Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

আশা 

বলাকায় রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন- “আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান, আমি গাই গান।” তেমনি যেন তাঁর প্রতিদান। রবীন্দ্রনাথ এ লেখায় আবার আসবেন, একেবারে শেষে। 
আশা 

ইজেল

সাগুফতা শারমীন তানিয়া
18 April, 2026, 08:15 pm
Last modified: 18 April, 2026, 08:37 pm

Related News

  • সিনেমা কেন দেখি অথবা তিরিশ বছরের ঘোর
  • কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী: শামসুর রাহমান
  • বাইনারি বিদ্যা: দূরত্ব আর মিলন
  • কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে আর নেই
  • মুখোমুখি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’

আশা 

বলাকায় রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন- “আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান, আমি গাই গান।” তেমনি যেন তাঁর প্রতিদান। রবীন্দ্রনাথ এ লেখায় আবার আসবেন, একেবারে শেষে। 
সাগুফতা শারমীন তানিয়া
18 April, 2026, 08:15 pm
Last modified: 18 April, 2026, 08:37 pm

কভি তো নজর মিলাও:

প্লেব্যাক সিঙ্গারদের তো চেহারা দেখা যায় না সহজে। জন্মেছি টিডিকে ক্যাসেটের আমলে। মুহম্মদ রফির গলা শুনে মনে ভাবতাম, না জানি কী রূপবান হবেন সেই গলার মালিক। শশী কাপুরের মতন? লতাজী নিশ্চয়ই নার্গিসের বা নূতনের মতো দীর্ঘগ্রীব নারী। আশাজী হয়তো স্মিতা পাতিল বা পারভিন ববির মতো চকচকে। যদ্দিনে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন ঘটলো, তদ্দিনে তাঁদের কন্ঠস্বর আমার কল্পনার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে, সেই সমসত্ত্ব মিশ্রণ থেকে তাঁদের আর আলাদা করা যায়নি। অনেক বছর পর যখন খানিকটা মঙ্গেশকর ভগ্নীদের জীবনের আদলে 'সাজ' সিনেমাটি মুক্তি পায়, একপিঠ খোলা চুল আর আটপৌরে তাঁতের শাড়ি পরা শাবানা আজমীকে রাতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে "রাত ঢলনে লাগি" গাইতে দেখে মনে পড়েছিল- আমার কল্পনার আশা ভোঁসলে দেখতে ছিলেন ওরকম। তারপর একদিন দেখতে পেলাম তেলচপচপে খোঁপার আশাজী নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে শুধুই গলা খেলিয়ে গাইছেন ক্যাবারে, শীৎকারের শব্দ করছেন অথচ ভাবলেশহীন চেহারা। একদিন দেখলাম শাদা রেশমে আর ঝিকিমিকি মুক্তোয় তাঁর সাজ, মুখের হাসিটি দেখলে মনে হয় যেন জীবনের তারিফ করছেন, অথচ হাসি নিভে গেলেই দেখা যায় সারা মুখে ব্যথার-উদ্বেগের কি আশ্চর্য চিহ্ন- "তামাম উমর কা হিসাব মাঙতি হ্যাঁয় জিন্দগী!"

মানুষ বই পড়ে হাসে কাঁদে, কারণ লেখক-ঔপন্যাসিক তার অনুভবের বাহন হয়ে তাকে ধারণ করে। প্লেব্যাকশিল্পী সিনেমার পর্দার নায়কনায়িকার হাসি-কান্না-অভিমান-আর্তি শুধু ধরেন না, উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাকশিল্পীরা নায়ক-নায়িকা-খলনায়ক-ভাঁড় সক্কলের চেহারা-মুড-চারিত্র-অভিব্যক্তি-স্টাইল পরিবহনে সক্ষম। মুহম্মদ রফির গলা শুনলেই বোঝা যেত- পর্দায় এখন শাম্মী কাপুর, এখন দেব আনন্দ, এখন মেহমুদ বা জনি ওয়াকার! আশাজী এক সাক্ষাৎকারে দেখিয়েছিলেন- একই লিরিক তিনি কেমন করে প্রেম ক্যাবারে ভক্তির ভঙ্গিতে আলাদা করে গাইতে পারেন। অবিস্মরণীয় তাঁরও সুরে মেশা অভিনয়ের তাৎক্ষণিক বদল, পর্দায় আশা পারেখ- রেখা- বিন্দু বা হেলেন অনুসারে। 

গুজর না যায়ে ইয়ে জিন্দগি ইয়েহি তামান্নামে:

শৈশবে মদ্যপ পিতার মৃত্যু আর উত্তরাধিকারসূত্রে কেবল সঙ্গীত প্রাপ্তি, ষোল বছর বয়সে পালিয়ে গিয়ে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে, নির্যাতক স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর নিজ উপার্জনের বাড়ি-গাড়ি-টাকাপয়সা সমস্ত হারানো, ও.পি. নাইয়ারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বমুখর কর্মযোগ, রাহুল দেববর্মন অধ্যায়…আশা একে একে সমস্ত বন্ধুরতা পাড়ি দিয়েছেন, একদিকে সুরসাধনা- আরেকদিকে বয়ে গেছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ যৌবন, সমস্ত ছোটবড় গলতি-খামতিকে আলিঙ্গন করে স্বীকার করে এক অনন্য উত্থান তাঁর জীবন। জীবদ্দশায় দুটি সন্তানের মৃত্যু সইতে হয়েছে তাঁকে। ছোটভাই তাঁকে বলেছিলেন- মনে রাখিস, আমরা সুরসভার অভিশপ্ত গন্ধর্ব্য। মর্ত্যে এসেছি দুঃখ পাবার জন্য আর গাইবার জন্য। দুঃখ আম করে দিসনি, ও বাঁটবার জিনিস নয়, হাসিমুখ দেখলে লোকে সঙ্গে হাসে, কান্নার সঙ্গে কি আর সঙ্গত করে কাঁদে! 'বাহারেঁ ফিরভি আয়েঙ্গে'তে মালা সিনহার মৃত্যুদৃশ্যে আশাজী গেয়েছিলেন এই প্রত্যয়ের গান- মালি বদলালে বসন্ত চলে যায় না, আবার আসে। একদিন অনিতা রাজের লিপে গেয়েছিলেন- "তুমনে পতঝড়কো শাওয়ান কে ধারে দিয়ে, তুমনে আশকো কে বদলে সিতারে দিয়ে।" আঘাতে বিদীর্ণ হয়েছে মাটি- তিনি শস্য ফলিয়ে গেছেন নিরন্তর, প্রতিটি অশ্রুকণাকে রুপোর নগদ মোহর করে ফিরিয়ে দিয়েছেন জীবনের কাছে। বলাকায় রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন- "আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান, আমি গাই গান।" তেমনি যেন তাঁর প্রতিদান। রবীন্দ্রনাথ এ লেখায় আবার আসবেন, একেবারে শেষে। 

আশা ভোঁসলে। ছবি: সংগৃহীত

যো দিল মে জ্বলোগে তো আরমাঁ জ্বলেগা:

জোহরাবাঈ আম্বালেওয়ালী, আমীরবাঈ কর্ণাটকী, মুবারক বেগম, রাজকুমারী দুবে, শামসাদ বেগম, অরুণ কুমার, শিবদয়াল বাতিশ, জি এম দুররানী, বন্দে হাসান, সুরাইয়া… কার সঙ্গে না প্লেব্যাক গেয়েছেন তিনি! গীতা দত্ত, মুকেশ, মুহম্মদ রফি, কিশোর কুমার, লতা, সুমন কল্যাণপুর, তালাত মাহমুদ, হেমন্ত কুমার, মান্না দে, মহেন্দ্র কাপুর— সোনালি যুগের চেনা নামগুলোর প্রত্যেকের সঙ্গে। পরে অভিজিৎ, সোনু নিগম, আদনান সামী, দালের মেহন্দি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আশা ভোঁসলের গানের গলায় কেমন সক্কালবেলা গলাভাত-কাঁচকলাসেদ্ধর সঙ্গে বুকের কান্নাটুকুও গিলে তারপর গাইতে বসার মতো ব্যাপার ছিল। পাখির কাঁদুনি+ শামসাদ বেগম+ গীতা দত্ত মিলিয়ে এক অদ্ভূত কন্ঠস্বর। সলিল চৌধুরীর জন্য যেমন লতা, সুরকার ও.পি. নাইয়ার তেমন এলেন আশাজীর জীবনে। আশার মন্দ্র মসৃণ স্বর, দীর্ঘস্থায়ী দম, ও.পি. দেখিয়ে দিলেন- দুরূহ কম্পোজিশন গাইতে আশাজীও কম পারেন না। এবার তাঁর স্বরে এলো মিষ্টতার পাশাপাশি একটা ধারালো ঝাঁজ—বেদনানিষিক্ত মানুষ অশ্রুতে নোনা রুটি খেতে গেলে হয়তো অমন কোমল নিখাদ উদ্গত হয়। আবার চোখ-মোছা উৎফুল্ল চপলতা এলো, মনে করে দেখুন 'হাওড়া ব্রিজ'-এ মধুবালার "আইয়ে মেহেরবাঁ" আর 'কালাপানি'র "আচ্ছা জী ম্যায় হারি",'সিআইডি'তে  "লেকে প্যাহলা প্যাহলা পেয়ার"। ১৯৫২-১৯৭৩ এর দীর্ঘ সুরেলা সফর নাইয়ার-ভোসলে যুগলের, তাঁদের শেষ গান বড় স্বব্যাখ্যাত- "চ্যায়নসে হম কো কভি আপ নে জীনে না দিয়া"। কখনো আশা নাইয়ারসাবের ভূমিকা মুক্তকন্ঠে স্বীকার করলেন, কখনো বললেন তাঁকে গাইতে দিয়ে কেউ করুণা করেনি- তিনি তাঁর কাজে উপচে দিয়েছেন নিজেকে।

লতা-ভীতি সরে গেলে আশা স্বমূর্তিতে আবির্ভুত হলেন যেন, বড় বড় সুরকাররা খুঁজে নিলেন তাঁকে। 'চলতি কা নাম গাড়ি'তে "হাল ক্যায়সা হ্যাঁয় জনাবকা"। ১৯৫৪তে "হরি ওম তত সত", আবার 'হুসন বানু'তে আর 'শান-এ খুদা'য় সন্ধ্যার আকাশে অনুরণিত আজানের মতো মধুরতম গলায় গাইলেন- "ইয়া নবী সালামালাইকা"। ১৯৫৭-এ 'মাদার ইন্ডিয়া'তে কৃষাণ-কৃষাণীর সুখের দিনের অনন্ত তৃষ্ণা গাইলেন শামসাদ বেগমের সঙ্গে মিলে সেই "দুখ ভরে দিন বিতে রে ভইয়া"। একই বছর 'নও দো গ্যারা'তে কিশোরকুমারের সঙ্গে এস ডি বর্মনের চপল সুরে- "আঁখোমে কেয়া জী রুপেহলা বাদল" আর 'পেয়িং গেস্ট'-এ "ছোড় দো আঁচল", 'নয়া দওড়'-এ নাইয়ারের সুরে "মাঙকে সাথ তুমহারা", "উড়ে যব যব জুলফে তেরি", আর "সাথি হাথ বাড়ানা"। আশাজীর কন্ঠে আমার প্রিয় গান? 'উমরাওজান'-এর গজল  আর আর 'দিদার-এ-ইয়ার'-এ মুজরা সঙ্গীত নিয়ে বলতে গেলে আলাদা লেখাই লিখতে হবে। ১৯৬৫তে 'মেরে সনম'-এ "যাইয়ে আপ কাহাঁ যায়েঙ্গে"তে আশাকন্ঠ একেবারে যাকে বলে জরিদার, যেমন মীনাকুমারীর লিপে- "ইয়েহি হ্যাঁয় ও সাঁঝ অওর সাভেরা"। রফির সঙ্গে "রাত কে হামসফর", "দিল উসে দো যো জাঁ দে দে", "হম ইন্তেজার করেঙ্গে"। কিশোরকুমারের সঙ্গে "মওসম পেয়ারকা" আর জয়া ভাদুড়ির লিপে- "তু লালি হ্যাঁয় সাভেরেওয়ালী" গাইতে গিয়ে পাল্লা দিয়ে মোলায়েম করেছেন গলা, আর.ডি.র সঙ্গে "রোজ রোজ আখোঁ তলে"তেও তাই। 'তিসরি কসম'-এ ওয়াহিদার লিপে "পান খায়ে সাইয়াঁ হামারো" গানে আশার সেই ফিকফিক হাসি, অথবা "মেরে ইশক মে লাখো লটকে বালাম জারা হটকে"…বারবনিতা শর্মিলা ঠাকুর বিড়ি কানে গুঁজে নাচতে নাচতে একটা অদৃশ্য গাগরী ধরিয়ে দিলেন জন্মদাতা সঞ্জীবকুমারের হাতে, তিনিও অজান্তে সেই কলস ধরে রইলেন হাতে, এক পলকের বিভ্রম। সিনেমার এক দুর্দান্ত মুহূর্ত। 

দিল জ্বলোকা দিল জ্বালাকে:

১৯৫৮এ এলো নার্গিসের 'আদালত', লতার গলায় সেই হৃদয়তন্ত্রী ছেঁড়া "উনকো ইয়ে শিকায়াত হ্যাঁয় হম কুছ নহি ক্যাহতে" আর "ইউ হাসরাতোঁ কে দাগ", পাশাপাশি আশার গলায় ভীষণ আধুনিক-রোম্যান্টিক-উদ্ধত-গরবিনী-পলকা-সংশয়াপন্ন "জমিঁ সে হামে আসমাঁ পর বিঠাকে"। যেন দুই জানালা- একদিক থেকে শ্রাবণের সজল বাতাস, আরেকদিক থেকে ফাল্গুন-চৈত্রের মিঠে হাওয়া বইয়ে দিলেন দুই বোন। 'দো ফুল' সিনেমায় লতা আশা ডুয়েট গেয়েছিলেন— "বচপনকা মোরা তোরা পেয়ার সুহানা দেখো জী ইয়াদ রাখনা"। তদ্দিনে দুই বোনের স্বর আলাদা গরিমায় ভাস্বর, লিরিক কখনো জীবন হয়ে ওঠে। সিনেমায় অলিখিত নিয়ম ছিল- লতা দেবেন নায়িকার মিষ্টিমধুর কুমারীকন্ঠ। কুক্কু, হেলেন, মুমতাজের আমন্ত্রণী গানে কখনোসখনো কন্ঠ দিলেও তিনি শরীরী- যৌনতাভরা লিরিকে সচ্ছন্দ নন (এমনকি তিনি যখন 'রাজিয়া সুলতান'-এ "জ্বলতা হ্যাঁয় বদন" গান, তখন শরীরের চেয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সুন্দর সতৃষ্ণ এক সন্ধ্যার রূপ)। আশা যথারীতি দেবেন ভ্যাম্প, নাইটক্লাব সিঙ্গার বা ক্যাবারে ডান্সারের গলা, তাঁর জন্য বরাদ্দ দুষ্টু গান। মাতা-কন্যা-বধুর ভিড়ে উর্বশীর সঙ্গীত। কবে যেন দুষ্টা স্ত্রীলোক আর নায়িকা একাকার হয়ে গেল, ভ্যাম্প যা করতেন নায়িকা তা করলেন অবলীলায়। উভয়ের পদস্খলন সম্ভব- কেননা পতন জীবনে সফলতার সমান্তরাল সম্ভাবনা। কবে যেন আমন্ত্রণী লাস্যময়ী নারী আর ঘৃণ্য রইলো না, আরাধ্যা হলো তার যৌনতা। সময়ের বদলে সে সংসারের প্রধান উপার্জনশীলা, প্রয়োজনে একাকিনী মা। তার কান্না পায়, ক্ষিদে পায়, প্রেমও পায়। আশার গলা তখন নীচুতলার যৌনকর্মী থেকে মধ্যবিত্তের নিয়ত যুদ্ধরত কন্যা হয়ে উঁচুতলার আদুরে মেয়ে— প্রজাতন্ত্রের সদস্যসকলের বেলায় প্রযোজ্য। "তবু আমাকে আর পাবেনা/ কারন আমায় অবহেলা করেছ/ আরে আমায় নিয়ে খেলা করেছ"— আশার গানের এমন লিরিক লতার "তুমহি মেরে মঞ্জীল তুমহি মেরে পূজা" থেকে বহুদূর হেঁটে এসেছে। অপ্রতিরোধ্য তিনি। 'এক মুসাফির এক হাসিনা'- 'বরসাত কি রাত'- 'হাম কিসিসে কম নেহি'তে কাওয়ালি, 'উমরাওজান'-এ গজল, "ভিনি ভিনি ভোর" বা "তোরা মন দর্পন ক্যাহলায়ে" বা "মন আনন্দ আনন্দ ছায়ো"র মতো শাস্ত্রীয়সঙ্গীতঘেঁষা গান। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে "দম মারো দম" সম্প্রচার বন্ধ হলে রেডিও সিলোন সম্প্রচার করতে শুরু করে সেই গান, হাজার লোকের নেশার ঘোর লেগে যায়।  

আশা ভোঁসলে। ছবি: সংগৃহীত

বোনে বোনে এই বিদারণরেখা সহোদরারাই জিইয়ে রেখেছিলেন, নাকি শোবিজ দুনিয়া আর সিনেপত্রিকাওয়ালারা বাঁচিয়ে রেখেছে, তা কে জানে। কোথাও পড়েছি- দুবোন মুখোমুখি বাড়িতে থাকতেন, একই বাঈ দুই বাড়িতে কাজ করতেন, লতা আর আশা সেই বাঈয়ের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করতেন- কে কোন গান রেয়াজ করছেন। কে জানে সত্যাসত্যের হিসেব! পড়ে আমার মনে হয়েছিল জিঞ্জিরা প্রাসাদে আলিবর্দীর দুই কন্যার সেই নিরুপায় সহবাসের গল্প। আশা একটি সাক্ষাৎকারে বিরসবদনে বলেছিলেন- ছোট বোনকে ছোট করে রাখাই এদিককার কার্যপ্রণালী, প্রথা, যদি অন্যত্র জন্মাতাম আর যদি অন্য ভাষায় গাইতাম তবে নিশ্চয়ই আজীবন এ তুলনা সইতে হতো না। লতার স্বরের মহাসমুদ্রে যেন হারিয়ে না যান- সেজন্য আজন্ম চেষ্টা করে গেছেন তিনি, সুমন কল্যাণপুরের মতো করে লতাসমুদ্র তাঁর সপ্তডিঙা গিলে খেতে পারেনি। আচ্ছা, লতা যদি কোকিলকন্ঠী হন তবে আশা কী? ঘুঘুর মতো চরে চরে বিরহগীত "আব কে বরষ ভেজো ভইয়া কো বাবুল", চিৎকৃত কেকা রবে "পিয়া তু আব তো আ যা", বিলের পানকৌড়ির মতো "দম মারো দম" আর পাপিয়ার মতো কুহরে "দিল চিজ ক্যায়া হ্যাঁয় আপ মেরে জান লিজিয়ে"! পাপিয়ার কথা উঠলোই যখন, তখন বলি— 'মিস ম্যারি' সিনেমায় লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে মিলে আশা গাইলেন "সাখিরি সুন বোলে পাপিহা উস পার"- শুনলে চিরদিন আমার মনে হতো তিনি বৃষ্টির ভেতর আমবাগানে হারিয়ে যাওয়া বিরহী পাখি। 'পড়োসন'-এ দুই বোন গাইলেন রোদে ভরা কম্পোজিশন- "ম্যায় চলি ম্যায় চলি"। 'উৎসব'-এ গাইলেন- "মন কিঁউ ব্যাহকা"…আদিগন্ত পৃথিবী অন্ধকার করে আড়াই হাজার বছর আগের নগরীতে রাত নামলো। নদীর পাড়ের নিষ্পত্র  শিমুলগাছে যে অনামা পাখি ডাকে- তার সঙ্গেও মিল আছে আশাজীর- নইলে কে আর ওভাবে – "কাতরা কাতরা মিলতি হ্যাঁয় কাতরা কাতরা জীনে দো" গাইতে পারেন। ১৯৬৩তে 'ফির ওহি দিল লায়া হুঁ' তে ঊষা মঙ্গেশকরের সঙ্গে মিলে গাইলেন ও পি নাইয়ারের ঘনঘোর কম্পোজিশন- "দেখো বিজলি ডোলে বিন বাদল কি", শুনলে বৃষ্টিশুরুর আগের নিস্তব্ধতা মনে পড়ে- যেন গাছেদের মাথা সাদা হয়ে এসেছে, মেঘে মেঘে বিজলি চমকাচ্ছে।

গুনগুনগুন কুঞ্জে আমার:

বাংলামুল্লুকের সঙ্গে আশাজীর বাঁধন বিচিত্র, এসডি বর্মণের গানে, রাহুলদেব বর্মণের সঙ্গে বিয়েতে, নিজের নামটি বাঙলায় স্বাক্ষর করার সক্ষমতায়, ভেটকিপাতুরি- আলুপোস্তর সঙ্গে, দেবশ্রী- শতাব্দী- মুনমুন সেনের লিপে। 'লাল কুঠি' সিনেমার "ঢলে যেতে যেতে" আর "তারে ভোলানো গেল না কিছুতে" আসলেই ভোলা যায় না। বাঙলায় কুহকিনী আশা তাঁর গলার শানিত আধুনিকতা আর মদির মাদকতা দিয়ে এক অনন্য মাত্রা এনেছিলেন। "আকাশে আজ রঙের খেলা", "যেতে দাও আমায় ডেকো না", "আরো দূরে চলো যাই", "আধো আলো-ছায়াতে", "ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী", "আর কত রাত একা থাকবো", "ফুলকলি রে ফুলকলি", "কিনে দে রেশমী চুড়ি", "কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে"…দূর থেকে ভেসে আসা সন্ধ্যার রেডিওর গান, পুজোর গান, পাড়ার প্যান্ডেলের গান সবেতেই আশাজী, আজো শুনলে মনে হয় এই বুঝি হোমওয়ার্ক- রেডিও- কুয়াশা- আত্মীয়মন্ডিত শৈশবের পৃথিবীতে আবার জেগে উঠবো। 

বেশ করেছি প্রেম করেছি:

আশাজী আর ও.পি. নাইয়ারের স্মৃতিস্মরণে সোমেন দে লিখেছেন- "ঠাকুরের কথায়- 'তুমি কোলে নিয়েছিলে সেতার, মীড় দিলে নিষ্ঠুর করে/ ছিন্ন যবে হল তার ফেলে গেলে ভুমি পরে', এই জুটি ভেঙ্গে যাওয়াতে আশাজীর সঙ্গীত যাত্রায় পরের চুড়া গুলো ডিঙ্গিয়ে যেতে তেমন  কোনো পিছুটান  বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ ততদিনের তিনি জগৎ বিখ্যাত হয়ে গেছেন। তাঁর নতুন ইনিংস শুরু  হয়ে গেছে রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে। তিসরি মঞ্জীল ছবিতে এক নতুন আশা কে গোটা দেশ শুনতে পেয়েছে এবং সেই নুতন আশাজী একটার পর একটা ম্যাজিক দেখাতে থাকলেন রাহুল দেব বর্মনের  সুরে।" পুরুষ যেমন দ্যাখে। যেন একটি স্ত্রী প্রেয়িং ম্যান্টিস বা ব্ল্যাক উইডো মাকড়সার সেক্সুয়াল ক্যানিবলিজমের বিবরণ। সংসারভাঙানিয়া নারী, একের পর এক সঙ্গীতস্রষ্টার সঙ্গে কাজ- একান্ত অধিকারে সুরকারদের গান হস্তগত করা। এক একটি সাম্রাজ্য ধুলায় লুটিয়ে ছিঁবড়ে করে দিয়ে চলেছে নারীর নটিনী যাত্রা। কিন্তু আসলেই কি তাই? বিশাল বহতা গঙ্গা চলেছে সমুদ্রসঙ্গমে, পদে পদে কত গোমতী যমুনা শোন দামোদর লীন হয়েছে তাতে, ছড়িয়ে পড়েছে তার থেকে…এই যাত্রায় কে ব্যবহৃত আর কে ব্যবহারকারী? দাতা আর গ্রহীতা কি আলাদা? আশার সম্পূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় এঁরা সঙ্গী হয়েছেন, বিস্তীর্ণ হয়েছে সুরনদী, ঋদ্ধ হয়েছে জনপদ, কুল ভেঙেছে চর জেগেছে। প্রকৃতির এ অনন্য যাত্রা নিষ্ঠুর নাকি প্রবৃত্তিতাড়িত নাকি নেহায়েত প্রাকৃতিক? পুরুষের জন্য চিরদিন সমস্ত চরাচর সমব্যথী। আর সে পুরুষ যদি গুণী হন, তবে তো কথাই নেই। তার সমস্ত অপারগতার জন্য সব পতন ও মূর্ছার জন্য পদে পদে নারী দায়ী। (মনে আছে- 'সাত পাকে বাঁধা'তে এক শুভযোগের রাতে কি এক অন্ধ আবেগে নায়িকা অর্চনা (সুচিত্রা সেন) ছুটতে ছুটতে অত্যাচারী স্বামীর বাড়িতে ফিরে গিয়ে জানতে পারেন- স্বামী সুখেন্দু দত্ত আর সেখানে থাকেন না, বিবাহবিচ্ছেদের পর বাড়ি ছেড়ে চাকরি ছেড়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। অমন রোদনভরা মুহূর্তে সে বাড়ির নতুন অধিবাসী কঠোর মুখে জিজ্ঞেস করে- সুখেন্দুর মতো এমন একটা জীবন এমন প্রতিভা ব্যর্থ হয়ে যাবার কোনো কারণ ছিল কি? "এর জন্য আপনাকেই আমরা অভিযোগ করবো।" শেষ অব্দি নারীতেই অভিযোগ এসে বর্তায়।) আজকাল তো সালিশের জমানা, খিস্তিখেউড়ের যুগ ফিরে এসেছে। দুটো বিয়ে, তিনটে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক, মীরা বর্মণকে শেষ বয়েসে আশা কেন দেখে রাখেননি, কেন গণপত রাওয়ের মাকে বরং ছেলের মৃত্যুর পরও আশা ভরণপোষণ করতেন এসব নিয়ে নিশ্চয়ই খুব চলবে কয়েকদিন। চলুক। এ লেখায় আশাজীর ফিনিক্স পাখির মতো "জানম সমঝা করো"র মতো ইন্ডিপপ নিয়ে হাজির হওয়া নিয়ে বা ক্রনোজ কোয়াট্রেট বা গোরিলাজের সঙ্গে তাঁর মিউজিক নিয়ে বলা হলো না। স্বল্পদৈর্ঘ্যে এ পুর্নদৈর্ঘ্য জীবন ধরা যায় কি? তাও বকলমের কলমে!

আশা ভোঁসলে ও লতা মঙ্গেশকর। ছবি: সংগৃহীত

আশা ভোসলেঁর অন্তিমযাত্রায় বাজলো রবীন্দ্রনাথের "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর", যেখানে সুন্দর আর সত্য মিলতে বাধা নেই সেই মহাগগনমাঝে চলে গেলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- "বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা", ঐ শবযাত্রার মিউজিক শুনে আমার মতো বহু বাঙালির তেমন সুখসুনিবিড় ব্যথা লেগেছে জানি। এ প্রিয়বিচ্ছেদের লগ্ন, এ চিরবিদায়ের কাফেলা, তবু এ যাত্রায় মহিমময়ী গান্ধর্বীর সঙ্গী বাঙালির রবীন্দ্রনাথ! আমার খুব ভাল লেগেছিল 'ফ্লোরেন্স ফস্টার জেঙ্কিন্স' দেখে, সত্য ঘটনা অবলম্বনে হালকা চালে রচিত সিনেমা, মৃত্যুশয্যায় ফ্লোরেন্স আপনমনে হেসে বলেছিলেন— "But no one can ever say I didn't sing." ফ্লোরেন্স বেসুরো ছিলেন, আশা সর্বকালের সুরেলা, কিন্তু ফ্লোরেন্সের শেষ কথাটি তাঁর জন্যেও প্রযোজ্য, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না- তিনি যে গান গেয়েছিলেন, জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় নয় শুধু, ফুল্ল কিশলয় জাগবার বেলায়, শ্রাবণদিনে বিরহী সবুজ ঘনিয়ে আসবার বেলায়, দাবানলে পাতা পুড়বার পরেও। "হা, ইয়েহি কহোগে তুম সদা, কে দিল আভি নহি ভরা"। মন কি আর ভরে!

Related Topics

টপ নিউজ

আশা ভোঁসলে / লতা মঙ্গেশকর / সঙ্গীতশিল্পী / উপমহাদেশ / ইজেল

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ২০১৯ সালে ইরানে বন্যার দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
    রাডার ধ্বংসের পরই ইরানে ঝরছে বৃষ্টি? নেপথ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ‘আবহাওয়া অস্ত্র’?
  • চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানের চাংশিং দ্বীপে অবস্থিত হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স, ১৬ জুলাই ২০১৮। ছবি: চেন আইঝু/রয়টার্স
    ৫ তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আটকে দিল চীন
  • ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যাত্রী সেবায় কমিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের
    ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যাত্রী সেবায় কমিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের
  • বেক্সিমকোর তিস্তা সৌর-বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন/টিবিএস
    মেগা রাউন্ডের ব্যর্থতার পর এবার ৪৯৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের দরপত্র আহ্বান করল বিপিডিবি
  • দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশ। প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
    সব ধরনের ভিসা দিচ্ছে বাংলাদেশ, আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বাভাবিক হতে পারে ভারতীয় ভিসা সেবা
  • প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
    যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার পাল্টা প্রস্তাব ইরানের

Related News

  • সিনেমা কেন দেখি অথবা তিরিশ বছরের ঘোর
  • কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী: শামসুর রাহমান
  • বাইনারি বিদ্যা: দূরত্ব আর মিলন
  • কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে আর নেই
  • মুখোমুখি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’

Most Read

1
২০১৯ সালে ইরানে বন্যার দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

রাডার ধ্বংসের পরই ইরানে ঝরছে বৃষ্টি? নেপথ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ‘আবহাওয়া অস্ত্র’?

2
চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানের চাংশিং দ্বীপে অবস্থিত হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স, ১৬ জুলাই ২০১৮। ছবি: চেন আইঝু/রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

৫ তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আটকে দিল চীন

3
ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যাত্রী সেবায় কমিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের
বাংলাদেশ

ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যাত্রী সেবায় কমিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের

4
বেক্সিমকোর তিস্তা সৌর-বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন/টিবিএস
বাংলাদেশ

মেগা রাউন্ডের ব্যর্থতার পর এবার ৪৯৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের দরপত্র আহ্বান করল বিপিডিবি

5
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশ। প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

সব ধরনের ভিসা দিচ্ছে বাংলাদেশ, আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বাভাবিক হতে পারে ভারতীয় ভিসা সেবা

6
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার পাল্টা প্রস্তাব ইরানের

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab