Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

Wednesday
April 22, 2026

Sign In
Subscribe
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
WEDNESDAY, APRIL 22, 2026
সুতপার আঙুল

ইজেল

নুসরৎ নওরিন
10 July, 2021, 09:25 am
Last modified: 10 July, 2021, 03:45 pm

Related News

  • হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?
  • প্রচ্ছদ: হু আর ইউ
  • আইজ্যাক বাবেলের গল্প | বুড়ো শ্লয়মি
  • জ্যাক রিচি-র রোমাঞ্চ গল্প | ২২ তলা উপরে—২২ তলা নিচে
  • মনিরু রাভানিপুরের গল্প | তেহরান 

সুতপার আঙুল

দুদিন লাইব্রেরিতে বসে সুতপা আমি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করি। লাইব্রেরি খোলা থাকে দুটা পর্যন্ত। দ্বিতীয় দিন বিকেল চারটায় স্যারকে দিতে হবে। এই অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে সুতপার সঙ্গে কথাবার্তা। আমি ঝড়ের বেগে লিখবার সময় তার চোখে পড়ে আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলটার অর্ধেক নেই। সে বলে, ‘তোমার আঙুলে কী হয়েছে, তারেক?’
নুসরৎ নওরিন
10 July, 2021, 09:25 am
Last modified: 10 July, 2021, 03:45 pm

সুতপার সঙ্গে বারবার দেখা হয়। কিন্তু প্রতিবারই একটা ব্যাপার অসমাপ্ত থাকে। ওর কোনো স্মৃতিও আমার ঠিকমত মনে থাকে না। কেবল একটি ছাড়া। সুতপা আমার জীবনে এসেছিল এক দিনের জন্য। ঠিক 'এক দিন'ই বলা যায়। কারণ তার আগের কোনো দিনের ঘটনা আমার মনে নেই। আর পরের ঘটনাগুলোতে মনে রাখার মত কিছু নেই।

আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলের ওপরের অংশটা নেই। ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনায় ওটা কাটা পড়েছিল। ফলে আঙুলটা অন্য রকম। একদিন আঙুলটা সুতপার চোখে পড়ে। সেদিন সারাদিন সে আঙুলটা তার কড়ে আঙুলে ধরে হেঁটেছিল। 

তখন আমরা কলেজে পড়ি। আমরা একই ক্লাসে পড়লেও আগে কথাবার্তা হয়নি কখনো। তাই সেটাকেই আমি প্রথম দেখার দিন ধরি।আমরা দুজনেই একটা টার্ম পরীক্ষা মিস করেছিলাম। এনায়েত স্যার আমাদের একটা অ্যাসাইনমেন্ট দেন। স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে সুতপা গজরাচ্ছিল। দরকার ছিল না। দোষ আমাদেরই। বিভিন্ন কারণে আমরা পরীক্ষা মিস করেছি। দুদিন লাইব্রেরিতে বসে দুজন অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করি। লাইব্রেরি খোলা থাকে দুটা পর্যন্ত। দ্বিতীয় দিন বিকেল চারটায় স্যারকে দিতে হবে। এই অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে সুতপার সঙ্গে কথাবার্তা। আমি ঝড়ের বেগে লিখবার সময় তার চোখে পড়ে আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলটার অর্ধেক নেই।

সে বলে, 'তোমার আঙুলে কী হয়েছে, তারেক?'

সুতরাং তাকে ঘটনাটা বলি।আমার বয়স তিন কিংবা চার। আমার পরিবার বলতে আমার দাদা। একদিন তিনি ক্ষেত থেকে এক গাদা ঘাস নিয়ে এসেছেন। বড় একটা কাঠের ওপর রেখে ওগুলো কাটছেন। আমি অস্থির দৌড়াদৌড়ি করছি। আমাদের একটা ধবধবে সাদা ছাগলের বাচ্চা ছিল। তাকে ধরার চেষ্টা করছি।দাদা দুবার ধমক দিয়েছেন। তৃতীয়বার ধমক দেওয়ার আগেই আমার হাত গিয়ে পড়ল সেই কাঠের ওপর। ধারালো দায়ের এক কোপে কাটা পড়া আঙুলটা মাটিতে পড়ে লাফাতে থাকে। তখনও আঙুলটা জীবিত।এই গল্প সুতপা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। মনে হল প্রতিটি শব্দ গিলছে। যখন বলি দাদা এখনও ঘটনাটা বলার সময় কাঁদেন। তখন সুতপার চোখে পানি। এই গল্প তাকেই প্রথম করেছি তা নয়। অনেকবার শুনে জিনিসটা আমার মুখস্ত, আর বলতে বলতে খুঁটিনাটি প্রতিবার মনে পড়ে। কাটা পড়া আঙুলটার লাফানোর কথা শুনে সবার চোখে অস্বস্তি কাজ করে।কিন্তু সুতপার চোখে অস্বস্তির চেয়ে বেশি সমবেদনা। 

সুতপা বলল, 'দেখি তোমার আঙুলটা।'

এই বলে সে টেবিলের ওপর দিয়ে হাত এগিয়ে খুব কোমলভাবে আমার কড়ে আঙুলটা স্পর্শ করে। মনে হয় আঙুলটা খুব মূল্যবান কিছু। এমনভাবে হাত বুলিয়ে ছুঁয়ে দেখে যেন কাটা অংশটা শূন্য নয়।সেদিন আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হবার পর আমরা দুপুরে কিছু খাওয়ার জন্য রুহুল ভাইয়ের ক্যান্টিনে যাই। বারোটা পর্যন্ত সরগরম থাকলেও এরপর একদম ভীড় পাতলা হয়ে যায়। একসঙ্গে দুজন আলুর চপ আর চা খাওয়ার পর সময় কাটানোর জন্য ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করি। হালকা হালকা ঠান্ডা। পুরোনো লাল বিল্ডিং, বটগাছ, দিঘির ঘাট, কাঠবিড়ালি, শালিক এসবের মধ্যে সময়টা মৃদুভাবে বয়ে যাচ্ছে। শুধু একাডেমিক বিল্ডিংয়ের গেটে একজন দপ্তরী আর ভেতরে আমাদের এনায়েত স্যার ব্যস্ত তাঁর কাজে। তাঁর কাছেই চারটার সময় অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার কথা।হাঁটাহাঁটির সময় সুতপা তার বাম হাতে আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলটা ধরে রাখে। 

আমাকে বলে, 'তারেক, আজকে আমার জীবনের একটা বিশেষ দিন।'

আমি বলি, 'কী আজকে?'
সে ভ্রু নাচিয়ে বলে, 'পরে বলব।'

সুতপা কিছুটা পাগলাটে ধরনের। আমাদের ক্লাসের ছেলেরা তাকে আড়ালে 'পান্ডা' ডাকে। কেন জানি না। তাকে সবাই একটু ভয়ও পায়। এ মেয়ের মনে হুটহাট যা আসে সে তাই করে। তবুও সেদিন আমার বুকের মধ্যে একটু পরপর রক্ত ছলকে ওঠে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে কথাবার্তা বলি। বেশিরভাগ কথা সুতপাই বলে। ওর এক দিদার অনেক গল্প। এক সময় আমার মনে হয় ওর এই দিদাকে না দেখলে আমার জীবনের অর্ধেকটাই বৃথা। সাদা শাড়ি, সাদা চুল, পিঠ বাঁকা করে হাঁটা শুভ্র, সুন্দর ছোটখাট এক বৃদ্ধা মাথার মধ্যে ঢুকে যায়। দিদা তাকে মন্টি ডাকে।স্কুলের রহিম স্যারের গল্প করে সুতপা। স্কুলগুলোর কোনোটাই তার তেমন প্রিয় না। বান্ধবীরা ছাড়া।অঞ্জন দত্তের 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' গানটা তার খুব পছন্দ। বিকেল চারটা নাগাদ আমার মনে হয় সুতপা মেয়েটাকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি, তার বাদামী বিড়ালকে রোজ ঘুমাতে দেখি। সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি সুতপার নীল মার্কার পেন কোন ফাঁকে আমার ব্যাগে ঢুকে পড়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই পরদিন কলেজে যাওয়ার আগে আমার উত্তেজনার শেষ নেই। অপেক্ষায় আছি কখন সুতপাকে দেখব।কিন্তু ফার্স্ট পিরিয়ড, সেকেন্ড পিরিয়ড পার হয়। অপেক্ষা শেষ হয় না। সুতপা আসে না। শুধু তাই না, এরপরের সাত দিনও সে আসে না। স্যার অ্যাসাইনমেন্টের মার্কস দিয়েছেন। আমি ৬৭ পার্সেন্ট আর সুতপা ৫৯ পার্সেন্ট মার্কস পেয়েছে। প্রায় একই জিনিস লিখেও সে কম পেয়েছে কারণ তার তাড়াহুড়ো। তার ছোট ছোট ভুল হয়।যাই হোক, একদিন শুনলাম সুতপার বাবার বদলি হয়ে গেছে। ওরা চলে গেছে খুলনায়। সেখানেই নতুন কলেজে পড়বে সে। সুতপা আমার সঙ্গে কখনো যোগাযোগ করেনি। যেদিন সে আমার হাত ধরে হেঁটেছিল সেটা কলেজে তার শেষ দিন ছিল।

এর সাত বছর পর সুতপার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় দেখা। তখন আমি ঢাকায়। একটা মেসে থেকে টিউশনি করি, বিসিএসের কোচিং করি। ধ্যানজ্ঞান বিসিএস এবং আমি জানি আমার হয়েও যাবে। পৃথিবীর আর কিছুই আমার মাথায় নেই। কোচিং করে ইন্দিরা রোড হয়ে ফিরছি। এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় প্যাচপেচে কাদা। খুব সাবধানে পা ফেললেও লাভ হয় না, অন্য কারো বেআক্কেলের মত হাঁটার কারণে জামাকাপড়ে কাদা এসে লাগে। সেই চূড়ান্ত মনোযোগে কাপড় বাঁচিয়ে হাঁটার সময় অপরিচিত একটা মেয়ে বলল, 'তারেক না?'

আমার চোখ নিচে কাদার দিকে। মাথা তুলে দেখি একটা রিকশায় দুটি মেয়ে। তাদের মধ্যে একজন কথাটা বলছে। সুতপা। সে ভাড়া মিটিয়ে রিকশা ছেড়ে দেয়। অনেক বদলে গেছে। তামার পাত্র পরিষ্কার করে ধোয়ার পর রোদ পড়লে যেমন আভা আসে তেমন আভা তার মুখে, গলায়। মুখে হাসি। চুল আগে ছোট ছিল। এখন বড় মেয়েদের মত লম্বা কোঁকড়া চুল পিছনে নিয়ে টানটান করে বাধা। পরনে বর্ষার আকাশের মত ঝকঝকে নীল জামা। তাকে ঘিরে ঝলমলে একটা ব্যাপার।আমার চুপ করে থাকা দেখে সুতপা বলল, 'তারেক আমাকে চিনতে পারছ না?'

আমি হেসে বললাম, 'চিনব না কেন?'

সুতপার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে। আমরা তিনজনই রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম। সুতপা সঙ্গের মেয়েটিকে বলল, 'অনামী। এ হলো তারেক। আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়েছি।' 

আরও মিনিট পাঁচেক তার সঙ্গে কথা হল। আমার রুমমেটের একটা মোবাইল ফোন ছিল। খুব জরুরি প্রয়োজনের জন্য সেখানে কল দেওয়া যেত। সুতপাকে সে নাম্বার দিলাম। সে তার হোস্টেলের ল্যান্ড ফোনের নাম্বার দিল। বলল, রুম নাম্বার ৩১৭। সেদিন কথার ফাঁকে সুতপাকে বললাম, 'সুতপা, তোমার একটা জিনিস আমার কাছে আছে।'

সুতপা ভ্রু উঁচিয়ে বলল, 'বাব্বাহ! তোমার কাছে আমার আবার কী থাকবে?'

আমি কণ্ঠে একটু রহস্য আনার চেষ্টা করে বললাম, 'আরেক দিন বলব।'

এরপর সুতপার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় না। চেষ্টা করি দেখা করার। হোস্টেলের যে নাম্বারটা সেটায় কোনো কাজ হয় না। সোমবার আমাদের দেখা হয়েছিল। বুধবার অনেকবার চেষ্টায়ও ওই নাম্বারে কল যায় না। ফোনের দোকানদারকে বললাম, 'আপনার ফোনে সমস্যা।'

সে বিরক্ত হয়ে আমাকে নাম্বারটা দেখাতে বলল। বলল, 'আপনে কী নম্বর দিছেন? নম্বর তো একটা কম আছে।'

কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম সে ঠিকই বলেছে, একটা ডিজিট কম। সুতপা তাড়াহুড়োয় ঠিক করে লেখেনি। নাকি লিখতে চায়নি জানি না। এরপরও আমি সুতপার সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবি। ফার্মগেটে নিবেদিকা হোস্টেলে সে থাকে। মেয়েদের হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব ভাবতে অস্বস্তি লাগে। একদিন সেই অস্বস্তি কাটিয়ে সত্যি সত্যি খামারবাড়ি পেরিয়ে নিবেদিকা হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। একটা মেয়ে গেট দিয়ে ঢুকছে, তাকে ডেকে বলি, 'আপু, ৩১৭ তে সুতপা অধিকারীকে একটু কল দেবেন?'

মনে আছে তার চোখজোড়া জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি গলায় একটু জোর এনে বলি, 'বলবেন তারেক এসেছে।'

মেয়েটা একটু হাসে। মুখের পেশিগুলো নরম হয়ে আসে। বলে, 'আচ্ছা।'

মিনিটগুলো কাটতে চায় না। সুতপা আসলে কী বলব মনে মনে গুছাই।

সুতপা নিশ্চয়ই আমাকে দেখে খুশি হবে। বলবে, 'আরে তারেক!?'

বলব, 'সুতপা, কলেজের কারো খবর জানো? আমাদের বন্ধু ফারুক বিয়ে করে ফেলেছে, জানো? আতিয়া মেডিকেলে চান্স পেয়েছে।...আচ্ছা, সুতপা তুমি কী বলতে চেয়েছিলে সেদিন?' 

সুতপা মনে করতে পারবে না। আমি মনে করিয়ে দেব, 'ওই যে কলেজে শেষ যেদিন তুমি গিয়েছিলে, সেদিন কী ছিল?'

তারপর ও উজ্জ্বল হয়ে বলবে, 'ও... সেই কথা! আচ্ছা, তোমার এখনও মনে আছে?'

আমি বলব, 'শুধু এটুকুই না আরো অনেক কিছু থাকে...'

একা একা থেকে আমার নিজের মনে কথা সাজানোর অভ্যেস। ভাবতে ভাবতে মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। তখন হোস্টেলের গেট দিয়ে অন্য একটা মেয়ে বের হয়ে বলে, 'সুতপাকে কল দিয়েছেন কে?' 

আমি বলি, 'এই যে আমি, তারেক।'

মেয়েটি বলে 'ভাইয়া, ও রুমে নেই।'

আমি বলি, 'কোথায় গেছে? কখন আসবে বলতে পারেন?'

সে বলে, 'সরি ভাইয়া, জানি না।'

একটা অজানা কারণে নিজেকে প্রত্যাখ্যাত লাগে। সুতপা আমাকে আসতে বলেনি। আমিও জানিয়ে আসিনি। প্রত্যাখ্যানের কোনো ব্যাপার এখানে নেই। এই ঘটনার পরও আমি আবার সুতপার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছি। এক পর্যায়ে মনে হল আমার রুমমেটের ফোন নাম্বার ওকে দেওয়া আছে। আমার কথা ভাবলে সুতপাও আমাকে ফোন দিতে পারত। ইন্দিরা রোড পার হওয়ার সময় আমার চোখ ইতিউতি সুতপাকে খোঁজে। বৃথাই।দ্বিতীয়বারের মত সুতপা আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়।

সুতপার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় সাড়ে ছয় বছর পর।মানিকগঞ্জে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে। বিসিএস ধ্যানজ্ঞান হলেও আমার দৌড় হল শেষমেষ সরকারি কলেজের প্রভাষক পর্যন্ত। কাজের অংশ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ওখানে স্টাডি টুরে গিয়েছি। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে এদিক ওদিন হাঁটছি। বারান্দার দিকে যাওয়ার সময় সেকেন্ড ইয়ারের তাসনুভা খানম বলল, 'স্যার, ওই মহিলা মনে হয় আপনাকে ডাকছে।'

তাকিয়ে দেখি একটা বাচ্চার হাত ধরে সবুজ শাড়ি পড়ে একজন ফর্সা মহিলা। হাতে শাখা, কপালে সিঁদুর। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এরকম সুন্দরী, প্রবল উপস্থিতির কোন নারী এখানে আমাকে ডাকতে পারে ভেবে পেলাম না। একটু এগোতেই দেখি সুতপা।সে হেসে বলল, 'তারেক, কেমন আছ?' 

আমার বুকের মধ্যে একটা কিছু হয়ে যায়।অবাক হয়ে বললাম, 'ভাল। তুমি এখানে?'

'মানিকগঞ্জ আমার শ্বশুরবাড়ি।এদিকে মাঝে মাঝে আসি।'

কী বলব বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে রইলাম। সুতপা নিজেই কথা বলতে লাগল। বাচ্চাকে বলল, 'তোমার তারেক মামা। আদাব দাও।'

সুতপার মত বড় বড় চোখের কোঁকড়া চুলের একটা বাচ্চা। তার কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই।আমি মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, 'কী খবর, বাবা?'

সুতপার স্বামীর সঙ্গে পরিচয় হল। ওদের তিনজনকে একসঙ্গে দেখতে দারুণ লাগছে। সুতপাকে আগেরবার যেমন ঝলমলে লেগেছিল এবার এদের তিনজনকে ঘিরেই সেই রকম একটা ভাব। মনে হচ্ছে সুখ নামক জিনিসটা তৈরিই হয়েছে ওদের জন্য।ওদের গাড়ি অপেক্ষা করছে। ফেরার তাড়াহুড়ো। এর মধ্যে একবার জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার দিদা কেমন আছেন?'

সুতপা এক সেকেন্ড থেমে বলল, 'ওহ দিদা? দিদা তো গত হয়েছেন। তাও দশ বছর হবে।'

সেদিনের পর আমি আরও কয়েকবার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি গেছি। ছয়বার একা, তিনবার আমার কোনো বন্ধু কিংবা কলিগকে নিয়ে। দেখার মত এত কিছু নেই। তবু গেছি। ওটা আমার একটা পছন্দের জায়গা হয়ে গেছে।

চার বছর কেটে গেল। তিন দিয়ে কোনো বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় কিনা জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় সুতপার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে। ভাবি তাকে আরেকটু পরিণত দেখাবে, গালগুলো ভরাট হয়ে আসবে আর তাকে ঘিরে থাকবে সেই চেনা আভা। আমার কিছু চুল পেকে যাবে, চেহারায় ছত্রিশের ছাপ পড়বে। কিন্তু ঘুরে-ফিরে সুতপার সঙ্গে দেখা হবে। হয়তো কোনো রেলওয়ে স্টেশনে। অথবা পান্থপথ মোড়ের সিগন্যালে। ময়মনসিংহে। অজান্তে আমার মধ্যে এক ধরনের অপেক্ষা কাজ করে। শাখা, সিঁদুর পরা কাউকে দেখলে একটু চমকে উঠে তাকাই। নাহ, সুতপা না। এখন ইচ্ছে করলে সুতপাকে ফোন দেওয়া যায়। আমার দুজনেরই ফোন নম্বর বিনিময় হয়েছিল সেদিন। কিন্তু ফোন দেওয়া হয় না। ফোন দিয়ে কী বলব!

সুতপাকে একটা কথা কখনোই বলা হয়নি। আমি খুব একলা মানুষ। একাই কাটিয়েছি জীবনের দীর্ঘ পথ। কিন্তু ডালিমকুমারের গল্পের দৈত্যের মত আমার একটা লুকোনো কৌটো আছে। সেখানে একটা স্মৃতি রাখা। সেটা ফেব্রুয়ারি মাসের এক দুপুরবেলার। প্রায় ষোলো বছর আগের। সুতপা আমার কড়ে আঙুল যে আঙুলে ধরেছিল, সে আঙুল কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি।অবিশ্রাম বৃষ্টির ঘুম-না-আসা রাত, কিংবা ক্লান্তিতে বুক ভেঙে আসা দুপুর, পৃথিবী ভেঙে পড়া দিনগুলো আমার আঙুলে একজনের আঙুল লেগে থাকে। সেটা সুতপার।আমি আর একা থাকি না। প্রতি রাতে আমি সতের বছরের তারেক হয়ে যাই।

বালিয়াটি জমিদারবাড়ির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সুতপা এক ফাঁকে জানতে চায়, 'তারেক, তোমার কাছে আমার কী যেন আছে বলেছিলে?' 

আমি ভুরু উঁচিয়ে না বোঝার ভান করে বলি, 'কী থাকবে?'

সুতপা নাছোড়বান্দার ভঙ্গিতে বলে, 'ওই যে ইন্দিরা রোডে বলেছিলে মনে নেই?'

আমি বলি, 'সেই কবেকার কথা! কেন বলেছিলাম মনে নেই।'

তখন জমিদারবাড়িশূন্য হয়ে আসে। কোথাও আমার ছাত্রছাত্রী কিংবা সুতপার স্বামী-সন্তান নেই। শূন্য করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা দুজন আলো থেকে অন্ধকারে যাই। সুতপা অনুনয় করে বলে, 'বলো না তারেক।

তার কথার প্রতিধ্বনি হয়। আমি হেসে বলি, 'বলব না।' আমার হাসিও দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে।

সুতপা হাঁটতে হাঁটতে আমার আঙুল ধরে বলে, 'বলো, প্লিজ।'

আমি হাসতে থাকি, 'তুমি তো শুনতেও চাওনি!'

অন্তহীন করিডরে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা আরও অনেক কথা বলি।

এগুলো আমার কল্পনা। সুতপা কোনোদিন জানতে চাইবে না তার কোন জিনিসটা আমার কাছে রয়ে গেছে। শুধু একটা মার্কার পেন নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ভাবতে ভাল লাগে সে হয়তো জানে। হয়তো সেই দিনটা তারও মনে আছে অথবা মনে নেই।হয়তো তার এত কৌতূহল নেই। একদিন আবেগের বশে সে কাটা আঙুলের একটা ছেলের হাত ধরে হেঁটেছিল সারা জীবন সে কথা মনে রাখতে হবে এর কোনো মানে নেই।

Related Topics

টপ নিউজ

গল্প

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ফাইল ছবি: সংগৃহীত
    আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ফি অপরিবর্তিত থাকছে; চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল আদালতের ওপর
  • ফাইল ছবি: সংগৃহীত
    'কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনুমতি ছাড়া ভিডিও প্রচার করলে সাইবার আইনে দ্রুত বিচার: তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী
  • কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মুফতি আমির হামজা। ছবি: সংগৃহীত
    মানহানির মামলায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
  • ফাইল ছবি: সংগৃহীত
    একীভূত ৫ ব্যাংকের অসুস্থ আমানতকারীদের টাকা ফেরতের বিষয়টি বিবেচনাধীন: আমির খসরু
  • ছবি: টিবিএস
    আ.লীগকে সরাতে ১৬ বছর লেগেছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না: এটিএম আজহার
  • রাজধানীর একটি ফিলিং স্টেশনের চিত্র। ছবি: টিবিএস
    তেলের দাম বাড়ার পর ফিলিং স্টেশনে কমেছে লাইনের চাপ, অপেক্ষার সময় কমছে রাজধানীতে

Related News

  • হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?
  • প্রচ্ছদ: হু আর ইউ
  • আইজ্যাক বাবেলের গল্প | বুড়ো শ্লয়মি
  • জ্যাক রিচি-র রোমাঞ্চ গল্প | ২২ তলা উপরে—২২ তলা নিচে
  • মনিরু রাভানিপুরের গল্প | তেহরান 

Most Read

1
ফাইল ছবি: সংগৃহীত
অর্থনীতি

আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ফি অপরিবর্তিত থাকছে; চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল আদালতের ওপর

2
ফাইল ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

'কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনুমতি ছাড়া ভিডিও প্রচার করলে সাইবার আইনে দ্রুত বিচার: তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী

3
কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মুফতি আমির হামজা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

মানহানির মামলায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

4
ফাইল ছবি: সংগৃহীত
অর্থনীতি

একীভূত ৫ ব্যাংকের অসুস্থ আমানতকারীদের টাকা ফেরতের বিষয়টি বিবেচনাধীন: আমির খসরু

5
ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

আ.লীগকে সরাতে ১৬ বছর লেগেছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না: এটিএম আজহার

6
রাজধানীর একটি ফিলিং স্টেশনের চিত্র। ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

তেলের দাম বাড়ার পর ফিলিং স্টেশনে কমেছে লাইনের চাপ, অপেক্ষার সময় কমছে রাজধানীতে

EMAIL US
contact@tbsnews.net
FOLLOW US
WHATSAPP
+880 1847416158
The Business Standard
  • About Us
  • Contact us
  • Sitemap
  • Privacy Policy
  • Comment Policy
Copyright © 2026
The Business Standard All rights reserved
Technical Partner: RSI Lab

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net