ্ট হচ্ছে তা বুঝে ওঠাই কঠিন হয়ে যায়। হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঘণ্টাখানেক সময় তো মোবাইল স্ক্রল করতেই শেষ। এদিকে কেউ আবার লম্বা সময় জলাঞ্জলি দিয়ে অনলাইন শপিং বা বিড়ালের ভিডিও দেখছে। অথচ জরুরি অ্যাসাইনমেন্টটি এখনো পড়ে আছে।
তবে এই সমস্যাকে নিজের ব্যক্তিত্বের কোন ত্রুটি মনে করবার কিছু নেই। গড়িমসি করা মানেই কেউ অলস বা দায়িত্বজ্ঞানহীন, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। বরং নিজেকে এভাবে দোষারোপ করলে সমস্যাটা আরও বাড়তে পারে। তখন প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হয়ে ওঠে আরও কঠিন। গড়িমসি বন্ধ করতে চাইলে আগে বুঝতে হবে, কেন এমনটা হচ্ছে।
গড়িমসি করার কারণ কী?
গড়িমসি অনেক সময় জটিল অনুভূতি থেকে বাঁচার একটি উপায়। গবেষণা বলছে, মানুষ এমন কাজগুলো ফেলে রাখে যেগুলো একঘেয়ে, বিরক্তিকর, মানসিক চাপের বা নিজের কাছে অর্থহীন মনে হয়।
কিছু কিছু কাজ আবার কষ্টদায়ক আবেগ তৈরি করে। যেমন ট্যাক্স ফাইল করতে বসা, যেখানে টাকা জমা দিতে হবে, কিংবা মা–বাবার মৃত্যুর পর তাদের ঘরবাড়ির গোছগাছ। এসব কাজ মানসিকভাবে কষ্টদায়ক বলেই এড়িয়ে যেতে মন চায়।
তবে এর পেছনে আরও গভীর কিছু মানসিক কারণও থাকতে পারে।
গড়িমসি অনেক সময় সব কাজে নিখুঁত হতে চাওয়ার প্রবণতা থেকেও আসে। কেউ কেউ এতটাই ভয় পান ভুল করার, যে সেই ভয়ই কাজের শুরুটা আটকে দেয়। এমন নিখুঁত হবার চাপে কাজ শুরু করাই হয়ে ওঠে কঠিন।
আবার যাদের আত্মবিশ্বাস কম, তারাও অনেক সময় কাজ ফেলে রাখেন। তারা হয়তো নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করেন না, কিন্তু নিজেদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ভাবেন, 'আমি ভালো পারি না', 'সঠিকভাবে করতে পারব না', এইসব ভাবনা থেকে পিছিয়ে পড়েন।
গড়িমসির পেছনে মাঝে মাঝে মনযোগ ছুটে যাবার ভূমিকাও থাকে। কাজের মধ্যে হঠাৎ মোবাইলের পিং শব্দে নোটিফিকেশন আমাদের মনযোগ কেড়ে নেয়। নিবিড় মনযোগ ধরে রাখাই যেন এখনকার সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে যারা খুব সহজে মনোযোগ হারান, তাদের ক্ষেত্রে এটা অন্য সংকেতও হতে পারে। হয়তো তারা মন থেকে এই কাজটি এড়িয়ে যেতেই চাইছেন।
কিছু মানুষের জন্য কাজ শেষ করতে না পারা হতে পারে আরও গভীর মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত। যেমন অ্যাটেনশন-ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (এডিএইচডি)। যদি মনে হয়, গড়িমসি জীবনের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
গড়িমসির কি কোন ভালো দিক আছে?
অনেকেই ডেডলাইনের আগে শেষ মুহূর্তের চাপ উপভোগ করেন। কেননা এটিই তাদের কাজ এগিয়ে নেবার আসল প্রেরণা। এতে সময়ও বাঁচে, মনোযোগও বাড়ে।
আবার, গড়িমসি হতে পারে মানসিক এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যে কাজটা করতে ইচ্ছে হয় না, সেটা এড়িয়ে চললেই তো স্বস্তি। ভুল করার আশঙ্কা, বা নেতিবাচক ফলাফলের ভয়-এসবের মুখোমুখি না হলেই তো ভালো। তবে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী। দীর্ঘমেয়াদে এর ফল বেশ জটিল।
কাজ ফেলে রাখার পর অনেকেই নিজের উপর বিরক্ত হন। আসে অপরাধবোধ, লজ্জা, হতাশা। এসব মিলে বাড়ে মানসিক চাপ।
গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিনের এমন অভ্যাস মারাত্মক হতাশা ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এমনকি পড়াশোনায় খারাপ ফল, পরীক্ষায় নকল ধরা পড়া বা চাকরিতে পিছিয়ে পড়ার মতো ঘটনাও এর সঙ্গে জড়িত। বেতনের পরিমাণ কম হওয়া বা বেকার থাকার আশঙ্কাও এর ফলে বাড়ে।
তাহলে এই সমস্যা মোকাবেলায় কি করা যেতে পারে?
১. মেনে নিন – আপনি গড়িমসি করছেন
সবচেয়ে আগে দরকার স্বীকার করে নেওয়া। কাজ ফেলে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়ার এই অভ্যাসটা চিনে ফেলাই প্রথম পদক্ষেপ।
২. কারণটা খুঁজে বের করুন
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন ,গড়িমসির কারণ কী? ভুল করার ভয়? অসম্ভব লম্বা টু-ডু লিস্ট? নাকি শেষ মুহূর্তের চাপে কাজ করতে চাওয়ার ইচ্ছা? যদি অতিরিক্ত নিখুঁত কাজের আকঙ্খায় , ভুল করার ভয়ে বা আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে এই সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে থেরাপিস্টের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা সিবিটি এমন সমস্যার চিকিৎসায় বেশ কার্যকর হয়ে থাকে।
৩. অগ্রাধিকার ঠিক করুন
টু-ডু লিস্টটা আবার খুঁটিয়ে দেখা দরকার যে সবচেয়ে জরুরি বা গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো উপরে আছে তো? সময় ঠিকভাবে ভাগ করা হয়েছে তো?
একটা বড় কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। মাঝে মাঝে বিরতি নিলে চাপ কমবে।এছাড়াও দিনের শুরুতেই সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলো শেষ করে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে।
৪. মনোযোগে বাধা এড়িয়ে চলুন
কাজের সময়ে মোবাইলে 'ডু নট ডিস্টার্ব' চালু করা ভালো। দরজায় ঝোলানো যেতে পারে 'ব্যস্ত আছি' লেখা সাইন। প্রিয়জনদের জানিয়ে রাখতে হবে এই সময়ে আপনি অফলাইনে থাকবেন। এছাড়া কাজ শুরুর ও শেষের সময় নির্ধারণ করে নিলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
৫. পুরস্কার দিন নিজেকে
জীবন এমনিতেই কঠিন। তাই কঠিন কাজের পর নিজেকে ছোট্ট একটা পুরস্কার দিন। টু-ডু লিস্টে টিক পড়ার পর একটু গান শোনা, প্রিয় কিছু খাওয়া, কিংবা ছোট্ট একটা বিরতি সবই হতে পারে উপহার। এতে পরের কাজগুলোর মুখোমুখি হওয়াটাও সহজ হয়ে যায়।
অনুবাদ : নাফিসা ইসলাম মেঘা