গ্রেপ্তারের আগের দিন মরক্কোর রাজপ্রাসাদ কেনার চেষ্টা করেন এপস্টিন
২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের ঠিক আগের দিন জেফরি এপস্টিন মরক্কোতে বহু কোটি ডলার মূল্যের একটি রাজপ্রাসাদ কেনার চেষ্টা করেছিলেন। গত মাসে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
'বিন এননাখিল' নামের ওই প্রাসাদটি কেনার জন্য ২০১১ সাল থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন এপস্টিন। তবে বিক্রেতার সঙ্গে দাম ও কেনার পদ্ধতি নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে ছিল।
মারাকেশের অভিজাত পালমেরা এলাকায় অবস্থিত এই বিশাল প্রাসাদটি স্থাপত্যের এক মাস্টারপিস হিসেবে পরিচিত। ১ হাজার ৩০০ কারিগর মিলে এটি তৈরি করেছিলেন, যেখানে রয়েছে চোখ ধাঁধানো নকশা ও মোজাইকের কাজ।
সম্পত্তিটির মালিকানাধীন অফশোর কোম্পানিটি ১৮ মিলিয়ন ইউরোতে (১ কোটি ৩৩ লাখ পাউন্ড) কেনার জন্য একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৫ জুলাই, অর্থাৎ গ্রেপ্তারের আগের দিন, এপস্টিন ১ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার ডলারের (১ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড) একটি ওয়্যার ট্রান্সফার বা অর্থ স্থানান্তরে সই করেন।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, নিউ ইয়র্কে ফিরে যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে এটিই ছিল এপস্টিনের শেষ বড় আর্থিক লেনদেন।
গ্রেপ্তারের তিন দিন পর এপস্টিনের হিসাবরক্ষক রিচার্ড কান ওই ওয়্যার ট্রান্সফার বাতিল করেন। ফলে শেষমেশ প্রাসাদটি আর কেনা হয়নি।
মরক্কোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। স্থানীয় গণমাধ্যমের ধারণা, নতুন কোনো অভিযোগ উঠলে গ্রেপ্তার এড়াতে এপস্টিন হয়তো মরক্কোকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে চেয়েছিলেন।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এপস্টিনের এক সাবেক সহযোগী বলেছেন, এই লেনদেন প্রমাণ করে যে এপস্টিনের তার আসন্ন গ্রেপ্তারের বিষয়ে 'কোনো ধারণা ছিল না'।
তিনি আরও বলেন, 'তবে তিনি যদি এমন কোনো আশ্রয়ের কথা ভেবে থাকেন যেখানে রাজার হালে থাকা যাবে, তাহলে এটি যৌক্তিক মনে হয়।'
অবশ্য প্রকাশিত নথিতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাত থেকে বাঁচতে মরক্কোকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহারের কোনো আলোচনার উল্লেখ নেই।
মরক্কোর সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ অন্তত ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই ছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী অন্যতম নারী ভার্জিনিয়া জিওফ্রে তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, এপস্টিন ও ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল তাকে ব্যক্তিগত বিমানে করে তানজিয়ারে নিয়ে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটি বিলাসবহুল সম্পত্তির অভ্যন্তরীণ নকশা দেখা।
সে সময় এপস্টিন তার দ্বীপের বাড়ির কিছু অংশ মরক্কোর স্টাইলে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিলেন।
২০০২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমন্ত্রণে এপস্টিন ম্যাক্সওয়েলকে সঙ্গে নিয়ে মরক্কোর রাজা মোহাম্মদের বিয়ের অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন।
এপস্টিনের যোগাযোগ
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাবালিকাকে দিয়ে যৌনকর্ম করানোর অভিযোগে দণ্ডিত হন এপস্টিন। ২০১০ সালে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মরক্কোর প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায় বলে মনে হয়।
প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ওই একই বছর এপস্টিন ব্রিটিশ লেবার পার্টির সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনকে অনুরোধ করেছিলেন এমন একজন সহকারী খুঁজে দিতে, যিনি তার জন্য 'মারাকেশে একটি বাড়ি খুঁজে দিতে পারবেন'।
নথিতে আরও দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে এপস্টিন মাঝেমধ্যেই মরক্কো সফরে যেতেন। তিনি অভিজাত পালমেরা এলাকায় থাকতেন। সেখানে কাতার রাজপরিবারের জাবর আল থানি-সহ অনেক ধনী প্রবাসী বাস করতেন। জাবরকে এপস্টিন তার 'আরব ভাই' বলে ডাকতেন।
তবে এপস্টিন নথিতে কারও নাম বা ছবি থাকা মানেই তিনি কোনো অন্যায়ে জড়িত, এমনটি নয়।
বিন এননাখিল এবং 'মিস্টার কিস'
এপস্টিনের দীর্ঘদিনের প্রেমিকা কারিনা শুলিয়াক মারাকেশে সম্পত্তি খোঁজার দায়িত্ব নেন। তার নামে অসংখ্য ইমেইলে এই সংক্রান্ত আলোচনা ও সফরের প্রমাণ রয়েছে।
কেনসিংটন লাক্সারি প্রপার্টিজের পার্টনার মার্ক লিওন বিবিসিকে জানান, ২০১১ সালেই এপস্টিনের নজর পড়েছিল তাদের সম্পত্তি 'বিন এননাখিল'-এর ওপর। আরবিতে এর অর্থ 'খেজুর গাছের মাঝখানে'।
তখন প্রাসাদের মালিক জার্মান বর্জ্য ব্যবসা মোগল গুন্টার কিস এর দাম হেঁকেছিলেন ৫৫ মিলিয়ন ইউরো। এপস্টিন এত কম দাম বলেছিলেন যে কিস অপমানিত বোধ করেন এবং তার সঙ্গে আর কোনো ব্যবসায় যেতে অস্বীকার করেন। এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সূত্র বিবিসিকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এরপর এপস্টিন প্রেমিকা শুলিয়াক এবং মরক্কোর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গোপনে সম্পত্তিটি দেখার ব্যবস্থা করেন। ২০১৮ সালে এপস্টিন নিজেও সেখানে যান। শুলিয়াক তখন এপস্টিনের বন্ধু ও বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী লিওন ব্ল্যাকের প্রতিনিধি হিসেবে চূড়ান্ত দরদাম করেন।
অবশেষে যখন পরিষ্কার হলো যে আসল ক্রেতা এপস্টিন, তখন বিক্রেতা 'মিস্টার কিস' (ইমেইলে এই নামেই পরিচিত) আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হন।
করের কারসাজি?
ফাইলগুলোতে দেখা যায়, একপর্যায়ে কেনসিংটন লাক্সারি প্রপার্টিজ এপস্টিনকে একটি 'বিক্রয় ও কর কৌশল' প্রস্তাব করেছিল। এতে বলা হয়েছিল, মরক্কো কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পত্তির দাম দেখানো হবে ১০ মিলিয়ন ইউরো, কিন্তু অফশোর কোম্পানির শেয়ার কেনার মাধ্যমে আসলে লেনদেন হবে ২০ মিলিয়ন ইউরোর।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে এপস্টিন নিজের নামে সম্পত্তির দলিল করতে পারতেন, অথচ মরক্কো সরকারকে কর দিতে হতো কম।
তবে কেনসিংটন লাক্সারি প্রপার্টিজ বিবিসিকে জানিয়েছে, কর কমানোর জন্য কোনো অনৈতিক বা বেআইনি চেষ্টা করা হয়নি।
মিস্টার লিওন বিবিসিকে বলেন, 'এই লেনদেনে কোনো কর আইন লঙ্ঘন করা হয়নি। মিস্টার এপস্টিন মরক্কোতে রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে চেয়েছিলেন, যদিও তার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না... যাতে তিনি নিজের নামে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন।'
ওই সময় প্রপার্টি কোম্পানিটি বিখ্যাত ব্রিটিশ নিলামঘর ক্রিস্টিজ-এর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত।
শেষ পর্যন্ত এপস্টিন অফশোর কোম্পানির শেয়ার কেনার মাধ্যমেই সম্পত্তিটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের সময় তিনি মরক্কোতে এটি কীভাবে নিবন্ধন করবেন, তা ঠিক করার প্রক্রিয়ায় ছিলেন।
