পাইকারি থেকে খুচরা: চট্টগ্রামে সরকার নির্ধারিত দামে চিনি বিক্রি করছে না কেউ
অস্থির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য চিনির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। গত ৬ এপ্রিল খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনির মূল্য ১০৪ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনির মূল্য ১০৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা একদিন পর ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
কিন্তু মূল্য নির্ধারণের এক সপ্তাহ পার হলেও তা মানছে না আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বরং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিনির দাম। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর বাজার ও মুদি দোকানগুলোতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হয় ১২০ টাকায় এবং প্যাকেটজাত ১২৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও খোলা চিনি ১১৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণের পর না কমে উল্টো পণ্যটির দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গেছে।
ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনি বিক্রি হয়েছে ৪০৮০ টাকা দামে। যা গত দুই সপ্তাহ আগেও ৪০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই হিসেবে, গত দুই সপ্তাহে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ চিনির দাম ৮০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কেজিপ্রতি ২ টাকারও বেশি।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে চিনির দাম নিম্নমুখী । কিন্তু এই সময়ে দেশীয় বাজারে পণ্যটির দাম না কমে উল্টো বেড়ে চলেছে। জানুয়ারির শুরুর দিকে পাইকারিতে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হয়েছে ৩৫০০ টাকার মধ্যে। তিন মাসের ব্যবধানে তা এখন ৪০০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ গত তিন মাসে পাইকারিতে চিনির দাম মণে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। যা খুবই অস্বাভাবিক। বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মনিটরিং না থাকার সুযোগে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগ হয়ে বাজার অস্থির করেছে বলে দাবি আমান উল্লাহসহ একাধিক ব্যবসায়ীর।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী মেসার্স ইসমাইল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকার খুচরা পর্যায়ে চিনির যে দাম নির্ধারণ করেছে তার চেয়েও বেশি দামে চিনি বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে। সরকার খুচরা পর্যায়ে খোলা চিনির দাম নির্ধারণ করেছে ১০৪ টাকা। কিন্তু পাইকারিতে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪০৮০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারিতেই প্রতি কেজি চিনির দাম পড়ছে ১০৯ টাকা ৩২ পয়সা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্ল্যাহ বলেন, "বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরমধ্যে সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল ও চিনি বিক্রির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। পাইকারিতে দাম বাড়লে খুচরায় দাম সমন্বয়ের বিষয়টি দেখবে সরকার। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ীর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই। আমরা এই বিষয়টি আরো জোরালোভাবে মনিটরিং করবো।"
এই বিষয়ে সিটি গ্রুপের ডিজিএম (সেলস) প্রদীপ করণ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির বুকিং দর কমেছে তা ঠিক। তবে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে তাদের আমদানি মূল্য পরিশোধে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের কম বুকিং দরের সুফলটা তারা পাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি অর্থবছরের গেল তিন মাসে চিনির আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু গেল অর্থবছরে পণ্যটির আমদানি ছিল আগের চেয়ে প্রায় ৪ লাখ টন। আমদানি সংকটের ওই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে মূলত গত তিন মাস ধরে চিনির বাজারকে অস্থির করে তোলেন আমদানিকারক ও কারখানা মালিকরা।
চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) প্রথম ছয়মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশে ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭৪ টন চিনি আমদানি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯ টন।
গত অর্থবছরে (২০২১-২২) চিনি আমদানির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ টন। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে চিনি আমদানি হয়েছিল ২১ লাখ টন।
বর্তমানে দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ১৮-২০ লাখ টন। দেশীয় চাহিদার মধ্যে সরকারি মিলগুলো একসময় দেড়-দুই লাখ টন চিনি উৎপাদন করত। তবে সর্বশেষ দুই বছরে ১৫টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে ছয়টির উৎপাদন বন্ধ থাকায় উৎপাদন ৫০ হাজার টনের নিচে নেমে এসেছে। যে কারণে দেশের চিনি খাতটি প্রায় শতভাগ বেসরকারি মিলগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
