ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে আরব আমিরাতে দ্রুত লেজার সিস্টেম পাঠিয়েছিল ইসরায়েল
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হাত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে রক্ষা করতে অত্যাধুনিক লেজার ব্যবস্থা ও উন্নত সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে ইসরায়েল।
উপসাগরীয় এই দেশটির ওপর ইরানের ভয়াবহ আক্রমণ ঠেকাতে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এই সামরিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর আগে এই দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা এই সহযোগিতাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে যে, এটি মূলত 'ইসরায়েলের বন্ধু হওয়ার সার্থকতা' প্রদর্শন করছে।
সংশ্লিষ্ট দুই সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েল দ্রুততার সঙ্গে 'স্পেকট্রো' নামক একটি উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা আমিরাতে পাঠিয়েছে। এটি ২০ কিলোমিটার দূর থেকেই আগত ড্রোন, বিশেষ করে 'শাহেদ' ড্রোন শনাক্ত করতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি সেখানে 'আয়রন বিম' নামক লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পাঠানো হয়েছে।
এই লেজার ব্যবস্থাটি স্বল্প পাল্লার রকেট ও ড্রোনকে নিমিষেই পুড়িয়ে বা বাষ্পীভূত করে দিতে পারে। চলতি বছরের শুরুর দিকে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর ছোড়া রকেট মোকাবিলায় ইসরায়েল প্রথম এটি ব্যবহার করেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়রন বিম ও স্পেকট্রো মোতায়েনের খবর এর আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রতিরক্ষা সহায়তা দিতে নজরদারি ব্যবস্থা ও লেজার প্রযুক্তির পাশাপাশি 'আয়রন ডোম' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পাঠিয়েছে ইসরায়েল। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো পরিচালনার জন্য 'কয়েক ডজন' ইসরায়েলি সামরিক সদস্যকেও দেশটিতে পাঠানো হয়েছে বলে এই মোতায়েন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম এক্সিওস প্রথম আয়রন ডোম মোতায়েনের খবরটি প্রকাশ করেছিল।
সংশ্লিষ্ট একজন সূত্র জানিয়েছেন যে, উপসাগরীয় এই দেশটিতে অতিরিক্ত আরও কিছু অস্ত্র ব্যবস্থা এবং আরও বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, 'সেখানে অবস্থানরত সেনার সংখ্যা কিন্তু ছোট নয়'।
তবে এ বিষয়ে অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস, রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
অস্ত্রের পাশাপাশি ইসরায়েল পশ্চিম ইরান থেকে আমিরাতকে লক্ষ্য করে ছোড়া স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের গুরুত্বপূর্ণ 'রিয়েল-টাইম' গোয়েন্দা তথ্যও আদান-প্রদান করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের সময় আরব আমিরাতকে ইরানি পাল্টা আক্রমণের বড় ধকল সইতে হয়েছে। ইরান আমিরাতের দিকে ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২,০০০ ড্রোন ছুড়েছিল। আমিরাত তাদের একাধিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এর বেশিরভাগই আকাশপথে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে ইসরায়েলি সরঞ্জামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুদ্ধের তীব্রতার সঙ্গে তাল মেলাতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এমন কিছু অস্ত্র আমিরাতকে সরবরাহ করেছে, যেগুলো তখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ছিল বা ইসরায়েলি রাডার ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত করা হয়নি। এ বিষয়ে একজন বলেন, 'আমরা তাদের আমাদের অন্তর্বাস পর্যন্ত দেখতে দিয়েছি'।
২০২০ সালের 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। এর আগে থেকেই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বাড়তে থাকে এবং ইসরায়েল আমিরাতের কাছে 'বারাক' ও 'স্পাইডার' প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করেছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যৌথ হামলার পর এই প্রথম দুই দেশের জোটের বড় ধরনের পরীক্ষা হলো।
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে এসেছে। এই মিসাইলগুলোর একেকটির উৎপাদন খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার এবং তৈরিতে কয়েক মাস সময় লাগে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর হিসাব অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ভাণ্ডারে থাকা সবচেয়ে উন্নত 'থাড' ও 'প্যাট্রিয়ট' মিসাইলের অর্ধেকই ব্যবহার করে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতিতে কম খরচে ও দ্রুত কাজ করে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা তৈরি হয়েছে। আরব আমিরাত বর্তমানে তাদের কাছে থাকা হাজার হাজার পুরনো 'সাইডউইন্ডার' এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলকে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য সংস্করণে রূপান্তরের একটি প্রকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এর ফলে পুরনো এই মিসাইলগুলোর হিট-সিকিং ক্ষমতার বদলে 'প্যাসিভ লেজার সিকার হেড' যুক্ত করা যাবে, যা এলবিটের 'স্পেকট্রো' নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শাহেদ ড্রোনের মতো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারবে।
