চীনে এখন ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের চেয়ে ৬৫-ঊর্ধ্ব প্রবীণদের সংখ্যা বেশি
চীনের ইতিহাসে এই প্রথম ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের তুলনায় ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির ন্যাশনাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস-এর সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাসে এই প্রথম এমন মাইলফলক স্পর্শ করল দেশটি। দেশজুড়ে পরিচালিত একটি নমুনা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মাত্র মাসখানেক আগে চীন তার জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকাতে নগর পরিকল্পনায় 'যুব উন্নয়ন' অন্তর্ভুক্ত করার একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার অন্তত ১৫.৮৭ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। বিপরীতে ০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের হার ১৫.২৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশটিতে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২২৩.০৯ মিলিয়ন। পরিসংখ্যান সংস্থাটি আরও দেখেছে যে, দেশটিতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ৩২১.২২ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ২২.৮৬ শতাংশ। এছাড়া ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের হার মোট জনসংখ্যার ৬১.৮৯ শতাংশ বা ৮৬৯.৮৭ মিলিয়ন।
গত নভেম্বরে ২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ওপর দেশব্যাপী পরিচালিত এক 'আদমশুমারি' থেকে এই পরিসংখ্যানগুলো পাওয়া গেছে।
এই তথ্য চীনের জনসংখ্যা হ্রাসের সংকটকে তুলে ধরেছে, যা নিয়ে এনবিএস আগেই সতর্ক করেছিল যে এটি দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো সমাজের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বা তার বেশি হলে তাকে 'এজিং' (বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পথে থাকা) সমাজ বলা হয়। আর এই হার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে তাকে 'এজড' (বয়োবৃদ্ধ) সমাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে চীনে জন্মহার রেকর্ড নিচে নেমে এসেছে এবং জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭.৯২ মিলিয়ন। গত বছর দেশটির মোট জনসংখ্যা ৩.৩৯ মিলিয়ন হ্রাস পেয়েছে, যা টানা চতুর্থ বছরের মতো বার্ষিক পতনের রেকর্ড।
চীনের জন্মহার কয়েক দশক ধরেই কমছে। এর মূল কারণ ছিল ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা 'এক সন্তান নীতি' এবং দ্রুত নগরায়ন। দেশটি ২০১৬ সালে এই নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করলেও, পুত্রসন্তানের প্রতি প্রথাগত ঝোঁকের কারণে জনসংখ্যার ভারসাম্য ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জনতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু লালন-পালনের উচ্চ ব্যয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ধীরগতির অর্থনীতি অনেক তরুণ চীনার বিয়ে ও পরিবার গড়ার ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি করেছে। এছাড়া লিঙ্গ বৈষম্য এবং ঘরের কাজে নারীদের প্রতি প্রথাগত প্রত্যাশাও জন্মহার হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।
গত মাসে চীন ১৫টি সরকারি বিভাগের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক রূপরেখা উন্মোচন করেছে, যেখানে কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসেবার মাধ্যমে 'যুব-উন্নয়নমুখী শহর' গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি 'সন্তান জন্মদান-বান্ধব সমাজ' গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিল বেইজিং।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, "২০৩০ সালের মধ্যে যুব-উন্নয়নমুখী শহরের ধারণাটি ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের লক্ষ্য হলো যুব উন্নয়নের জন্য একটি অপেক্ষাকৃত পরিপক্ক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।"
প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যাচমেকিং ও সামাজিক সেবার মান উন্নয়ন, শিশু যত্নে ভর্তুকি বাড়ানো এবং জনসমাগমস্থলে মা ও শিশুদের জন্য বিশেষ কক্ষের ব্যবস্থা করা। আরও রয়েছে মাতৃত্বকালীন ও শিশুরোগ চিকিৎসার উন্নয়ন, স্কুল-পরবর্তী এবং ছুটির দিনগুলোতে শিশুদের যত্ন নিশ্চিত করা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
তবে এই জনতাত্ত্বিক সংকটে চীন একাই নয়; জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানও একই ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কারণে জনসংখ্যা হ্রাসের সম্মুখীন হচ্ছে।
