পরবর্তী প্রজন্মের চিপ উৎপাদনে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ পরিকল্পনা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে চীন। পারমাণবিক শক্তি গড়ে তোলার মতো সমান অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এক্ষেত্রে, জানান সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি তৃতীয় প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। অক্টোবরে চীনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে দেশটির ১৪তম পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণা, অর্থায়ন রাখা হয়েছে এই পরিকল্পনার খসড়ায়।
আগামী অর্ধ যুগের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নের জন্য চীনের নেতারা সামনের মাসে বৈঠকে বসবেন। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। চীনের সব ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেই সেমিকন্ডাক্টর আবশ্যক।
কিছুদিন আগেই ট্রাম্প প্রশাসন চীনে রপ্তানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা জানায়।
গাভেকাল ড্রাগোনোমিক্স নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড্যান ওয়াঙ জানান, 'চীন সরকার অনুধাবন করেছে সকল উন্নত প্রযুক্তির জন্য সেমিকন্ডাক্টর প্রয়োজনীয় এবং বুঝতে পেরেছে আমেরিকান সাপ্লাইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা যাবে না। চিপ আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, নিজস্ব প্রযুক্তির উন্নয়নই চীনের জবাব হবে।'
চীনের চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দামও বেড়েছে ইতোমধ্যেই। সাংহাই ফুদান মাইক্রোইলেকট্রনিক গ্রুপ কো.-এর দর বৃদ্ধি পায় ৪.৩ শতাংশ, উইল সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেডের ১০ শতাংশ, শিয়ামেন চেইঞ্জলাইট কো.-এর ১৪ শতাংশ ও ফোকাস লাইটিংস টেক কো.-এর ৫.৬ শতাংশ।
চীনের শিল্প ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।
চীন প্রতি বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সার্কিট আমদানি করে। দেশটির সেমিকন্ডাক্টর নির্মাণকারীরা চিপ ও নির্মাণকৌশলের প্রযুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতির জন্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাপারটি কঠিন হচ্ছে।
মার্কিন সরকার অনেকগুলো চীনা টেক কোম্পানি ব্ল্যাকলিস্টে রেখেছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি সম্ভব নয় তাদের জন্য। এছাড়াও টিকটক ও উইচ্যাট ব্যান করেছে। হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে চাপ দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্বের যে কোনো প্রতিষ্ঠান আমেরিকান প্রযুক্তি ও সরঞ্জামাদি ব্যবহার করলেই তারা চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সাথে লেনদেন করতে পারবে না বলে নতুন নিয়ম জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ফলস্বরূপ, হুয়াওয়ে এই মাস থেকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কো. থেকেও চিপ ক্রয় করতে পারবে না। একারণেই দ্রুত নিজস্ব বিকল্প প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে বেইজিং।
তৃতীয় প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর মূলত একপ্রকার চিপসেট যা সিলিকন কার্বাইড ও গ্যালিয়াম নাইট্রাইড হতে প্রস্তুত করা হয়। এটি মূলত মিলিটারি গ্রেড রাডার, বৈদ্যুতিক যানবাহন, পঞ্চম প্রজন্মের রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি চিপে ব্যবহার করা হয়।
এককভাবে একটি দেশের তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিগত দুনিয়ায় আধিপত্য না থাকায়, চীন এই খাতে গবেষণা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার কথাই ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের 'ক্রি ইঙ্ক', জাপানের 'সুমিতোমো ইলেকট্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ লি.' প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, চীনের টেক জায়ান্ট 'সানান অপটোইলেকট্রনিকস কো. লি.' ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ কর্পোরেশন' তাদের সাথে পাল্লা দেয়ার কাজ শুরু করেছে।
সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, উইল সেমিকন্ডাক্টর লি. এবং ন্যাশনাল সিলিকন ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ কো., চিপ উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানগুলোও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবে।
আন শিন ক্যাপিটাল কো.-এর অ্যালান ঝু জানান, 'শিগগিরই এই খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি দেখা যাবে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও বিশাল বিনিয়োগের কারণে এই খাতেই ভবিষ্যতে বিশ্বমানের চীনা চিপ-জায়ান্ট গড়ে উঠবে।'
- সূত্র: ব্লুমবার্গ
