Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

Wednesday
March 11, 2026

Sign In
Subscribe
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
WEDNESDAY, MARCH 11, 2026
দহনদাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্মসহচর

ইজেল

সাগুফতা শারমীন তানিয়া
08 February, 2026, 11:10 am
Last modified: 08 February, 2026, 11:10 am

Related News

  • বোকা বাকশোর কথকতা
  • ‘চৌরঙ্গী’র লেখক শংকর মারা গেছেন
  • এপস্টেইনের ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ 
  • রিগন, আপনি আমাদের কাছেই আছেন
  • সুন্দরী এক পাখির গল্প

দহনদাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্মসহচর

আজ কথা বলব তাঁদের নিয়ে, পুরুষ কখনো তাঁদের সাধনসঙ্গী, কখনো সখা, প্রায়-সর্বত্র প্রতিপক্ষ। পুরুষ ও পুরুষশাসিত সমাজের হাতে হেনস্থা হবার-ডুববার-ভূলুণ্ঠিত হবার পরও নারীসাহিত্যিকদের উঠে দাঁড়াবার গল্প, ‘দহনদাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্মসহোদর’...সেই তাঁদের গল্প করব। 
সাগুফতা শারমীন তানিয়া
08 February, 2026, 11:10 am
Last modified: 08 February, 2026, 11:10 am
ইলাস্ট্রেশন: ইজেল

কয়েকটি মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এ লেখা শুরু করছি। 

১) পাল রাজাদের আমলে বিদূষী জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শিনী লীলাবতী শ্বশুর বরাহ আর স্বামী মিহিরের তারা গণনার সমস্যা সমাধান করে দিয়ে রাজসভায় নাম করলেন, হিংসুক বরাহ আদেশ করলেন মিহির যেন স্ত্রীর জিভ কেটে নেন, রক্তপাতে মৃত্যু হলো লীলাবতী কন্যার–লোকমুখে যাঁর নাম খনা। 

২) ষোড়শ শতাব্দীর কবি–'মলুয়া' কাব্যের রচয়িতা চন্দ্রাবতী একাগ্রচিত্তে ধ্যান করছিলেন মন্দিরে, বের হয়ে দেখলেন প্রাঙ্গণে ছিন্ন সন্ধ্যামালতীর ফুল–নদীর জলে ধুয়ে দিতে হবে বলে নদীতে গেলেন–সেখানে বাল্যপ্রেমিকের শব নদীতে ভাসছে–চন্দ্রাবতী নদীতে অবগাহন করলেন আর উঠলেন না। 

৩) আবার উন্মাদ হতে চলেছেন এই সন্দেহে স্বামী লেনর্ড উলফকে চিঠি লিখেছেন ভার্জিনিয়া, ১৯৪১ এর সেই বসন্তদিনে তিনি ওভারকোটের পকেট বোঝাই করেছেন নুড়ি দিয়ে, নদীতে ডুবে মরবেন বলে...মৃত্যুতেও রেহাই নেই, লিংকনের বিশপের স্ত্রী তাঁর আত্মহত্যার সমালোচনা করে দ্য সানডে টাইমসে লিখবেন, আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা অনেকেই এর চেয়ে ঢের স্পর্শকাতর, তবু প্রতিদিনকার অসহ প্ররোচনার সামনা করে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের আদর্শকে ধারণ করে বেঁচে আছি। 

৪) জর্জ অরওয়েলের স্ত্রী আইলীন ও'শনেসি অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেছেন, আরেক স্বনামধন্য সাহিত্যিক টলকিয়েনের ছাত্রী তিনি, নিজেও বুদ্ধিমত্তায়-রসবোধে-পরিশ্রমের ক্ষমতায় অতুলনীয়া। 'অ্যানিম্যাল ফার্ম'-এর মূল আইডিয়াটা আইলিন ও'শনেসির, লন্ডন ব্লিৎজের সময় তিনি অরওয়েলের সঙ্গে মিলে এ উপন্যাস লিখেছিলেন। শুধু তাই নয়, দুবার জর্জ অরওয়েলের জীবন বাঁচিয়েছিলেন আইলিন, অথচ অরওয়েলের সাহিত্যে কোথাও তাঁর উল্লেখ নেই। 'সকল প্রাণী সমান, কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে আরেকটু বেশি সমান' বৈকি! 

যে নারী তাকে জন্ম দেয়, প্রতিপালন করে, নির্মাণ করে, যে সাধনসঙ্গিনী নারী তাকে দেয় শিল্পসৃষ্টির অখণ্ড অবসর (প্রেরণার প্রসঙ্গে ধরুন গেলাম না)–তাদের সকলকে অদৃশ্য করে দিয়েই তো একাকী পুরুষের স্বয়ম্ভূ প্রতিভাসৌধ নির্মাণ সম্ভব, তাই না?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, 'জল জিনিসটা নিত্যপ্রয়োজনীয়, অথচ ইহার দাম নাই। ...যদি কোনদিন সংসারে নারী বিরল হইয়া উঠেন, সেই দিনই ইঁহার যথার্থ মূল্য কত, সে তর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়া যাইবে–আজ নহে। আজ ইনি সুলভ।' ('নারীর মূল্য') সেই সুলভ নারী সাহিত্যচর্চায় কেমন? আজ কথা বলব তাঁদের নিয়ে, পুরুষ কখনো তাঁদের সাধনসঙ্গী, কখনো সখা, প্রায়-সর্বত্র প্রতিপক্ষ। পুরুষ ও পুরুষশাসিত সমাজের হাতে হেনস্থা হবার-ডুববার-ভূলুণ্ঠিত হবার পরও নারীসাহিত্যিকদের উঠে দাঁড়াবার গল্প, 'দহনদাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্মসহোদর'...সেই তাঁদের গল্প করব। 

কারা কবে কথা বলেছিল 

ঋগ্বেদের যুগে সাতাশজন ঋষিকবি ছিলেন, যাঁরা স্ত্রীলোক, হিন্দু বিবাহমন্ত্রের কিছু শ্লোক সেই কবিদের একজনের (সূর্যা) লেখা। পাণিনির যুগে আচার্য্যানীর কাছে মেয়েরা বেদশিক্ষা নিতে পারতেন। মৈত্রেয়ী স্বামী যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যা আমায় অমৃত দেবে না, তা নিয়ে আমি কী করব? জ্ঞান-অমৃতের অধিকার ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে এল। বাৎস্যায়নের আমলে শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্না রাজকন্যা, কৌতুকি-ভার্যা এবং গণিকা প্রচুর দেখা যেত, নারীশিক্ষার চৌষট্টিকলার ভেতর কাব্যচর্চা ছিল অন্যতম। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের নারী কবি সাফো, প্লেটো তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; হোমার যেমন পুরুষ কবিদের প্রধান, সাফো তেমনি নারীকবিদের প্রধানা। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে কবি হিসেবে শোনা যায় আরও অনেক নারীর নাম–করিন্না, এরিনা, সালপিসিয়া, মেত্রোদোরা। 

'দোন কিহোতে' পুরুষের প্রথম উপন্যাস, তারও আগে এগারো শতকের জাপানে নারীর হাতে রচিত হয়েছে উপন্যাস লেডি মুরাসাকি শিকিবুর 'দ্য টেল অব গেঞ্জি', রাজকুমার হিকারু গেঞ্জির প্রেমকথা। জেন অস্টেন-মেরি শেলী-ব্রন্টি সিস্টার্স-লুইজা মে অ্যালকট-ভার্জিনিয়া উলফ-হারপার লি এঁদের সব্বার পূর্বসুুরি শিকিবু। আঠারো শতকের মাঝামাঝি ইংরেজ নারীরা একরকম সাহিত্যসভার আয়োজন করতে লাগলেন। সেখানে নারী-পুরুষ উভয়ই আমন্ত্রিত হতেন, ডিনারের পর লিঙ্গভেদে আলাদা কক্ষে চলে না গিয়ে বরং একসঙ্গে বসে সাহিত্য আলোচনা করতেন। 

হ্যারিয়েট বিচার স্টো

আঠারো শতকের ইংল্যান্ডে সাহিত্যমনা মননশীল এই নারীদের ডাকা হতো নীল-মোজা বা 'ব্লু-স্টকিং', অর্থাৎ কিনা পরিশীলিত সুভদ্র নারীর মতো এঁরা কালো সিল্কের মোজা পরেন না, পরেন নীল উলের মোজা...নামেই কমনীয়তার অভাবের ইঙ্গিত- এঁরা ঠিক 'নারী' নন, পুরুষালি। ব্লু-স্টকিং নারীদের মধ্যমণি এলিজাবেথ মন্টেগু সগর্বে লিখেছিলেন, 'কোনো অপদার্থকে আমার বাড়িতে কখনো ডাকিনি। আমাদের কালের সবচেয়ে জ্ঞানী, সবচেয়ে নন্দিত পুরুষদের সঙ্গে এবং সর্বকালের সেরা শিক্ষিতা-মার্জিতা নারীদের সঙ্গে আমরা সময় কাটিয়েছি।'

শ্লোক রচয়িতা মানিনী দেবী বিধবা হবার পর সহমরণে যান, রমাবাঈ বিধবা হবার পর নারীশিক্ষার অগ্রপথিক হিসেবে কাজ করেন। ভক্তিমতী মীরাবাঈ, করমেতি বাঈ ভক্তি-সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। সহজীবাঈ, ষোড়শ শতকের প্রবীণাবাঈ, অষ্টাদশ শতকের হিন্দি কবি শেখ ও তাজ–কত নাম! সুলতানা রাজিয়া, বাবরকন্যা গুলবদন বেগম, আকবরপত্নী সলিমা সুলতানা, শাহজাহানপত্নী মমতাজমহল ও কন্যা জাহানারা, আওরঙ্গজেবকন্যা জেবুন্নিসা, বাহাদুরশাহপত্নী নুরউন্নিসা–এঁরা প্রত্যেকে সাহিত্যামোদী ছিলেন। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের বিদূষী আনন্দময়ী দেবী, গঙ্গামণি দেবী, যজ্ঞেশ্বরী দেবী, দ্রবময়ী দেবীর নাম জানা যায়। পুরোনো ছেলেভুলানো ছড়াগুলো যে ছেলের মায়েদেরই রচিত, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। 

বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে আমাদের অতিপরিচিত সমাসবদ্ধ পদ ছিল–'নভেল-পড়া বউ', ঐ যারা দিবসের ঘরকন্নার অবকাশে পায়ের গোছটি শূন্যে তুলে বালিশ বুকে চেপে নভেল পড়ত, সুর্যমুখী নাকি কুন্দনন্দিনী...রোহিনী নাকি ভ্রমর কে প্রিয়পুরুষটিকে জয় করতে পারল, তাই নিয়ে মাথা ঘামাত। নভেল লিখিয়ে বউ নিয়ে কোনো সন্ধি-সমাস নেই, 'পুত্রার্থে ক্রিয়ন্তে' নারীর বেলায় ওটা কিনা অকল্পনীয়। তার কাজ বিনেপয়সার কাজ, অপ্রতিস্থাপনীয় তার ভূমিকা, অথচ সমস্তটাই কেমন অদৃশ্যপ্রায়। 

পালরাজার আমল থেকে আজ অব্দি অবস্থা খুব পাল্টেছে বলে মনে হয় না। শিক্ষায় তার অধিকার ছিল না বলে সাহিত্যে সে অনুপস্থিত, চিন্তায় বা উপলব্ধিতে তার ভাগ নেই, তার দায় কেবল কর্মের আর আচরণের। স্বামীর ঘোড়াটিকে দেখলে সে ঘোমটা দিচ্ছে (রাসসুন্দরী দাসী), বড় ভাইয়ের কাছে রাতের অন্ধকারে পড়ালেখা করছে (বেগম রোকেয়া)। কে জানে, রেশমসুতার কাসিদায় যেসব কবিতা লেখা থাকত, এই যেমন–'শিশিরে কি ভিজে বন বিনা বরিষণে, চিঠিতে কি ভিজে মন বিনা দরিশনে', সেসব কবিতা প্রাচীনা কোনো নারী-বিরচিত কি না। নারীর সাহিত্যপ্রতিভা প্রথমত সমাধিস্থ করা হয় গৃহকৃত্যতে, তারপর ইতিহাসে-নিঃশব্দে। সুনীতিকুমার কি সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতার হাতে কেবল পুরুষের শোভাযাত্রা। নারীর সাহিত্য বহুকাল যাবত বড়জোর জাতীয় দৈনিকের নারী পাতায় মিহি কলকাকলীতে সীমাবদ্ধ। 

কে লেখে কী লেখে

পুরুষ-সাহিত্যিকের ভেতর চিরদিনই একটি গণমানস-শোধনমূলক চিন্তা কাজ করেছে। অলিভার গোল্ডস্মিথের লাইন মনে করে দেখুন–'হোয়েন লাভলি উওমেন স্টুপস টু ফলি'... পুরুষের ছলনায় সমাজপিঞ্জর থেকে নারী বেরিয়ে এলে নারীর পদস্খলনের লজ্জা ঢাকবার একমাত্র ঢাকনি নাকি মৃত্যু! বেচারী 'টেস অব দ্য ডুবারভিলস' (টমাস হার্ডি) প্রায় ঘুমন্ত দশায় ধর্ষিত হয়ে আমৃত্যু সুখবঞ্চিতা হলো, 'যথার্থ' নারী আর হতে পারল না। ফ্লবেয়ারের 'মাদাম বোভারি'র সামান্য অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড, বঙ্কিমের রোহিণীর (কৃষ্ণকান্তের উইল) যেমন প্রেমের শাস্তি মরণ। 

এর বিপরীতে নারীদের লেখা 'অ্যামেটরি ফিকশন' জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সতেরো শতকের শেষের দিকে। অ্যামেটরি ফিকশন নারীরচিত ও নারীর তৃষ্ণাবিরচিত–প্লেজার উইদাউট কনসিকোয়েন্সেজ। পুরুষের পবিত্র-কুমারী পূজার বিপ্রতীপে নারীর কলমে নারীর যৌনতার সার্বভৌম গাথা। এমন সব 'কৃষ্ণকান্তের উইল' যেখানে রোহিণী বেঁচে থাকে, এমন সব 'চোখের বালি' যেখানে দিনশেষে বিধবা প্রেমিকা বিনোদিনীকে বৌঠান ডেকে প্রণাম করে না একদা-প্রেমিক। বরং অনাথা নারীকে আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে–অথচ সে সেখানে প্রেম করছে, বিয়ে করছে, বিধবা হয়েছে জেনে দ্বিতীয় বিয়ে করছে–মৃত স্বামী ফিরে আসবার পর তাকে হত্যা করছে দ্বিচারিতা থেকে রক্ষা পেতে, কিংবা প্রেমিকের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের কারণে গর্ভবতী হচ্ছে, প্রেমিক বিয়ে করতে চাইলে তার যদি সেই পুরুষকে ভালো না লাগে, তাহলে না করে দিচ্ছে–বিয়েটা তার কাছে ভালো মেয়ে হবার অন্তিম পুরস্কার নয়। 

নারীই মূলনায়িকা, তার অন্বিষ্ট বস্তু পুরুষের মতোই একেবারে–ভালোবাসা, রোমাঞ্চ, যৌনতা কিংবা অ্যাডভেঞ্চার। যে নারী গার্হস্থ্যের কলে জুতে দেয়া পশু, যে নারী জানে এ জাঁতাকলের বাইরের দুনিয়া ছোট বড় অসংখ্য ফাঁদে পরিপূর্ণ, অ্যামেটরি নভেল তাদেরকে খোলা হাওয়ার স্বাদ দিল। এই নভেল-লেখিকাদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন এলাইজা হেইউড, ডেলারিভিয়ের ম্যানলি, আফরা বেন (তাঁদের নামকরণ করা হয়েছিল–কলমবেশ্যা)। 

ব্রন্টি সিস্টারসদের কথা না বললেই নয়। এখানে এমিলি ব্রন্টি সম্পর্কে কিছু লিখব না, তিনি ও তাঁর একমেবাদ্বিতীয়ম উপন্যাসটি একটি আলাদা রচনার দাবিদার। অ্যান ব্রন্টি তাঁর নভেলে দেখিয়েছেন–সেকালের ভদ্রঘরের দুস্থ নারীরা কীভাবে গভর্নেসের পেশা বেছে নিয়ে শিশুদের হাতে নির্যাতিত হতেন। শার্লট ব্রন্টির 'জেন এয়ার' অ্যানের গভর্নেসদের তুলনায় সামাজিকভাবে প্রান্তিক অনাথা ঠিকই, কিন্তু তার চোখ-মন-প্রাণ দিয়ে সেকালের সমাজের যে আশ্চর্য অবগুণ্ঠন মোচন আর বীক্ষণ তা অতুলনীয়। গথিক অন্ধকারে সেখানে মিলেছে রিয়্যালিজমের তীক্ষ্ণধার চোখ। 

মেয়েদেরকে খুব জিতিয়ে দিতেন আশাপূর্ণা দেবী, প্রতিভা বসু, লীলা মজুমদার, নাজমা জেসমীন চৌধুরীরা। জেন অস্টেন কিংবা শার্লট ব্রন্টি যেমন। নবনীতা দেবসেন লিখেছিলেন, সমরেশ বসু একটি শারদীয় সংখ্যায় লিখলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষের সঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীর মধুর প্রেমের কাহিনি। পড়ে নবনীতার মনে হলো, বাহ, পুরুষ মানুষ বলে বুঝি যা খুশি তাই লিখতে পারা যায়? 

তিনিও তবে লিখবেন, চল্লিশোর্ধ্ব একজন মেয়ের সঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণির কোনো ছাত্রের প্রেমকথা! এ কথা খাবার টেবিলে পাড়তেই ঘরে যেন বাজ পড়ল। নবনীতার হতভম্ব মা বলে বসলেন, 'ওই সব লিখবি, ছাপাবি, তার পরেও মা-বাপেরা তোদের কাছে কলেজে ছেলেপুলেদের পড়তে পাঠাবে ভেবেছিস? তোকে তো ডাইনি মনে করবে!' নবনীতার মেয়ে কাঁদোকাঁদো–তার শিক্ষিকারা-বন্ধুরা–সব্বাই ওর মাকে কী মনে করবে? সে আর মুখই তো দেখাতে পারবে না!  

প্রতিক্রিয়া দেখে নবনীতা হতবাক। 'মা না হয়ে যদি বাবা হতুম, তাহলে কিন্তু মেয়ের শিক্ষক, সতীর্থ, আমার ছাত্রছাত্রীরা কেউই কিছু মনে করত না। বাবারা মুক্ত প্রাণী। তাঁদের কলমও মুক্ত। তাঁরা যা প্রাণ চায়, লিখতে পারেন। আমি মেয়ে, আমি পারি না।' সামাজিক অনুশাসন বড় শক্ত মনবেড়ি হয়ে বসেছে হাতেপায়েমনে। বিকেলবেলা নারীসাহিত্যিকের প্রাঙ্গণে কোনো ভোরের ফুল ফোটে না। সেকালের মীর মশাররফ হোসেন গৃহপরিচারিকার সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতার কথা লিখতে পারেন, একালের হেলাল হাফিজ লিখতে পারেন জিগোলো হিসেবে কাজ করবার কথা, কিন্তু নবনীতা দেবসেনকে প্রেমের গল্প লিখতেও সতর্ক হতে হয়। সমাজের রক্তচক্ষু মেয়েদের বেলায় সদাজাগরুক।

কেন লেখে

কলম-তুলির মাধ্যমে মানুষ একান্তকে আন্তর্জাতিক করে, শোককে করে শ্লোক, একাকিত্বকে পরিণত করে ঐক্যে। নারী-পুরুষনির্বিশেষে এ কথা সত্য। তবু বাংলায় নারীসাহিত্যিকদের ব্যাপারে বাজারচলতি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধারণা–জীবনে যথেষ্ট 'দুঃখদুর্দশা' না থাকলে কোনো মেয়ে লিখতে আসে না। উল্কি যেমন ক্রীতদাসকে চেনায়, তেমনি 'পদস্খলিত'কে চিনিয়ে দেয় লেখনী। 

তসলিমা 'নির্বাচিত কলাম'-এ লিখেছিলেন, 'মেয়েরা, যারা লেখে, সাধারণের মধ্যে তাদের সম্পর্কে এমন একটি ধারণা আছে যে, তারা লেখে, নিশ্চয়ই তাদের জীবনে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। জীবনে কোনো না কোনো বিপর্যয় ঘটলে মেয়েরা কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ বেশ্যাপাড়ায় আশ্রয় নেয়, অথবা কেউ সাহিত্যে আশ্রয় নেয়। একটি মেয়ে লিখতে শুরু করলে লেখার চেয়ে তার নাড়ি নক্ষত্রের প্রতিই মানুষের আকর্ষণ জন্মায়। প্রেমে পড়া অথবা প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, সংসারে অশান্তি অথবা সংসার-বৈরাগ্য ইত্যাদি ব্যাপারগুলো না ঘটলে একটি মেয়ে অযথা সাহিত্য রচনা কেন করবে তা অনেকের বোধগম্য নয়।' 

বিবাহবিচ্ছেদ-ধর্ষণ-পরকীয়া-বেশ্যাবৃত্তি-গর্ভধারণ-গর্ভপাত—যা কিছু নিয়ে সে লেখে, ছাপবার সঙ্গে যুক্ত পুরুষ দিব্য জিজ্ঞেস করে ফেলে, এতটা সে জানল কোথায়। সাধারণ পাঠক আরও অম্লানবদন, সে ধরে নেয় এমনটি লেখিকার সঙ্গে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, অমৃতা প্রীতম কিংবা তসলিমা নাসরিনের ব্যক্তিগত জীবন লোকে ভালো খায়, পঞ্চায়েত বসায়–মহাশ্বেতা দেবী কেন শিশুপুত্রকে ছেড়ে সাহিত্যচর্চা করতে গেলেন। 

আমরা জন্মাই, মরে যাই, আত্মীয় আত্মজ কিছু নাই

প্রাচীন গ্রিসের কবি সাফোর কবিতা লিঙ্গচিহ্নহীন ছিল না, সেখানে আশেক ও মাশুক উভয়ই স্ত্রীলোক। তাঁর বিরুদ্ধে সমাজ সহস্রমুখ–কেননা তিনি সমকামী। সেনেকা সন্দেহ করলেন, সাফো হয়তো বেশ্যা, অতএব প্রচারিত হলো–সাফো দুজন, একজন কবি, আরেকজন বেশ্যা। 

ওভিড এমনকি সাফোকে বর্ণনা করলেন ব্যর্থ প্রেমিকারূপে, তাঁর কলমে পাহাড়ের ঢাল থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাফো মৃত্যুবরণ করলেন। একালের মার্কিন ঔপন্যাসিক এরিকা জং আবার সাফোর সেই লাফিয়ে পড়বার কাহিনি লিখলেন–এবার সাফো তাঁর বিবিধ প্রণয়ের পরেও রীতিমতো অক্ষত, পাথরে পা পিছলে তিনি পড়ে যান সত্যি, দৈবক্রমে বেঁচে যান, প্রথম প্রেম অ্যালকেয়াস আর নিজের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আমৃত্যু সুখেশান্তিতে বসবাস করেন। 

'ওয়াইড সার্গাসো সি'তে জিন রিস তুলে আনেন ব্রন্টির 'জেন এয়ার'-এ চিলেকোঠায় আটক অবহেলিতা উন্মাদিনী প্রথম স্ত্রীকে। প্যাট বার্কারের কলমে একিলিস বা আগামেমননের চেয়ে উল্লেখযোগ্য এখন মালে-গনিমাত ব্রিসিয়স। একালের অ্যানা ফান্ডার তাঁর ফিকশনালাইজড মেমোয়ার 'ওয়াইফডম'-এ আইলিন ও'শনেসির জীবনে গার্হপত্য বা বউ-পনার মাধ্যমে নারীসাহিত্যিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা লিখেছেন, যথারীতি বইটির বিরুদ্ধে অরওয়েল সোসাইটি সরব প্রতিবাদ করেছে। কি লোককথায় কি জীবনে, নারীর যেসব ত্রুটিকে ফলাও করে পুরুষতন্ত্র তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে–আজ সেসব দণ্ড বহাল থাকছে না, নারীর হাতেই পুনর্লিখিত হচ্ছে। দেখলে ভারী পুলক লাগে। 

কে কার বিপরীতে

উনিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যে নারী সাহিত্যিকেরা তখন প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। নারীর ভূমিকা নিয়ে শার্লট ব্রন্টি তাঁর প্রতিটি উপন্যাসেই অত্যন্ত ব্যগ্র উদ্বিগ্ন ব্যতিব্যস্ত, উন্মত্ত প্যাশনের পাশাপাশি গভীর সংযম সেখানে। 'জেইন এয়ার' প্রকাশিত হবার পর সি এইচ লুইস তাঁকে জেন অস্টেনের লেখা পড়বার উপদেশ দেন। লুইসকে এক চিঠিতে শার্লট ব্রন্টি নিজের এবং অস্টেনের ভেতরকার ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক তফাতগুলো নিয়ে লেখেন, 'মিস অস্টেনকে আপনাদের কেন এত ভালো লাগে? 

অস্টেনের 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস'-এ কোথায় বন্য প্রকৃতি, কোথায় সামাজিক পঙ্ক্তিমালার বৈচিত্র্য, কোথায় সাধারণ মানুষের জীবনব্যাপী অসহ টানাপোড়েন আর স্বাধীনচেতা স্পষ্টবক্তা নারী-পুরুষের প্রকাশ?' ফ্যান্টাসির সঙ্গে সোশ্যাল রিয়ালিজমের যে আপনমনা ঘোল অস্টেনে, যেমন করে অসম্ভবকে মধ্যবিত্তের জীবনে অনায়াসে গুলে দেয়া, নারী চরিত্রের অন্তলীন আলোড়নকে জায়গা দেয়া–সদর থেকে সত্যিকারের অন্দরে, তা শার্লট ব্রন্টি অস্বীকার করলেন। 

ভিক্টোরিয়ান পিউরিটানদের কবলে পড়ে অ্যামেটরি নভেলরচয়িতা হেইউড-ম্যানলি-বেনের কীর্তি মুছে গেল। ডিটার শুলৎস ঘোষণা দিলেন–ড্যানিয়েল ডেফো, স্যামুয়েল রিচার্ডসন এবং হেনরি ফিল্ডিং-এর সাহিত্যকীর্তি এই হেইউড-ম্যানলি আর বেনের মতো নারী সাহিত্যিকদের অনন্ত রোমান্সের উচিত জবাব। এঁরা অলস লেখিকার বিকার লেখেন না, নটেগাছটি মুড়নো 'সুখেশান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল' এঁদের উপন্যাসের গন্তব্য নয় ইত্যাদি। 

এলাইজা হেইউডের 'লাভ ইন এক্সেস' তখনকার দিনে ডেফোর 'গালিভার্স ট্র্যাভেলস' বা 'রবিনসন ক্রুসো'র চেয়ে কম জনপ্রিয় ছিল না, অথচ আলোচ্য হলো কই? ১৭৯২এ অবশ্য মেরি ওলস্টোনক্রাফট 'ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান' প্রকাশ করে ফেলেছেন। যে জমানায় পুরুষ সমালোচকেরা (সশব্দে) ভাবতেন, নারীরা সফল সাহিত্যিক হতে পারছেন পুরুষ সাহিত্যিকদের সম্মতিতে বা অনুমতি জ্ঞাপনের পরে, তাঁরা স্বীকৃতি পাবেন এই শর্তে যে তাঁরা মেয়েলি-জগতে সীমাবদ্ধ থাকবেন এবং বাইরের দুনিয়াতে পুরুষের আধিপত্যের বাস্তবতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইবেন না, সাহিত্যলক্ষ্মীর আসনের কাছে তবেই তাঁদের আমরা বসতে দেব, এই মহানুভবতার কথা ভুলে গেলে তাঁদের আমরা ছুড়ে ফেলতে দ্বিধা করব না। 

অনেক অনেক বছর পর ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর 'আ রুম অব ওয়ানস ওউন'-এ অনুরোধ করেছিলেন, দুনিয়ার তাবত নারীর আফ্রা বেনের সমাধিতে ফুল ছড়ানো উচিত, হৃদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল নারীর মুখ ফুটে বলবার হক তিনি আদায় করেছিলেন। বেনই প্রথম ইংরেজ ঔপন্যাসিকা, যিনি লিখে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন, ভবিষ্যতের নারীলেখকদের পথ, স্বর, স্বাধীনতার তিনিই রূপকার।

পুরুষ লেখক-সমালোচক-সম্পাদকই নয় শুধু, পুরুষশাসিত সমাজও নারী লেখকের বিরুদ্ধে। হ্যারিয়েট বিচার স্টোর 'আঙ্কল টমস কেবিন' প্রকাশিত হবার পর দক্ষিণের সমাজে দাসব্যবসায়ের কুফলের সার্বিক চিত্র উঠে এসেছিল, বিপরীতে দক্ষিণ ইউনাইটেড স্টেটসে অনেক অ্যান্টি-টম নভেল (প্ল্যান্টেশন-সাহিত্য) রচিত হয়েছিল আঙ্কল টমস কেবিনের বিপরীতে 'আন্টি ফিলিসেজ কেবিন'। দাসদের সঙ্গে মালিকদের সৌহার্দ্যরে সুখদ ছবি রচনাই ছিল এসব উপন্যাসের মুখ্য উদ্দেশ্য। নারী কেন সত্য উদ্ঘাটন করবে! 

এলিজাবেথ জেন হাওয়ার্ড বলেছিলেন, নারীকে তার নিজ মেধায় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পুরুষ রীতিমতো বাধা দেয়, অস্বীকার করে। আমরা উপন্যাস লিখতে শুরু করেছি পুরুষেরও আগে, অথচ পুরুষ সম্পাদক-সমালোচকেরা একে অপরের পিঠ চাপড়াচাপড়ি করে কেবল। এমনকি ২০১১ সালের একটি সাক্ষাৎকারে নাইপল নারীসাহিত্যিকদের তাঁর সমকক্ষ বলে মনে করেননি, বরং তাঁদের ভাবপ্রবণতার সমালোচনা করেছেন। 

'বিষাদসিন্ধু'র মতো উপন্যাসের পর একসময় মীর মশাররফ হোসেনের মতো সাহিত্যিক লেখেন 'গাজী মিয়াঁর বস্তানী', সম্ভবত বেগম রোকেয়ার ভগ্নী দেলদুয়ারের সুশিক্ষিতা জমিদার বেগম করিমন্নেসাকে কটাক্ষ করে এ আত্মজীবনীমূলক রচনা। 

চল্লিশের দশকে প্রতিভা বসুর গল্পে হিন্দু-মুসলমানের প্রেম ('সুমিত্রার অপমৃত্যু'), মা ও মেয়ে একই ব্যক্তির প্রেমে পড়ছে ('বিচিত্র হৃদয়'); ৮২ বছর বয়সে লিখলেন দুঃসাহসী 'মহাভারতের মহারণ্যে', যেখানে বিদুর আসলে কুন্তীর ছেলেদের প্রকৃত পিতা। দময়ন্তী বসু সিংহ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মহিলারা মায়ের (প্রতিভা বসুর) লেখার অন্ধ ভক্ত হলেও অনেকে বলতেন, পুরুষ সমাজের কাছে প্রতিভা বসু খুব গ্রহণযোগ্য নন, সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে তাঁকে চিরদিন ব্রাত্য করেই রাখা হলো, চিক-লিট এর স্রষ্টা হিসেবে বড়জোর। মনে আছে নিজের লেখায় বুদ্ধদেব বসু ভারী গর্ব করে বলেছিলেন, প্রতিভা বসুর এমনকি লেখার টেবিলটা পর্যন্ত নেই। ছোট্টবেলায় আশাপূর্ণা দেবীকে বাড়িতে সবাই ডাকত 'ছিষ্টিছাড়া'। 

দাদারা পড়তে বসলে বোনটি উল্টো দিকে বসে পড়া শুনতে শুনতে উল্টো অক্ষর চিনলেন। বিয়ের পরে একান্নবর্তী পরিবারের বধু, সবার মন জুগিয়ে সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে লেখার সময় বের করতেন! দিনের বেলা সেই সুযোগ না হলেও রাতে অনেকক্ষণ লিখতেন। আশাপূর্ণা দেবীর জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার নিয়ে পুরুষ বিচারকের নির্লজ্জ বৈষম্যমূলক আচরণের কথা নবনীতা দেবসেন 'দেশ'-এ লিখেছিলেন, 'সুবর্ণ লতা'র নাম প্রস্তাব করা হলে পুরুষ বিচারক বাগড়া দেন। 

সাহিত্য আকাদেমি আশাপূর্ণা দেবীকে পুরস্কৃত করেনি, জ্ঞানপীঠ করেছিল। জুলিয়ান বার্নস-ইয়ান ম্যাকেয়ান বা সালমান রুশদীর সমকালীন হেলেন ডানমোরকে অরেঞ্জ ওম্যানস প্রাইজ পেয়েই তুষ্ট থাকতে হয়। সুনীল-শক্তির বিপরীতে কবিতা সিংহ যেমন। টেড বনাম সিলভিয়া, দেবারতি বনাম মণীন্দ্র, সুবোধ বনাম মল্লিকা এমনি তর্ক চলছে, চলবে আরও বহুকাল।

তসলিমা নাসরিন যখন 'নির্বাচিত কলাম' লিখছেন, তখন আমরা স্কুলপড়ুয়া, তিনি লিখেছিলেন কেমন করে এক ঔপন্যাসিক বন্ধু তাঁকে বাহবা দিয়ে বলেছিলেন–তোমার লেখা সেলিনা হোসেনের চেয়ে ভালো হচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে সেলিনা হোসেনই ভালো কিনা! সেই সিঙ্গলস খেলার রীতি আজো বদলায়নি, মিক্সড সিঙ্গলস বাংলাদেশের কলম-ধরা মেয়েদের খেলতে দেয়া হয় না। সলিমের বিপরীতে কলিম সেখানে, সেলিনার বিপরীতে তসলিমা। সঙ্গীতার বিপরীতে তিলোত্তমা। অস্টেনের বিপরীতে শার্লট ব্রন্টি। আজও। 

কার নামে

জেন অস্টেনের পাণ্ডুলিপিতে দেখবেন মার্জিন নেই, প্যারাগ্রাফও বিরল, যতিচিহ্ন হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ড্যাশ–চরিত্রগুলোর কথোপকথনে কোথাও তিনি কাটাকুটি করেননি, যেন অবিরল ধারায় তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়েছে গল্পস্রোত। জীবদ্দশায় এই স্বভাবশিল্পীকে সমস্ত বইয়ের রয়্যালটি হারাতে হয়েছিল, এমনটি কোথাও পড়েছি, অন্যত্র পড়েছি–রয়্যালটি থেকে বড় অর্থহীন অর্থ জুটত তাঁর। তাঁর উপন্যাসগুলো বেনামীতে ছাপা হতো, কভারে শুধু লেখা থাকত–'নারী বিরচিত'। 

ব্রন্টি সিস্টার্সরা, জর্জ এলিয়ট, ও ডগলাস পুরুষ ছদ্মনামে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। লুইসা মে অ্যালকট 'লিটল উইমেন' লিখবার আগে এ এম বার্নার্ড ছদ্মনামে লিখতেন, আমৃত্যু বিয়ে করেননি তিনি, বলতেন, 'স্বাধীনতার স্বাদ স্বামীর চেয়ে তো বটেই, ভালোবাসার চেয়েও স্বাদু।' সায়েন্স ফিকশন লেখিকা অ্যালিস শেল্ডন পুরুষের ছদ্মনামে লিখতেন, তিনি মনে করতেন–তাঁর পুরুষালি গদ্য এবং বিষয়ের জন্য ঐ আড়ালটুকু জরুরি। সিলভিয়া প্লাথ, জয়েস ক্যারল ওটস এবং জে কে রলিংসও পুরুষ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। 

আঁধারের বন্দিনী

লিখবার জন্য নারীকে ক্রমাগত যুদ্ধ চালাতে হয়, বহিরঙ্গে তো বটেই, নিজের মন ও মস্তিষ্কের বহু রাক্ষসকে পরাস্ত করতে হয়। আঠারো শতকের মেরী ল্যাম্বকে মনে আছে? ভাই চার্লস ল্যাম্বের সঙ্গে মিলে যিনি 'টেলস ফ্রম শেকসপিয়ার' লিখলেন? মানসিক রোগিনী মেরী মাকে খুন করে মানসিক আশ্রমে চালান হয়ে যান। মৃত্যুর পর লেখক বন্ধু ট্যালফর্ড যে স্মারক রচনা লেখেন, তাতে মেরীর প্রতি চার্লসের দাক্ষিণ্যের কথাই বেশি, পরবর্তীতে ব্রিটিশ কোয়ার্টারলি জার্নালের মতো পত্রিকাগুলো মেরিকে নিয়ে যে সম্প্রচার চালায়, তা যথেষ্ট হৃদয়হীন ও অসম্মানকর। 

উনিশ শতকে রান্নার বই লিখে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিলেন ইসাবেলা বিটন, প্রথম বছরেই তাঁর বই ষাট হাজার কপি বিক্রি হয়। স্বামী ব্যক্তিগত ঋণ শুধতে অপারগ হয়ে বিটনের অত জনপ্রিয় বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করে দেন, স্বামীর বেশ্যাসঙ্গ থেকে প্রাপ্ত সিফিলিসে ইসাবেলা আক্রান্ত হয়েছিলেন, মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। 

কবি এমিলি ডিকিনসন একসময় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। জীবদ্দশায় তাঁর ১৮০০ কবিতার ভেতর হাতে গোনা কয়েকটি কেবল প্রকাশিত হয়েছিল, বাকি সম্ভার আবিষ্কৃত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে। 

স্কট ফিটজেরাল্ডের স্ত্রী জেল্ডা নিজেও ছিলেন চমৎকার লেখক ও আত্মজীবনীকার। বাইপোলার ডিজর্ডারের রোগিনী জেল্ডা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। 

এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং ছিলেন চিররুগ্ণা, প্রতাপান্বিত বাপের কোণঠাসা কন্যা। বাবা চাননি তাঁর কোনো ছেলেমেয়ে বিয়ে করুক। এলিজাবেথ আশ্রয় নিয়েছিলেন কবিতার কাছে। কবিতা এনে দিয়েছিল রবার্ট ব্রাউনিং-এর নৈকট্য, রোগশয্যায় সম্ভাবনার প্রথম স্পন্দন। বাড়ি থেকে বের হয়ে একদিন এলিজাবেথ নিঃশব্দে রবার্টকে বিয়ে করে এলেন, নয়দিন বাদে বাবার বাড়ি থেকে চিরতরে বের হয়ে গেলেন প্রাণবন্ত, শিল্পমুখর জীবনের খোঁজে। 

আরেক বাইপোলার লেখক অ্যান সেক্সটন আত্মহত্যার আগপর্যন্ত কবিতাতেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের মূলমন্ত্র। পিনাক বিশ্বাসের সূত্র ধরে জেনেছি সান্ত্বনা গুহ নাম্নী এক লেখকের তিনটি বই রাজদ্রোহিতার অভিযোগে বৃটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে, বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকেন, রাজশাহী জেলের ভেতরই তাঁকে খুন করা হয়। 

কে চলিতে পারে

গল্পের নাম 'অজাচার' (নবনীতা দেবসেন) এবং 'প্যান্টি' (সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়) রাখবার কারণে সমরেশ মজুমদার এবং বুদ্ধদেব গুহ আপত্তি করেছিলেন, এ তো ভদ্রমহিলার কলমের ভাষা নয়! কৃত্তিবাসে দেবারতি মিত্রের ওরাল সেক্স বিষয়ক কবিতায় আপত্তির ঝড় উঠেছিল, অথচ ঐ একই বিষয়ে একই পত্রিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা ছাপানো হলে কবির দুঃসাহসের প্রশংসা করা হয়েছিল। পুরুষ কবি-সাহিত্যিক-সমাজ নির্ধারণ করে দেবেন নারীর ভাষা, ছকে দেবেন চিন্তা, অর্গল দেবেন স্বাধীনতায়। এ শুধু বাংলায় নয়, সর্বত্র সত্য। এই সত্য মিথ্যে হয়ে যাক, মর্ত্যে বা ত্রিদিবে।

Related Topics

টপ নিউজ

ইজেল / নারী সাহিত্যিক / সাহিত্যিক / কবি

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • জামায়াতে ইসলামী ও শফিকুর রহমানের বিভিন্ন পোস্টের স্ক্রিনশট। কোলাজ: টিবিএস
    শফিকুর রহমান: এক স্বঘোষিত বিরোধী দলীয় নেতার অদ্ভুত কাহিনি
  • ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দুই উপদেষ্টা বাম থেকে- স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ছবি: গেটি/ ভায়া দ্য নিউ রিপাবলিক
    কুশনার, উইটকফ দুজনেই নির্বোধ, তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প
  • জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
    জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
  • ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
    ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নির্মম বোমাবর্ষণ চলছেই, ২০ বছরে ভিয়েতনামে ফেলা হয় ৭৫ লাখ টন
  • বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। ফাইল ছবি: বাসস
    '২০৪২ সালেও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকবেন' বক্তব্য, জয়নুল আবদিনকে সতর্ক করল বিএনপি
  • মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর গত ৭ মার্চ ওমানের মাস্কাট উপকূলে নোঙর করে আছে ‘লুওজিয়াশান’ তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: বেনোয়া তেসিয়ের/রয়টার্স
    তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার হওয়ার প্রস্তুতি নিন, বিশ্বের প্রতি ইরানের বার্তা

Related News

  • বোকা বাকশোর কথকতা
  • ‘চৌরঙ্গী’র লেখক শংকর মারা গেছেন
  • এপস্টেইনের ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ 
  • রিগন, আপনি আমাদের কাছেই আছেন
  • সুন্দরী এক পাখির গল্প

Most Read

1
জামায়াতে ইসলামী ও শফিকুর রহমানের বিভিন্ন পোস্টের স্ক্রিনশট। কোলাজ: টিবিএস
মতামত

শফিকুর রহমান: এক স্বঘোষিত বিরোধী দলীয় নেতার অদ্ভুত কাহিনি

2
ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দুই উপদেষ্টা বাম থেকে- স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ছবি: গেটি/ ভায়া দ্য নিউ রিপাবলিক
আন্তর্জাতিক

কুশনার, উইটকফ দুজনেই নির্বোধ, তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প

3
জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
বাংলাদেশ

জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ

4
ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
ফিচার

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নির্মম বোমাবর্ষণ চলছেই, ২০ বছরে ভিয়েতনামে ফেলা হয় ৭৫ লাখ টন

5
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। ফাইল ছবি: বাসস
বাংলাদেশ

'২০৪২ সালেও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকবেন' বক্তব্য, জয়নুল আবদিনকে সতর্ক করল বিএনপি

6
মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর গত ৭ মার্চ ওমানের মাস্কাট উপকূলে নোঙর করে আছে ‘লুওজিয়াশান’ তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: বেনোয়া তেসিয়ের/রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার হওয়ার প্রস্তুতি নিন, বিশ্বের প্রতি ইরানের বার্তা

EMAIL US
contact@tbsnews.net
FOLLOW US
WHATSAPP
+880 1847416158
The Business Standard
  • About Us
  • Contact us
  • Sitemap
  • Privacy Policy
  • Comment Policy
Copyright © 2026
The Business Standard All rights reserved
Technical Partner: RSI Lab

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net