Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

মুখোমুখি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’

দুই কবির অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা নানাভাবে ফ্রেমবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী, সেসব ছবির অধিকাংশই থেকে গেছে অপ্রকাশ্য, বর্তমানে এই সংগ্রহ নিয়েই আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকায় শুরু হয়েছে এক প্রদর্শনীর, এ সূত্র ধরেই ইজেলের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনের নেওয়া দুই কবির সাক্ষাৎকার ও দুর্লভ সব আলোকচিত্র।
মুখোমুখি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’

ইজেল

নাসির আলী মামুন
11 April, 2026, 01:50 pm
Last modified: 11 April, 2026, 01:50 pm

Related News

  • সিনেমা কেন দেখি অথবা তিরিশ বছরের ঘোর
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামাল যা বললেন
  • আশা 
  • বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুক্রবার
  • কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী: শামসুর রাহমান

মুখোমুখি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’

দুই কবির অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা নানাভাবে ফ্রেমবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী, সেসব ছবির অধিকাংশই থেকে গেছে অপ্রকাশ্য, বর্তমানে এই সংগ্রহ নিয়েই আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকায় শুরু হয়েছে এক প্রদর্শনীর, এ সূত্র ধরেই ইজেলের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনের নেওয়া দুই কবির সাক্ষাৎকার ও দুর্লভ সব আলোকচিত্র।
নাসির আলী মামুন
11 April, 2026, 01:50 pm
Last modified: 11 April, 2026, 01:50 pm
শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ, শ্যামলী, ২০০৪, আলোকচিত্রী: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

বাংলা ভাষার প্রধান দুই কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। দীর্ঘ সময় পর তারা মুখোমুখি বসেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের উদ্যোগে। দুলর্ভ এই ঘটনার সাক্ষী মামুনের ক্যামেরা। এ সময়ে এ দুই কবির অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা নানাভাবে ফ্রেমবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী, সেসব ছবির অধিকাংশই থেকে গেছে অপ্রকাশ্য, বর্তমানে এই সংগ্রহ নিয়েই আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকায় শুরু হয়েছে এক প্রদর্শনীর, এ সূত্র ধরেই ইজেলের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনের নেওয়া দুই কবির সাক্ষাৎকার ও দুর্লভ সব আলোকচিত্র।

নাসির আলী মামুন: আপনারা তো বহুকাল এই রকম একসঙ্গে অন্তরঙ্গ হন নাই। প্রায় পঁচিশ বছর দুই কবি একরকম বিচ্ছেদ নিয়া থাকছেন।

আল মাহমুদ: ব্যক্তিগতভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকলেও আমাদের চর্চার ক্ষেত্র কবিতায় আমরা বিচ্ছিন্ন ছিলাম না। শামসুর রাহমান কবিতা লিখলে আমি পড়েছি। তার স্টাইল লক্ষ করেছি। আমার সামনে অনেকে তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। আমি কখনো পাত্তা দিইনি। আমি সব সময় তাদের বলেছি, তোমরা ভুল করছ। তার কবিতা আমার ভালো লাগে।

মামুন: এইটা কি শামসুর রাহমান সামনে বসা দেইখা বলতেছেন?
পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য একটা পতনোন্মুখ সময় অতিক্রম করছে। পশ্চিমবঙ্গে লেখা কবিতা, উপন্যাস, গল্পের সঙ্গে আমাদের একটা পার্থক্য তো সবার চোখে ধরা পড়ছে। আমি মনে করি, আমাদের ভাষাই প্রকৃত আধুনিক বাংলা ভাষা। প্রকৃত আধুনিক বাংলা ভাষা এখন ঢাকায় সঞ্চরণশীল।

মাহমুদ: না-না। অসংখ্য তরুণ কবির এ ধরনের মন্তব্যের উত্তরে আমি সব সময় বলেছি, শামসুর রাহমানের কবিতায় এখনো আমার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় আছে। আমি সেটা দেখি। পরীক্ষা করি। তিনি এক স্টাইলে লেখেন, আমি আরেক স্টাইলে। কিন্তু তিনি কী লিখেছেন, কী ভাবছেন, সেদিকে আমি সব সময় চোখ রেখেছি, স্বাদও পেয়েছি।

মামুন: আপনারা কী কারণে দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন থাকলেন?

মাহমুদ: সেটা অবশ্য শামসুর রাহমান ভালো বলতে পারবেন।

মামুন: তরুণদের প্রতিনিধি হইয়া আমি জানতে চাইতেছি।

শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। শ্যামলী, ২০০৪। আলোকচিত্রী: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

মাহমুদ: আমি তো শামসুর রাহমান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইনি। কীভাবেই বা হব, আমি তার সমসাময়িক কালের কবি, একসঙ্গে কাজ করছি। কমবেশি উনি আমার অগ্রণী। পাঁচ-ছয় বছরের বড়ও। বিচ্ছিন্ন হওয়ার তো কোনো কারণ ঘটেনি। রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্নতা ঘটতে পারে, যেহেতু আমি ধর্ম বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি কোনো সময় কোনো রাজনীতি করি নাই। আমি কোনো দলের সদস্য নই; কারও রাজনৈতিক গোলাম নই। আমি ধর্ম করি। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য হলো, ধর্মের কারণে সব সময় বলা হয়েছে আমি মৌলবাদী। এটা আমাকে হজম করতে হয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাকে বলা হয়েছে রাজাকার।

মামুন: কারা বলছে?

মাহমুদ: নাম বলা আমার জন্য নিরাপদ না, আর জিজ্ঞেস করাও ঠিক না। আমি অত্যন্ত নিঃসঙ্গ লোক, দুঃখী মানুষ। আমি পরিশ্রমী। কেউ আমাকে কোনো সাহায্য করেনি। সামান্যতম পৃষ্ঠপোষকতা আমাকে কেউ দেয়নি। না আর্থিক, না সামাজিক কোনো সুবিধা। সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার করে আমি কোথায় যাব? আমার ওপরে তো বড় একটা ফ্যামিলি। আমি চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছি। তখন আমাকে ডেকে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছে এখানে আপনি কাজ করেন, আমি করেছি। যেমন সংগ্রামে। আমি যত দিন ওখানে ছিলাম, তারা আমাকে সম্মান করেছে। আমি কোনো দলের সদস্য ছিলাম না। আমি যখন গণকণ্ঠে ছিলাম, তখনো প্রফেশনাল জার্নালিস্ট ছিলাম।

মামুন: কিন্তু দুই ধারার। জাসদ আপনার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। আর সংগ্রাম হলো ডানপন্থী।

মাহমুদ: আমি যখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেছি, তখন এটাকে গভীরভাবে বিশ্বাস করেছি। আমি বেরিয়েছি সমাজতন্ত্র থেকে। আমি গুলির সামনে যেতেও ভয় পাইনি। একটা অবস্থায় তো তুমি আর আমি জেলেই ছিলাম। আমি যতটুকু পড়াশোনা করেছি, অত কোনো নেতা তখন করেনি। আমি অবাক হয়ে যেতাম।

মামুন: আপনি উদ্বিগ্ন ছিলেন যে এত কম জানা, এত কম পড়াশোনা নিয়া বিপ্লব করতে চায়?

মাহমুদ: পরিস্থিতি যে রকম ছিল বিপ্লব হয়ে যেত। ওই দিন যদি ওরা সফল হতো, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হতো। হয়তো তারা ভালোই পারত কিংবা পারত না। কিন্তু যে বিষয়ে তারা অগ্রসর হচ্ছিল, তাতে পড়াশোনা ছিল আমার চেয়েও কম।

মামুন: আপনার কবিতায়ও প্রচুর পরিবর্তন আসছে। এইটা কি মূলত ধর্মীয় কারণেই?

মাহমুদ: ধর্মীয় কারণ তো কিছু আছেই। ধর্মকে কি কবিতার স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছি? না। আমি মানুষের পক্ষে ছিলাম। এখনো মানুষের পক্ষেই আছি। কিন্তু ধর্ম আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে। ধর্ম আমার চিন্তায়, আমার কাব্য সৃষ্টিতে কোনো বাধা হয় নাই।

মামুন: আপনার কি মনে হয় শামসুর রাহমান ভাগ্যবান? কারণ, জীবিতকালে এই উপমহাদেশে এইভাবে ইন্টারন্যাশনাল ফেমের নবীন-প্রবীণদের মধ্যে, রিকগনাইজড কবি!

মাহমুদ: যারা প্রশংসা করে, উনারা শামসুর রাহমানের শুধু প্রশংসাই করেন। আমি ভিন্ন ধারার কবি। কিন্তু আমি যখন শামসুর রাহমানের প্রশংসা করি, ওই প্রশংসা খাঁটি প্রশংসা। তার কাজটা আমি জানি। তার কবিতার যে মর্মবোধ, সেটা আমি বুঝতে পারি। আমি তার বন্ধু নই বলে শুধু কবিতাটাকে বিচার করতে পারি। আমার তার প্রতি পক্ষপাত নাই। আরও কবি ছিলেন যেমন হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ–এরা তার সমসাময়িক, বন্ধু ছিলেন। আমি তো ভিন্ন ট্র্যাক থেকে আসছি। শুধু তার কবিতায় পরিতৃপ্ত এবং মুগ্ধ হয়ে কথা বলেছি। আমি যেটা বলতে পারব, অন্যরা সেটা বলতে পারবে না। তারা কবিতা পড়েই না।

মামুন: রাহমান ভাই বিচ্ছিন্ন থাকলেন ক্যান এত দিন?

মাহমুদ: এটা হয়ে গেছে। ইচ্ছে করে আমি তাকে দেখতে পারি না কিংবা তিনি আমাকে দেখতে পারে না, এ জন্য এটা হয়নি। হয়ে গেছে। অনেক সময় দেখা হয় না মাসের পর মাস। হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। এটা আমার তরফ থেকে কোনো পলিসি করা হয়নি।

শামসুর রাহমান: আমি আল মাহমুদকে সব সময় ভালো কবি মনে করি। সব সময় আমি বলি, আল মাহমুদ যা-ই করুক না করুক, সে কবি হিসেবে খুবই উল্লেখযোগ্য এবং প্রথম শ্রেণির কবি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা আমি বিশ্বাস করি। এবং আমি আল মাহমুদকে খাটো করে দেখিনি। কারণ, সে খাটো হওয়ার মতো কবি নয়। সে বড় ধরনের কবি। হ্যাঁ, আমি হয়তো ব্যাখ্যা করে বলি না। আমি কথাই বলি এ রকম।

শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। শ্যামলী, ৩১ অক্টোবর ২০০৪। আলোকচিত্রী: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

মামুন: আল মাহমুদ তো রাহমান ভাইয়ের ওপর লিখছিলেন?

মাহমুদ: হ্যাঁ লিখেছি, আজ থেকে ৩৫-৩৬ বছর আগে একটা কাগজে 'পরিবেশ, শামসুর রাহমান ও তার কবিতা' শিরোনামে। কাগজটার সম্পাদক ছিলেন ত্রৈমাসিক পত্রিকার মীজানুর রহমান, তিনি আমার কাছ থেকে লেখাটা আদায় করেছিলেন।

মামুন: রাহমান ভাই পড়ছিলেন আপনি?

রাহমান: হয়তো পড়েছি। অনেক দিন আগে। মনে করতে পারছি না।

মামুন: আপনি আল মাহমুদকে নিয়া লিখছেন কখনো?

রাহমান: আল মাহমুদ সম্পর্কে আমি ডেলিবারেটলি কিছু লিখিনি। আমি কাউকে নিয়েই আসলে ডেলিবারেটলি লিখিনি। আমার মধ্যে আসলে সমালোচক নেই। যখনই কবিতা সম্পর্কে কথা হয়েছে, আমি তাকে খাটো করিনি। সে যদি আমার বিরুদ্ধে বলত, তবুও আমি তাকে কোনো দিন খাটো করিনি। খাটো করার মতো কবি সে নন। আমি তার কবিতা পছন্দ করি। তার কবিতা যখনই যেখানে বেরোয়, আমি পড়িনি, হতে পারে না।

মাহমুদ: না, এ কথা বলা যাবে না যে, আমি বিরূপ মন্তব্য করিনি। কার্যকারণটা কী, কথার পৃষ্ঠে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো বিদ্বেষ নিয়ে আমি ঠিক বলিনি শামসুর রাহমানের মতো কবিকে।

রাহমান: আল মাহমুদকে নিয়ে কখনো যদি বিরূপ কথা বলে থাকি, কবিতা নিয়ে কখনো বলিনি। কখনো না। আমি ওর কবিতার একজন ভক্ত।

মামুন: কী নিয়া বলছেন?

রাহমান: আল মাহমুদ মৌলবাদীদের পক্ষে থাকেন হয়তো এ কথা আগে বলে থাকতে পারি।

মামুন: আল মাহমুদ যে ইদানীং কবিতা লেখেন আপনে দেখেন? আল মাহমুদ আপনার কবিতা দেখেন, আপনার কবিতার স্টাইল-কৌশল সব। সেইটা আপনিও করেন?

রাহমান: অবশ্যই আমি আল মাহমুদের সব কবিতা পড়ি।

মাহমুদ: কথাটা বুঝতে হবে কিন্তু। শামসুর রাহমান একটা কবিতা লিখলে তরুণরা কী বলে আমি থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু আমি তো পাঠ করি। কারণ, শামসুর রাহমান আমার সহবর্তী, অগ্রবর্তী কবি। তিনি যা লিখবেন, পড়া আমার জন্য বাধ্যতামূলক।

মামুন: একটা কথা রাহমান ভাই খুব বলা হয়, এটা বাকোয়াজ কি না জানি না; আমরা তরুণরা বলি আর কি, যিনি বেশি লেখেন, তার অনেক কবিতা নাকি মানসম্পন্ন হয় না। রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা সে রকম।

মাহমুদ: যিনি বড় কবি, তিনি বেশি লিখলে খারাপ হয় না। কবিতা অন্তরাত্মা থেকে আসে। যখন কলম ধরে বসেন শামসুর রাহমান, বা আমি, সমস্ত অন্তরাত্মা দিয়েই লিখি।

মামুন: কিন্তু কখনো এমন হয় না যে, প্রকাশকের তাগাদা, সম্পাদকের তাগাদা, পত্রিকার তাগাদায় ইচ্ছা না থাকলেও বাধ্য হন লিখতে, তখন?

রাহমান: ইচ্ছা না থাকলেও লিখতে শুরু করলে প্রকৃত কবির ইচ্ছা-অনিচ্ছাটা থাকে না। কবিতা এসে যায়।

মাহমুদ: এটা তো বলা যাবে না যে আমি বেশি লিখি বলে আমার কবিতা দুর্বল হয়ে গেছে। শামসুর রাহমান কবি বলে বেশি লেখেন, অনেকে তো লিখতে পারছে না। একটা প্রশ্ন আমি করি তরুণদের, তারা কি পারবে শামসুর রাহমানের মতো লিখতে?

মামুন: এই প্রশ্নের উত্তরে তারা হয়তো বলবে, অত বেশি লেখার ইচ্ছাও নাই। তাইলে আপনি কী বলবেন?

মাহমুদ: কেন, আপনারা কি এমন কোনো কবিতা লিখে ফেলেছেন যে আর আপনার না লিখলেও চলবে? আমার বয়স সত্তর প্রায়। আমি বলি যে, আমি অনেক লিখেছি। কিন্তু এটা মনে হয় না আমার, ব্যস, আর না লিখলেও চলে। এই রকম তো হয় না। আমার পরিতৃপ্তি হয় না। চোখ নাই হাতড়ে হাতড়ে লিখি। আরেকজনকে জোর করে ধরে বসি, ভাই আমার এই কথাগুলো লিখে দাও। এই যে লিখে যাওয়ার বাসনা, এটাই হলো বড় কথা। আমি মনে করি, প্রকৃত কবির তৃপ্তি হয় না; পরিকল্পনার শেষ হয় না।

শামসুর রাহমানের মৃত্যুর পর নিজেদের ছবি হাতে আল মাহমুদ। ১৬ জুন ২০১৬। আলোকচিত্র: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

মামুন: রাহমান ভাই আপনি এই রকম তাগিদ অনুভব করেন কি না যে লেখাটা হয়তো কবিতায় আসতেছে না, কবিতা হইতেছে না। গদ্যে চেষ্টা করি?

রাহমান: খারাপ হোক যা-ই হোক কবিতাই লিখি।

মামুন: রাহমান ভাই, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ দশক পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এদের নাম শোনা গেছে। বিশেষ কইরা এই উপমহাদেশে। ইদানীং অনেক তরুণ ক্রিটিক বলেন, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের নাম বেশি উচ্চারিত হইছে, উভয় বাংলায় এরা পারফর্মিংয়ের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের গান বাঙালিদের গাইতেই হয়। কিন্তু আপনাদের কোনো কিছু নিয়ে পারফর্ম করা যায় না–নাটক লেখেন নাই, ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লেখেন নাই, গান লেখেন নাই। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালির মনে মনে ঘরে ঘরে আছে। আপনাদের মরার পরে বা ভবিষ্যতে কী হবে?

রাহমান: ওটা আমি অত ভাবি না। কারণ, আমি যেটা লিখতে ভালো লাগে, সেটাই লিখি। কারও হুকুমে লিখি না।

মামুন: আবার যদি গান না লিখতেন, তারা নাকি দীর্ঘকাল জীবিত থাকতেন না।

মাহমুদ: হতে পারে তাদের ব্যাপারে। কাজী সাহেব কবিতার চেয়ে গীতই বেশি লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ তো অন্য ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের রাজা। তিনি একধরনের গান লিখেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত হলো সাহিত্যেরই একটা সুরারোপিত ভঙ্গি।

মামুন: কিন্তু সুর না থাকলে কী অবস্থা হইত?

রাহমান: সুর থাকাতে সুবিধা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে গীত লিখেছেন, তার বইয়ের নাম গীতবিতান না? একাকী বসে পড়ে মনে হয়েছে যে, কবিতারই অঙ্গ। শুধু তিনি সঙ্গীতের যে লয়-মাত্রা বুঝতেন সেই জন্য ওইভাবে বাণীটাকে সাজিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের গীত হলো সুরারোপিত সাহিত্য। সুরারোপিত কাব্য।

মামুন: রাহমান ভাই, জীবনানন্দ দাশের কবিতাগুলোকে কী বলবেন?

রাহমান: জীবনানন্দ দাশের কবিতা, কবিতা।

মামুন: না, রবীন্দ্রনাথের কথা যেইটা বললেন যে সঙ্গীতও তার কবিতার মতো। জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতা আছে খুব মেলোডিয়াস।

রাহমান: কিন্তু গান কি? গানে নেওয়া যায় কি? 'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা'–সুর দিয়ে বললেই কি এটা গান হয়ে যাবে? কবিতারও একটা সুর আছে। এই সুর তো গানের সুর না।

মাহমুদ: সেই অন্তর্লীন সুরকে ধরতে হবে।

রাহমান: কবিতা, কবিতার ছন্দটাই তো...

মাহমুদ: সুর তৈরি করে। এই যে মাত্রা। মাত্রা ছাড়া তো চলে যাচ্ছে না সে, কারণ, কবিতা নিজের নিয়মে ছন্দ সৃষ্টি করে। অন্তর্লীন গীত সৃষ্টি হয়েছে, ছন্দের কবিতায়। এখন ধরো আমি গদ্যে লিখছি কবিতা, তুমি কি মনে করো এ গদ্য স্বাভাবিক গদ্য? না। আমি একটু ভিন্ন জায়গায় নিয়ে এসেছি গদ্যকে, আলাদা করে কবিতার কাছে গদ্যে নিয়ে এসেছি। আমি গদ্যকে নিংড়ে-টিংড়ে দেখতে চাচ্ছি, কবিতাটা কী।

মামুন: আপনি নিজেও জানেন, একটা মানুষ ৬০-৭০ বছরের বেশি বাঁচে না। কিন্তু রাহমান ভাই, আপনার একটা ব্যাকুলতা যে পাঁচ হাজার বছর বাঁচার। সেইটাও কি একধরনের সিম্বল যে মৃত্যুর পরবর্তী আরও বাঁচতে চান আপনি হাজার বছর? আকাক্সক্ষাটা আসলে কী?

রাহমান: মৃত্যুর পর তো আমি বাঁচব না। মৃত্যু মানে তো শেষ। এটা একটা আকাক্সক্ষার কথা আমি সত্যভাবে বলছি, তা তো না। পাঁচ হাজার বছর কেউ বাঁচে নাকি? মৃত্যু তো অবধারিত। কখন মৃত্যু হয়, তা-ও কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না।

মাহমুদ: খুব সুন্দর বলেছেন উনি। আমি অকপটে বলেছি যে, আমি বিশ্বাস করি মৃত্যুতে, আমি শেষ হয়ে যাব না। আমার একটা লাইন আছে তো পড়াশোনার। আমি সবগুলো ধর্মগ্রন্থের নির্যাস পাঠ করেছি। এ ছাড়া আমি খুবই রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার থেকে এসেছি। তারা ধর্ম বিশ্বাস করত।

মামুন: শামসুর রাহমানও তো ধর্মীয় পরিবার থেকে আসছেন।

রাহমান: আমার তো দাদা-নানা, বাবা-মা সবাই তো ধর্মে বিশ্বাস করে। আমিই না একটা অপদার্থ।

মাহমুদ: আমি বলতে চাই, আমি একটা ধর্মীয় পরিবেশ থেকে এসেছি। এটার তো প্রভাব আছেই আমার ওপর ছোটকাল থেকে। আর এ ছাড়া আমি খুব নিরপেক্ষ পড়াশোনা করেছি। আমার জানামতে, পৃথিবীর যেসব শ্রেষ্ঠ কবি গত হয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে অনেকে ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলা ভাষার যিনি প্রতিষ্ঠাতা, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এলিয়টকে বিশ্বাসী মনে হয়েছে।

মামুন: আপনাদের দুজনের নাম কেন এত উচ্চারিত হয়?

রাহমান: কেন করা হয়, জানি না, তাতে আমার দোষ নেই। তারও দোষ নেই।

আল মাহমুদ স্ত্রী নাদিরা মাহমুদের সঙ্গে, আলোকচিত্র: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

মাহমুদ: আরে, এটা তো আমরা তৈরি করিনি। আমি যখন লিখতে আসি, তখন শামসুর রাহমানের পরে অন্তত ৩০টা নাম ছিল। তারপর আমার নাম থাকত। কখনো কখনো থাকতও না। আমি সত্য কথা বলছি। এখন বলা হয় শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ। আমি যেমন এটার জন্য দায়ী নই, তিনিও দায়ী না। এটা তোমরা, মানে তরুণরা বলছে এবং লিখছেও। তার দেশের প্রধান কবি উপাধিই আছে। এখন একসঙ্গে আমাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। এতে আমার কোনো প্ররোচনা নাই। আরেকটা কথা, আমাকে তোমরা বলো মৌলবাদী, ঠিক আছে। আমি যেহেতু ধর্মে বিশ্বাস করি, তাই একদল লোক আমাকে ব্যবহার করতে চায় বা আমাকে আপন মনে করে। তারা আমাকে সাহিত্যের ব্যাপারে কোনো সাহায্য করে নাই। সাহিত্য নিয়ে তারা অত মাথা ঘামায় না।

মামুন: তারা কি আপনার বই পড়ে?

মাহমুদ: কেউ পাঠ করে না। তারা বরং পারলে আমাকে, এটা বলা ঠিক না মিডিয়াতে, তারা আমাকে তোলেনি, কিচ্ছু করেনি। আরেকটা কথা, আমি কোথায় লিখি? তুমি দেখো, আমি তাদের পত্রিকায় লিখি না কখনো। শামসুর রাহমান লেখেন না। যারা আমাকে মৌলবাদী বলে, তাদের কাগজে লিখে আমি আল মাহমুদ হয়েছি।

মামুন: শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ নাম দুটি যখন একসঙ্গে আসে, তখন কেমন লাগে?

মাহমুদ: এটা শুনলে আমি লজ্জা পাই। আমি শামসুর রাহমানের সমতুল্য লোক নই। কবিতায়ও যদি কোথাও কোথাও একসঙ্গে নাম এসে থাকে, তবে বুঝতে হবে যে আমার কবিতায় কিছু কাজ আছে। শামসুর রাহমানের সমান আমি দাবি করেছি কোনো সময়?

রাহমান: শোনেন, যদি কেউ মনে করে, আপনি তো না করতে পারবেন না। আমি কিন্তু এটা নিয়ে মাথা ঘামাই না।

মাহমুদ: আপনি মাথা ঘামান না। কিন্তু আমাকে তো জিজ্ঞেস করা হয়। যেমন ও জিজ্ঞেস করল, জবাবটা দিতে হয়। আমি কী জানি সেটা? আমি তো শামসুর রাহমানের কাছে পড়ার মতো ক্ষমতাই রাখি না।

রাহমান: আপনি হয়তো আমার চেয়ে ভালোই লেখেন। যার যা প্রাপ্য, সেটা তো সে পাবেই।

মাহমুদ: আপনি একটা কথা অন্তত স্বীকার করবেন যে আমার কবিতা এ পর্যন্ত এসে উপস্থিত হয়েছে অন্তত আপনাদের কাছে–এটা সহ্য করার কোনো ক্ষমতা বাংলাদেশের কোনো কবির ছিল না। আপনার অনেক বন্ধু। আমিও আপনার বন্ধু। শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আমি ছাড়া আর কারও সে পরিশ্রম ছিল না। আমি সেটা করছি। এই যে আপনার বাসায় ডেকে আমাকে ইফতার করালেন, দুজন কথা বলছি পাশাপাশি বসে–এটা আমার কবিতা দিয়ে আমি আদায় করে নিয়েছি। আপনার বড়ত্বটা বোঝার ক্ষমতা আমার আছে। আমি যা যা লিখেছি, পাঠ করেছেন। তরুণদের কথায় আপনি কোনো দিন দ্বিধায় থাকবেন না। আপনি অনেক বড় কবি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি। আপনার সমকক্ষ কেউ নাই। আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি। এত কাজ কে করেছে? কেউ করেনি। আমাকে যতই বলা হোক আমি একমুখী। আমি পল্লির প্রকৃতির মধ্যে কাজ করেছি। কিন্তু আপনি অনেক কাজ করেছেন।

রাহমান: আপনিও ভালো জায়গায় কাজ করেছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মামুন: এই বাংলা তো গ্রামবাংলা, পল্লি।

মাহমুদ: পল্লিই তো। আমরা সবাই পল্লির। কিন্তু আমি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছি, সে জন্য গ্রামের প্রকৃতি আমার মধ্যে কাজ করে বেশি, আর সহজে এটা বলার মতো ভাষা আমি নিজে তৈরি করে নিয়েছি। চট্ করে বলে ফেলতে পারি, এটাই বলতে চেয়েছি। আরেকটা সিগারেট খাই?

রাহমান: হোয়াই নট?

মামুন: পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা তো আমাদেরই বাংলা ভাষা। কিন্তু মধ্যে তফাত তো নিশ্চয়ই আছে? তফাতগুলো কী কী?

রাহমান: পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান যা-ই বলো না কেন, এটা ওখানকার একটা ডিভিশন আছেই। কথা বলার ভঙ্গি, ভাষা প্রয়োগের ভঙ্গি। একই ভাষা যদিও, তবুও আমাদের ভাষা যে আলাদা হয়ে আছে, তাদের ভাষার মধ্যেও আলাদা হয়ে আছে। মিল আছে। আবার কিন্তু অমিলও আছে। ওখানকার জীবনযাত্রাও আলাদা।

মামুন: বাংলা সাহিত্যে কি এখন, পূর্ববাংলার ডোমিনেট লেখকরা করে? নাকি পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা?

রাহমান: এটা বলার আমি কোনো প্রয়োজন মনে করি না। আমরা আমাদের মতো গড়ে উঠেছি, ওরা ওদের মতো গড়ে উঠেছে।

মামুন: কিন্তু ভাষা তো বাংলা।

রাহমান: ভাষা একটা হলেও জীবন তো একটা নয়; সমাজও তো একটা নয়। আলাদা। সুতরাং আমাদের লেখা এক রকম আসবে, তাদের লেখা অন্য রকম আসবে। কী, ঠিক বললাম নাকি?

মামুন: কথাটা আংশিক ঠিক। আমি বলতে চাইতেছি মানের দিকটা।

রাহমান: মান তো অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।

মামুন: তা আমি বলতেছি না। আল মাহমুদ ভাই কী বলেন?

মাহমুদ: আমি বলব? আমার কাছে মনে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য একটা পতনোন্মুখ সময় অতিক্রম করছে। পশ্চিমবঙ্গে লেখা কবিতা, উপন্যাস, গল্পের সঙ্গে আমাদের একটা পার্থক্য তো সবার চোখে ধরা পড়ছে। আমি মনে করি যে আমাদের ভাষাই প্রকৃত আধুনিক বাংলা ভাষা। ঢাকার সাহিত্য হচ্ছে যে ভাষায়, নাটক হচ্ছে যে ভাষায়, কবিতা হচ্ছে যে ভাষায়, এটাই হলো আধুনিক ভাষা। প্রকৃত আধুনিক বাংলা ভাষা এখন ঢাকায় সঞ্চরণশীল।

মামুন: তাইলে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বাংলা ভাষা কি মৃত ভাষা?

রাহমান: আমি মৃত তো বলিনি। আমি বলেছি যে, অবক্ষয় তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে আছে। যেমন ধরেন এখন কলকাতায় যে পরিস্থিতি, কলকাতায় পূজাসংখ্যা বেরোয় কয়টা? বড়জোর ২টা বা ৩টা। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদসংখ্যা বেরোচ্ছে অন্তত তিরিশটা। আধুনিক সাহিত্য তো কলকাতামুখী না। ঢাকামুখী হয়ে গেছে। কলকাতার লেখকরা লিখছেন আমাদের ঈদসংখ্যাগুলোতে।

মামুন: আমাদের লেখকরা তো ওদের পূজাসংখ্যায় লেখেন।

মাহমুদ: খুবই কম। এক-আধজন লেখেন। হয়তো শামসুর রাহমানের কবিতা দিয়ে অঙ্কিত করা হয়। এটা অ্যাকচুয়ালি কোনো ধর্তব্যের ব্যাপার না। প্রধান লেখক শামসুর রাহমান এখানে। তার কবিতা দিয়েই তো শুরু হয় সবগুলো পত্রিকা। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা এখন কোথায়? এটা খোঁজ করে দেখতে হবে। ওখানে যারা আমাদের বয়সী যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা অন্য যারা লেখেন, এ কী যেন নাম তার ওই যে ঠাকুরের শিষ্য, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, এরা যারা লিখছেন, এদের বই কি কলকাতায় বিক্রি হয়? হয় না। তাদের বই বিক্রি হয় আমাদের আজিজ মার্কেটে।

মামুন: বাংলাদেশে আপনাদের পাঠক কারা? মানে কোন শ্রেণির?

রাহমান: মধ্যবিত্ত শ্রেণির। আর কমবেশি সব বয়সেরই, একেবারে তরুণরাও পড়ছে। যারা তরুণ নয়, তারা পড়ছে না, তা নয়। কমবেশি সবাই পড়ে। সবাই পড়ে বললে মনে হয় যেন আমি জনপ্রিয় লেখক, তা-ও না। কিছু লোক তো পড়েই।

মামুন: মাহমুদ ভাই, আপনার?

মাহমুদ: আমার মনে হয়, আমার পাঠক প্রকৃতপক্ষে তরুণরাই। তরুণ-তরুণীরাই আমার বই কেনে বেশি আমি দেখেছি। আমি খোঁজও নিয়েছি এ ব্যাপারে দোকানদারদের কাছে। আমার দেশই আমার ভিত্তি। আমার পাঠক আমার দেশেই। অন্য কিছুর জন্য আমি কেয়ারও করি না।

মামুন: আপনারা দুইজনই প্রেমের কবিতা লিখেছেন অনেক। ভালোবাসার কবিতা। অনেকে শামসুর রাহমানকে বলে প্রেমের কবি।

মাহমুদ: নিঃসন্দেহে।

মামুন: প্রশ্ন আপনার কাছে, পৃথিবীতে যদি নারী না থাকত, আপনি কি কবিতা লিখতেন?

রাহমান: নারী না থাকলে কী হতো, জানি না আমি। তখন হয়তো আমি সমকামী হয়ে পুরুষকে নিয়ে কবিতা লিখতাম। পশু, পাখি, গাছ এগুলো নিয়ে লিখতাম। নারী বাদ যেত। জীবনই অর্ধেক নষ্ট হয়ে যেত।

মাহমুদ: আমার মনে হয়, নারী না থাকলে পৃথিবীরই কোনো প্রয়োজন হতো না। কারণ, দেখবে যে পৃথিবীর প্রত্যেকটা জিনিস জোড়ায় জোড়ায়। নারীই তো পৃথিবী। নারী না থাকার চিন্তাটাই বা আসে কী করে? এটা তো স্বাভাবিক না। আমি অবশ্য কোনো দিনই সমকামী হতে পারব না। যদিও আমি এর ওপরে একটা বই লিখেছি 'পুরুষ সুন্দর' বলে। আমি নারীর কাছে দাবি করি, নারীর কাছে পাই এবং নারীর কাছে পরিতৃপ্ত হই। নারীর কাছে ফিরে যাই। নারীকে ভাঙিয়ে খাই।

রাহমান: নারী না থাকলে তো জীবনই মরুভূমি।

মামুন: একজন পুরুষ কবির জন্য নারী কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?

রাহমান: খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারী তো অমানুষ না। ওরা তো মানুষ, পুরুষের মতোই তাদের সমমর্যাদা থাকা উচিত এবং আছেও বোধ হয়।

মামুন: আপনারা দুইজনই নারী নির্ভরশীল আরকি।

মাহমুদ: আমি তো বলেছিই, আমি আমার স্ত্রী ছাড়া চলতে পারতাম না। এখনো আমি চলতে পারি না। আমার স্ত্রী ছাড়া আমি অন্ধকার দেখি। কয়েক ঘণ্টার জন্য বাইরে গেলে আমার সংসার আটকে যায়। কোনো কোনো সময় বিরক্তিকরও, সে ডোমিনেট লেডি তো। সবকিছুর ওপরে কর্তৃত্ব করে।

মামুন: রাহমান ভাই, বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়া কথা বলতে চাই। পুরস্কার কারা পায়?

মাহমুদ: নাম উল্লেখ দরকার নেই।

মামুন: আচ্ছা ঠিক আছে। কবি জসীমউদ্দীনকে দিতে পারে নাই।

মাহমুদ: তুমি বলতে চাচ্ছ, অবিচার-টবিচার এই সব তো?

মামুন: হ্যাঁ।

মাহমুদ: প্রকৃত লেখকদের ইগনোর করা তো উচিত না। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠান, মনে রাখতে হবে যে যারা ক্ষমতায় আসে, তাদের সন্তুষ্ট করতে চায়। এগুলো তুলে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে লাভ কী। কিছু রাজনৈতিক দল আছে, তারা যদি কোনো দিন ক্ষমতায় যায়, আমি কোনো দিন পুরস্কার পাব না, এটা আমি জানি। ক্ষোভ প্রকাশ করে লাভ আছে? কিছু কিছু সরকার ক্ষমতায় গেলে হয়তো শামসুর রাহমানকে পুরস্কার দিতে চাইবে না। এতে উনি কি ছোট হয়ে যান? কিছুই হবে না। তার কারণ, আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি। কে এসব বলল, এটা কোনো ম্যাটার করে না।

রাহমান: হ্যাঁ, আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি। লেখাটাই আমাদের একমাত্র কাজ।

মামুন: বাংলা একাডেমির বইমেলাতে যান প্রত্যেক বছর?

মাহমুদ: আগে যেতাম না, ভাই। অপমানের ভয় ছিল। কিন্তু দু-তিন বছর ধরে বাংলা একাডেমিতে যাই। বই-টই যা-ই হোক, আমার প্রকাশক যারা, তাদের স্টলে ১০ মিনিট করে দাঁড়াই। বসে স্বাক্ষর করে বই বিক্রি করা আমার আদত না।

মামুন: রাহমান ভাইরা তো যান। স্বাক্ষর করেন।

রাহমান: প্রকাশক নিয়ে যান। বলেন, আসেন একটু। আমি কোনো দিন সই করার জন্য যাইনি।

মামুন: আল মাহমুদের সঙ্গে এই যে যোগাযোগ হইল আইজকা, আমরা তরুণরা আশা করব, এ যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।

রাহমান: আজকেই যে প্রথম হয়েছে, তা না।

মামুন: মাঝখানে প্রায় ১৯-২০ বছর যোগাযোগ হয় নাই সত্যিকার অর্থে। সেই যে পদাবলী অনুষ্ঠান, তারপর দেখলাম কথা বন্ধ।

মাহমুদ: এখন হবে। তুমি তো জানো, আমি কথা বন্ধ করি নাই। আমার তো নালিশ নাই। এটার জন্য আমার কোনো ক্ষোভ নাই। এখন যদি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়, এটা মনে হয় আজকে থেকে হচ্ছে। আমি মনে করি, এইটা আইজকা রিনিউ হইল। এটা হতো।

রাহমান: অনেকে অনেককে বড় কবি মনে করে, করবেই। এটা অন্যায়ভাবে করে না। ঠিকমতোই করে। হি ডিজারভস, সে তো ফালতু কবি নয়। সে তো ভালো বড় কবি এবং সে যদি আমার চেয়েও বড় কবি হয়, আমার কোনো বাধা থাকবে না।

মামুন: যেমন কেউ কেউ উচ্চারণও করে যে আল মাহমুদ শামসুর রাহমানের চেয়েও বড় কবি। আপনার কানে কোনো সময় আসছে?

রাহমান: তাতে কী হয়েছে? আমি কিছু মনে করব কেন?

মাহমুদ: তবে এইটা আমাকে কেউ বলেনি, এমনকি যারা প্রবলভাবে আমার সমর্থক, তারাও আমাকে এই কথা কখনো বলেনি। এই অন্যায় কথাটা তারা বলতে সাহস করেনি যে আমি শামসুর রাহমানের চেয়েও বড় কবি।

রাহমান: হতে পারে। এটা বলতে পারে। এটা কোনো অন্যায়ও তো না। একজনের কাছে একজন বড় হতেই পারে। এতে আমার তো ক্ষিপ্ত হওয়ার কিছু নাই। এটা খুবই ন্যাচারাল মনে করি আমি। কারও কথা একজনের ভালো লাগতেই পারে। আরেকজনের হয়তো লাগবে না।

মামুন: আপনারা দুজন কিন্তু দুইজনের কথা বললেন, অন্য কবিদের কথা বললেন না। বাংলাদেশে আরও অনেক কবি আছে। আপনারা সব কবিতাই তো পড়েন, এদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করবেন?

মাহমুদ: কেন করব না? নাম উচ্চারণ করেও যদি বলতে বলো, সেটাও আমি বলতে পারি। কিন্তু সেটা তোমার জন্য সুখকর হবে না। এ দেশে অনেক তরুণ কবি আছে। এখন আমি একটা বৃদ্ধ লোক। হয়তো কয়েকজনের নাম বলব, দেখা গেল খুব ইম্পর্টেন্ট কবি বাদ পড়ে গেল। ওর কথা মনে পড়ল না। কিংবা আমার লেখাপড়ার আওতার মধ্যে নাই তারা। এই যদি হয়ে যায়, তবে আমাকে বিব্রত করে কোনো লাভ আছে? সামগ্রিকভাবে বলি, সত্তরের দশকের ইম্পর্টেন্ট কিছু কবি রয়েছেন, ষাটের দশকেও রয়েছেন। নিত্য আমি এদের কবিতা পড়ি। আশির দশকে কয়েকজন ভালো কবির আবির্ভাব হয়েছে। এখন নব্বইয়ের দশকে আরও ভালো কবি এসেছে।

মামুন: যেমন মাহমুদ ভাই বললেন, ৩০ জন কবি ছিলেন আপনি আর তার মাঝখানে। তারপর হাওয়া হইছে তারা।

রাহমান: হয়তো। এগুলো বলা মুশকিল।

মামুন: রাহমান ভাই ব্যক্তিগত জীবনে আপনি একজন সফল মানুষ না আল মাহমুদ সফল?

মাহমুদ: সফল? সফল কি না, জানি না, আমরা একই রকম মানুষ।

মামুন: এইটা আপনের কি মনে হয় পরিবারের প্রধান হিসেবে?

মাহমুদ: আমার সফলতা অনেক দিকেই আছে। আমার ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু অসফলতাও আমার আছে।

রাহমান: সফলতা আপেক্ষিক ব্যাপার। বিষয়টিকে মানুষ একেক সময় বুঝতে পারে না। সফল-অসফল দুটোই আমাকে পেরিয়েছে। তবে কবিতা আমাকে মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে।


  • সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় ৩১ অক্টোবর ২০০৪, এখানে ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো

 

Related Topics

টপ নিউজ

আল মাহমুদ / শামসুর রাহমান / ইজেল / সাক্ষাৎকার

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। ছবি: সংগৃহীত
    যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে: সারাহ কুক
  • ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
    ১.৬ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তের ঋণ অনুমোদন দিল সরকার
  • কলম্বিয়ায় পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন জলহস্তী’। ছবি: এপি
    পাবলো এসকোবারের জলহস্তী মারতে চায় কলম্বিয়া, ভারতে এনে বাঁচাতে চান অনন্ত আম্বানি
  • কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স
    ইউক্রেনের হাতে আটক এড়াতে ‘আত্মঘাতী’ হওয়া সেনাদের প্রশংসা করলেন কিম জং উন
  • ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স
    ওপেনএআই আমার আইডিয়া, লুট হওয়ার আগে এটি চ্যারিটি ছিল: আদালতে ইলন মাস্ক
  • বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফাইল ছবি: ইউএনবি
    ট্যাক্সে সুবিধা দিতে পারব না, তবে ব্যবসায়ের সব বাধা সরিয়ে দেব: অর্থমন্ত্রী

Related News

  • সিনেমা কেন দেখি অথবা তিরিশ বছরের ঘোর
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামাল যা বললেন
  • আশা 
  • বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুক্রবার
  • কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী: শামসুর রাহমান

Most Read

1
ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে: সারাহ কুক

2
ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
অর্থনীতি

১.৬ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তের ঋণ অনুমোদন দিল সরকার

3
কলম্বিয়ায় পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন জলহস্তী’। ছবি: এপি
আন্তর্জাতিক

পাবলো এসকোবারের জলহস্তী মারতে চায় কলম্বিয়া, ভারতে এনে বাঁচাতে চান অনন্ত আম্বানি

4
কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনের হাতে আটক এড়াতে ‘আত্মঘাতী’ হওয়া সেনাদের প্রশংসা করলেন কিম জং উন

5
ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

ওপেনএআই আমার আইডিয়া, লুট হওয়ার আগে এটি চ্যারিটি ছিল: আদালতে ইলন মাস্ক

6
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফাইল ছবি: ইউএনবি
বাংলাদেশ

ট্যাক্সে সুবিধা দিতে পারব না, তবে ব্যবসায়ের সব বাধা সরিয়ে দেব: অর্থমন্ত্রী

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab