সরকারের ঋণ বাড়ায় সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বাড়ছে
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ বাড়ায় সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয়ও বাড়ছে। নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮,৫৮৯ কোটি টাকা, যা বাজেটে মোট ব্যয়ের ১১.৩৬ শতাংশ।
সমাপ্ত হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে নতুন অর্থবছরের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ৪,৭৬৬ কোটি টাকা বেড়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৩,৮২৩ কোটি টাকা।
তবে গত ৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধের যে ব্যয় ধরা হয়েছে তা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ওই অর্থবছরে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ছিল ৩৫,৬৯১ কোটি টাকা।
সুদ জনিত ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়া। সমাপ্ত হতে যাওয়া অর্থবছরে এই খাত থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও জুলাই-মার্চ ৯ মাসে বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদহার একেবারে কমে যাওয়ায় বিকল্প ও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। সরকার নানাভাবে নিরুৎসাহিত করলেও বিক্রি কমানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, কোডিভ পূর্ব সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারকে উচ্চ সুদেই ঋণ নিতে হয়েছিল। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহাল থাকায় তখন বেসরকারিখাতে ঋণের চাহিদা ছিল। এসব মিলিয়ে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় গত ৫ অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, রাজস্ব আয় যেহেতু সেভাবে বাড়বে না, এক্ষেত্রে সরকারকে ঋণ নির্ভর বাজেট করতে হয়েছে। এতে সুদ জনিত ব্যয় বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।
তবে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণ কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে ধার করে যে টাকা নিচ্ছে তা যেন ভালোভাবে খরচ হয়। এর অর্থনৈতিক সুফল যেন জনগণ পায়।
তিনি বলেন, যেহেতু ঋণ কমানো যাবে না, অন্যদিকে সুদের ব্যয়ও বাড়বে, সেক্ষেত্রে সরকারের হাতে উপায় হলো প্রশাসন পরিচালনার ব্যয় কাঁটছাট করা। বিশেষ করে অপচয়গুলো বন্ধ করা।
এছাড়া অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের যে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, সেখানে লাগাম টেনে ধরতে হবে। তাহলেই সরকার ঋণ ও সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে অতটা চাপ অনুভব করবে না।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রেটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, কোভিডের সময়টাতে যখন কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিবে, তখন সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে চাপে পড়বে সরকার। অনেক ব্যয় কাঁটছাঁট করতে হতে পারে।
তার মতে, সরকার দুটি উপায়ে এই চাপ কমাতে পারে। একটি হচ্ছে বিদেশ থেকে সহজ শর্তের স্বল্প সুদের দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ নেওয়া। অন্যদিকে, ব্যাংক কিংবা সঞ্চয়পত্র থেকে উচ্চ সুদে ঋণ না নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ মেয়াদী বন্ড (ইসলামিক বন্ড সুকুকের মতো) ছাড়তে পারে সরকার।
