সন্তানের বন্ধু নিয়ে বিরক্ত? বিশেষজ্ঞদের ৩ পরামর্শ
এটা প্রায়ই ঘটে থাকে যে, সন্তানের সব বন্ধুকে বাবা-মায়ের ভালো লাগে না। হতে পারে সেই বন্ধুটি অভদ্র, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী অথবা জিজ্ঞাসা না করেই খাবার-দাবারে হাত দেওয়ার অভ্যাস আছে। কিংবা সমস্যাটা হয়তো আরও গভীর; আপনার মনে হতে পারে যে তার প্রভাব আপনার সন্তানের ভেতরের খারাপ দিকগুলোকে বের করে আনছে।
এ অবস্থায় সন্তানকে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া যায় যে, "ওর সঙ্গে আর মিশবি না," কিন্তু তাতে সাধারণত সমস্যার সমাধান হয় না।
প্যারেন্টিং কোচ সু অ্যাটকিন্স এবং চার সন্তানের মা ও কমেডিয়ান রিয়া লিনা এমন পরিস্থিতি সামলানোর তিনটি উপায়ের কথা বলেছেন, যা সন্তানকে দূরে সরিয়ে না দিয়েও সমাধান করতে পারে।
১. ভেবে দেখুন, কেন তাকে আপনার অপছন্দ
সমস্যাটা কি গুরুতর কিছু, যেমন—অসম্মান করা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ? নাকি সেই শিশুটিকে শুধুই আপনার বিরক্ত লাগছে?
বিশেষজ্ঞ অ্যাটকিন্স বলেন, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে নিজের একটু আত্মসমীক্ষা করে নেওয়া ভালো। কারণ, কোনটি কেবল বিরক্তিকর আর কোনটি আসলেই ক্ষতিকর, তা আলাদা করতে পারাটা জরুরি।
তিনি বলেন, যদি ঝুঁকিটা সত্যিকারের হয়, যেমন—বিপজ্জনক আচরণ বা উৎপীড়ন, তাহলে কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করার সময় এসেছে। কিন্তু সমস্যা যদি হয় কেবল আদবকেতা নিয়ে, তবে আপনি নিজেই ভালো আচরণ করে তাকে একটি উদাহরণ দেখাতে পারেন।
রিয়া লিনা প্রায়ই এই কাজটি করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "যখন কোনো শিশু আমার দায়িত্বে থাকে, তখন তাদের আমার নিয়মই মেনে চলতে হয়।"
তিনি আরও বলেন, "আমি আমার সন্তানদের বাসের সিটে পা তুলে বসলে বকা দিই। আমার দায়িত্বে থাকা অন্য শিশুরাও যদি এমনটা করে, তাহলে আমি তাদেরও পা নামাতে বলি।"
লিনার মতে, সন্তানের বন্ধুদের অপছন্দ হওয়ার একটি বড় কারণ হলো অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে "মূল্যবোধের সংঘাত"।
তিনি বলেন, "আমার এমনও মনে হয়েছে যে, এই শিশুটির কারণে আমার সন্তান আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, এটা আসলে শিশুটির দোষ নয়।" উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, "আমি বাড়িতে বন্দুক নিয়ে খেলা একেবারেই পছন্দ করি না, এমনকি আঙুল দিয়ে বন্দুক বানিয়ে খেলাও নয়। কিন্তু অনেক ছেলেই এটা করে, এবং আমি যখন আমার সন্তানদের এই খেলায় যোগ দিতে বারণ করেছি, তখন কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।"
তিনি যোগ করেন, অনেক সময় শিশুটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বললে এমন একটি মাঝামাঝি পথ খুঁজে পাওয়া যায়, যাতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকে।
২. কথা বলুন, নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন না
অ্যাটকিন্সের মতে, সবচেয়ে খারাপ কাজটি হলো সন্তানের কোনো বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা নিষিদ্ধ করে দেওয়া। তিনি বলেন, "এতে আপনি তাকে ভালো বন্ধুত্ব গড়তে সাহায্য করছেন না, এমনকি তাকে এটাও ব্যাখ্যা করছেন না যে কেন সে শিশুটির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবে না।"
তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত কঠোর হলে তা "হিতে বিপরীত হতে পারে এবং আপনার সন্তান হয়তো আপনাকে রাগানোর জন্যই সেই বন্ধুর সঙ্গে আরও বেশি মিশবে।"
এর বদলে আপনার সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা উচিত সে কেন ওই বন্ধুকে পছন্দ করে। তাদের মধ্যে মিল কোথায়? তারা একসঙ্গে কী করতে ভালোবাসে?
তাদের কথা শোনার মানে এই নয় যে আপনি বন্ধুত্বটাকে সমর্থন করছেন, বরং এর মাধ্যমে আপনাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।
অ্যাটকিন্স বলেন, "যখন কথা বলবেন, সঠিক মুহূর্ত বেছে নিন। আপনার গলার স্বর ও শারীরিক ভাষার দিকে নজর রাখুন, কারণ আপনি যদি আক্রমণাত্মক বা সমালোচনামূলক হন, তবে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেবে।" তার কথায়, "আপনি দেয়াল নয়, সেতু তৈরি করতে চান।"
রিয়া লিনা যোগ করেন, সন্তানকে এটা পরিষ্কার করে বলা জরুরি যে, "আপনি একটি নির্দিষ্ট আচরণকে সমর্থন করেন না এবং আপনি চান না যে সে এর অনুকরণ করুক।" তিনি আরও বলেন, "এভাবে আপনি বন্ধুত্ব বা মেলামেশা বন্ধ করছেন না, কিন্তু কোনটি করা উচিত নয়, তার একটি সীমারেখা টেনে দিচ্ছেন।"
৩. সামাজিক পরিধি বাড়ান
যদি আপনার সন্তান এমন কোনো বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়ে যা নিয়ে আপনি অস্বস্তিতে আছেন, তাহলে কৌশলে তার সামাজিক জগৎকে আরও বড় করে দিন।
অ্যাটকিন্স পরামর্শ দেন, "অন্যান্য বন্ধুদেরও এই বৃত্তে নিয়ে আসুন। কাজিনদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান, তাকে কোনো স্পোর্টস ক্লাবে ভর্তি করুন বা স্কুলের পরের কার্যক্রমে যুক্ত করুন—এমন যেকোনো কিছু, যা তাকে নতুন মানুষের সঙ্গে মিশতে সাহায্য করবে।"
এটাও মনে রাখা জরুরি যে, সব বন্ধুত্ব সারাজীবনের জন্য হয় না এবং শিশুরা প্রায়ই বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়। তাই হস্তক্ষেপ করার আগে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে বন্ধুত্বটি কীভাবে বদলাচ্ছে, তা লক্ষ করা ভালো।
অ্যাটকিন্স বলেন, "কখনো কখনো এটা কেবল গ্রীষ্মের ছুটির বন্ধুত্ব, অথবা হতে পারে কোনো কিশোর আপনাকে রাগানোর জন্য এমনটা করছে।"
সবচেয়ে ভালো যে কাজটি আপনি করতে পারেন, তা হলো আপনার সন্তান যে ধরনের বন্ধুত্ব তৈরি করুক বলে আপনি আশা করেন, নিজে সেই ধরনের বন্ধুত্বের একটি উদাহরণ তৈরি করা।
আপনার নিজের সম্পর্কগুলো নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বললে তারা বুঝতে পারবে সম্মান, দয়া এবং সুস্থ সম্পর্কের সীমারেখা কেমন হওয়া উচিত। এর ফলে, তারাও সেই ধরনের আচরণ অনুকরণ করার সম্ভাবনা বাড়বে।
