আইজ্যাক বাবেলের গল্প | বুড়ো শ্লয়মি
আমাদের শহরটা ছোট, মানুষজনও হাতে গোনা। অথচ গত ষাট বছরে এই শহর ছেড়ে এক পা না নড়লেও, শ্লয়মি লোকটা কে বা ওর পরিচয় কী, এ কথা সাহস করে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারণটা খুব সোজা—লোকটা বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে; ঠিক যেভাবে মামুলি, অপ্রয়োজনীয় জিনিসের কথা ভুলে যায় মানুষ। চোখে পড়ে না, মনে পড়ে না। বুড়ো শ্লয়মিও ঠিক সে রকমই একটা জিনিস।
ছিয়াশি বছরের জরাজীর্ণ শরীর। চোখ দুটো সারাক্ষণ পানিতে ছলছল করে। বলিরেখা পড়া নোংরা, কুঁচকানো ছোট্ট মুখটা ঢাকা পড়েছে হলদেটে দাড়ির ঝোপে; তাতে কোনো দিন চিরুনি পড়েনি। মাথায় একরাশ ঘন, জটাপাকানো চুল। শ্লয়মি পারতপক্ষে গোসল করে না, কাপড়ও বদলায় কালেভদ্রে। তাই গা থেকে একটা ভ্যাপসা দুর্গন্ধ বেরোয়। সে থাকে ছেলে আর ছেলের বউয়ের সাথে। ঘরের এক কোণে একটা উষ্ণ আশ্রয় আর দুবেলা খাবার দিয়েই বুড়োর অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়েছে তারা। এই উষ্ণ কোণ আর সামান্য খাবার—শ্লয়মির জগৎ বলতে এটুকুই। আর দেখে মনে হয়, ওর চাহিদাও কেবল এইটুকুই।
বুড়ো, ভাঙা হাড়গুলোকে একটু ওম দেয়া আর চর্বিঅলা, রসালো এক টুকরো মাংস খাওয়াই এখন বুড়ো শ্লয়মির কাছে স্বর্গসুখ। খাবার টেবিলে সবার আগে হাজির হয় সে। অপলক, লোভাতুর চোখে চেয়ে থাকে খাবারের প্রতিটি দানার দিকে। তারপর লম্বা, হাড়জিরজিরে আঙুল দিয়ে খপ্খপ্ করে খাবার ঠুসতে থাকে মুখে। খেতেই থাকে, খেতেই থাকে...যতক্ষণ না ওকে খাবার দেয়া বন্ধ করা হয়।
শ্লয়মির ভোজনপর্ব দেখলে গা গুলিয়ে ওঠে। খাওয়ার সময় তার শীর্ণ দেহ থরথর করে কাঁপতে থাকে, তেল-চর্বিতে মাখামাখি হয়ে যায় হাতের আঙুল। করুণ চেহারায় লেপটে থাকে আতঙ্কের ছাপ। সারাক্ষণ একটা ভয়—এই বুঝি কেউ ওর মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, এই বুঝি সবাই তাকে দিতে ভুলে যায়!
মাঝে মাঝে পুত্রবধূ শ্লয়মিকে নিয়ে একটা নিষ্ঠুর রসিকতা করে। খাবার বেড়ে সবার পাতে দেয় সে, কিন্তু এমন ভান করে যেন শ্লয়মির কথা তার মনেই নেই। বুড়ো মানুষটা তখন ছটফট করতে শুরু করে। অসহায় দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকায় আর ফোকলা, বিকৃত মুখে একটা হাসির রেখা ফোটানোর চেষ্টা করে। বোঝাতে চায়, খাবার তার কাছে কিছুই না, ওটা ছাড়াই তার দিব্যি চলে যাবে। কিন্তু ওর ছলছলে চোখের গভীরে, ঠোঁটের কোণে, সামনে বাড়িয়ে দেওয়া মিনতিভরা দুই হাত আর অতি কষ্টে ফোটানো বোকা বোকা হাসিটা এতটাই করুণ হয় যে রসিকতা করার ইচ্ছেটা উবে যায় পুত্রবধূর। এবং যথারীতি খাবার পড়ে শ্লয়মির পাতে।
এভাবেই ঘরের এক কোণে দিন গুজরান করে সে—খায়, ঘুমায়, আর আর গরম এলে রোদে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দেখে মনে হয়, বহু আগেই কোনো কিছু বোঝার, উপলব্ধি করার ক্ষমতা হারিয়েছে সে। ছেলের কাজকর্ম কিংবা ঘর-গেরস্থালির বিষয়আশয়—কোনো কিছুতেই ওর কিছু যায়-আসে না। আশপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, সব শূন্যদৃষ্টিতে দেখে সে। কেবল একটাই ভয় শ্লয়মির মনে মাঝে মাঝে কাঁটার মতো খচখচ করে—ওর নাতিটা যদি টের পেয়ে যায় যে সে বালিশের নিচে এক টুকরো শুকনো হানি-কেক লুকিয়ে রেখেছে! কেউ কখনো শ্লয়মির সাথে কথা বলে না, কোনো ব্যাপারে তার পরামর্শ চায় না, সাহায্য তো দূর অস্ত। ওর দিন অবশ্য বেশ সুখেই কেটে যাচ্ছিল।
অবশেষে ফুরাল বুড়ো শ্লয়মির সুখের দিন, একদিন রাতের খাবারের পর যখন ছেলে এসে কানের কাছে চেঁচিয়ে বলল, 'পাপা, ওরা আমাদের এখান থেকে তুলে দেবে! শুনছ? উচ্ছেদ করে দেবে আমাদের। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে! তাড়িয়ে দেবে!'
ছেলের গলা কাঁপছিল, চেহারাটা বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছিল অসহ্য যন্ত্রণায়। ধীরে ধীরে ঘোলাটে দুচোখ তুলে চাইল শ্লয়মি। নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাল, কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে আবছাভাবে। তেলতেলে ফ্রক কোটখানা আরও ভালোমতো জড়িয়ে নিল গায়ের সঙ্গে। একটা কথাও বলল না বুড়ো শ্লয়মি, পা টেনে টেনে চলে গেল নিজের শোবার জায়গায়।
সেদিন থেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করতে শুরু করল শ্লয়মি, অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটছে বাড়িতে। ছেলেটা একেবারে মনমরা হয়ে ঘোছে, কাজে-কর্মে মন নেই, থেকে থেকে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আর আড়চোখে তাকায় বাপের দিকে। নাতিটা হাইস্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বউমা যখন-তখন গলা ফাটিয়ে চেঁচামেচি করে, হাত কচলায়, ছেলেকে বুকে চেপে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে।
শ্লয়মির এখন একটা কাজ জুটে গেছে: সবকিছু দেখা আর বোঝার চেষ্টা করা। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে থাকা মাথাটায় আবছা কিছু চিন্তা যেন কিলবিল করে উঠল। 'ওদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে!' কেন ওদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, কারণটা শ্লয়মির জানতে বাকি নেই। 'কিন্তু শ্লয়মি তো যেতে পারবে না! ওর বয়েস ছিয়াশি! বুড়ো মানুষটা সারাক্ষণ একটু ওম পেতে চায়! বাইরে কী ভীষণ ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে...না! শ্লয়মি কোথাও যাবে না! যাওয়ার কোনো জায়গা নেই ওর, কিচ্ছু নেই!'
নিজের কোণটায় লুকিয়ে পড়ল শ্লয়মি। নড়বড়ে কাঠের খাটটাকে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করল ওর। পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিল চুলাটার গায়ে—আহ্, কী মিষ্টি, গরম চুলা, ঠিক ওর নিজের বয়সী। 'এখানেই তো বড় হয়েছে ও। এখানেই কেটেছে ওর নীরস, বিবর্ণ জীবন। এই মাটির ছোট্ট গোরস্তানেই তো মিশে যেতে চায় ওর বুড়ো হাড়গুলো!'
এসব চিন্তা মাথায় এলেই অস্বাভাবিক অস্থির হয়ে পড়ে শ্লয়মি। ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় ছেলের সামনে। অনেক কথা বলতে চায়, আবেগ দিয়ে বোঝাতে চায় সব, দু-একটা পরামর্শও দিতে চায়। কিন্তু...কত দিন হয়ে গেল কারও সাথে কথাই বলেনি ও! কাউকে কোনো পরামর্শও দেয়নি। কথাগুলো সব জমে বরফ হয়ে যায় ওর ফোকলা মুখে, উত্তোলিত হাতখানা নিচে নেমে আসে নিস্তেজভাবে। আকস্মিক এই আবেগের বিস্ফোরণে নিজেই যেন লজ্জা পায় শ্লয়মি। জড়সড় হয়ে, মুখ কালো করে ফিরে যায় নিজের কোণে। সেখান থেকে কান পেতে রাখে ছেলে আর বউমার কথা শোনার জন্য। ওর কান প্রায় অকেজো, কিন্তু ভয় আর আতঙ্কে ঠিকই টের পেল, ভয়াবহ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এই সময়টায় ছেলেও টের পায় বাপের ওই ভারী, পাগলাটে দৃষ্টি। প্রায়োন্মাদ বুড়ো মানুষটার ওই দৃষ্টি যেন আঠার মতো আটকে আছে তার ওপর। ছোট্ট দুটো চোখে কী এক সর্বনেশে অনুসন্ধান—অনবরত কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে, কিছু একটা জানতে চাইছে।
একদিন কথা বলার সময় গলার আওয়াজ একটু বেশিই চড়ে গেল বউমার—বোধহয় বেমালুম ভুলে গিয়েছিল যে শ্লয়মি এখনো বেঁচে আছে। আর বউমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘর থেকে ভেসে এল একটা চাপা, গোঙানির মতো কান্নার আওয়াজ। বুড়ো শ্লয়মি! টলোমলো পায়ে, ময়লা, উষ্কখুষ্ক শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সে ছেলের কাছে। চেপে ধরল ছেলের হাত দুটো, পরম আদরে তাতে আঙুল বোলাল, চুমু খেল। লাল চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্যও ছেলের ওপর থেকে না সরিয়ে মাথা নাড়ল কয়েকবার। তারপর, বহু...বহু বছর পর, ওর দুচোখ বেয়ে নামল জলের ধারা। একটা কথাও বলল না। হাঁচড়েপাঁচড়ে সিধে হয়ে দাঁড়াল সে, হাড় বের করা হাত দিয়ে মুছল চোখের পানি। কেন যেন নিজের কোট থেকে ধুলো ঝাড়ল একবার। তারপর খসখস করে পা টেনে ফিরে গেল নিজের কোনায়, ওর উষ্ণ চুলার কাছে। উষ্ণতা দরকার শ্লয়মির। ঠান্ডা লাগছে।
এর পর থেকে শ্লয়মির মাথায় কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খায়। একটা ব্যাপার এখন ওর কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার: ওর ছেলেটা নিজের জাত, নিজের লোকজনকে ছেড়ে নতুন এক ঈশ্বরের কাছে চলে যেতে চায়। বহু পুরোনো, ভুলে যাওয়া বিশ্বাসটা যেন দপ করে জ্বলে উঠল ওর ভেতরে। শ্লয়মি কোনোকালেই ধার্মিক ছিল না। প্রার্থনা করেছে কালেভদ্রে। যৌবনে তো লোকে ওকে নাস্তিক বলেও জানত। কিন্তু তাই বলে নিজের ঈশ্বরকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া...চিরদিনের জন্য পরিত্যাগ করা...সেই ঈশ্বরকে, যিনি চিরকাল নিপীড়িত আর দুঃখী মানুষদের ঈশ্বর হয়ে ছিলেন—এই ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারল না শ্লয়মি। মাথার ভেতর চিন্তাগুলো যেন ভারী পাথরের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে, সহজে কিছু বুঝতে পারছে না, কিন্তু একটা কথা ওর সামনে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে: 'এ হতে পারে না, কিছুতেই না!'
কিন্তু শ্লয়মি যখন বুঝল, সর্বনাশ যা হওয়ার তা হবেই—ওর ছেলে আর ঠেকাতে পারবে না—তখন সে নিজেকে বলল: 'শ্লয়মি, বুড়ো শ্লয়মি! এখন তুই কী করবি?'
অসহায়ের মতো চারদিকে তাকাল বুড়ো মানুষটা। ছোট্ট বাচ্চার মতো করে ঠোঁট ফোলাল, বুড়ো বয়সের তিতকুটে কান্নায় ভেঙে পড়তে চাইল। কিন্তু না, এক ফোঁটা জলও এল না চোখে, হালকা হলো না বুক। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন ওর বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠল, যখন ও উপলব্ধি করতে পারল এই সর্বনাশের কোনো কূলকিনারা নেই, তখনই শ্লয়মি শেষবারের মতো তাকাল ঘরের কোণে নিজের উষ্ণ আশ্রয়টার দিকে। মনস্থির করে ফেলল, ওকে এখান থেকে কেউ বের করতে পারবে না। পারবে না তাড়াতে। 'বালিশের নিচে রাখা শুকনো হানি-কেকের টুকরোখানা বুড়ো শ্লয়মিকে খেতে দেবে না ওরা! না দিক, তাতে কী! শ্লয়মি গিয়ে ঈশ্বরকে নালিশ করবে, জানাবে কেমন অন্যায় করা হয়েছে ওর সাথে! ঈশ্বর তো একজন আছেন, নাকি? ঈশ্বরই ওকে আশ্রয় দেবেন!' এই ব্যাপারে শ্লয়মি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত।
সেদিন মাঝরাতে, কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বিছানা থেকে উঠল সে। চুপিসারে, যেন কেউ জেগে না যায়, একটা ছোট কেরোসিনের বাতি জ্বালল। কাঁপতে কাঁপতে, বৃদ্ধ শরীরের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে ধীরে ধীরে গায়ে চাপাল ময়লা কাপড়। তারপর তুলে নিল আগের রাতে জোগাড় করে রাখা টুল আর দড়িটা। দুর্বল পায়ে টলতে টলতে, দেয়ালে ভর দিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়। হঠাৎ যেন হাড়কাঁপানো ঠান্ডা লাগতে শুরু করল। সারা শরীর কেঁপে উঠল থরথর করে। শ্লয়মি আর দেরি করল না। ঝটপট একটা আংটার সাথে বাঁধল দড়িটা, দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, টুলখানা রাখল ঠিক জায়গায়। উঠে দাঁড়াল টুলের ওপর, সরু, কাঁপতে থাকা গলার চারপাশে পেঁচিয়ে নিল দড়িটা, তারপর শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে লাথি মেরে পায়ের নিচ থেকে সরিয়ে দিল টুলখানা। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে শেষবারের মতো একবার শহরটাকে দেখে নিল, যে শহর ছেড়ে গত ষাট বছরে সে এক দিনের জন্যও কোথাও যায়নি। তারপর ঝুলে পড়ল।
বাইরে তখন দমকা হাওয়া বইছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ো শ্লয়মির দুর্বল, হালকা শরীরটা দুলতে শুরু করল তার নিজের বাড়ির দরজার সামনে, যে বাড়ির ভেতর সে ফেলে এসেছে ওর উষ্ণ চুলা...আর পূর্বপুরুষদের তেলচিটে তোরাহ।
[আইজ্যাক বাবেলের জন্ম ১৮৯৪ সালে, ইউক্রেনের বহু ভাষা ও সংস্কৃতির শহর ওডেসায়, সাধারণ এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে। তার লেখা 'রেড ক্যাভালরি', 'স্টোরি অব মাই ডাভকোট', 'টেলস অব ওডেসা'কে রুশ সাহিত্যের একেকটি মাস্টারপিস বলে গণ্য করা হয়। তার লেখায় উঠে এসেছে আধুনিক রুশ শহরের ধূসর, মধ্যবিত্ত জগতের ছবি। বাবেলকে সমীহ করে বলা হয় 'রুশ ইহুদিদের সর্বশ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী'। তার গল্পের জগৎ ছিল বিচিত্র। ঝড় তুলেছিলেন ছোটগল্প ও আত্মজীবনীমূলক লেখার জগতে। রাশিয়া ছাড়িয়ে তার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বিদেশেও, বিশেষ করে আমেরিকায়। বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তার লেখা।
বাবেল স্নাতক সম্পন্ন করেন ওডেসার কমার্শিয়াল একাডেমি থেকে। পরে ওই শহরেই সপরিবারে থিতু হন। ১৯১১ সালে কিয়েভের ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্টাডিজে অর্থনীতি ও ব্যবসা শিক্ষা নিয়ে পড়তে যান। সেখানে পড়াশোনা শেষ করার আগেই তার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। ভর্তি হলেন বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গের সাইকো-নিউরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে আইন বিভাগে। সেখানে গিয়েই রিপোর্টার ও ছোটগল্পকার হিসেবে ভাগ্য পরীক্ষায় নামেন। কিয়েভের ছোট সাপ্তাহিক পত্রিকা 'ওগনি'তে ১৯১৩ সালে প্রকাশিত 'বুড়ো শ্লয়মি' বাবেলকে প্রথম পরিচিতি এনে দেয়।
১৯১৬ সালে তার দেখা হয় ম্যাক্সিম গোর্কির সাথে। বাবেলের কয়েকটি গল্প নিজের বিখ্যাত পত্রিকা 'লেটোপিস'-এর ১৯১৬ সালের নভেম্বর সংখ্যায় ছেপে দেন গোর্কি। ব্যস, রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে গেলেন বাবেল। দুজনের গভীর বন্ধুত্ব টিকে ছিল ১৯৩৬ সালে গোর্কির মৃত্যু পর্যন্ত।
বাবেল গুপ্ত পুলিশ চেকার হয়ে অনুবাদকের কাজও করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ওডেসার রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদক হিসেবে। ছদ্মনামে যোগ দিয়েছিলেন সেমিওন বুদেন্নির ফার্স্ট ক্যাভালরি আর্মিতেও। সেনাবাহিনীর পত্রিকার জন্য লেখার পাশাপাশি মাঝে মাঝে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রেও যেতেন। লিখেছেন সিনেমার চিত্রনাট্য, নাটকও।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অনুগত থেকেও দলটির সমালোচনায় বাবেল পিছপা হতেন না। এই আপসহীনতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শিকার হন স্তালিনের 'গ্রেট পার্জ'-এর। এর পেছনে মূল কারণ ছিল কুখ্যাত গুপ্ত পুলিশ সংস্থা এনকেভিডি-প্রধান নিকোলাই ইয়েঝভের স্ত্রীর সঙ্গে বাবেলের দীর্ঘদিনের গোপন প্রণয়।
১৯৩৯ সালের এক রাতে পেরেদেলকিনো থেকে বাবেলকে গ্রেপ্তার করে এনকেভিডি। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের মুখে বাবেল স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন, তিনি ট্রটস্কিপন্থী সন্ত্রাসবাদী এবং বিদেশি গুপ্তচর। পরে দুবার সেই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু লাভ হয়নি। অবশেষে ১৯৪০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। আইজ্যাক বাবেলের এই গ্রেপ্তার এবং মৃত্যুদণ্ডকে বিশ্বসাহিত্যের জন্যে এক মহাবিপর্যয় বলে অভিহিত করা হয়।]
