চলতি বাজেট সংশোধন ও পরবর্তী বাজেট প্রণয়ন নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে যাবে অন্তর্বর্তী সরকার
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার যাতে তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধন করতে পারে, সেজন্য পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে বাজেট সংশোধন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরের বাজেটের প্রাক্কলন নিয়ে আলোচনা হলেও, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজও শুরু করবে না বর্তমান সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে আসন্ন নতুন রাজনৈতিক সরকার যাতে তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করতে পারে, সেই সুযোগ রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১০ নভেম্বর) অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাউন্সিলের প্রথম সভা।
অনলাইনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা অংশ নেন।
সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারণা, মধ্য ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এরপরও চলতি অর্থবছরে প্রায় সাড়ে চার মাস সময় অবশিষ্ট থাকবে।
কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমান সরকার যদি বাজেট সংশোধন করে, তা পরবর্তী সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তখন নির্বাচিত সরকারের পক্ষে আবার বাজেট সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বাজেট সংশোধন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারকেরা। তবে তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার যদি ৭ শতাংশের নিচে নামানো যেত, তাহলে অর্থনীতির জন্য তা আরও স্বস্তিদায়ক হতো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের বেশি।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছর নভেম্বরে কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে রাজস্ব আহরণ, এডিপি বাস্তবায়ন, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। এ সভায় সাধারণত চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধনের একটি খসড়া রূপরেখা এবং পরবর্তী অর্থবছরের প্রাথমিক প্রজেকশন অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে অর্থ বিভাগ।
অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকেই পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন এবং চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধনের কাজ শুরু হয়। জানুয়ারির মধ্যেই সংশোধিত বাজেট চূড়ান্ত করা হয়।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার পর গত মাসে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ টিবিএসকে জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বর মাসেই চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধন চূড়ান্ত করা হবে।
তখন তিনি বলেছিলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে এবং এজন্য ডিসেম্বরেই বাজেট সংশোধন করে বেতন-ভাতা খাতে বাড়তি অর্থের সংস্থান রাখা হবে।
তবে রোববার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নয়, বরং আগামী নির্বাচিত সরকারই বেতন কাঠামো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সংশোধন
চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধন চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত না নিলেও, কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৬.৫ শতাংশ ধরা হলেও, তা অর্জন সম্ভব নয় বলে নীতিনির্ধারকরা নিশ্চিত হয়েছেন। তাই সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। তবে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাসে দেখা গেছে, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না হওয়ায় সরকারও মনে করছে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হবে না। তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সংশোধন করে ৫ শতাংশ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে নতুন সরকারের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন রেখে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এডিপি কাটছাঁট ও দুর্বল বাস্তবায়ন
অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কম হওয়া, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন উপদেষ্টারা। বাজেট ঘাটতি না বাড়িয়ে এডিপি বাস্তবায়ন বাড়াতে রাজস্ব আহরণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইএমএফ থেকে ডিসেম্বর মাসে ঋণের কিস্তি না পাওয়া এবং বিদেশি সংস্থানের ওপর আইএমএফের ঋণসীমা নির্ধারণ করায় সরকারও এডিপি বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে আগ্রহী নয়।
একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আগামী মাসগুলোতেও এডিপি বাস্তবায়নের গতি ধীর থাকবে, যা সরকারের জন্য 'শাপে বর' হিসেবে কাজ করবে।
কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় এডিপি থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়াবে ৭,৭৫,০০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭,৯০,০০০ কোটি টাকা—যা আগের অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৭,০০০ কোটি টাকা কম।
