ভালো রাজনীতিক হতে হলে কি ভালো বাবা হওয়া যায় না?
রাজনীতি করতে আসা একজন মানুষের জন্য ভালো রাজনীতিক হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আরও জরুরি হচ্ছে ভালো বাবা হওয়া। বড় পরিসরে বলা যায়, একজন ভালো বাবা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বও বটে। কারণ সুস্থ পরিবার থেকেই জন্ম নেয় সুস্থ নেতৃত্ব।
পরিবার ও সন্তানের সাথে যে ব্যক্তির যোগাযোগ নেই বা দুর্বল সম্পর্ক, তারা কীভাবে দেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি বুঝবেন ও ভালবাসবেন। রাজনৈতিক এই সম্পর্কও আত্মিক হতে হবে।
রাজনীতিক ও ভালো বাবা হওয়ার প্রসঙ্গটা মনে হলো নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনে। উনি তার পাঁচ মাস বয়সী সন্তানের মুখের দিকে খুব বেশি তাকান না, কারণ সন্তানের প্রতি দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভয়।
তিনি বলেন, 'আমার সন্তান আছে—এটা চিন্তা করে যেন আমি কোনো ডিসিশন নিতে বাধাপ্রাপ্ত না হই, সেজন্য মায়ায় জড়াতে চাই না। আর যদি সেই মায়ার জন্য দেশের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নরম হতে হয়?' তাই তিনি ইচ্ছে করেই নিজের ছেলের প্রতি মায়া বাড়ান না।
নিজের সন্তানের মায়াকে সাথে রেখেই সব রাজনীতিবিদকে দেশের কথা ভাবতে হয়। এই ভালোবাসা আবেগের না, এই ভালোবাসা দায়িত্বের। শুধু রাজনীতিবিদ নন, সেনাসদস্য, পুলিশ বাহিনী সবাইকেই পরিবারকে পাশে রেখেই দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। তাই বলে কি তারা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য ও মায়াকে পাশ কাটিয়ে যান? নাকি যেতে পারেন?
আর যদি হাসনাত মায়ার কথা ভাবেন, তাহলে তো তার সংসারের মায়াজালে জড়ানোই উচিৎ হয়নি। বৃটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন চলাকালে এমন অনেক বাম নেতা ছিলেন, যারা কায়মনোবাক্যে দেশের কাজ করবেন বলে সংসার জীবনে প্রবেশ করেননি বা দেরিতে প্রবেশ করেছেন। তারা মনে করেছেন, সংসার জীবনে প্রবেশ করলে একে অগ্রাহ্য করাটা অন্যায়। সন্তানের পাশে না থাকাটা আরও অমানবিক।
হাসনাত আবদুল্লাহ'র মতো অনেকে এখনো মনে করেন সংসার বা পরিবার চালানোর দায়িত্ব নারীর একার। পুরুষ আয় করবে, নারী সংসার সামলাবে। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও পুরোনো। কারণ এখন সন্তান প্রতিপালন, সংসার চালানো শুধু নারীর একক দায়িত্ব নয়। ঠিক তেমনি আয় করা ও বাইরের জগত সামলানো পুরুষেরও একার দায়িত্ব নয় ও হওয়া উচিৎ নয়। তাই বর্তমানে মেয়েকে শেখানো প্রতিটি কাজই, পরিবারের ছেলে সন্তানকেও শিখতে হবে।
আধুনিক সমাজে পারিবারিক সিস্টেম, দায়িত্বপালন, কাজের ধরন-ধারণ, সামাজিকতা, আয়-উপার্জন সবকিছুতেই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নারী সংসারের কাজ যেমন একা সামলাবেন না, পুরুষও তেমনি পায়ের ওপর পা তুলে খাবেন না। সন্তান প্রতিপালন ও সংসারের কাজটা স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং শিশু বিকাশ সংক্রান্ত গবেষণা বলে যে সন্তান প্রতিপালনে বাবার দায়িত্ব মায়ের দায়িত্বের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেকক্ষেত্রে বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাবা যদি সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান, কথা বলেন, খেলাধুলা করেন তাহলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। বাবার কাছ থেকে পাওয়া নিরাপত্তাবোধ শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা তৈরি করে। মায়ের পাশাপাশি বাবা সন্তানের আবেগকে গুরুত্ব দিলে শিশু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে।
সেই ষাটের দশকে আমার বাবার সহচার্য, যত্ন, ভালবাসা পেয়ে আমি নিজে একজন স্বনির্ভর মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি। আমার সন্তানও তার বাবার নৈকট্য পেয়ে বিকশিত হয়েছে। সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে শুধু মায়ের আদর নয়, তার দরকার বাবার স্নেহও। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এটা সমান জরুরি।
শিশু অনেক কিছুই শেখে বাবার আচরণ দেখে। বাবা যদি সৎ, দায়িত্বশীল, নারীর প্রতি মর্যাদাসম্পন্ন আচরণ করেন এবং সংযত স্বভাবের হন, তাহলে সন্তানও সেই গুণগুলো সহজে রপ্ত করে। মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, সমাজে কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়, সমস্যা মোকাবিলা করার কৌশল সন্তান বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই শেখে। বিশেষ করে, ছেলে সন্তান বাবাকে রোল মডেল হিসেবে দেখে।
যদিও আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাবার বড় দায়িত্ব অর্থ উপার্জন, কিন্তু এর পাশাপাশি প্রতিটি কাজে সন্তানের পাশে থাকাও একজন আধুনিক বাবার দায়িত্ব। বাবার পেশা যাই হোক না কেন, তাকে তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য সময় বের করে নিতেই হবে।
এই দেশে অধিকাংশ মানুষ মনে করেন সন্তান মানুষ করা শুধু মায়ের কাজ। কিন্তু এটি খুব ভুল ধারণা। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বাবা-মা দুজনই সন্তানের সমান অভিভাবক। সেখানে মায়া বাড়বে এই ভয়ে সন্তানের দিকে না তাকানোটা অন্যায় ও এক ধরনের অপরাধ।
হাসনাত আবদুল্লাহ রাজনীতিতে সময় দেবেন বলে সন্তানের প্রতি মায়া বাড়াতে চাইছেন না, অর্থাৎ উনি সন্তানকে ন্যায্য সময়টুকু দিচ্ছেন না। তার ধারণা হয়েছে, রাজনীতিতে সফল হতে ও দেশকে সময় দিতে হলে সন্তান, পরিবারকে বেশি সময় দেওয়া বা মায়া বাড়ানো যাবে না। দেখি ইতিহাস কী বলে—
এটা সত্য যে সফল রাজনীতিকদের অনেকেই সমানভাবে সন্তানকে সময় দিতে পারেননি। তবে যারা পরিবারকে তুলনামূলক বেশি সময় দিয়েছেন, তাদের সন্তানরা মানসিকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও সফল হয়েছেন।
রাজনীতি যারা করেন, তাদের সবারই সময় নিয়ে টানাটানি থাকে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানুষকে সময় দেওয়া, মিটিং, মিছিল, পার্টির কাজ, সমাজসেবা করতে গিয়ে একজন রাজনীতিবিদ চাইলেও পরিবার ও সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।
রাজনীতিক বাবাদের প্রসঙ্গে পরে আসছি। যেসব মা রাজনীতি করেন বা করতেন, তারা কি সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছেন? একদম তা নয়, আমাদের দেশের দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী টানা ৩০ বছর দেশ পরিচালনা করেছেন। অথচ তারা দুজনেই ছিলেন সংসারি। যেসব নারী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারা বরং বেশি সময় পরিবারকে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
দুনিয়া কাঁপানো নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা জীবনের অধিকাংশ সময় জেলে থাকার কারণে সন্তানদের সময় দিতে পারেননি। এটি তার জীবনের বড় আক্ষেপ ছিল। অথচ মানুষের অধিকার আদায়ে এর কোনো বিকল্পও ছিল না তার জীবনে। মুক্তির পর তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, পরিবারকে সময় দিতে না পারা তার জীবনের অন্যতম বড় কষ্ট।
আধুনিক সময়ের অন্যতম সফল রাজনীতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় প্রায় প্রতিদিন মেয়েদের সঙ্গে রাতের খাবার খেতেন, সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন। তিনি পরিবারের জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট সময় বের করে রাখতেন। ওবামা নিজেই বলেছেন, "আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমার সন্তানদের ভালো বাবা হওয়া।"
রাজনীতি করলেও পরিকল্পনা থাকলে পরিবারকে সময় দেওয়া সম্ভব। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু খুব ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিক ছিলেন। কিন্তু তিনি কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে চিঠি লেখা, গল্প করার মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিত্ব গঠনে বাবার এই মানসিক উপস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছিল।
সাধারণ অনেক রাজনীতিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান প্রতিপালনের বড় দায়িত্বটা থাকে মায়ের ওপর। বাবা অধিকাংশ সময় থাকেন রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত। তবে রাজনীতিক বাবাকে যেকোনভাবে সময় বের করে হলেও সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নয়তো সন্তান বাবাকে দূরের মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখে।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাজনীতিবিদই হোক আর ব্যবসায়ী বা অন্য যেকোনো পেশারই হোক না কেন—সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের চেয়ে গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ যতটুকু সময় দেওয়া হবে, তা হতে হবে আন্তরিক ও ভালবাসায় মোড়ানো।
কাজের চাপ, ক্ষমতার মোহ, ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দেশের জন্য কাজ করছি—এই অজুহাত দেওয়ার ফলে সন্তান নিজেকে অবহেলিত মনে করতে পারে। একজন মানুষের জন্য শুধু 'সফল রাজনীতিক' হওয়াই যথেষ্ট নয়, ভালো সন্তানের বাবা হওয়াও কাম্য।
কারণ তার উত্তরসূরী যদি ঠিকমতো দাঁড়াতে না পারে, মানুষের পাশে থাকতে না পারে, অসাধু ব্যক্তি হয়—তাহলে রাজনীতিক হিসেবে তার সব পাওয়াই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। মানুষ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সন্তান প্রতিপালনে ব্যর্থতার কথা টেনে আনবে, এবং তা ইতিহাসেও লেখা থাকবে। সন্তানকে সময় না দিলে সাফল্যের মূল্য অনেক সময় অর্থহীন হয়ে যায়।
তরুণ রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে 'রাজনৈতিক ব্যস্ততা' ও 'দেশের কাজ' ভালো অজুহাত হতে পারে, কিন্তু তা দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় না। রাজনীতিবিদদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল শেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রাজনীতিবিদ নয়, আরও কিছু পেশার মানুষের জীবন স্বাভাবিক পেশার চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত ও ব্যস্ত। তবু পরিকল্পনা করলে সন্তানের জন্য মানসম্মত সময় বের করা সম্ভব।
সন্তানের কিছু বিশেষ দিনে তার পাশে থাকাটা ম্যান্ডেটরি মনে করতে হবে। যেমন–বাচ্চার জন্মদিন, স্কুলের অনুষ্ঠানে, অসুস্থ বাচ্চার শয্যাপাশে, বিশেষ অর্জনের মুহূর্তে, পরীক্ষার সময় ইত্যাদি। সন্তান যেন অনুভব করে যে, বাবা ব্যস্ত বা দূরে থাকলেও আমার খোঁজ রাখছেন।
এমনকি নিজের কাজের জায়গায়, জনসংযোগ চলাকালে মাঝেমাঝে সন্তানকে পাশে রাখা, যেন তারা বাবার কাজের পরিধি ও ধরন বুঝতে পারে। তাহলে সন্তানও নিজেকে রাজনীতিক বাবার আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
ব্যস্ততা ও দেশের কাজের অজুহাতে রাজনীতিক বাবা যদি সন্তানের কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে সব ফলাফল শূন্য হতে বাধ্য। সবচেয়ে বড় কথা সন্তান প্রতিপালন কারও একার দায়িত্ব নয়, এটা স্বামী–স্ত্রীর মিলিত একটি টিমওয়ার্ক।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
