পর্যটক ও বিদেশি কর্মীদের প্রতি জাপান দিন দিন বিরূপ হয়ে উঠছে কেন?
জাপানের প্রাচীন রাজধানী নারা। এখানকার ঐতিহাসিক মন্দির আর হরিণের জন্য এই শহরের সুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে। লোকগাথা অনুযায়ী, এই হরিণগুলো ঈশ্বরের দূত। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রিয় প্রাণীগুলো এক জাগতিক বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রধান হওয়ার লড়াইয়ের সময় নারার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে সরব ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, বিদেশি পর্যটকরা এই পবিত্র প্রাণীদের লাথি মারছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'আপনার কি মনে হয় না কোনো কিছু খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে?'
পর্যটকরা হরিণ পেটাচ্ছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেওয়া তাকাইচির এই বক্তব্য একটি প্রকৃত সত্যকে প্রতিফলিত করে। তা হলো- পর্যটক থেকে শুরু করে অভিবাসী শ্রমিক, বিদেশিদের মাধ্যমে হওয়া তথাকথিত 'হুমকি'র বিষয়টি এখন জাপানি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। 'ডু ইট ইয়োরসেলফ' (সানসেইতো) নামক এক পপুলিস্ট রাজনৈতিক দল, যারা 'জাপানিজ ফার্স্ট' বা আগে জাপানি স্লোগান দেয়, তারা গত জুলাইয়ের উচ্চকক্ষ নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা ১ থেকে বাড়িয়ে ১৫-তে নিয়ে গেছে। এই রক্ষণশীল ভোটারদের সমর্থন হারানোর ভয়ে ক্ষমতাসীন এলডিপিও এখন সব ধরণের বিদেশিদের ওপর কড়াকড়ি আরোপের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমনকি চীনের সাথে কূটনৈতিক টানাপড়েনের কারণে সেখান থেকে আসা মানুষের সংখ্যা কমলেও জাপানি নেতাদের এই কঠোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
জাপানি নাগরিকদের একাংশ যাকে 'বিদেশি সমস্যা' বলছেন, তার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বৃদ্ধি ২০১০ সালের পর থেকে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, পর্যটন খাতে জোয়ার ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩ কোটি ৬৯ লাখ পর্যটক জাপান ভ্রমণ করেছেন, যা ২০১০ সালের তুলনায় চার গুণেরও বেশি। তৃতীয়ত, দুর্বল ইয়েনের সুযোগ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সস্তায় জাপানি সম্পদ ও সম্পত্তি কিনে নিচ্ছে এমন এক ভীতি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই সমস্যাগুলো খুব বড় না হলেও, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে ক্ষুব্ধ জাপানি ভোটারদের কাছে বিদেশিরা এখন এক সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃত বাস্তবতা বুঝতে হলে প্রথমেই বিদেশি বাসিন্দাদের দিকে তাকাতে হবে। মূলত শ্রমবাজারের তীব্র সংকট মেটাতেই তাদের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি সংস্থা জাইকা'র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১.২৪ শতাংশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৪০ সালের মধ্যে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা তিনগুণ বাড়িয়ে প্রায় ৭০ লাখে উন্নীত করতে হতে পারে জাপানকে। এদের বড় একটি অংশ আসছে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে, যার মধ্যে ভিয়েতনামি, চীনা ও ফিলিপিনোদের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া শিক্ষার্থী বা দক্ষ পেশাজীবী হিসেবেও অনেকে আসছেন। এখন শহরের চেইন শপ থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের নার্সিং হোম, হোটেল, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, কারখানা এমনকি ধানক্ষেতেও বিদেশিদের কাজ করতে দেখা যায়। এমনকি সম্প্রতি এক ইউক্রেনীয় শরণার্থী সুমো চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন।
জাপানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ বর্তমানে বিদেশি। যেখানে উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি'র সদস্য দেশগুলোতে এই গড় হার ১৫ শতাংশ। তা সত্ত্বেও এলডিপি নেতারা বারবার দাবি করছেন যে সরকারের কোনো 'অভিবাসন নীতি' নেই। অথচ নেপথ্যে বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচির প্রসারের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। অভিবাসী অধিকার কর্মীদের মতে, এই লুকোচুরি নীতির ফলে বিদেশিদের সুরক্ষা ও জাপানি সমাজে তাদের একীভূত করার আলোচনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটি সানসেইতো দলের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে; তারা এই জনস্রোতকে একটি অশুভ 'নীরব আগ্রাসন' হিসেবে প্রচার করছে। সলিডারিটি নেটওয়ার্ক উইথ মাইগ্রেন্টস জাপানের তোরি ইপ্পেই বলেন, 'অভিবাসন নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক এড়িয়ে চলার খেসারত দিচ্ছে এখন জাপানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।'
বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম। মহামারীর সময় জাপানের সীমান্ত ছিল প্রায় বন্ধ। কিন্তু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর পর্যটকের সংখ্যা কল্পনাতীতভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বছরে ৪ কোটি পর্যটকের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিলেন, যা ২০২৫ সালে সম্ভবত ছাড়িয়ে গেছে। এখন জাপানের গাড়ি রপ্তানির পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলো পর্যটন। পর্যটন শিল্পের বিকাশের আরও বিশাল সুযোগ থাকলেও জাপানের দর্শনীয় স্থানগুলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকায় ভিড় অনেক বেশি মনে হয়। এছাড়া মন্দিরের গেটে পর্যটকের পুল-আপ করার মতো অশোভন আচরণের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া জাপানিদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যও এই তিক্ততার একটি বড় কারণ। দুর্বল ইয়েনের কারণে বিদেশি পর্যটকরা লাভবান হলেও সাধারণ জাপানিদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সেইকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইতো মাসাকি বলেন, 'যখন আপনি দেখবেন ধনী পর্যটকরা ৫০০০ ইয়েন খরচ করে আয়েশ করে দুপুরের খাবার খাচ্ছে, আর আপনি মাত্র ৫০০ ইয়েনের বেন্তো (খাবারের বক্স) খেয়ে দিন পার করছেন, তখন তিক্ততা আসাটা স্বাভাবিক।' এছাড়া বিত্তশালী বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শহরের আবাসন সম্পত্তি কিনে নেওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ির দাম বেড়ে যাচ্ছে এমন তথ্যও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে।
এই উদ্বেগ প্রশমনে তাকাইচি প্রশাসন বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। অভদ্র আচরণকারী বিদেশিদের সামলাতে একটি বিশেষ সরকারি সংস্থা গঠন করা হয়েছে। বিদেশি কর্মীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা আরোপের আলোচনা চলছে। যারা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও জাপানে থাকছেন বা স্বাস্থ্যবিমা ও পেনশনের ফি দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পর্যটকদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ, স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য জাপানি ভাষার দক্ষতা বাধ্যতামূলক করা এবং বিদেশিদের সম্পত্তি ক্রয়ে নিয়ন্ত্রণ আনার বিষয়গুলোও এলডিপির আলোচনায় রয়েছে।
শাসক দল আশা করছে, এই কড়াকড়ি ভোটারদের আবার তাদের দিকে টানবে, যদিও এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, তাকাইচির এই কঠোর অবস্থানের কারণে এলডিপির সমর্থন কিছুটা বাড়ছে। তবে ব্যবসায়ী নেতারা এবং জাপানের ৪৭টি প্রিফেকচারের গভর্নরা এই বিদেশি-বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে চিন্তিত। তারা সম্মিলিতভাবে বহুসংস্কৃতিবাদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, 'বিদেশি ভীতি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।'
তবে, শহরের চেয়ে জাপানের গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিদেশিদের প্রতি বেশি সহনশীল। কারণ শ্রম সংকট সেখানে সবচেয়ে ভয়াবহ। শিকোকু দ্বীপের একটি মৎস্য সমবায়ের প্রধান মিজুনো দাইসুকে বলেন, 'বিদেশিরা না এলে আমরা বড় বিপদে পড়ব। আমার অর্ধেক কর্মী ইন্দোনেশীয়। আমাদের উচিত তাদের ধন্যবাদ জানানো।'
নারার হরিণ সংরক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধি নাকাশি ইয়াসুহিরো জানান, হরিণকে লাথি মারার বিষয়টি ছিল স্রেফ গুজব যা একজন ডানপন্থি ইউটিউবার ছড়িয়েছে। তিনি নিজে প্রতিদিন এলাকাটি তদারকি করেন এবং এমন কোনো ঘটনা দেখেননি। বরং বিদেশিরা জাপানের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানালে তারা খুশিই হন। কিন্তু জাপানি রাজনীতির বর্তমান প্রবাহ সম্ভবত ভিন্ন কোনো পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
