বাইনারি বিদ্যা: দূরত্ব আর মিলন
১
বাঙালির দরকার হয় বাইনারি।
আমাদের মগজের মধ্যেই, কোথাও একটা যেকোনো বিষয় নিয়েই নিরন্তর দ্বৈরথ চলে। রাজ্জাক না আলমগীর, শাবানা না ববিতা, উত্তম না সৌমিত্র, সুচিত্রা না সুপ্রিয়া, পেলে না ম্যারাডোনা, মেসি না রোনাল্ডো। না শব্দটিকে আমরা পড়তে পারি—বনাম। এ বনাম ও। এ আর ও—এর মধ্যে আছে—সে। আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা সাদা আর কালোর বিভাজনে বিশ্বাসী। ভালো আর মন্দ। কোনো রকম সংশয়, দ্বিধা আর চোরা টান আমাদের আগ্রহী করে না। সকলেই যেকোনো বিষয়ে সুনিশ্চিত। দুটি দেশের সীমান্তের মাঝখানে নো ম্যানস ল্যান্ড, সাদা আর কালোর মধ্যবর্তী ধূসর এলাকা আমাদের কোনো কিছু তলিয়ে দেখতে আগ্রহী করে না। একের বিপরীতে অন্যের প্রতিযোগিতার একটা ছক কষে আমরা আনন্দ পাই। এভাবেই শামসুর রাহমান না আল মাহমুদ। একজন বনাম আরেকজন। একজন বড় কবি বনাম আরেকজন বড় কবি। কিন্তু তখন তো মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণসহ আরও অন্তত দশজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ছিলেন। কিন্তু আপামর বাঙালির অপেক্ষা নেই, সহিষ্ণুতা নেই, জানবার ইচ্ছে আর কমফোর্ট জোন থেকে বেরোবার প্রয়োজনীয়তার বোধ নেই।
দীর্ঘদিন কেবল ছোট কাগজেই লিখে লিখে নিজেই লেখার জায়গা তৈরি করেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর মিনিবুক সিরিজ প্রকাশনার ভেতর দিয়ে। তিনি 'গ্রহান্তরের মানুষ' আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' প্রকাশ করেন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই মিনিবুক পত্রিকার স্টলে পড়তে না পড়তেই ফুরিয়ে যেত। তখন মিনিবুকের প্রথম পাতায় লেখা থাকত—'মাস মিডিয়ার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী', আর ভেতরের পাতায়—'বইয়ের কোনো কপিরাইট নেই।' প্রতিটি মিনিবুক অন্তত কয়েক হাজার কপি মুদ্রিত হতো। সস্তা কাগজে ছাপা কাগজের মুদ্রিত মূল্য ছিল যৎসামান্য। শামসুর রাহমানের 'বন্দী শিবির থেকে' প্রকাশিত হয় অরুণা প্রকাশনী থেকে। কবির একাধিক বিখ্যাত কবিতা এই অতিলৌকিক বইয়ের সম্পদ। এসব ঘটনা যখন ঘটছিল, তখন রক্তাক্ত ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হচ্ছিল। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় পাশাপাশি মুদ্রিত হয়েছে দুজনের কবিতা। বাংলাদেশে যেকোনো মুদ্রিত দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় দুজন কবিই পাশাপাশি থাকতেন। শামসুর রহমান প্রয়াত হওয়ার পর তাঁর অনুপস্থিতি চোখে লাগত, যদিও প্রকৃতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু নেই। কোথাও পাশাপাশি মুদ্রিত হতে সমস্যা না হলেও অসুবিধে না ঘটলেও বাংলাদেশে কারা যেন এই দুজন মানুষের মধ্যে এক ধরনের ছদ্ম যুদ্ধ তৈরি করে দিল। আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন এই দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের সংকট কবে থেকে শুরু—আমাকে লিখতেই হবে, যখন ধর্ম পালন আর প্রগতিশীলতাকে বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো, সেদিন থেকে। একজন সৃজনশীল মানুষের সৃজনের চেয়ে তার ব্যক্তিজীবন প্রধান হয়ে উঠলে ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রধান হয়ে উঠলে এমনকি অনেক সময় মানুষটির চর্চিত অন্ধকার যদি থেকে থাকে, সেই ইতিহাসের প্রতি যদি সহ নাগরিকেরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তাহলে শিল্পের কোনো শুভ ঘটে না।
২
মঞ্জুশ্রী দাশ আল মাহমুদের সাথে সিনেমা হলে বসে সময় কাটাচ্ছেন। ঢাকা শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন বাবার কথা। কেমন ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ! মাহমুদকে লিখছেন, বরিশালে তাঁদের বাড়িটি উদ্ধার করবার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না। কবি উত্তর দিচ্ছেন, এখন পেতে গেলে পুরো অর্থমূল্য দিয়েই পেতে হবে। তবু একান্তে ভাবছেন, ক্ষমতাবান কাউকে বলবার কথা। একজন মহৎ কবির বাড়ি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা। অপর্ণা সেনের বাড়িতে তাঁর দেখা হচ্ছে জীবনানন্দের ছেলের সাথে। 'গণকণ্ঠ' পত্রিকায় আশ্চর্য সব যুক্তি পরম্পরা দিয়ে নির্মিত নিবন্ধ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, 'বিপ্লবী মানসিকতা' প্রসঙ্গে, একুশের ২১ জন নয়, সারা বাংলাদেশ ধর্ষিতা, আওয়ামী লীগে একজনও ভালো লোক নেই, সরল হৃদয় মন্ত্রীদের স্বীকারোক্তি, মওলানা ভাসানীকে বাঁচাতে হবে, লোকচক্ষুর আড়ালে, জনসমুদ্র লেখকদের ডাকছে, একটি পরিবর্তন আসতে বাধ্য—নির্বাচিত কিছু নিবন্ধ শিরোনাম তুলে দিলাম লেখক ও সম্পাদক হিসেবে তাঁর সাহসের জায়গাটা চিহ্নিত করতে। মনে রাখতে হবে, তখন মাত্র মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু দেশকে সারিয়ে তুলতে পারা যায়নি পুরোপুরি। বাহাত্তর থেকে চুয়াত্তর সময়কালের এই নিবন্ধমালা ইতিহাসের সামগ্রী আজ।
শামসুর রাহমান মাহুতটুলীতে জন্মে শেষ বয়সেও ভুলতে পারেন না সেখানকার বাখরখানির ঘ্রাণ। ডায়না সিনেমা, শাবিস্তান আর তাজমহল সিনেমা হলের বসবার আসন ভেঙেচুরে গেলে যে পরিবারের হাতে তা সারাইয়ের ভার ছিল, তারা ছিলেন কবির প্রতিবেশী। তাদের উত্তরপুরুষেরা অনেক অনেক বছর পরে কবিকে দেখেও চেনা দেন। এই সাধারণ পরিবেশ থেকে শামসুর রাহমান কালের বিবর্তনে জড়িয়ে পড়েছেন মহানাগরিক কর্মসূচিতে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আল মাহমুদ মোটামুটি গ্রহণযোগ্যই ছিলেন। বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। সম্প্রতি তরুণ গবেষক মুহিত হাসান দিগন্ত অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক, কবি হুমায়ুন আজাদের অগ্রন্থিত রচনার দুটি সংকলন প্রকাশ করেছেন। এই দুটি পাঠ করলে বাংলাদেশে 'বায়াসড ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাকটিভিটি'র কিছু নমুনা পাওয়া যাবে। আমরা জানি, অধ্যাপক আজাদ তাঁর সম্পাদিত 'আধুনিক বাঙলা কবিতা'য় কবি আল মাহমুদের কবিতা গ্রহণ করে উঠতে পারেন নাই। কারণ, মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভালো কথা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে অধ্যাপকের বক্তব্য আলাদা। গণ-অভ্যুত্থানের বছর, উনসত্তরে ইত্তেফাক পত্রিকায় তিনি 'জর্নাল' শিরোনামে ধারাবাহিক নিবন্ধ লিখছিলেন। প্রথম নিবন্ধেই, যেসব লেখক নতুন বই উপহার দিয়েছেন, 'মনের আশ্চর্য অলৌকিক খাদ্য' উপমা দিয়েছেন এসব বইকে। সেই তালিকায়, অবাক হয়ে দেখি আল মাহমুদ আছেন। আধুনিক কবি বলছেন যাদের, ঠিক পরের লেখায়, সেখানেও মাহমুদ আছেন। এক নিবন্ধে লিখছেন: 'আল মাহমুদের মানসসুন্দরী কখনো হয়তো বাউলের বিধবা, আবার কখনো বাঙালি স্ত্রী যে বুকের বাঁধন আলগা করে বলে, "আমাকেও করো লজ্জাহীনা"।' তাহলে এমন কী হলো, মুক্তিযুদ্ধের মাত্র সাড়ে তিন মাস পর, বাহাত্তর সালের এপ্রিলের দুই তারিখ দৈনিক বাংলার 'রোববারের সাহিত্য' বিভাগে 'নরকের চন্দ্রমল্লিকা' শীর্ষক যে নিবন্ধ লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে, সেইখানে একাধিক গুরুত্বহীন কবিদের নাম, শামসুর রাহমান অনেকটা জুড়ে, আল মাহমুদ নেই কোথাও। রহস্য কোথায়? পশ্চিম থেকে পড়াশোনা করে আসা ডক্টর আজাদের প্রগতিশীলতার ধারণা এতখানি সংকীর্ণ কেন! ধর্মবিশ্বাসী হলেই কোনো বড় কবিকে ব্রাত্য করা যায়? অধ্যাপকের প্রবাদপ্রতিম যুক্তিশীলতা ও প্রথাবিরোধিতা কই হারাল? নিছক রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে কাউকে ইতিহাস থেকে লুপ্ত করে দেয়ার ইতিহাস যারা শুরু করেছেন দেশ স্বাধীনের পর পরেই, দেখা যাবে তারাই আবার মুক্তচিন্তা ও বাক্স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার। অথচ শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ দুইজনই আমাদের ভাষার সম্পদ, উজ্জ্বল সন্তান। এইটুকু ইতিহাসের সত্য। মেনে নেয়া না নেয়ার কিছু নেই।
৩
আল মাহমুদ নিজেই বলছেন এই দূরত্বের বিষয় নিয়ে, সতীর্থ শামসুর রাহমানের সাথে, 'তাঁর দিক থেকে ছিল অবজ্ঞা আর আমার দিক থেকে উদাসীনতা।' আমাদের দেশের কালের সন্তানদের নিয়মিত ধারণ করে রাখছেন নাসির আলী মামুন। তিনি মোটামুটিভাবে দুই হাজার সাল থেকে চেষ্টা করে দুই হাজার চারের অক্টোবরের একত্রিশ তারিখ একসাথে বসালেন দুই কবিকে, বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিনের জন্ম হলো। নিজের লেখা সম্পর্কে মাহমুদ বলছেন: '...ধরো, বড় গল্প, সব কয়টা নভেলের জাতীয় যেগুলো লিখেছি, আমার ধারণা কোনো প্রগতিবাদী লেখকের সাধ্য নাই এগুলো লেখার। মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে লেখলে সেটা...। তোমাদের অভিজ্ঞতা থাকলেও লিখতে পারছ না—প্রগতির কথা বলে লাভ নেই। এটা বলে যেমন লাভ নাই, মৌলবাদীর কথা বলেও লাভ নাই। মানুষের পক্ষে যে দাঁড়িয়েছে তার ভয়ের কী আছে? আমি মানুষের পক্ষেই ছিলাম সব সময়। একবার জেলখানায় গিয়েছিলাম, তখনো আমি মানুষের পক্ষে ছিলাম, তাই না?' আবার কিছু ঐতিহাসিকভাবে ভুল কথাও তাঁকে বলতে দেখা যায়। যেমন—'বাংলাদেশের কোনো ইনটেলেকচুয়াল লেখক মুক্তিযুদ্ধ করেননি। এই সত্য স্বীকার করতেই হবে।' যেমন—'একটা রাজাকারকে ক্ষমা করা যায়। কারণ, সে না বুঝে কাজটি করেছে। তার মাথার মধ্যে বুদ্ধি নাই। কিন্তু একজন প্রগতিবাদীকে ক্ষমা করা যায় না। তারা এত দীর্ঘকাল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে ছিল, একটা দেশে ব্যর্থ, কোনো জনসংযোগ সৃষ্টি করতে পারে নাই। তাদের ক্ষমা নাই কোনো।' সত্যিই কোনো ইন্টেলেকচুয়াল মুক্তিযুদ্ধ করেননি?
একটি আলাপ বা ক্রমাগত ধারাবাহিক আলাপ থেকে একজন ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার কিছু নেই। আবার আরেকটি জিনিস দেখবার, রাষ্ট্র যখন একজন বড় মাপের কবির দায়িত্ব নেয় না, তথাকথিত প্রগতিশীলেরা যখন অদৃশ্য, অচ্ছুৎ মনে করে, তখন তিনি কোথায় যাবেন? কেন, কোন যুক্তিতে ধর্মরহিত মন আর ধর্মপ্রাণ মন একইসাথে র্যাডিক্যাল হতে পারছে না এই দেশে? এইখানে বা ভারতে, সহজ কথায় সারা পৃথিবীতেই ধার্মিকতার সাথে যুক্তিবাদীতার একটি জল-অচল ভেদ তৈরি হলো কেন? একজন শিল্পমনের মানুষের ক্ষেত্রে, শিল্পসৃজন আর তার পেছনের মানুষকে আমরা আলাদা করতে পারি না কেন? কবি, লেখককে তো খেতে হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদহীন কোন লেখক সরকারি, বেসরকারি, রাজনৈতিক সহায়তার কাছে যাননি, তার হিসাব করতে গেলে চিন্তায় পড়ে যেতে হবে। কিন্তু আমরা সব ভার চাপিয়েছি আল মাহমুদের ওপর। এদিক থেকে দেখতে গেলে, শামসুর রাহমান আওয়ামী প্রসাদ ধন্য হন নাই? কিন্তু আমার কথার সারমর্ম হলো, কবি কেমন করে জীবিকা নির্বাহ করেন এই তৃতীয় বিশ্বের দেশে, তা নিয়ে ভাবনা অর্থহীন; কেননা যেকোনো মুহূর্তেই যখন আমরা মারা পড়তে পারি, তখন এইসব আলাপ কেন আর...বরং আমরা তাঁদের লেখাপত্রের দিকে তাকাই। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে এই দুইজন কবি যেমন করে অক্ষরের সন্ততিদের মাধ্যমে সংলগ্ন হয়ে আছেন, আসুন আমরা তার ভেতর অবগাহন করি।
বিশ্বাস করুন, ন্যারেটিভ বা তত্ত্ব শেষ বিচারে আমাদের বিভাজিত করে। আমাদের মধ্যে দূরত্ব আনে। নাসির আলী মামুনের এই সেতুবন্ধনের ইতিহাস বাংলা ভাষার প্রেমিকারা মনে রাখবেন।
কবি মোহাম্মদ রফিক একটি কথা বলেছিলেন ব্যক্তিগত আলাপে। উদ্ধৃত করি: মাহমুদের রাজনৈতিক বিশ্বাস আর আমার বিশ্বাসে পার্থক্য আছে কিন্তু তোমরা যদি বাংলা কবিতা থেকে তাঁকে বাদ দাও, সম্পূর্ণ বাংলা কবিতার সাথেই অন্যায় করা হবে।
তথ্যসূত্র:
১. শামসুর রাহমান আল মাহমুদ: তফাৎ ও সাক্ষাৎ; নাসির আলী মামুন; আদর্শ, তৃতীয় সংস্করণ, ২০২০
২. জর্নাল: হুমায়ুন আজাদ; সংকলন: মুহিত হাসান; আগামী, প্রথম সংস্করণ, অক্টোবর ২০২৫
৩. এক একর সবুজ জমি: হুমায়ুন আজাদ; সংকলন: মুহিত হাসান, আগামী, প্রথম সংস্করণ, অক্টোবর ২০২৫
