এপস্টেইনের ‘ললিতা এক্সপ্রেস’
নিরাময়-অযোগ্য একজন মনোবিকৃত ব্যক্তির ছোটখাটো বিপদ হলো–তার নিজের বইয়ের তাক। এই তাকের খোদ বইই একদিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে। কিছু বইয়ের মলাট তাই ঘরের ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে রাখাই ভালো।
কিশোরদের প্রতি বিকৃত আসক্তির ব্যক্তি চাইলেই টমাস মানের 'ডেথ ইন ভেনিস' বইটি লুকিয়ে রাখতে পারে। বইটিতে এক মধ্যবয়সী জার্মান লেখক এক পোলিশ কিশোর ছেলের শরীরের দিকে অতিরিক্ত আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
অত্যধিক শিক্ষিত কোনো ধর্ষক হলে সে হয়তো আরও সতর্ক হবে। 'আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ'-এর ওপর নতুন মলাট চাপাতে পারে। বাইরে থেকে যাতে বইটাকে কোনো সাদামাটা প্রেমকাহিনি বলে ভুল হয়।
এ কারণেই জেফরি এপস্টেইনের আচরণটা কৌতূহল জাগায়। ২০১৯ সালে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রভাবশালী অর্থলগ্নিকারী। শিশু পাচারের অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় আটক ছিলেন সে সময়। এপস্টেইন খোলামেলাভাবেই দাবি করতেন, তার প্রিয় বইটি হলো ভ্লাদিমির নাবোকভের 'ললিতা'।
১৯৫৫ সালে ফ্রান্সে প্রথম প্রকাশিত এই উপন্যাসটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কিশোরী-আসক্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। এ থেকেই জন্ম নিয়েছে দুটো শব্দ–'ললিতা' আর 'নিম্ফেট'। এমন সব মেয়েদের বোঝাতে, যাদের শরীর বড়দের চোখে কামনার বস্তু হয়ে ওঠে।
বইটি এপস্টেইন বিছানার পাশের সাইড টেবিলে রাখত কি না, তা তেমন বড় কোনো কথা নয়। প্রকাশিত নথিপত্রের ভিত্তিতে জানা যায়, জেফরি এপস্টেইনের মালিকানায় ছিল ললিতার প্রথম সংস্করণ। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক ৪৩ দিন আগে এপস্টেইন ই-বুক রিডার কিন্ডলের জন্য দ্য অ্যানোটেটেড ললিতা অর্ডার করেছিল। এপস্টেইন যে নাবোকভের 'বড় ভক্ত'–এমন দাবির বিপরীতে যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া একটাই, তার এই দাবি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সে হয়তো চেয়েছিল অন্যরা তা বিশ্বাস করুক। হয়তো ভদ্র আলোচনার ছলে বইটি নিয়ে কথা বলে কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। এসব মানুষ হয়তো নাবোকভের নামের বানানও ঠিকমতো জানে না বা করতে পারে না। অথবা নগদ নারায়ণের লোভে বা বিনিময়ে এপস্টেইনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভণিতাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আগ্রহী ছিল না তারা।
২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এলিসা নিউয়ের সঙ্গে এপস্টেইনের ই-মেইল যোগাযোগে ললিতা হঠাৎ করেই হাজির। নিউ হলেন ল্যারি সামার্সের স্ত্রী; সামার্সের একটি কবিতা প্রকল্পে এপস্টেইন টাকাকড়ি ঢেলেছিল। ই-মেইলটিতে নিউ লেখেন, 'আমি ওপরে যাচ্ছি, আমার ললিতার কপিটা খুঁজে দেখব'–যেন এই প্রস্তাবটি এপস্টেইনের দিক থেকেই এসেছে। পরবর্তী ই-মেইলে এপস্টেইনকে উইলা ক্যাথারের মাই অ্যান্টোনিয়া পড়ার পরামর্শ দেন নিউ। তিনি দাবি করেন, উপন্যাস দুটির মধ্যে মিল রয়েছে; কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই একজন পুরুষের পুরো জীবন নাকি চিরতরে ছাপ ফেলেছ, অল্পবয়সী মেয়ের প্রতি তার প্রথম আসক্তি-অনুভূতি। অথচ উইলা ক্যাথারের লেখা, মাই অ্যান্টোনিয়া আসলে কোনো রোমাঞ্চকর কাহিনি নয়। বইতে জড়িয়ে রয়েছে স্মৃতিময়তা। বইটিতে দেখি, একজন পুরুষ তার জীবনের পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখছে, শৈশবে দেখা এক মেয়েকে। অ্যান্টোনিয়া। মেয়েটি কোনো রহস্যময় চরিত্র নয়। কোনো নিষিদ্ধ আকর্ষণও না। মেয়েটি ছিল পরিশ্রমী, প্রাণবন্ত, মাটির কাছাকাছি থাকা এক কিশোরী, যার উপস্থিতি কথকের জীবনে স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। এই উপন্যাসে আকাক্সক্ষা আছে, কিন্তু তা কামনার নয়। বরং নস্টালজিয়ার। একজন মানুষের পুরো জীবন কীভাবে অল্প বয়সে দেখা একটি মেয়ের স্মৃতিতে ছায়া ফেলে থাকে, মাই অ্যান্টোনিয়া সেই কথাই ধীরে ধীরে বলে।
ললিতার সাথে মিল থাকার এই তুলনাটি ঠিক তো নয়ই, বরং ভয়ংকর। ললিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি বারো বছরের মেয়ে, যাকে এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অপহরণ করে এবং ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ করে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ললিতাকে মাই অ্যান্টোনিয়ার সঙ্গে এক কাতারে রাখা অনেকটা এমন, যেন বলা হয় মোবি-ডিক এবং ডেলিভারেন্স–দুটিই কেবল মাছ ধরার গল্প। মোবি-ডিক আর ডেলিভারেন্স–দুটোকেই যদি শুধু 'মাছ ধরার গল্প' বলা হয়, তাহলে সেটা সত্যিও হয় আবার সম্পূর্ণ মিথ্যেও। মোবি-ডিক-এ সমুদ্র আছে, তিমি শিকার আছে–কিন্তু আসল লড়াইটা মানুষের ভেতরে। ক্যাপ্টেন আহাবের প্রতিশোধ-উন্মাদনা ধীরে ধীরে দর্শন, ঈশ্বর, ভাগ্য আর মানুষের সীমা নিয়ে এক বিশাল চিন্তার জালে পরিণত হয়। গতি কখনো ধীর, কখনো থেমে যায়; যেন সমুদ্রের মতোই গভীর আর অসীম ধৈর্যময়।
ডেলিভারেন্সে নদী আছে, মাছ ধরা আছে; কিন্তু সেটা সভ্যতার মুখোশ খুলে পড়ার গল্প। চারজন শহুরে পুরুষ প্রকৃতির ভেতরে ঢুকে পড়ে, আর সেখানেই বেরিয়ে আসে সহিংসতা, ভয় আর নৈতিক ভাঙন। গতি দ্রুত, চাপ বাড়তে থাকে, নিশ্বাস নিতেও সময় দেয় না। একটা বই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মানুষের আত্মা বোঝার চেষ্টা করে। আরেকটা বই নদীর স্রোতে মানুষ কীভাবে পশু হয়ে উঠতে পারে। তাই-ই দেখায়।
এমন পরিপ্রেক্ষিতে কাণ্ডজ্ঞান বাতলায়, ললিতার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পর্কই প্রকাশ করা উচিত নয়। ঠিক সে কাজটাই এপস্টেইন করেনি।
কংগ্রেস থেকে সদ্য প্রকাশিত এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিতে কিছু ছবি রয়েছে। ছবিগুলোতে দেখা যায় এক তরুণী বা সম্ভবত কিশোরী, যার ত্বকের ওপর সূক্ষ্ম কালো কালি দিয়ে লেখা রয়েছে ললিতার অশ্লীল সূচনাপঙ্ক্তি। (এপস্টেইন মামলার ভিকটিমদের একজন, জোহানা সজোবার্গ, সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে এপস্টেইনের নিউইয়র্ক ম্যানশনে ললিতা উপন্যাসের উদ্ধৃতি-সংবলিত আর্টওয়ার্ক বা ছবি ছিল। এটি এপস্টেইনের বিকৃত রুচি এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি তার লালসার একটি ভয়ানক প্রতিফলন।) লেখাগুলো এমনভাবে উপস্থাপিত, যেন সেগুলো কোনো তুচ্ছ রসিকতা। বাস্তবে এগুলো ছিল ক্ষমতার নীরব প্রদর্শন। এর আগেও নভেম্বর মাসে প্রকাশিত নথিপত্রে ললিতা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কখনো স্পষ্টভাবে, কখনো ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে।
সে সময় সাংবাদিক মাইকেল উলফ এপস্টেইনকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেন। উলফের বর্ণনায়, এপস্টেইনের শোবারঘরের পাশের টেবিলে রাখা ছিল একটি মাত্র বই, ললিতা। অন্য কোনো বই নয়। উলফ আরও উল্লেখ করেন, ঠাট্টা বা অতিশয়োক্তি বাদ দিয়েও এপস্টেইন নিজেকে নাবোকভের 'ভীষণ বড় ভক্ত' হিসেবেই উপস্থাপন করত।
এই তথ্য যাচাই করতে একজন ফ্যাক্টচেকার যখন এপস্টেইনের কাছে ই-মেইল পাঠান, এপস্টেইন সেটি উলফকে ফরোয়ার্ড করেন। সঙ্গে ছোট্ট এক নোট, তিনি এই যাচাইপ্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না। একটি সংক্ষিপ্ত শব্দে উত্তর, 'এনএফডব্লিউ।' ভদ্রভাবে মানে করলে দাঁড়ায়, কোনোভাবেই না। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিবেদন আর প্রকাশিতই হয়নি।
একজন মানুষের বইয়ের তাক ধীরে ধীরে কীভাবে তার মানসিক জগতের দরজা খুলে দেয়, এখানে সন্দেহ যায় না-এপস্টেইন আদৌ কখনো ললিতা পড়েছিলেন কি না। আর পড়লেও সেটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এমন প্রমাণ নেই।
এই উপন্যাসের আনন্দ তীব্র, কিন্তু তা কামজ নয়। আর সেই আনন্দ এপস্টেইনের রুচির সঙ্গে খাপে খাপে মেলে না। তার স্বাদ ছিল মূলত কামজ, রূঢ়, ইন্দ্রিয় বা ভোগবাদী। এককথায় সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা-বর্জিত।
নাবোকভের আরেকটি মহান উপন্যাস 'পেল ফায়ার'-এর মতোই ললিতা আসলে একধরনের আত্মপ্রতারণার গল্প। এখানে একজন বুদ্ধিমান, লেখকসত্তাসম্পন্ন মানুষ আছে; যিনি এতটাই বুদ্ধিমান যে বাক্য বানাতে পারেন, কিন্তু এতটাই অন্ধ যে বুঝতে পারেন না, তিনি নিজেই ভয়াবহভাবে বিকারগ্রস্ত। এই উপন্যাসে যে করুণার স্তরগুলো ধরা পড়ে, সেখানে পৌঁছানোই একজন প্রকৃত পাঠকের কাজ। এপস্টেইনের মতো মনোবিকৃত এক মানুষের পক্ষে সেই স্তরে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।
তার ই-মেইলগুলো আমাদের আরেকটা জিনিস জানায়। এপস্টেইন কিনতেন অর্থনীতি, ক্ষমতা, যৌনতাকেন্দ্রিক নানা ধরনের নন-ফিকশন বই। তার সঙ্গে থাকত কিছু এলোমেলো বই। এসব বই হয়তো তার চারপাশের ক্ষমতাবান পুরুষদের কাছে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারত।
সব কেনাকাটাই নিম্নমানের ছিল না। তিনি কিনেছিলেন নরম্যান মেইলারের আগুনঝরা কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক নারীবিদ্বেষী বিতর্কিত গ্রন্থ 'দ্য প্রিজনার অব সেক্স'। এমনকি ডন ডেলিলোর উপন্যাস 'জিরো কে'ও। ডন ডেলিলোর উপন্যাস 'জিরো কে'-এ (২০১৬) সংক্ষেপে বলা যায়, মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার এক আধুনিক স্বপ্নের গল্প। কিন্তু শুধু 'ক্রায়োনিক্স', অর্থাৎ শরীর হিমায়িত করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ, এই প্রযুক্তিগত ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে গল্পটিকে বিচার করলে ভুল হবে। উপন্যাসটি আসলে মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করার আকাক্সক্ষা, পুঁজির ক্ষমতা এবং পিতা-পুত্রের দূরত্ব–এই তিনটির জটিল সম্পর্কের কাহিনি। প্রযুক্তির গল্পের চেয়ে বেশি, এটি বরং অপেক্ষার উপন্যাস। এমন এক ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা, যা হয়তো কখনোই আসবে না।
কিন্তু তার সংগ্রহে সস্তা রুচির বইও ছিল। ফ্ল্যাশম্যান সিরিজ-যেন জেমস বন্ড, তবে আরও নির্বোধ, আর পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ ও পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী অহংকারে ডুবে থাকা ব্যক্তি। এ ছাড়াও ছিল 'দ্য ম্যান ফ্রম ওআরজিওয়াই'। ষাটের দশকের এক হালকা গুপ্তচর, যৌন ফ্যান্টাসি, যাদের কাছে 'পুসি গ্যালোর'ও অতিরিক্ত সূক্ষ্ম বলে মনে হয়।
এই লেখাগুলো এতটাই সেকেলে আর ফাঁপা যে পড়তে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য এপস্টেইনের জন্য করুণাই জাগে।
তবে মাঝে মাঝে হালকাধর্মী, পলায়নপ্রবণ লেখা পড়া কোনো অপরাধ নয়। তাতে ভালো গদ্য পড়ার সক্ষমতা নষ্ট হয় না। গুপ্তচর আর বীর প্রেমিকের গল্প পড়ার দিকে যার ঝোঁক, তার জন্য ললিতা ভুল বই। কারণ, এই উপন্যাসে নায়ক বলে কিছু নেই। হামবার্র্র্র্ট, এর কথক। সে বিভ্রান্ত, আত্মপ্রবঞ্চিত, আর বোকার মতো আত্মবিশ্বাসী। এই উপন্যাস আসলে তাকে নিয়েই একটি নির্মম রসিকতা।
হলিউড বিষয়টা বুঝেছিল। ললিতা উপন্যাসের দুই চলচ্চিত্র রূপান্তরে হামবার্ট চরিত্রে বেছে নেওয়া হয়েছিল জেমস ম্যাসন ও জেরেমি আইরনসকে। তারা দুজনেই এক বিশেষ ধরনের চরিত্রে অভিনয়কারী পরিচিত মুখ। ঠান্ডা, সরীসৃপসদৃশ, অস্বস্তিকর উপস্থিতির বিকৃত মানুষ–এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেই তাদের খ্যাতি। এমনিতেই একজন গড়পড়তা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ একজন মার্কিন কিশোরীর সঙ্গে ভয়ংকর রকম বেমানান; সেখানে এই দুই অভিনেতার শরীরী ভাষা ও মুখভঙ্গি সেই অমিলটাকে আরও কদাকার ও অস্বস্তিকর করে তোলে।
হামবার্ট সাহিত্যজগতের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও আত্মমগ্ন চরিত্রগুলোর একটি। সে একজন ধর্ষক, একজন খুনি, দায় এড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বমানের শিল্পী, 'আমি নই, ও-ই আমাকে প্রলুব্ধ করেছিল'–এই তার যুক্তি। একই সঙ্গে সে শিশু নিপীড়নে লিপ্ত, আত্মম্ভরী ইউরোপীয় আবর্জনার এক নিখুঁত নমুনা। কেলেঙ্কারিটা এখানেই–এই চরিত্রটি নিজের কথা এত ভালোভাবে বলতে পারে। ভাষার এমন নিপুণতা, এমন বাকচাতুর্য–যা শেষ পর্যন্ত ভ্লাদিমির নাবোকভের ভাষা প্রতিভারই প্রতিফলন।
উপন্যাসের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে হামবার্ট আর ললিতার আমেরিকা জুড়ে গাড়ি চালিয়ে বেড়ানো। একটি জীর্ণ পুরোনো গাড়িতে চড়ে তারা মোটেলের পর মোটেল ঘোরে, রাস্তার ধারের সস্তা বিনোদন আর কদর্য দর্শনীয় স্থানের পাশ দিয়ে চলে যায়। এই 'কন্টিনেন্টাল' বুদ্ধিজীবী আর তার শিকারকে ঘিরে এক দীর্ঘ, অস্বস্তিকর যাত্রা।
(এপস্টেইন অবশ্য এই দিক থেকে আলাদা ছিল। সে এতটাই স্নব ছিল যে মাটির পথে ভ্রমণকে নিজের মর্যাদার হানি বলেই মনে করত। সে উড়ত ব্যক্তিগত বিমানে। বোয়িং ৭২৭। বিমানটির অনানুষ্ঠানিক নামই ছিল 'ললিতা এক্সপ্রেস'।)
এইখানেই ফাঁকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এপস্টেইন ললিতাকে চেয়েছিল একধরনের কল্পিত পরিচয় হিসেবে–নিজের রুচি আর ক্ষমতার আড়াল হিসেবে। কিন্তু উপন্যাসটি নিজেই সেই পরিচয়কে নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো–এপস্টেইন ললিতাকে ভুলভাবে পাঠ করেছিল।
তার কাছে বইটি ছিল উচ্চ সাহিত্যিক মোড়কে বাঁধা একধরনের ভোগবাদী কল্পকাহিনি–যেন বুকার পুরস্কারজয়ী কোনো পেন্টহাউস ফোরাম; সেই প্রাপ্তবয়স্কদের সাময়িকী, যেখানে পাঠকের পাঠানো যৌন কল্পগল্প ছাপা হতো, কামনাকে বিনোদনের পণ্য বানিয়ে। অর্থাৎ ভাষা থাকবে, কিন্তু ভাষার ভেতর কোনো নৈতিক অস্বস্তি নয়; শিল্প থাকবে, কিন্তু শিল্পের কেন্দ্রে মানুষ নয়–উত্তেজনা।
এই ভ্রান্তি শুধু পাঠগত ভুল নয়, দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা। কারণ, ললিতা কামনার উদযাপন নয়, বরং কামনার ভাষায় লুকোনো আত্মপ্রবঞ্চনার শারীরবিদ্যা। সেটিকে যদি কেউ নিছক উত্তেজনাকর রগরগে পাঠ মনে করে, তবে সে শুধু বইটিকে ভুল পাঠ করছে না; বরং নিজেকেও ভুল বুঝছে। এপস্টেইন-ফাইলসের একটি ছবিতে যে সূচনাপঙ্ক্তিগুলো এক নারীর শরীরে লেখা দেখা যায়, সেগুলো আদৌ কামনার বর্ণনা নয়। সেগুলো আত্মমগ্ন ভাষার খেলা।
এই উপন্যাসকে যদি নিছক যৌন উদ্দীপনার পাঠ হিসেবে পড়া হয়, তাহলে আরেক স্তরের বিদ্রূপ তৈরি হয়। কারণ, তখন এপস্টেইন গিয়ে দাঁড়ায় ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে বইটি প্রথম প্রকাশের সময় তার
বিরুদ্ধে নীতিবাগীশ সমালোচকেরা দাঁড়িয়েছিলেন।
তবে উপন্যাসটির শেষাংশ এপস্টেইনের মতো প্রবৃত্তির মানুষের কাছে আরও বেশি অগ্রহণযোগ্য, আরও বেশি ঘৃণ্য। হামবার্ট আবার ললিতার মুখোমুখি হয়, তখন তার বয়স সতেরো। ললিতা তখন আর আগের মতো নয়। অর্থাৎ সে বড় হয়ে গেছে। হামবার্টের কাছ থেকে সে যৌন অর্থে নিজেকে মুক্ত করেছে, যদিও তার টাকার প্রতি তার আগ্রহ রয়েই গেছে। সে এখন বিবাহিত, অন্তঃসত্ত্বা। আর এই বদলে যাওয়া ললিতা হামবার্টের কাছে আর আকর্ষণীয় নয়। কিছুটা হলেও হামবার্ট নিজেও নিজের চোখে আকর্ষণ হারায়। এমনকি তার করা অপরাধগুলোর জন্য সে খানিকটা অনুতপ্তও হয়।
এই অপমানগুলোর তালিকায়, প্রেমিকার বয়স বেড়ে যাওয়া, সস্তা মোটেলে দিন কাটানো, নিজের নৈতিক ক্ষুদ্রতা আবিষ্কার, হামবার্ট শেষ পর্যন্ত আরেকটি অপমান যোগ করে। সম্ভবত এই জায়গাতেই একমাত্র এপস্টেইন নিজেকে তার সঙ্গে মেলাতে পারত।
উপন্যাসের শেষে হামবার্ট জানায়, সে কেন এসব কথা লিখে যাচ্ছিল। সে তখন কারাগারে, বিচার শুরুর অপেক্ষায়। এই লেখাগুলো আসলে তার নোট, নিজের জন্য রাখা হিসাব।
কিন্তু সেই বিচার আর হবে না। বিচার শুরু হওয়ার আগেই হামবার্ট হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবে। আর ললিতা, সে মারা যাবে সন্তান প্রসবের সময়।
এই কাহিনির ভেতরের বিদ্রূপটা লক্ষ করার মতো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একটি শিশুর শৈশব চুরি করে, আর সেই শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনটাই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে লক্ষ্য করার মতো আরেকটি বিদ্রূপ আছে, যা এপস্টেইনের সঙ্গে মিলে। হামবার্টের মতো সে-ও অকালমৃত্যুর মাধ্যমে বিচারের হাত এড়িয়ে যায়।
এপস্টেইন চাইলে নিজেকে হামবার্টের মধ্যে দেখতে পারত। হামবার্টকে খুব ভালোভাবে বুঝতেও পারত এবং তবু তাকে ঘৃণ্য মনে না করতেও পারত।
শেষ পর্যন্ত এপস্টেইন ছিল এপস্টেইনই। সে পরিচিত মানুষজনের মতো একই নৈতিক জগতে বাস করত না। ভাবনাটা অন্ধকার–এপস্টেইন একা কম্বলের নিচে গুটিসুটি হয়ে বসে, রাতের পর রাত উপন্যাসের কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়ে যাচ্ছে; কারণ, সে সেখানে নিজের লালসা আর নৈতিক দুর্বলতাকে চিনে ফেলেছে, আর সেই চিনে ফেলার মধ্যেই সে একধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে। এই হামবার্ট লোকটা–কী অসম্ভব আপন! আমিই তো! এক আত্মম্ভরী কামুক!
কিন্তু এমনটা হতে হলে এপস্টেইনের নিজের প্রতি ব্যঙ্গ করার ক্ষমতা থাকতে হতো, নিজের বিকৃতির বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি থাকতে হতো। তার এর কোনোটাই থাকার প্রমাণ নেই।
ললিতাকে যৌন উত্তেজনার সাহিত্য হিসেবে পড়লে আরেক স্তরের বিদ্রূপ তৈরি হয়। কারণ, সেই শ্রেণিভ্রান্তি ঘটাতে গিয়ে এপস্টেইন আসলে বইটির প্রথম দিককার নীতিবাগীশ সমালোচকদের সঙ্গেই এক কাতারে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু যেমনটা অবিশ্বাস্য মনে হয়, এপস্টেইন ললিতা পড়ে তা বুঝেছিল। এমনটি প্রায় ভাবাই যায় না আরেকটা সম্ভাবনা–সে বইটি পড়ে উত্তেজনা অনুভব করেছিল। ললিতাকে আকর্ষণীয় মনে করা মানে শুধু শিশু ধর্ষণকে আকর্ষণীয় মনে করা নয়; এর মানে হামবার্ট হামবার্টকেও আকর্ষণীয় মনে করা। আর সেটা এমন এক বিকৃতির স্তর, যা সম্ভবত জেফরি এপস্টেইনের পক্ষেও অতিক্রম করা কঠিন।
