শৈশব ছিল বাবা-মায়ের সোশ্যাল মিডিয়া ‘কন্টেন্ট’, এখন আতঙ্কে দিন কাটছে বড় হওয়া সেই শিশুদের
আমার শৈশবের ছবি এবং ভিডিওগুলো হলো বিব্রতকর পরিস্থিতির এক আদর্শ নিদর্শন। আমার একটি ছবি আছে কেবল একটি ডায়াপার পরিয়ে টলমল পায়ে হাঁটা অবস্থায় ও একটি ভিডিও করা হয়েছিল যেখানে আমার সারা শরীর খাবারে মাখানো অবস্থায় ছিল। কিন্তু আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে সেই সব 'কম্প্রোম্যাট' (আপত্তিকর নথি) আমার বাবা-মায়ের চিলেকোঠার ছবির অ্যালবাম এবং ভিএইচএস টেপের ভেতরেই নিরাপদে আছে।
এমনকি আমার শুরুর দিকের ডিজিটাল কার্যকলাপ—মাইস্পেস-এ আবেগঘন ক্যাপশন এবং নিজের বানানো মিউজিক ভিডিও— তার সবই হয়েছিল দুই হাজার দশকের শুরুর দিকের সেই অপরিপক্ক ইন্টারনেটে এবং সৌভাগ্যবশত সময়ের গর্ভে তা হারিয়ে গেছে।
যখনই আমি সেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিদর্শনের কথা ভাবি, তখনই ভেবে স্বস্তি পাই; আর বর্তমানের ইন্টারনেটে শিশুদের ছবি ও ভিডিও দেখলে আরও বেশি স্বস্তি বোধ করি এই ভেবে যে, তারা আমার মতো ভাগ্যবান না।
গত ডিসেম্বরে আমি অলিভিয়া এবং মিলি নামের দুই ছোট বোনের বড়দিনের উপহার খোলার একটি টিকটক ভিডিও দেখছিলাম। যখন তাদের সামনের বড় বক্সগুলো খুলতে দেওয়া হয় এবং ভেতর থেকে দুটি স্যুটকেস বেড়িয়ে এলো, তখন চার বছর বয়সী মিলি কান্নায় ভেঙে পড়ল। (কারণ স্বাভাবিকভাবেই, সান্টার কাছে সে স্যুটকেস চায়নি।)
তার বাবা-মা তড়িঘড়ি করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে আসল উপহার—চার দিনের ডিজনী ক্রুজ-এর টিকিট, আর সেগুলো স্যুটকেসের ভেতরেই আছে, কিন্তু মিলি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সে চিৎকার করে কেঁদেই যাচ্ছিল। নয় মিলিয়ন অচেনা মানুষ তার সেই কান্নাকাটি দেখেছে এবং হাজার হাজার মানুষ সেখানে মন্তব্য করেছে। একজন লিখেছেন, 'জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি দারুণ বিজ্ঞাপন।' (টিকটকটি অবশ্য পরে ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।)
দুই দশক আগে, এই কান্নাকাটি কেবল একটি পারিবারিক গল্প হয়ে থাকত, অথবা বড়জোর বড়দিনের সন্ধ্যায় আত্মীয়দের সামনে দেখানো কোনো ঘরোয়া ভিডিও হয়ে থাকতে পারত। কিন্তু এখন, কয়েক বছর আগের নেওয়া হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত—যেমন মদ্যপ অবস্থার ছবি বা দোকানে ঝগড়ার ভিডিও—একজন মানুষের ডিজিটাল পরিচয় নির্ধারণ করে দিতে পারে।
মিলির বাবা-মায়ের মতো এক প্রজন্মের অভিভাবকরা জেনে বুঝেই তাদের সন্তানদের ওপর আরও বড় একটি অনলাইন নথিপত্রের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন।
২০০৬ সালে ফেসবুক সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর যে প্রজন্ম বড় হয়েছে, তারা এখন কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর তারা তাদের বাবা-মায়ের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফল ভোগ করছে।
অনেকে এমন এক ডিজিটাল ব্যক্তিত্বের জুতোয় পা গলাচ্ছে যা আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে এবং যা মুছে ফেলার ক্ষমতা তাদের নেই।
কেমি ব্যারেট, যার বয়স এখন ২৪। তিনি এমন এক মায়ের কাছে বড় হয়েছেন যিনি ব্যারেটের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো—গোসলের ছবি, তার এমআরএসএ রোগ শনাক্তকরণ, তার দত্তক হওয়ার তথ্য, এমনকি একবার মদ্যপ চালকের গাড়িতে তার দুর্ঘটনার খবর—সবই ফেসবুকে পাবলিকলি পোস্ট করতেন। (ব্যারেটের মা মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।)
এই অভিজ্ঞতা তাকে পরে শিশুদের ইন্টারনেট গোপনীয়তা নিয়ে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে এবং চলতি বছরের শুরুতে ওয়াশিংটন স্টেট হাউসে সাক্ষ্যও দেন।
কিন্তু তার আগে, কিশোরী বয়সে যখন ব্যারেট প্রথম টুইটার অ্যাকাউন্ট খোলেন, তখন তিনি তার মায়ের উদাহরণ অনুসরণ করেই ভাইবোনদের নিয়ে অভিযোগ এবং তার শারীরিক সমস্যা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতেন।
ব্যারেট বলেন, তার চেয়ে কমবয়সী ব্যবহারকারীরাই প্রথম সমস্যাটি চিহ্নিত করে। তার ইন্টারনেটের বন্ধুরা তাকে মেসেজ দিয়ে বলত, 'হেই, হয়তো তোমার এগুলো ডিলিট করে দেওয়া উচিত।'
বর্তমানের কিশোর-কিশোরীরাও একইভাবে অতিরিক্ত শেয়ার করার বিষয়ে সতর্ক। তারা টিকটকে মজা করে বলে, তাদের বন্ধুরা যদি তাদের বাবা-মায়ের ফেসবুক খুঁজে পায় তবে কী আতঙ্ক তৈরি হবে।
অলাভজনক সংস্থা 'ফ্যামিলি অনলাইন সেফটি ইনস্টিটিউট'-এর সিইও স্টিফেন বালকাম বলেন, এমনকি আরও ছোট শিশুরাও একটি 'ডিজিটাল ম্যাচিউরিটি' বা বয়ঃসন্ধির অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমরা দেখেছি ১০, ১১ বা ১২ বছর বয়সী অত্যন্ত পরিপক্ক শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে বসে বলছে—মা, তুমি কী ভাবছিলে (এসব পোস্ট করার সময়)?'
যুক্তরাষ্ট্রে, শিশুর গোপনীয়তার অধিকারের চেয়ে বাবা-মায়ের কর্তৃত্বই বড় এবং সামাজিকভাবে আমরা শিশুদের সম্পর্কে এমন তথ্য বা ছবি শেয়ার করাকে স্বাভাবিক করে তুলেছি যা আমরা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কখনোই করতাম না।
বাবা-মায়েরা নিয়মিতভাবে শিশুদের ডায়াপার বদলানোর দুর্ঘটনা, পটি-ট্রেনিংয়ের সাফল্য এবং একটি শিশুর প্রথম ঋতুস্রাবের বিবরণ শত শত বা হাজার হাজার মানুষের সামনে প্রকাশ করেন। এর বিরুদ্ধে আসলে কোনো কঠোর নিয়ম নেই। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর নীতিমালায় কেবল চূড়ান্ত পর্যায়ের অনুপযুক্ত বিষয়—যেমন শারীরিক নির্যাতন, নগ্নতা বা অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আছে। কিন্তু অনলাইনে যাদের জীবন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে, সেই শিশুদের মতে, অপব্যবহারমূলক নয় এমন কন্টেন্ট আপলোড করাও ক্ষতিকারক হতে পারে।
বাবা-মায়ের জন্য এই পোস্টিং করা বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। ভিউ, লাইক এবং কমেন্ট বাবা-মায়েদের জন্য এক ধরণের ইতিবাচক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে, কারণ তাদের লালন-পালনের কাজগুলো মূলত অদৃশ্য এবং প্রায়ই কৃতজ্ঞতাহীন।
'মমফ্লুয়েন্সড' বইয়ের লেখক সারা পিটারসেন আমাকে বলেন, 'আমাদের কাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ হলো সন্তানরা নিজেই। এবং কখনও কখনও একটি সুন্দর ছবি পোস্ট করার পর ১০ বা ১২ জন মানুষের 'সো কিউট' বলাটা সত্যিই ভালো লাগে।'
লাইক আর কমেন্ট এক জিনিস, টাকা অন্য জিনিস। যেসব পরিবার ইউটিউব বা টিকটকে তাদের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে তুলে ধরে, তারা বিশাল দর্শক, স্পন্সরশিপ এবং বিজ্ঞাপনের অর্থ পায়।
বর্তমানে, এই ফ্যামিলি ভ্লগারদের উপার্জিত অর্থের ওপর শিশুদের কোনো আইনি অধিকার দেওয়ার মতো কোনো ফেডারেল বা রাজ্য আইন নেই, যদিও ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এবং ইলিনয়-এর মতো রাজ্যগুলোতে এ ধরণের আইন প্রস্তাব করা হয়েছে।
কিছু নতুন বাবা-মা মনে করেন, শিশুদের এভাবে জনসমক্ষে নিয়ে আসার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ৩৪ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা তার মেয়ের খুব কম ছবি পোস্ট করেন এবং সব ছবিতে মুখ ঢেকে দেন। তিনি বলেন, 'সে তো সম্মতি দিতে পারে না, তাই আমরা তার ছবি প্রকাশ করতে চাই না।'
তবে সবাই এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করে না। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে—'তোমার সন্তানের কি কোনো সমস্যা আছে?'
এমনকি বাবা-মায়েরা যদি সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তবুও কেবল তারাই একমাত্র ফোন ব্যবহারকারী নন।
ক্রিস্টিনা বলেন, তাকে প্রায়ই বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ করতে হয় যাতে তারা তার মেয়ের ছবি অনলাইন থেকে সরিয়ে নেয়। কারণ জন্মদিনের অনুষ্ঠান বা রাস্তায়—সবার হাতে ক্যামেরা আছে, ফলে গোপনীয়তা রক্ষা কঠিন।
ব্যারেট বলেন, তার মায়ের এক দশকের সেই অতি-শেয়ারিংয়ের প্রভাব তিনি এখনো অনুভব করন।
১২ বছর বয়সে একবার এক ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে বাড়ি পর্যন্ত এসেছিল, ব্যারেটের বিশ্বাস সেই ব্যক্তি তাকে ইন্টারনেট থেকেই চিনেছিল। পরবর্তীতে সহপাঠীরাও তার মায়ের পোস্ট করা ব্যক্তিগত তথ্যগুলো নিয়ে তাকে উত্ত্যক্ত করত এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সেই হাই স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
তার মায়ের সাথে এখন তার কোনো সম্পর্ক নেই, যার বড় কারণ হলো তার মায়ের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি যা তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে।
এমনকি অন্য মানুষের সাথেও ব্যারেট এখন অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং কিছুটা আতঙ্কিত থাকেন। তিনি বলেন, 'আমি এমনকি আমার বন্ধুদের বা বাগদত্তাকে কিছু বলতে ভয় পাই, কারণ আমার মনের পেছনে সারাক্ষণ এই চিন্তা কাজ করে যে—এটি কি ইন্টারনেটে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে?'
