অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপ; সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুদের প্রবেশ সীমিত করতে উদ্যোগী বিভিন্ন দেশ
গত ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে অস্ট্রেলিয়া। টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম—শিশুরা এখন আর এর কোনোটিই ব্যবহার করতে পারবে না।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। তাদের দেখাদেখি এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে নড়েচড়ে বসেছে।
এক্ষেত্রে কোন দেশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
অস্ট্রেলিয়া
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। কোনো কোম্পানি এই আইন অমান্য করলে তাদের প্রায় ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেন্ডাল জানিয়েছেন, তারাও অনেকটা অস্ট্রেলিয়ার আদলেই আইন করার কথা ভাবছেন। চলতি বছরেই ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা এবং এআই চ্যাটবট ব্যবহারের নিয়ম কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
চীন
চিনে 'মাইনর মোড' বা শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু আছে। এর আওতায় বয়সভেদে শিশুদের স্ক্রিন টাইম বা মোবাইল ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকে।
মালয়েশিয়া
গত নভেম্বরে মালয়েশিয়া ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সাল থেকে সে দেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে।
ভারত
দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গত জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে 'শিকারি', 'গ্রাসকারী' হিসেবে আখ্যা দিয়ে শিশুদের অনলাইনে আটকে রাখার কৌশলের সমালোচনা করে তিনি বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধের আহ্বান জানান। পর্যটন এলাকা গোয়াতেও অস্ট্রেলিয়ার মতো বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তাভাবনা চলছে।
ইউরোপের চিত্র
ফ্রান্স: ১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে গত জানুয়ারিতে দেশটির জাতীয় পরিষদে একটি বিল পাস হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত হতে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। অনলাইন বুলিং বা হয়রানি রোধেই এই উদ্যোগ।
ডেনমার্ক: ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। তবে মা–বাবা চাইলে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন।
স্পেন: দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা হবে এবং বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা বা ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু করা হবে।
জার্মানি: মা-বাবার অনুমতি সাপেক্ষে ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সীরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারে। তবে শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই নিয়ম যথেষ্ট নয়।
ইতালি: ১৪ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে মা-বাবার অনুমতি লাগে। এর বেশি বয়স হলে অনুমতির প্রয়োজন নেই।
নরওয়ে: বর্তমানে ১৩ বছর বয়সীরা সম্মতি দিতে পারলেও সরকার এটি বাড়িয়ে ১৫ বছর করার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নূন্যতম বয়স ১৫ বছর করার জন্য আইন তৈরির কাজ চলছে।
স্লোভেনিয়া ও গ্রিস: স্লোভেনিয়া ১৫ বছরের নিচে এবং গ্রিসও একই বয়সসীমার শিশুদের জন্য খুব শিগগির নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র
শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষা আইনে ১৩ বছরের কম বয়সীদের তথ্য তাদের মা–বাবার অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মা–বাবার অনুমতি বাধ্যতামূলক করতে আইন পাস করেছে। তবে বাকস্বাধীনতার যুক্তিতে এসব আইন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
টিকটক, ফেসবুক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বলছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহারকারীর বয়স অন্তত ১৩ বছর হতে হয়। তবে শিশু সুরক্ষা কর্মীরা মনে করেন, এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। ইউরোপের বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে, ১৩ বছরের কম বয়সী প্রচুর শিশু দিব্যি এসব সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে।
