খাতুনগঞ্জে হঠাৎ বেড়েছে চিনির দাম, সিন্ডিকেট কারসাজির অভিযোগ
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে টানা কয়েক মাস দরপতনের পর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করেছে চিনির দাম।
সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ চিনির দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নানা চাপের মুখে চিনির দাম দফায় দফায় কমলেও চলতি সপ্তাহে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বাজারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনির পাইকারি দাম ছিল ৪ হাজার ৪৪০ টাকা। এরপর কয়েক মাস ধরে কমতে কমতে গত নভেম্বরের শেষ দিকে তা নেমে আসে ৩ হাজার ২১০ টাকায়। তবে গত এক সপ্তাহে এই নিম্নমুখী প্রবণতা থেমে গেছে। বর্তমানে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩ হাজার ২৫০ টাকার নিচে।
পাইকারি বাজারে এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো পুরোপুরি খুচরা বাজারে না পড়লেও, পাইকারিতে ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাদা চিনি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের দাবি, আসন্ন রমজান ও নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে মিলার সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, গত বছর সরকার সাদা চিনি আমদানির সুযোগ দেওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং দামও নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে সরাসরি সাদা চিনি আমদানি বন্ধ থাকায় পরিশোধিত চিনির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।
এদিকে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে কারখানার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিংয়ের কারণে পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। এতে মিল গেট থেকে চিনি সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে মিলভেদে ডিও বা ডেলিভারি অর্ডার পেতে ৮ থেকে ১১ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে।
কারসাজি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ
অন্যদিকে, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই মূল্যবৃদ্ধিকে পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করেছে।
ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন টিবিএসকে বলেন, "রমজান সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা এখনই দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যে বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও অসাধু মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ব্যস্ততার সুযোগে বাজার তদারকিতে শিথিলতা এসেছে, আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগানো হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।"
চট্টগ্রাম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহিদ টিবিএসকে বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কম এবং সরকার শুল্কও কমিয়েছে। এসব বিবেচনায় দেশে চিনির দাম আরও কমার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি, বরং বাড়ানো হয়েছে।" এতে মিল মালিকরা অতিরিক্ত লাভ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভোক্তা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ টিবিএসকে জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
