কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী: শামসুর রাহমান
নাসির আলী মামুন: রাহমান ভাই, কবিতা কী?
শামসুর রাহমান: এ তো মুশকিল বলা। কবিতা যে কী? কেউ কেউ বলেছেন, বেস্ট ওয়ার্ডস ইন বেস্ট অর্ডারস—এটাই বলেছেন। আরও কেউ কেউ অনেক কিছু বলেছেন। তবে কবিতা যে কী, এটা ঠিক, কোনো একটা বিশেষ সংজ্ঞা দিয়ে বোঝানো যাবে না।
একেকজন একেক ধরনের কথা বলেছেন এবং প্রত্যেকটি বাক্যের মধ্যে, প্রত্যেকটি কথার মধ্যে কিছু না কিছু শর্ত আছে। আমি যে কিছু বলব, তা কিছু হবে না। অনেকেই অনেক কিছু বলেছেন। অনেক ব্যক্তি, যারা কবিতা লেখেন, তারা বেশ বিখ্যাত ব্যক্তি। আর তাদের কথার মধ্যে একবারের কথায় সবটা কবিতার সংজ্ঞা ফুটে ওঠেনি। উঠবেও না। তো কারও কারও মধ্যে আংশিক, কারও কারও মধ্যে একটু হয়তো বেশি, কারও কারও মধ্যে হয়তো সামান্য কিছু ঠিক হয়। আমি মনে করি, বেস্ট ওয়ার্ডস ইন বেস্ট এটা একটা মূল্যবান সংজ্ঞা। এটাকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না।
মামুন: কবিতা কি এমন হইতে পারে, যেমন সুন্দরের কোনো সংজ্ঞা নাই?
রাহমান: হ্যাঁ, তা হতে পারে ও রকম।
মামুন: পানির যেই রকম কোনো রং নাই?
রাহমান: সেই...
মামুন: অনেকটা বিমূর্ত না কবিতাটা?
রাহমান: এটা ঠিক। তুমি ভালো বলেছ। এটা খুবই বিমূর্ত। কিন্তু আংশিকভাবে সত্য, অনেক সংজ্ঞাই সত্য আংশিকভাবে, ঠিক পুরোটাই কেউ ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
মামুন: কবিতা আপনাকে কী দিছে?
রাহমান: আমাকে যা দিয়েছে, তা কাউকে কাউকে দেয়, সবাইকে দেয় না। সেটি হলো, আমাকে অন্য মানুষ করে ফেলেছে। যদি আমি কবিতা থেকে, কবিতা চর্চা না করতাম, কবিতার সঙ্গে আমার সংস্পর্শ না হতো... কবিতা হলো খুব সুন্দরী নারী, সুন্দরী। যার সঙ্গে হঠাৎ একটি নির্জন পথে দেখা হয়ে যায় এবং তার যে রূপ দেখা হলো, সে চলে গেল কিন্তু তার সে সুন্দর দৃশ্য মনের মধ্যে গেঁথে রইল। কোনো দিন, কোনো দিন মুছবে না এবং এটা খুব মূল্যহীন এবং আজগুবি মনে হতে পারে। কিন্তু এটা আমার কাছে একধরনের বড় সত্য, যা আমাকে অনেক সময় অনেক কিছু থেকে দূরে রাখে এবং সামনে যেটি নিয়ে যায়, সেটি হলে—ওটি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং দূরে যাদের নিয়ে যায়, জানি না... তারা কী ভাবেন এবং কী মনে করেন। কিন্তু কবিতা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে এবং আর যদি কিছু না-ও দেয় ভবিষ্যতে, তবু আমি কবিতার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।
মামুন: আপনাকে কেউ যদি কবি বলে, তাহলে কি আপনের মনে একধরনের দোলা লাগে? কীভাবে রিঅ্যাক্ট করেন?
রাহমান: কখনো কখনো কবি বললে... আবার অনেকে আমার কাছে এমনভাবে বলে, যেটাতে মনে হয় ইয়ার্কি মারছে।
মামুন: এটা কি আগে মনে হইত, প্রথম যখন লিখতেন তখন?
রাহমান: না, এটা সব সময়ই মনে হয়। আবার কারও বলার ভঙ্গিতে এমনি করে বলে...
মামুন: কৌতুক থাকে?
রাহমান: না, কৌতুক থাকে না। খুব খাঁটি যাদের, সেটা খুব ভালো লাগে। আমি তো কবিতা লিখি। ওই যে কবি বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এটা আমার কাছে খারাপ লাগার তো কথা নয়। আমার ভালোই লাগে। কিন্তু অনেকে কবি, কবি সাহেব... এই 'কবি সাহেব' কথাটা আমার ভালো লাগে না। খুব খারাপ লাগে। কবি বললে আমার ভালো লাগে, কিন্তু সঙ্গে সাহেব যুক্ত করলে রাগ লাগে।
মামুন: কবির দিকে মানুষের একটা আলাদা ফোকাস থাকে। সাধারণ মানুষ মনে করে, কবিতা হইল সব চাইতে শক্তিশালী মাধ্যম আরকি সাহিত্যের। তার কারণ অল্প জায়গায়, অল্প স্পেসে, অল্প কয়েক লাইনে বেশি কথা বলে কবিতা এবং অনেক বড়। যেটা ১০০ পৃষ্ঠা, ৫০০ পৃষ্ঠার বইয়ের অনেক সময়ে বলা সম্ভব হয় না।
রাহমান: সবাই যে বুঝে করে, তা নয় কিন্তু। সকলেই করে না। এটা কেন করে, এটাও বলা মুশকিল। শ্রম এবং কল্পনা চিন্তা একজন নাট্যকারও তো করেন, একজন ঔপন্যাসিকও করেন এবং কবিরাও করেন। তবে কবিতা সবকিছু থেকে আলাদা, ওপরে।
মামুন: কিন্তু তার ভলিউমটা তো অনেক বড়, অনেক বেশি।
রাহমান: পৃথিবীতে কবি না থাকলে ক্ষতিটা কী?
রাহমান: কবি না থাকলে কবিতা থেকে অনেক মানুষের মন পরিশীলিত হতো না। এটা আমার মনে হয়।
মামুন: পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা অসাধারণ মানুষ, ভালো মানুষ কিন্তু কবিতা পড়তে চায় না।
রাহমান: অসাধারণ মানুষ কবিতা পড়বেই। কবিতা না পড়লেও তার মধ্যে কবিতার কোনো কোনো ভাব হয়তো তার অজ্ঞাতে তার মধ্যে যায়। আমার তা-ই মনে হয়। আমার এটা বিশ্বাস। তা জানি, অনেক হয়তো একমত হবেন না। তা না হলে আগের কালে কবিতার কোনো রচনা হতো না। এবং এই যে গুহার যে ছবি এঁকেছে, সেটা হতো না। সব মানুষ আঁকেনি কিন্তু। একজন মানুষই এঁকেছে। তার মনে সে শিল্পের আভা ছড়িয়েছিল। সে যে কাজটা করেছে শিল্পের আভা থেকেই।
মামুন: কবিতা আমাদের কী কী উপকার করতেছে?
রাহমান: কবিতা উপকার তো ডাল-ভাতের মতো করে না। কবিতা হলো মানুষের মনকে পরিশীলিত করে। এবং সেই মনকে পরিশীলিত করা একটি বড়, আমার মনে হয় বড় উপহার মানুষের জন্য। শিল্পই এটা করে। কবিতা সে অর্থে করে।
মামুন: আপনের যখন কবিতা লিখতে মন চায়, তখন কি অস্থিরতা কাজ করে?
রাহমান: এই অস্থিরতা যেটা বললে না, ওটাই আসে। হয়তো ঘুমুতে যাব এমন সময় একটা ঝিলিক দিল মনে, ওই ঝিলিকটাই আমাকে অস্থির করে তুলল। আমি উঠলাম। আমার স্ত্রী হয়তো ঘুমিয়ে আছে আমার পাশে, আমি সেদিকে না তাকিয়ে হয়তো লাইটটা জ্বালালে তার অসুবিধা হতে পারে, এটাও না চিন্তা করে আমি টেবিলে বসে গেলাম। আমি লিখতে শুরু করলাম। কোনো দিন লেখা হলো। কোনো দিন লেখা হলো না। এই।
মামুন: এমনি আরও অনেক বিশেষ সময়ে, ধরেন আপনাকে চাপ সৃষ্টি করা হয় লেখার জন্য, একটা অন্য ধরনের।
রাহমান: হ্যাঁ, সেটাও হয়। অনেকের চাপের মধ্যেও কিন্তু অনেক সময় ভালো লেখা হয়ে যায়। আবার অনেক সময় ভাবনা নিয়ে লেখা ভালো হয় না। এটা একটা অদ্ভুত অনুভব। বলা মুশকিল।
মামুন: কবিতা ছাড়া আর কিছু করার যোগ্যতা নাই বা ইচ্ছে হয় না অন্য কাজ করতে, সেই কারণেই কি কবিতা লেখেন?
রাহমান: না। আমি তো অনেক কাজই করতে পারি। আমি যে করতে পারি না, তা না। কেরানিগিরি করতে পারি, আমি ইচ্ছে করলে অধ্যাপনা করতে পারতাম। ইচ্ছে করলে কুলিগিরি করতে পারতাম। আমি অনেক কিছু করতে পারতাম। আমি সেগুলো করিনি। আমি কবিতা লিখেছি। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে জীবনকে রক্ষা করার জন্য। কবিতাটা জীবনকে রক্ষা করার একেকটা অর্থে দেয়। আবার সাংসারিক অর্থে দেয়। যে একটা লোক বড় অফিসার, যতটা টাকা উপার্জন পারে, কবিতা সেটা পারে না। কবিতা দিয়ে করা যায় না।
মামুন: কিন্তু আজকাল কবিতা লেইখা অনেক সময় সাহিত্যচর্চা কইরাও জীবিকা নির্বাহ করা যায়। যখন আপনে প্রথম শুরু করছেন, তখন তো এই চিন্তাটা ছিল না?
রাহমান: এগুলো ছিল না। এবং আমি তো লিখে পয়সা উপার্জন করব, তারও কিছু ছিল না। একটা আবেগ থেকে, একটা তাগিদ থেকে করেছি।
মামুন: এখন মিডিয়ার টাকা কামাই করতেছেন, এইটা তো আগে আপনের সময়ে ছিল না, যখন আপনে শুরু করেছিলেন?
রাহমান: টাকা আর এমন কী কামানো হয়? কিছু কিছু তো হচ্ছে।
মামুন: আপনে বললেন যে কেরানিগিরি করতে পারতেন, অধ্যাপনা করতে পারতেন, অন্য কোনো কাজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্য কাজ টানে নাই।
রাহমান: না। কিছু কিছু কাজ করেছি। অন্য কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু কবিতাটাকে ত্যাগ করিনি কিংবা কবিতা আমাকে ত্যাগ করেনি, কবিতা কাউকে ওভাবে ত্যাগ করে কিন্তু!
মামুন: সেইটা কী রকম?
রাহমান: কবিতা যাকে ত্যাগ করে, সে আর লিখতে পারে না, হাতের মধ্যে লেখার ইচ্ছে থাকে না। আমি কখনো লিখব না বা লিখতে পারছি না এ রকম সিচুয়েশন হয়নি। প্রত্যেক কবিরই কখনো কখনো লেখা হয় না। আবার কবিতা ফিরে আসে না। এ জন্য তার ভেতরের কবি মরে যায়। যার মধ্যে আসে মাঝেমধ্যে। আবার যেয়েও আসে, সে কবিতা তখনো থাকে। তোমাকে কী বলব আমি!
মামুন: আমি বুঝছি। এমনকি মনে হয় কোনো সময় যে আপনে কবিতার কাছে সমর্পণ করছেন নিজেকে? অথবা কবিতা আপনের কাছে সমর্পণ করছে? এই দুইটা কি একই রকম?
রাহমান: একই। এবং এ দুটো এক হয় বলে লেখা হয় ভালো।
মামুন: এইটা কি আপনের জীবনে আগেও ঘটছে, এখনো ঘটতেছে।
রাহমান: এখনো হয়। জানি না আর কত দিন থাকবে।
মামুন: তাইলে কবিতার মধ্যেই আপনে সব সময় আছেন আরকি?
রাহমান: আছি, আছি।
মামুন: আপনে তো ছাড়তে পারেন নাই?
রাহমান: কিছুই হতো না, বাংলা সাহিত্যের কিছু হতো কি না জানি না। তবে...
মামুন: আধুনিক বাংলা কবিতা নাকি আপনের হাতেই গতিশীল ও পরিশীলিত হইছে?
রাহমান: আমি লিখেছি, আমি নিজের প্রাণের টানে লিখেছি, মনের টানে লিখেছি এবং আমি আজ লেখায় বাংলা সাহিত্যের কিছু হবে কি না, এটা নিয়ে অতটা মাথা ঘামাইনি। লিখে গেছি। হ্যাঁ, কেউ কেউ বলেছেন, আমার লেখায় কিছু জিনিস আছে, যেগুলো আমাদের সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে। এগুলো ঠিক আছে।
মামুন: একটা দেশে একটা ভাষায় তো নানা ধরনের কবি থাকে—ছোট, বড়, মাঝারি। সবাই তো আর রবীন্দ্রনাথ হয় না। নজরুল, জীবনানন্দ দাশ হয় না। তো আপনে কি একজন বড় কবি?
রাহমান: এটা আমার পক্ষে বলা তো মুশকিল। এটা পাঠকরা বলবেন। বোদ্ধা পাঠকরা বলবেন আমি কী রকম কবি।
মামুন: কিন্তু যখন আপনে ভুইলা যান আপনে শামসুর রাহমান, কবি না। শুধু পাঠক। এই রকম কল্পনা যদি কখনো করেন, তাইলে আপনের কী মনে হয় শামসুর রাহমান সম্পর্কে?
রাহমান: আমার পক্ষে সম্ভব নয় এটা বলা।
মামুন: আপনে তো একজন রিডার। আপনের সমসাময়িকদের সঙ্গে একটা তুলনা তো করতে পারেন? তখন তো আপনে বুঝতে পারেন কোথায় দাঁড়ায়া আছেন?
রাহমান: না। কিন্তু আমার তো ভুল হতে পারে।
মামুন: ভুল না-ও তো হইতে পারে?
রাহমান: না-ও হতে পারে। এটা বলা মুশকিল। যারা সত্যিকারের বোদ্ধা পাঠক, তারাই বলবেন। আমি তো কন্ডিশন হয়ে যাব। হয় আমি নিজেকে খাটো করে দেখব, নয় বড় করে দেখব।
মামুন: সেই রকম কোনোটাই আপনে ভাবতে রাজি নন?
রাহমান: রাজি নই মানে কী, সম্ভব নয় বোধ হয়। এমন যদি হয়, একেবারে রবীন্দ্রনাথের মতো হয়ে গেলাম, তা-ও হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু হয়তো মনে হয় কোনো কবি নিজের সম্পর্কে শেষ কথা বলে যেতে পারেন না। কোথাও না কোথাও তার মনে একধরনের সন্দেহ থেকেই যায়। কী জানি, আমি যা ভাবছি সেটা কি ঠিক? আমি যেটা লিখছি সেটা কি ঠিক থাকে?
মামুন: আপনাকে নাকি বাংলাদেশের একজন খুব নামকরা কবি বলছিলেন, আমি পৃথিবীর শেষ কবি, তাই না?
রাহমান: এগুলো তো খুবই বাজে কথা। এগুলো বলার তো কোনো মানেই নেই। জসীমউদ্দীন বলেছিলেন আমাকে।
মামুন: শামসুর রাহমান ভাই, কবি হইতে গেলে কী কী দরকার?
রাহমান: সেটা আমার জানা নেই।
মামুন: আপনে হতাশ করলেন। কেউ যদি চায় কোনো তরুণ বা কোনো নতুন কেউ কবিতা লেখতে চায়, তবে সে কী করবে? কোন পথে বা কোন তরিকায়?
রাহমান: যে কবি হয়, কখনো সে কারও কাছে বলে না যে কবি হব। কিংবা কীভাবে কবি হব। আমি যদি কবিতা লিখতে চাই, আমাকে যদি সবাই বারণ করে দেয় কবিতা লিখতে পারব না, তুব আমি লিখব। আমি তো কারও পারমিশন নিয়ে লিখব না। আমি তো কারও পারমিশন নিয়ে লিখিনি। অনেকের অনুবোধে কিন্তু কবিতা পরে লিখেছি। কিন্তু সেটা কারও পারমিশন নয়। সেটা আমারই অনুরোধে, কিন্তু কবিতা আমি যখন লিখি, তখন আমি ডিফারেন্ট ম্যান। তখন অন্য মানুষ। সাধারণ মানুষই নই। যখন আমার কবিতা লেখা শেষ হয়ে গেল, তখন আমি সাধারণ মানুষ। তুমি যখন ছবি তুলছ, তখন কিন্তু তুমি সাধারণ মানুষ নও, তুমি তখন আলাদা মানুষ। যখন তুলছ না, তখন তুমি সাধারণ।
মামুন: মানে একই মানুষের মইধ্যে আরও এক মানুষ বাস করে। সেই একই মানুষ কবিতা লেখে, একই মানুষ আবার খুনও করে। তার মানে একটা মানুষে অনেক রূপ?
রাহমান: অনেক মানুষ আছে এবং আছে। পাল্টায়ে যায় সে বিভিন্ন সময়ে।
মামুন: কবি-লেখকরা নিজেকে মারতে চায় কেন? কেন আত্মহত্যা করে?
রাহমান: সবাই না, কেউ কেউ।
মামুন: সবাই না, কিছু লেখক, বড় লেখক, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে...
রাহমান: এটা লেখক হিসেবে নয়, এটা মানুষ হিসেবেই। অনেক সাধারণ মানুষ, অনেক মহিলা, যারা বিবাহিত, তারা গলায় ফাঁসি দিয়ে মরে না? তারা কি কবি? এর সঙ্গে একটা দেশে একটা ভাষায়, সবাই একই মাপের, একই লেভেলের কবি না। এইটা হয় না, এইটা কোথাও নাই।
মামুন: আমাদের দেশের ছোট কবি কারা?
রাহমান: এটা কী করে বলি, ভাই। তুমি কি আমাকে মার খাওয়াতে চাও নাকি?
মামুন: ঠিক আছে, নাম না বলেন...
রাহমান: এগুলো বলা উচিত নয়। আজ বড় নয়, সে কাল বড় হতে পারে। এটা বলাও উচিত নয়। প্রশ্ন করাও উচিত নয়।
মামুন: আপনে কোন দেশের কবির কবিতা বেশি পড়ছেন আগে বা এখন পড়েন? কোন দেশের সাহিত্য?
রাহমান: আমি সবচেয়ে বেশি পড়েছি আমার নিজের দেশের কবিতা, মানে বাংলাদেশের কবিতা। আর ইংরেজি কবিতা, ফরাসি কবিতা এবং যখনই আমি ভালো কবিতা পেয়েছি, বই পেয়েছি—পড়েছি।
মামুন: কিন্তু আপনে তো ফরাসি ভাষা জানেন না?
রাহমান: আমি এগুলো অনুবাদ থেকে পড়েছি।
মামুন: কোনো বিশেষ দেশের ভাষা কি আকর্ষণ করে আপনাকে? ফরাসি, হিস্পানিক বা ইংরেজি?
রাহমান: কবিতার জন্য আমি মনে করি প্রত্যেক ভাষাতেই ভালো কবিতা আছে এবং কিছু ভাষা আছে, যেগুলো ব্যাপকতা পেয়েছে। ফরাসি ভাষা খুবই উন্নত মানের, ইংরেজি ভাষাও। সব ভাষারই আলাদা একটা মূল্য আছে। এবং সেগুলো, সবগুলো ভাষা তো সবাই জানে না। অনেকে অনেক ভাষা জানে; কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ জানে না। সুতরাং অনুবাদেও ভালো ভালো কবিতার স্বাদ পাওয়া যায়, এটা যে পাওয়া যায় না, তা নয়। সুতারাং প্রত্যেক ভাষায় ভালো কবিতা আছে।
মামুন: আপনে ৫৬ বছর ধইরা লিখতেছেন। আপনের কি এমন মনে হইছে, এই যে বাংলা ভাষা, তার চাইতে আরও অন্যান্য ভাষা উঁচু স্তরের? আপনে যদি অন্য ভাষা জানতেন—এই রকম আক্ষেপ হয় কি না। যেমন ইংরেজি বা ফরাসি? তাইলে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাইতেন, এ রকম আক্ষেপ হয়?
রাহমান: না। সে আক্ষেপ আমার হয় না। যদি আমার কবিতা খুবই উন্নত মানের হয়, তবে যে ভাষাতেই লিখি না কেন, একদিন না একদিন সেটা মূল্যায়িত হবে। শুধু পুরস্কার পেতেই হবে, তা নয়, লোকে সেটার কদর করবে। আমি যখন প্রথম লিখতে শুরু করি, আমাকে নিয়ে অনেক বিদ্রুপ করা হতো। কিন্তু এখন তো আমাকে নিয়ে কেউ বিদ্রুপ করে না।
মামুন: কারা করত?
রাহমান: কবিদের মধ্যেই এ রকম বিদ্রƒপ করত। আমার চেয়ে যারা বয়সে বড় ছিলেন, তারা করতেন কেউ কেউ।
মামুন: কিন্তু সেই দিকে তো আপনে কোনো তোয়াক্কা করেন নাই।
রাহমান: না, আমি লিখে গেছি। কে কী বলেছে সেটা আমলে নিইনি। আমার ভালো লাগত লিখতে, লিখেছি।
মামুন: আমাদের দেশে অনেক কবি। এইটা কী কারণে?
রাহমান: সব দেশেই বোধ হয় কবি আছে। কবির সংখ্যা তো আমরা জানি না, কোন দেশে কত আছে। কবিতা মানুষের একটা সহজাত শিল্প। নইলে যারা একেবারেই তথাকথিত শিক্ষিত নন, যেমন লালন, কী আশ্চর্য সব কবিতা লিখে গেছেন।
মামুন: তার ওগুলা তো বলে সঙ্গীত, গান।
রাহমান: সঙ্গীত তো কবিতাই। কবিতার কথাগুলো আছে তার মধ্যে। লালন তো নিজে লেখেননি। তিনি তো অন্ধ হয়েছিলেন।
মামুন: উনি তো লেখতেও পারতেন না।
রাহমান: সুতরাং পুরো মুখে মুখে বলেছেন। লালন ওয়ান অব দি বেস্ট পোয়েট অলসো।
মামুন: আমাদের দেশে কবিতার পাঠকদের মেধা এবং টেস্ট কেমন?
রাহমান: আমাদের দেশে যেটা তুমি বললা, মেধা ও টেস্ট সে রকম খুব লিমিটেড, খুব বেশি লোকের সে মেধাও নেই। সেই টেস্টও নেই।
মামুন: কবিদের বই কম চলে সেই কারণে বললেন?
রাহমান: না, সে জন্য না। অনেক কিছুই তো কম চলে।
মামুন: পৃথিবীতে সব দেশে সব ভাষায় উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য যেগুলা, সেই বই কিন্তু কম চলে। হয়তো পরবর্তী সময়ে কবির মৃত্যুর পরে অনেক বেশি চলে। তার মধ্যে ব্যতিক্রম ইউলিয়াম শেক্্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু একটা জিনিস আপনে খেয়াল করবেন যে উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য যেগুলো, সেগুলোর প্রিন্ট হইতেছে না; পরে হয়তো হয়। এই দিকে থিকা আপনে বলতেছেন যে লিমিটেড পাঠক?
রাহমান: এটা হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। হয়তো ভালোই নয়, পরেও আবার তা-ই হতে পারে। আবার এও হলো যে ভালো। কিছু কিছু মানুষ গ্রহণ করছে। সবাই পারছে না গ্রহণ করতে। পরে গিয়ে করতে পারল।
মামুন: কবি কি সময়ের আগে চলে? সেই জন্য হয়তো অনেক পাঠক ওই সময়, ওই কালকে ধরতে পারে না চিন্তায়। আমাদের দেশে বললেন যে এইটা খুব লিমিটেড, নাকি শিক্ষা-দীক্ষার দিক দিয়ে অনেক নিচের দিকে?
রাহমান: অনেক তথাকথিত শিক্ষিত কবি, লেখক, ব্যক্তিও তো কবিতা পড়েন না।
মামুন: না পড়ার কারণ কী? কবিতার প্রতি আমাদের দেশের মানুষের এত অনীহা কেন? পাঠক কম কেন? কবিতার বই কেন কম চলে?
রাহমান: না..., আমার মনে হয়, এটা মানসিক দিকের ওপর নির্ভর করে। একজন এমএ পাস কিন্তু তার চিন্তা বা কোনো চেতনা নেই। মানে ভালো জিনিসের প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই।
মামুন: জীবনবিমুখ?
রাহমান: হ্যাঁ, সে বোঝেই না কিছু ওগুলোর। একজন ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত হয়তো পড়েছে, সে কবিতা পড়ছে, কবিতা উপভোগ করে। এমনকি নিজেও কবিতা লেখে। এবং সে কবিতা বেশ উন্নত মানের। হয়তো এ রকম।
মামুন: আপনে যখন পঞ্চাশের দশকে লেখতেন, ষাটের দশকে লেখতেন বা সত্তরের দশকে, এই যে ২০০৪ সাল...। এর মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন? পাঠকের কথাই বলতেছি। কবিতা আগে যেইভাবে পড়ত এবং নিত মানুষ?
রাহমান: আগে ভালো ছিল মানে, এখনো আছে।
মামুন: ৫০ বছর ধইরা একই জায়গায় আছে পাঠক? এইটা দুর্ভাগ্যজনক।
রাহমান: নিশ্চয়ই। তোমার কী মনে হয়?
মামুন: মানুষ তো মোটামুটি শিক্ষিত হইছে। ৫০ বছর আগে তো অত শিক্ষিত ছিল না। আর তখন একটা দেশের দুইটা ভাগ ছিল। বাংলা ভাষা তখন এইভাবে রাষ্ট্রভাষা ছিল না। কিন্তু এতকাল পরে রাষ্ট্রীয় ভাষা তো হইছে, সেই তুলনায় পাঠক বাড়া উচিত ছিল না? কিন্তু আপনে বলতেছেন, পাঠক কবিতার প্রতি অত আগ্রহী না। সেই কারণগুলো খুঁজছেন কোনো সময়? এই জাতির পাঠকরা, এই ভাষার পাঠকরা তাদের এক্সপেকটেশন অনুযায়ী কবি পাইতেছে না, এমন হইতে পারে? তারা যা চায়, কবিতার মধ্যে তা পায় না?
রাহমান: বুঝি না আমি, আমি জানি না।
মামুন: এইগুলি নিয়া কোনো সময় ভাবেন না? কারা আপনের কবিতা পড়েন। এইটা তো আপনে বলতে পারবেন। কারণ, আপনের কাছে পাঠক আসে, ফোন করে, বাইরে গেলে যোগাযোগ হয়। আপনে বলতে পারবেন, কারা পাঠক, কোন শ্রেণির?
রাহমান: নানা ধরনের পাঠকের আমি চিঠিও পাই, আবার...
মামুন: নিশ্চয়ই, সবাই শুধু শামসুর রাহমান পাঠ করে না?
রাহমান: কেউ কেউ করে। আবার অনেক শহরের লোক পাঠ করে।
মামুন: শহরের পাঠকসংখ্যাই কিন্তু বেশি।
রাহমান: মফস্বলের পাঠকসংখ্যা আছে, তাদের চিঠি-টিঠি পাই।
মামুন: কোন শ্রেণির পাঠকসংখ্যা বেশি? মানে বয়সের দিক দিয়া।
রাহমান: ওটা মুশকিল বলা। ইয়াং বেশি, ইয়াং।
মামুন: আপনে অনেক প্রেমের কবিতা লেখছেন। আপনে কি জানেন, অনেক মহিলা পাঠক আপনের আছে যারা আপনের প্রেমের কবিতাগুলা পড়ে, মুখস্থ করে?
রাহমান: কী জানি, আমি অতটা গভীরে যাইনি।
মামুন: আল মাহমুদের নাকি শামসুর রাহমানের পাঠকসংখ্যা বেশি?
রাহমান: আমি তো হিসাব করি নাই।
মামুন: পাঠকের জন্য আপনে কবিতা লেখেন। এবং পাঠক আপনের কবিতা পইড়া কি রিঅ্যাক্ট করে এবং আপনাকে কীভাবে সে দেখে, কীভাবে একসেপ্ট করে, এইটা জানার জন্য একজন কবি কিন্তু খুব ব্যাকুল? আপনে নিজেও।
রাহমান: আমি লোকটা এত ব্যাকুল না। কারণ, আমি লেখি আমার মনের ভেতরে যে একটা মানুষ আছেন আমার মতোই। তারা আবার লিখেন না। তাদের মনে আমার লেখা কিছুটা হয়তো দোলা দেয়। আমার লেখা পছন্দ করে। কেউ পছন্দ করল কি করল না, ওটা ভেবে তো লেখা যায় না। এখন সবাই যদি বলে, তোর লেখা বন্ধ কর, আমি তো লেখা বন্ধ করব না। ছাপাতে হয়তো দেব না বা দেখা গেল আমার লেখা প্রকাশকরা হয়তো ছাপবে না, আমি ওদের কাছে পাঠাব না। আমি কিন্তু অনেককাল থেকে কোনো কবিতা নিয়ে যাই না। ভাই, আমার কবিতা ছাপো, বলি না। এটা তোমাদের শুভেচ্ছার কারণে হোক, যে কারণে হোক, আমার ভাগ্য এখনো হয়নি যে সম্পাদকদের তোষামোদ করা। যদি এ ধরনের হয়, কখনো আমি লিখব কিন্তু আমি যাব না কারও কাছে।
মামুন: বুঝতে পারছি।
রাহমান: আমি এখানে বসে লিখে রেখে দেব। আমি ড্রয়ারে ফেলে রাখব। তবু যাব না কোনো সম্পাদকের কাছে যে, দয়া করে আমার লেখাটা ছাপেন। নো, অ্যাট অল।
মামুন: আপনের পরিবার, ঘর, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী বা নাতি-নাতনি, এই পরিবেশের মধ্যে আপনাকে কতটুকু বোঝে এরা একজন কবি হিসাবে?
রাহমান: আমাকে মনে হয় না যে ঠিকমতো বোঝে। কেউ কেউ হয়তো বোঝে, তারা এক্সপ্রেস করে না। কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
মামুন: আপনে কি অনুভব করেন যে জাতির শ্রেষ্ঠ কবি আপনে?
রাহমান: এটা আমি জানি না।
মামুন: লোকে তো আপনাকে বলে যে দেশবরেণ্য কবি। প্রধান কবি।
রাহমান: সেটা হোক, আমি নিজে বলতে পারব না। হয়তো। হয়তো না।
মামুন: অন্য কারও বেলায় তো এইভাবে বলে না যে দেশের প্রধান কবি। কারও নামের আগে বলে না।
রাহমান: যেটা বলে সেটাই যে সত্য, তা না-ও হতে পারে।
মামুন: এতগুলা মানুষ যেইভাবে বলে, সেইটা আপনে বলতেছেন, সত্য না-ও হইতে পারে?
রাহমান: যদি বলে, আমি তাদের শ্রদ্ধা করি। তাদের আমি হেলায় ফেলে দিই না। তবু এটা যে সত্য, সেটা তো আমি জানি না। আমি কী করে বলি যে এটাই সত্য? আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামাইও না। আমি শ্রেষ্ঠ নাকি নিকৃষ্ট, এগুলো ভাবি না। শুধু লিখি। ভালো লাগে; মেইনলি অনেকে চায়ও আমার লেখা।
মামুন: আপনে আজকে কিছু লেখছেন?
রাহমান: আজকে কিছু লিখিনি।
মামুন: আজকে মন চায় নাই?
রাহমান: একটুখানি টায়ার্ড আপাতত।
[সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে গ্রহণ নভেম্বর, ২০০৪]