বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তিতে ভরা আফগান সরকারের শেষ মুহূর্ত
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ২০ বছর পর আবারও তালেবানদের ভাগ্য ফিরেছে। রাজধানী কাবুল থেকে আফগানিস্তানের নতুন সরকারের ঘোষণা দিয়েছে তারা। তবে, একটি শিক্ষিত, সচেতন এবং গণতন্ত্রপ্রত্যাশী প্রজন্মের কাছে এই ঘটনা মেনে নেওয়া অনেকটাই অবিশ্বাস্য।
তাহলে কীভাবে এত দ্রুত আগের প্রশাসনের পতন ঘটল?
তালেবানরা তাদের প্রথম প্রধান শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর, মাত্র ১০ দিনের মাথায়ই কাবুলের প্রবেশপথে পৌঁছে যায়। অথচ ধারণা করা হয়েছিল, রাজধানী দখলের ব্যাপারটি হবে অন্য সব প্রদেশের তুলনায় ভিন্ন। বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন, একটা চুক্তি আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তালেবানরা কাবুল দখলে নেবে না। কিন্তু ১৫ আগস্ট রোববার, সব বদলে গেল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারা পালিয়ে গেলেন। আফগান সেনাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর অনেকেই চলে গেলেন আত্মগোপনে।
আফগান সরকারকে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল পশ্চিমা সরকারগুলো। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বলতে হয়, সে সবকিছুই বিফলে গেছে।
কাবুল পতনের আগ মুহূর্তে, আফগানিস্তান সরকারের কয়েক ঘণ্টার বিশৃঙ্খল ও উন্মত্ত সময় কীভাবে কেটেছিল, তা প্রত্যক্ষদর্শী ও সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে বিবিসি নিউজ।
শনিবার, ১৪ আগস্ট
উর্ধ্বতন সূত্র বিবিসিকে জানায়, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সেদিন কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তবে আতঙ্কিত নয়। তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল হায়বাতুল্লাহ আলিজাই এবং আফগানিস্তানের শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল পিটার ভ্যাসেলির সঙ্গে রাজধানী সুরক্ষার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল, শহরের প্রবেশ পথগুলোর বাইরে তালেবানদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করার পরিকল্পনা।
দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হেলমান্দের সাবেক আফগান সেনা কমান্ডার সামি সাদাতকে কাবুলের নিরাপত্তার দায়িত্বে একটি নতুন দলের নেতৃত্ব দেওয়ার খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল প্রয়োজনে যুদ্ধ করা, তবে এর আগে তালেবানদের সঙ্গে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ সমঝোতা করার চেষ্টা করতে হবে। যদি তা অর্জন করা সম্ভব না হয়, তাহলে উদ্ধার অভিযানের জন্য কিছু সময় চেয়ে নিতে হবে কাবুল প্রশাসনকে। এটিই ছিল পরিকল্পনার মূল বিষয়।
কিন্তু লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদাত তালেবানের শীর্ষ সামরিক দলের সঙ্গে দেখা করলেও, তারা দেশের উত্তরের সবচেয়ে বড় শহর মাজার-ই-শরীফ দখল করে নিয়েছিল এবং পূর্বের শহর জালালাবাদে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দু'টি শহরের কোনোটিই তেমন প্রতিরোধ দেখাতে পারেনি।
কাবুল ছিল পতনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সর্বশেষ শহর।
একজন প্রাক্তন শিক্ষাবিদ এবং আইএমএফ কর্মকর্তা আশরাফ গনি, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এতে কোনো সন্দেহ নেই, আশরাফ গনি সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নজিবুল্লাহর পরিণতি মনে করেই তালেবানের ক্ষমতা দখলের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তার পালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবেও নাজিবুল্লাহর পরিণতিকেই উল্লেখ করেছেন।
১৯৯৬ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহকে তালেবান যোদ্ধারা সীমাহীন নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছিল; এবং তার মরদেহ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে ট্রাফিক লাইটের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।
রোববার সকাল, ১৫ আগস্ট
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। ততক্ষণে তালেবান যোদ্ধাদের শহরের প্রবেশমুখে পৌঁছে যাওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো শহরে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংক ও বিমানবন্দরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় বাড়তে শুরু করে। কিন্তু তখনও রাষ্ট্রপতি গনি এবং তার ঘনিষ্ঠরা ধারণা করছিলেন কাবুলের পতন আসন্ন নয়।
কাবুলের ১৯ শতাব্দীর প্রেসিডেন্ট ভবনের আর্গের কর্মীরা যথারীতি দৈনন্দিন কাজের জন্য এসেছিলেন।
রাষ্ট্রপতির অন্যতম শীর্ষ সহযোগী সালাম রহিমির কাবুল পতনের আগের দিন তালেবানের সঙ্গে হওয়া একটি চুক্তি তাদের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। গনির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, রহিমি তালেবানদের সঙ্গে ব্যাক-চ্যানেলে যোগাযোগ করেছিলেন এবং একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল, দলটি অন্তর্বর্তী ক্ষমতার বিনিময়ে জোর করে শহর দখল করা থেকে বিরত থাকবে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেবে। এছাড়া বিদেশী নাগরিক এবং যারা হুমকির মুখে রয়েছে তাদের বিমানবন্দরে যাতায়ত ও দেশ ছাড়ার সুযোগ দেবে। কাতারে ইতিমধ্যে চলমান আলোচনা এবং সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো পর্যন্ত সময় দেবে বলেও আলোচনায় সম্মত হয় তারা।
কাবুলের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টায়, সরকারের পক্ষ থেকে রোববার প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে শহরের সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করছেন। সেই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মূলত, তিনি এটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন, তালেবানদের সাথে একটি চুক্তি আসন্ন, যার মাধ্যমে কাবুলকে যুদ্ধের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
কিন্তু এই চুক্তি তার সিনিয়র মন্ত্রীদের আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ, ইতিমধ্যেই কাবুল ছেড়ে ৩০ মাইল দূরবর্তী পানশির উপত্যকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিসমিল্লাহ খানের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, প্রায় এক ডজনখানেক উর্ধ্বতন আফগান রাজনীতিবিদদের একটি দল ইসলামাবাদের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধরার জন্য বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল। এই দলে হাউস অফ দ্য পিপল এর স্পিকার মীর রহমান রাহমানী এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট করিম খলিলিও ছিলেন।
তবে প্রতিনিধি দলের সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাকিব শরিফি পরবর্তীতে গণমাধ্যমের এই খবরকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সরকারকে মধ্যস্থতায় আহ্বান করা এবং আফগানিস্তানে রক্তপাত এড়াতে রাজি করা।"
কিন্তু এই প্রস্তাবে প্রেসিডেন্ট গনি রাজি ছিলেন না। শরিফি বলেন, "তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, আমরা পাকিস্তানের সাহায্যে এমন কোনো চুক্তি করব, যেটি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। তিনি আমাদের ইসলামাবাদ যাওয়ার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন।"
তিনি আরও জানান, "আমরা শুনেছিলাম তলেবানরা শহরের প্রবেশমুখে চলে এসেছে। কিন্তু তারা এত দ্রুত শহরে ঢুকে পড়বে তা বুঝতে পারিনি। আগের রাতে আমরা প্রচণ্ড শঙ্কিত ছিলাম, এবং পাশে আমাদের অস্ত্র নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম।"
"ব্যাংকের বাইরে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়, সবাই নিজেদের সঞ্চয় তুলতে এসেছিলেন। লোকজন বিমানবন্দরেও ভিড় করেছিল; রাস্তায় প্রচুর যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল।"
ট্রাফিক এতটাই খারাপ ছিল যে প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি খলিলির সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট ধরতে শেষ ১৫ মিনিটের পথ হাঁটতে হয়েছিল। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রতিনিধি দলটি তালেবানদের অগ্রগতির নিয়মিত আপডেট পাচ্ছিল।
শরিফি বলেন, "প্রতি মিনিটে আমরা তালেবানদের শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলের খবর পাচ্ছিলাম। এটি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর।"
বিমানবন্দরের ভিতরে সম্পূর্ণ নিয়ম শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল।
বিবিসির একজন প্রতিবেদক জানিয়েছেন, মানুষজন বাণিজ্যিক ফ্লাইটের টিকিটের জন্য বিমানবন্দরে হাতাহাতিশুরু করেছিল। যারা ইতিমধ্যে টিকিট পেয়েছিল, তাদের কয়েকজনকে আবার বাদ দিয়ে এমপি, মন্ত্রী এবং অন্যান্য ভিআইপিদের টিকিট দিয়েছিল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
অনেক সীমান্ত কর্মকর্তা এবং বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা লোকজন তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব ছেড়েই পালিয়ে গিয়েছিল।
অবশেষে প্রতিনিধি দলটি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে জায়গা পেল। তবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে বিমান উড্ডয়নের জন্য বেশ অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাদের।
শরিফি বলেন, "আমরা জানতাম যেকোনো মুহূর্তে তালেবান জঙ্গিরা বিমানবন্দরটি দখল করে নিতে পারে। তাই আমরা নিজেদেরকে রক্ষা করার উপায় নিয়ে ভাবছিলাম। নিজেকে রক্ষা করারা জন্য একমাত্র জিনিস যা আমি ব্যবহার করতে পারতাম, তা ছিল ল্যাপটপের একটি ভারী ব্যাটারি।"
রোববার দুপুর
পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছিল ক্রমাগত। প্রেসিডেন্ট গনি তখনও প্রতিরক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সে চেষ্টা বারবারই ব্যর্থ হচ্ছিল।
একজন উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, "মনে হচ্ছিল পুরো সরকার ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল এবং উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা সব দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন, এবং একদল আরেক দলের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানত না।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা প্রেসিডেন্ট প্যালেস থেকে নির্দেশনা আশা করছিলাম। কিন্তু সেখান থেকে কোনো নির্দেশনাই দেওয়া হয়নি।"
গনির চারপাশটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছিল এবং তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন।
গনি সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামদুল্লাহ মহিব তাকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। কারণ এর ঘণ্টাখানেক আগেই, প্রাসাদের বাইরে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। সেখানে থাকা ব্যক্তিদের মতে, জনাব গনি দেশ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। কিন্তু মহিব তাকে বলেছিলেন, তার জীবন এখন তালেবানদের হুমকির মুখে রয়েছে।
একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তার চলে যাওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ছিলেন। যখন তিনটি হেলিকপ্টার রাষ্ট্রপতি গনি, তার স্ত্রী এবং তার সহকর্মীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাসাদে পৌঁছেছিল, তখন তার সহকর্মী এবং প্রাসাদের প্রহরীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোল শুরু হয়।
সাড়ে ৩ টার দিকে প্রেসিডেন্ট গনি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা হেলিকপ্টারে চড়ে প্রাসাদ ছেড়ে যান।
তারা উজবেকিস্তানের তেরমেজ হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই, তালেবান যোদ্ধাদের রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ দখল করে নেয় এবং সেই একই ডেস্কের সামনে তারা ছবি তুলে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করে।
প্রেসিডেন্ট গনির সকালের কনফারেন্সের সময় যে বইটি ডেস্কে দেখা গিয়েছিল, সে বইটি তখনও সেভাবেই ডেস্কে পড়ে ছিল। তবে, পার্থক্য শুধু এটিই যে, ততক্ষণে তালেবানরা আফগানিস্তানে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
তবে তখনও অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদরা জানতেন না রাষ্ট্রপতি পালিয়ে গেছেন।
কিছু দিন পরে, প্রেসিডেন্ট গনি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফেসবুকে লাইভ হাজির হন। তিনি জানান, "মানবিক কারণে" ও "রক্তপাত এড়াতে" তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, এমন সমালোচনা এড়াতেই মূলত তিনি ফেসবুক লাইভে এসে তার দেশ ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন।
তিনি বলেন, "কাবুল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমার ছিলনা। এটা আমার ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা দলের সিদ্ধান্ত ছিল। যদি আমি থাকতাম, তাহলে রক্তপাত হতো।"
তিনি আরও বলেন, "এবং আফগানিস্তানে ২৫ বছর আগে যা ঘটেছিল, তা আবার ঘটতে চলেছিল। আমাকে আফগানিস্তানের মানুষের চোখের সামনে ফাঁসি দেওয়া হত এবং আমাদের ইতিহাসে আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসত।"
রোববার বিকেলে তালেবানরা যে গতিতে কাবুল দখল করেছিল, তা কারো কারো কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও দেশের অধিকাংশ স্থানেই এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল।
এত দ্রুত আফগান বাহিনীর ভেঙে পড়া এবং তালেবানদের অগ্রগতির কারণ খুঁজে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে বিবিসি-এর অনুসন্ধানে।
পাকিস্তানের সীমান্তে আফগানিস্তানের জাবুল প্রদেশ থেকে তালেবানের একটি সূত্র বিবিসি-কে জানায়, ২০১৪ সালে ঐ প্রদেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগান সেনাবাহিনী জাবুলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি; বরং প্রতিরোধ ছাড়াই তালেবানের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলো।
তালেবানের সঙ্গে আলোচনার জড়িত এক ব্যক্তি বিবিসি-কে বলেন, "যখন আমেরিকান বাহিনী জাবুলে এসেছিল, তখন তারা চেকপয়েন্ট এবং ঘাঁটিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু যখন তারা চলে গেলো, তখনও আফগান সেনাবাহিনী নিজে থেকে এই জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিল না। ফলে তালেবানরা সহজেই সরকারি বাহিনীর কাজকে অসম্ভব করে তুলেছিল।"
তালেবান যোদ্ধারা দ্রুতই দেশের গ্রামাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছিল। এবং এরপর তারা ধীরে ধীরে চেকপয়েন্টগুলোও দখল করে নেয়; যার ফলে আফগান সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়ে, জাবুলের পরিস্থিতি স্পষ্টতই তালেবানদের পক্ষে ছিল।
সূত্রটি জানায়, "আমরা আমাদের স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি জিরাগা (উপজাতীয় সভা)-এর সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।"
স্থানীয় তালেবান কমান্ডার মুখলিসের নেতৃত্বে দুই দিনের একটি আলোচনা সভা শুরু হয় ১৫ই জুন। সভায় জাবুলের ডেপুটি গভর্নর ইনায়েতুল্লাহ হোতাক সহ উভয় পক্ষের কয়েক ডজন প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার প্রধান দুটি বিষয় ছিল - কীভাবে আফগান সেনাবাহিনীর নিরাপত্তার নিশ্চিত করা হবে এবং কীভাবে তালেবান ও স্থানীয়দের মধ্যে অস্ত্র ভাগাভাগি করা হবে।
তালেবানদের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে পরের দিন আফগান সেনাবিহিনী একটি সমঝোতায় পৌঁছে অস্ত্র হস্তান্তরে সম্মত হয়। সমঝোতায় বলা হয়, অস্ত্র আত্মসমার্পনের বিনিময়ে তালেবানরা সরকারি বাহিনীকে নিরাপদে প্রাদেশিক রাজধানী কালাতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেবে। এছাড়া প্রত্যেক সেনাকে ৫ হাজার করে আফগান (প্রায় ৫৫ ডলার) টাকা, ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য একটি করে হালকা অস্ত্র এবং প্রত্যেককে শহর ছাড়া পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল তালেবান যোদ্ধারা। ১৬ই জুন, তালেবানের তত্ত্বাবধানে শত শত আফগান সেনা কর্মী একসঙ্গে জাবুলের শিনকাই গ্রাম ছেড়ে কালাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
ঠিক একইভাবে কাবুলের আরো বেশ কয়েকটি স্থানীয় ব্যারাক, নিরাপদে তাদের অবস্থান ছাড়ার নিশ্চয়তায় একই ধরনের চুক্তি করেছিল।
আর এর কয়েক দিনের মধ্যেই কাবুলের পতন ঘটল।
- সূত্র: বিবিসি
