রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এর বাইরে আপাতত বড় কোনো ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান।
মঙ্গলবার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর থেকেই কেন্দ্রটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিএইআরএ।
বুধবার মাহমুদুল হাসান টিবিএসকে বলেন, ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন শুরু হলে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে, কারণ গ্রিডের সক্ষমতাও পরীক্ষা করা জরুরি।
তিনি বলেন, "নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিড সাধারণ পানি বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নয়; এখানে ফ্রিকোয়েন্সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ৫০ হার্জের মধ্যে রাখতে হবে। সামান্য বিচ্যুতি হলেও সমস্যা হতে পারে, আর নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে প্ল্যান্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "ফ্রিকোয়েন্সি, ভোল্টেজ—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কত লোড দেওয়া হবে। নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ওঠানামাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমনকি প্ল্যান্ট শাটডাউনের কারণ হতে পারে। তাই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।"
গ্রিড সংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "গ্রিডে যেকোনো ত্রুটির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।"
তিনি জানান, নিজেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশিকা তুলে ধরে সেগুলো অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মাহমুদুল হাসান বলেন, রূপপুর প্রকল্পে নিরাপত্তা বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতি পাঁচ দিন অন্তর সেখানে গিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম, বোরিক অ্যাসিডের মাত্রা, রেডিয়েশনসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়মিতভাবে পরিমাপ ও লিপিবদ্ধ করা হবে।
তিনি বলেন, "বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে—প্রথমে ৩০০ মেগাওয়াট, এরপর ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতার দিকে নেওয়া হবে, এবং প্রতিটি ধাপে নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।"
পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, "এটি একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। প্রতি পাঁচ দিন অন্তর পরিদর্শন, তথ্য সংগ্রহ এবং তা লিপিবদ্ধ করার কাজ চলবে। এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই প্ল্যান্টের নিরাপদ ও কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করা হবে।"
রূপপুর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
মাহমুদুল হাসান আশা প্রকাশ করেন, ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রথম ইউনিট থেকে শুরুতে ৯০০ থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এবং পরে পূর্ণ ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হবে।
জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বিএইআরএর চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটিতে পর্যাপ্ত জনবল নেই; প্রায় অর্ধেক পদ খালি রয়েছে। সরকারি প্রক্রিয়ায় নতুন জনবল নিয়োগ সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করা কঠিন।
"এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরির জন্য অনেককে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে ফিরেছেন," বলেন তিনি।
দ্বিতীয় ইউনিট সম্পর্কে তিনি জানান, প্রথম ইউনিটের মতোই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করে তা চালু করা হবে। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের সম্ভাব্য তারিখ ৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হলেও তখন সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ছিল না। সব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ফায়ার সেফটির বিষয়টি তখন সন্তোষজনক ছিল না বলে তিনি জানান। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধান করা হয় এবং মান নিশ্চিত হওয়ার পর লাইসেন্স প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, "প্রথম ইউনিটের অপারেশনাল লাইসেন্স সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স দেওয়ার পরই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট চালুর সময় নতুন করে লাইসেন্স নিতে হবে।"
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, "যেমন প্রতিটি গাড়ির জন্য আলাদা লাইসেন্স লাগে, তেমনি প্রতিটি ইউনিটের জন্যও আলাদা লাইসেন্স প্রয়োজন।"
তিনি জানান, সব প্রস্তুতি শেষ করে আগামী এপ্রিলে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং নিশ্চিত করতে রাশিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিলম্ব হলে সুফল পেতেও দেরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "একই স্থানে আরও ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে ছোট আকারের (যেমন ৬০০ মেগাওয়াট) ইউনিটও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল এবং সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে। ভবিষ্যতে ভিন্ন প্রযুক্তি বা অন্য দেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।"
