তেল-চিনির মজুত পর্যাপ্ত, তবু আতঙ্কজনিত কেনাকাটায় খুচরা পর্যায়ে সংকট
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধকে ঘিরে আতঙ্কিত হয়ে তেল ও চিনি কেনা বাড়িয়েছেন ক্রেতারা। ফলে পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকা সত্ত্বেও রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে ভোজ্য তেল ও চিনির সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাবে আমদানিতে সাময়িক সমস্যা তৈরি হলেও দেশে এখনও এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত তেল ও চিনির মজুদ রয়েছে, আমদানি প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক রয়েছে।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭৮-১৯৩ টাকা। ৫ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৯৪০-৯৫৫ টাকা এবং ২ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৩৯০-৩৯৫ টাকায়। আর প্রতি কেজি পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৮-১৬২ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১০৫ টাকায়।
তবে মহল্লার অনেক দোকান ঘুরে দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। বেশিরভাগ দোকানে ৫ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। গত দুই সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে বলে জানান খুচরা বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীরা বলেন, মানুষের চাহিদা বেশি। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকার শাহজাদপুরের ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'কোম্পানিগুলো পাঁচ লিটারের বোতল দেয় না বললেই চলে। দুই লিটারের বোতলও মাঝেমধ্যে দেয়। কোম্পানি থেকে জানিয়েছে, তাদের কাছে নাকি তেলের সরবরাহ নেই। এটা ঠিক, মানুষও বেশি কিনেছে। কিন্তু এখন তো আমার কাছে নেই।'
ক্রেতাদের মধ্যেও যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, যার ফলে বেশি করে তেল কিনে রাখছেন অনেকে। যুদ্ধ শুরুর পর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইসরাত জাহান লিপসা দুই মাসের বাজার করে রাখেন।
সাবেক এই ব্যাংকার বলেন, 'দুর্যোগ বা সংকটে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। অনেক সময় পাওয়া যায় না। এগুলো আগে আমরা দেখেছি। এ কারণে আমি দুই মাসের বাজার একসাথে করে রেখেছি, যেন সংকট হলেও আমাদের সমস্যা না হয়।'
তবে পাইকারি পর্যায়ে ভোজ্য তেল ও চিনির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। কারওয়ানবাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. মামুনুর রশীদ টিবিএসকে বলেন, মাঝে দুই-একদিন সমস্যা থাকলেও এখন সব ধরনের তেল পর্যাপ্ত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, দেশে বছরে সয়াবিন তেল ও পাম তেলের চাহিদা ২৫ লাখ টন। এছাড়া চিনির চাহিদা রয়েছে প্রায় ২০-২১ লাখ টন। এরমধ্যে ৩০-৩৭ হাজার টন চিনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। সয়াবিন তেল ও চিনির বেশি চাহিদা সবচেয়ে থাকে রমজান মাসে। এ দুই পণ্যই রমজানে ৩ লাখ টন করে চাহিদা রয়েছে।
পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানালেন আমদানিকারকরা
তেল ও চিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারাও বলছেন, পণ্য দুটির সংকট নেই। মূলত যুদ্ধের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি কিনছে। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি হতে পারে। অন্তত এক মাসের তেল ও চিনি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে মজুত রয়েছে।
দেশে সয়াবিন সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করছে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। পাড়ার দোকানে তেল না পাওয়াটা আতঙ্কজনিত ক্রয়ের কারণে হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। তবে বসুন্ধরাসহ কয়েকটি কোম্পানি ঠিকঠাক ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় কিছু সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানায় তারা।
ভোক্তা পণ্যের বাজারে শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারী মেঘনা গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানিটি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত তেল ও চিনি আমদানি করেছে। 'মাসে ৫০ হাজার টনের বেশি তেল সরবরাহ হচ্ছে। কোনো সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।'
খুচরা বাজারে ২ লিটার ও ৫ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমাদের সরবরাহ চেইন ঠিক আছে।' ডিলার পর্যায়ে সংকট তৈরি হলে ভোক্তা অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তিনি।
একই কথা বলছেন সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি বলেন, সিটি গ্রুপ সরবরাহ কমায়নি। এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু ছোট কোম্পানি তেল আমদানি করতে পারছে না। 'তবে রমজানের অতিরিক্ত চাহিদা এবং কিছু মানুষের মজুতের কারণে সংকটটি হতে পারে।'
দেশে সয়াবিন তেলের যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে আগামী এক মাস চলবে বলে জানান এসিআই লিমিটেডের বিজনেস ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত আমরা তেলের দাম বাড়াইনি। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে বাড়াতে হবে না। তবে গ্লোবাল মার্কেটের ক্রুড তেলের দাম বাড়লে সবখানেই তার ইমপ্যাক্ট পড়ে।'
কড়া নজরদারির আহ্বান
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুধু ক্রেতাদের দোষ দিলেই চলবে না।
'অনেক ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এমন সংকটের সময় মজুত করা শুরু করে। এর ফলে একটা সংকট তৈরি করে তারা বাড়তি দামে বিক্রি করতে চায়। তাদের গোডাউনে অভিযান পরিচালনা করলে ঠিকই পণ্য পাওয়া যাবে। সরকারকে এখানে ভূমিকা রাখতে হবে,' বলেন তিনি।
মজুত পর্যাপ্ত জানিয়ে নাজের হোসাইন বলেন, 'আমাদের হিসেবে প্রায় ৬ মাসের অপরিশোধিত চিনি ও তেল মজুত রয়েছে বা পাইপলাইনে রয়েছে। কারণ এগুলো পরিশোধন করতেও সময় লাগে। এ কারণে সংকট তৈরি হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। এটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো পাঁয়তারা।'
