এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে ‘কিছুই জানতাম না’: জবানবন্দিতে বিল ক্লিনটন
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কংগ্রেসের একটি কমিটিকে জানিয়েছেন, মৃত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি 'কিছুই দেখেননি' এবং এ বিষয়ে তিনি নিজে 'কোনো ভুল করেননি'।
নিউ ইয়র্কে বদ্ধ কক্ষে দিনভর চলা এই শুনানিতে এপস্টিন–সংক্রান্ত নতুন প্রকাশিত নথিপত্র নিয়ে সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা হয়। এর মধ্যে একটি হট টাবের (গরম পানির চৌবাচ্চা) ভেতরে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির সঙ্গে তার একটি ছবির বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
বিল ক্লিনটন সাক্ষ্য দেওয়ার এক দিন আগে তার স্ত্রী ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও একই কমিটিকে জানান, এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে তার 'কোনো ধারণাই ছিল না'।
উল্লেখ্য, কোনো নথিতে নাম থাকা মানেই সেটি অপরাধের প্রমাণ নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কেউ ক্লিনটন দম্পতির বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণের অভিযোগ আনেননি।
বিল ক্লিনটন বলেন, এপস্টিন কী করছেন—এ বিষয়ে সামান্যতম আভাস পেলেও তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন এবং তার বিমানে কখনোই উঠতেন না। সাক্ষ্য দেওয়ার আগে জনসমক্ষে প্রকাশিত এক প্রাথমিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'আমি নিজেই তাকে আইনের হাতে তুলে দিতাম।'
সাক্ষ্য শেষে ক্লিনটন একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করেন। সেখানে তিনি আগের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, 'আমার যত ছবিই দেখানো হোক না কেন, আমি তার অপরাধ সম্পর্কে জানতাম না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি আশা করি, আজকের সাক্ষ্যের ভিডিও প্রকাশের পর সবাই কংগ্রেসের সামনে এসে যা জানেন তা বলতে উৎসাহিত হবেন। আমি চাই বিচার বিভাগ সব নথি প্রকাশ করুক, যাতে এমন ঘটনা আর কখনো না ঘটে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা এটি পাওয়ার দাবি রাখেন।'
এর আগে ক্লিনটন দম্পতি এই কমিটির তলবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটি তাদের বিরুদ্ধে 'কংগ্রেস অবমাননার' অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর ইঙ্গিত দিলে তারা সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন।
একটি হট টাবের ছবিতে বিল ক্লিনটনকে এক নারীর সঙ্গে দেখা গেছে (যার পরিচয় গোপন রাখতে মুখ ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে)—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ক্লিনটন জানান, তিনি ওই নারীকে চেনেন না।
বিবিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই নারীর সঙ্গে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্লিনটন তা অস্বীকার করেছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর হিলারি ক্লিনটন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও বিল ক্লিনটন সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি।
প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমার বিল ক্লিনটনের কয়েক ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদকে 'একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ জবানবন্দি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন অথবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।'
তিনি আরও জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তার সাক্ষ্যের ভিডিও ও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হবে।
ক্লিনটন দম্পতির এই জবানবন্দিকে 'ঐতিহাসিক' আখ্যা দিয়ে কোমার বলেন, কংগ্রেসের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে একটি সংসদীয় কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন।
কোমার বলেন, 'এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত। মার্কিন জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরতে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।'
এদিকে, বিল ক্লিনটনের সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। হাউস ডেমোক্র্যাটরা দাবি করেছেন, ক্লিনটনের জবানবন্দিতে ট্রাম্প সম্পর্কে এমন কিছু 'অতিরিক্ত তথ্য' পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে বর্তমান প্রেসিডেন্টকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা প্রয়োজন।
কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রবার্ট গার্সিয়া বলেন, ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কিছু আলোচনার বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দিয়েছেন এবং ট্রাম্পকেও কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গার্সিয়া আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রেসিডেন্টরা এই কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে পারেন—এমন একটি নতুন নজির এখন দেশে তৈরি হলো।'
কোমার জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ক্লিনটনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ট্রাম্পকে সাক্ষ্যের জন্য ডাকা উচিত কি না। জবাবে ক্লিনটন বলেন, 'এটি আপনাদের সিদ্ধান্তের বিষয়।'
কোমার আরও বলেন, এপস্টিনের অপরাধে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বিল ক্লিনটনের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, 'ট্রাম্প অনেক আগেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।' এদিকে ট্রাম্প শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ক্লিনটনকে এভাবে জবানবন্দি দিতে দেখাটা তার ভালো লাগছে না।
জিজ্ঞাসাবাদের বিরতির সময় উভয় দলের আইনপ্রণেতারা জানান, ক্লিনটন তদন্তে সহযোগিতা করছেন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। ক্লিনটন দাবি করেন, তিনি এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না এবং দুই দশক আগেই তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।
তিনি জানান, ২০০১ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর তার দাতব্য কাজের সূত্রে এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। এই বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য তিনি অনুতপ্ত বলেও জানান।
এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিপত্রে ক্লিনটন দম্পতির নাম শত শত বার এসেছে। তবে বিচার বিভাগের নথিতে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়। এসব নথি থেকে মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের চিত্রই ফুটে উঠেছে।
সাধারণত কংগ্রেসের জবানবন্দি বদ্ধ কক্ষে নেওয়া হয়। তবে ক্লিনটন দম্পতি চেয়েছিলেন, এটি জনসমক্ষে হোক—যাতে তাদের বক্তব্যের কোনো নির্দিষ্ট অংশ প্রসঙ্গ ছাড়া ফাঁস না হয়।
