সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নে জাপানের ‘সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনে’র সঙ্গে চুক্তি বাংলাদেশের
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার সমুদ্র সংরক্ষণ এবং টেকসই সুনীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) এবং জাপানের বিখ্যাত সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের (এসপিএফ) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মৎস্য ও সামুদ্রিক বিষয়ক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অধ্যাপক ইউনূসের উপস্থিতিতে মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং এসপিএফ-এর ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ওপিআরআই) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিতসুতাকু মাকিনো এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে এসপিএফ প্রেসিডেন্ট ড. আতসুশি সুনামি আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিটি অনুমোদন করবেন।
চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করার পর অধ্যাপক ইউনূস বলেন, 'আমাদের সমুদ্র একটি বড় সম্পদ, তবে এটি ক্রমশ দূষিত হচ্ছে।' তিনি উল্লেখ করেন যে, সমুদ্রের কয়েক হাজার মিটার গভীরেও এখন প্লাস্টিক বর্জ্য শনাক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, 'এই সমঝোতা স্মারক আমাদের সমুদ্র রক্ষা এবং পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করবে।'
এই অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমাদের অবশ্যই সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। তিনি যোগ করেন, 'সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন তাদের সামুদ্রিক গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আমাদের গবেষণা উদ্যোগে তাদের সম্পৃক্ত করতে পেরে আমরা আনন্দিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এই ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত থাকবে এবং এই গবেষণা সহযোগিতা পর্যায়ক্রমে আরও সম্প্রসারিত হবে।'
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন মহেশখালীর তিনটি গ্রামকে 'উমিগিয়ো' (সমুদ্র শিল্প-ভিত্তিক উন্নয়ন) মডেল অনুসরণ করে আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে মিডাকে সহায়তা করবে। মহেশখালী ও এর আশপাশের উপকূলীয় উন্নয়ন এবং কৌশলগত অবকাঠামোর জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে মিডা মৎস্য ও সামুদ্রিক বিষয়ক জাতীয় অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে এসপিএফ-এর সাথে অংশীদারিত্ব করবে। এই অগ্রাধিকারগুলো বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, যারা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে সামুদ্রিক নীতিমালা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।
এই সমঝোতা স্মারকের অধীনে মিডা এবং এসপিএফ বেশ কিছু মূল ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। এর মধ্যে রয়েছে ম্যারিকালচার, মৎস্য চাষ, ফসল পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কল্যাণে জাপানের সুনীল অর্থনীতি মডেলগুলো গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাই। এই সহযোগিতা 'উমিগিয়ো' (সমুদ্র শিল্প-ভিত্তিক সম্প্রদায় উন্নয়ন) বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেবে, যা সমন্বিত উপকূলীয় জীবিকা, সমুদ্রে নিরাপত্তা, সম্প্রদায়-ভিত্তিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, টেকসই স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
মৎস্য সম্পদ এবং উপকূলীয় পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা (বেসলাইন স্টাডি) পরিচালনা করা হবে। জেটি নির্মাণ, স্বয়ংক্রিয় মাছ নামানোর সুবিধা, কোল্ড চেইন ও পরিবহন লজিস্টিকস, সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে এই সহযোগিতার আরেকটি মূল ভিত্তি। এছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, সামুদ্রিক খাবারের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ, ম্যারিকালচার, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য ও উপজাত ব্যবহারের প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ সহজতরকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রে নিরাপত্তা, গুণমান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি, কাজের পরিবেশ এবং শ্রম মানদণ্ডের ওপর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওপিআরআই-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিতসুতাকু মাকিনো বলেন, 'এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার এবং বিশেষ করে মৎস্য খাতে একটি সমন্বিত ও টেকসই নীল অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি মূল্যবান সুযোগ।' তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই সহযোগিতা জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণ ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে।
মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী মিডারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, 'মিডা নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত তৈরির পাশাপাশি পুরনো উপকূলীয় জীবিকা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসপিএফ-এর সাথে এই অংশীদারিত্ব আমাদের লক্ষ্য, মূল্যবোধ এবং কর্মপরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা উন্মোচনে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, কৌশল ও সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করবে। বাংলাদেশকে এখন এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উচ্চতর পর্যায়ে কাজ করতে হবে।'
১৩-১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত 'নর্থইস্ট ইন্ডিয়ান ওশান রিজিওনাল ডায়ালগ অন সাসটেইনেবল ব্লু ইকোনমি, কানেক্টিভিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস (সিডস)' শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সংলাপের ফাঁকে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দুই দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে এসপিএফ-এর ওপিআরআই, মিডা এবং পিস অ্যান্ড পলিসি সলিউশনস (বাংলাদেশ)। সংলাপে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নীতি-নির্ধারক, বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নিচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে ওপিআরআই-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এমাদুল ইসলাম এবং মিডারের সদস্য কমডোর তানজিম ফারুক উপস্থিত ছিলেন।
