Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

Thursday
March 12, 2026

Sign In
Subscribe
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
THURSDAY, MARCH 12, 2026
গত দশ বছরে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র্য: ধ্বংসস্তূপ থেকে আশার আলো

মতামত

আশিকুর রহমান সমী
26 January, 2026, 11:20 pm
Last modified: 28 January, 2026, 12:01 pm

Related News

  • বাংলাদেশ হবে মেছোবিড়ালের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
  • দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১২ ‘হিমালয় গৃধিনী’ শকুন উদ্ধার, পাঠানো হলো হবিগঞ্জ পুনর্বাসন কেন্দ্রে
  • সৌন্দর্যই যে পাখিদের জীবনে বিপন্নতার ছায়া
  • কুড়িগ্রামে বিরল প্রজাতির হিমালয় গৃধিনী শকুন উদ্ধার
  • গাজীপুরে মানুষ ও শিয়ালের বিরল বন্ধুত্ব, নাম ধরে ডাকলেই জঙ্গল থেকে ছুটে আসে ‘লালু’

গত দশ বছরে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র্য: ধ্বংসস্তূপ থেকে আশার আলো

আশিকুর রহমান সমী
26 January, 2026, 11:20 pm
Last modified: 28 January, 2026, 12:01 pm
ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত

রাত সাড়ে বারোটা, ডিসেম্বর ২০২৫। আমার গাড়ি ছুটে চলছে মধুপুরের দিকে। উদ্দেশ্য প্রথাগত বনবাসী জনগণের সাথে বনের আর বন্যপ্রাণীর সুরক্ষার কথা বলা এবং পাখি দেখা। সেই ২০১৮ থেকে মধুপুরের পাখি আর বন্যপ্রাণী দেখি। বন আর বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় এখন সারাদেশে ঘুরি, গবেষণা করি, লেখালেখি করি, গণমনে সচেতনতা তৈরি করি। গল্পের শুরুটা ২০১৬-তে। মাঝে কেটে গেল এক দশক। চোখের সামনে বন আর বন্যপ্রাণীর ঘটে গেল অনেক কিছু। পরিবর্তনটা ছিল খুবই ভয়াবহ, কিন্তু গত এক-দেড় বছরে আবার প্রকৃতি বেঁচে ফিরছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসাবে আমার পথচলা ২০১৬ থেকে। প্রাণিবিদ্যার প্রতি আগ্রহ আমার কলেজ থেকে। তার পুরোপুরি সাধ পূরণ হয় ঢাবিতে এসে। আমার পছন্দের প্রাণী ছিল ফড়িং। ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে একটি গবেষণার আবহ ছিল। আর বন্যপ্রাণী দেখা, ফড়িং প্রজাপতি দেখার আগ্রহটা আমার আসে মূলত সিনিয়রদের উৎসাহে। শুরুটা হয় কার্জন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, ঢাকা শহর, আমার বাড়ির চারপাশ আর গ্রামের বাড়ি; যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে যায় সারাদেশে আর একপর্যায়ে পৃথিবীজুড়ে। 

আমি আমার এই দশ বছরকে মূলত চার ভাগে ভাগ করব: করোনা-পূর্বকালীন, করোনাকালীন, করোনা-পরবর্তী সময় এবং জুলাই ২০২৪-এর পর। কারণ এই সময়টি সংরক্ষণের উদ্যোগকালীন হিসাবেই আমি চিহ্নিত করব।

সাল, ২০১৬, ভর্তি হই প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে বিভাগে একটা সেমিনার হয়, সেটা মূলত প্রাণিকল্যাণ নিয়ে। ওই দিন আমার মধ্যে একটা অন্যরকম বিষয় কাজ করে। এই পৃথিবীতে প্রাণীদের অধিকার রয়েছে এবং তাদের অধিকার আছে বেঁচে থাকার। বিভাগের বা জীববৈচিত্র্য নিয়ে সেমিনারের কোনোটাই কখনও বাদ দিতাম না অংশগ্রহণের জন্য। আস্তে আস্তে ফিল্ডে আসা। ফড়িং থেকে শুরু। এরপর দিন, ঋতুর পরিক্রমায় পলিসি লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া। দেশের সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কথা বলা।

যদি বলি কেমন পরিবর্তন চোখ পড়ল, আমি বলব প্রকট এবং এটা সারাদেশেই। যখন কাজ শুরু করি তখনকার তুলনায় এখন অনেক বেশি জীববৈচিত্র্য কমে গিয়েছে। যে পুকুরগুলো ফড়িংয়ের উড়ে বেড়ানোয় মুখরিত ছিল, যে ফুলবাগানগুলো প্রজাপতিতে পরিপূর্ণ ছিল, যে জলাভূমিগুলো পাখিতে পরিপূর্ণ ছিল, তা আর নেই। কৃত্রিমতার ছোঁয়ায় প্রাকৃতিক আবাসস্থল অনেকটাই মৃত। করোনাকালীন সময়ে প্রকৃতি তার অবস্থান অনেকটা জানান দিলেও পরবর্তী সময়ে তা একেবারে মলিন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আসার পর পুনরায় প্রাণ পেয়েছে প্রকৃতি। দখল, দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার, পাচারসহ বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকিগুলো নিরসনে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। 

২০১৬ সালের দিকে ঢাকার মধ্যের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে শীতে গেলে দেখা মিলত অসংখ্য পাখপাখালির, কিন্তু গত ২-৩ বছরে শুধুই রিক্ততার আর শূন্যতার প্রতিচ্ছবি। এ অবস্থা পুরো দেশেরই। আবাসস্থলের গুনগত মানের অনেক বেশি পরিবর্তন ঘটেছে। 

চলুন ঢাকার বাইরের কথা বলি। প্রথম যখন ২০১৭-তে শালবনে গেলাম মধুপুরে, তখনকার জীববৈচিত্র্য আর এখনকার জীববৈচিত্র্যে দৃশ্যমান পার্থক্য। তখনকার কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি ছড়া আর এখনকার ছড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যে ঘটেছে পরিবর্তন। আর জলাভূমিগুলোর অবস্থা তো খুবই শোচনীয়। এদের প্রাকৃতিক অবস্থার যা পরিবর্তন ঘটেছে, তার ফলে হারিয়ে গিয়েছে অসংখ্য জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত শিকার, দখল, অপরিকল্পিত পর্যটন সব মিলে জলাভূমির প্রাণীরা আজ হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ, কিন্তু এর জীববৈচিত্র্য অনেক। তখন কেবল প্রথম বর্ষে, ফড়িং দেখা শুরু। বোঝা শুরু করলাম Dragonfly এর মধ্যে আছে অসংখ্য প্রজাতি। আর তখন যেখানেই যাই নতুন নতুন প্রজাতির সাথে দেখা হয়। এরই মধ্যে প্রথম বর্ষেই দেখা পেলাম Common Torten Hawk নামক একটি ফড়িং এর যা তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নথিভুক্ত ছিল না। প্রথম দিকে জানতাম না এগুলো বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রকাশ করতে হয়। যা পরবর্তী বছর অন্য এক গবেষক দল নথিবদ্ধ করে বৈজ্ঞানিক ভাবে তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী। এরকমই যত প্রকৃতির দিকে তার মতো করে তাকাই, তত বেশী প্রকৃতিতে প্রাণীদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্যম দেখে মুগ্ধ হই।

দেশ আয়তনে ছোট একটি দেশ হলেও ইন্দো-চায়না ও ইন্দোবার্মা হটস্পটের সংযোগস্থলের অবস্থানের কারণে এর জীববৈচিত্র্য বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ। নদী–নালা, হাওর–বাঁওড়, বনভূমি, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চল মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র।

এইসব পরিবেশে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী স্বাভাবিকভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশে রয়েছে উষ্ণমণ্ডলীয় চিরসবুজ বন, ম্যানগ্রোভ বন ও মিঠাপানির জলাভূমি। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ দেশের জীববৈচিত্র্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

এই দেশ ১৪০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭৩০ প্রজাতির পাখি, ১৭০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬৫ প্রজাতির উভচরসহ নানা বর্ণের, রঙের, আকৃতির ও স্বভাবের অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। 

নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি জলজ জীববৈচিত্র্যকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পাহাড়ি অঞ্চল বিরল ও স্থানিক প্রজাতির আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই জীববৈচিত্র্য দেশের খাদ্য, জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের প্রাণীবৈচিত্র্যের সম্পূর্ণ তথ্য এখনও অজানা। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এখন পর্যন্ত ১২টি নতুন প্রাণীর তথ্যের সন্ধান আছে বাংলাদেশ থেকে। প্রতিবছরই নতুন নতুন প্রাণীর সাথে দেখা হয়। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় যারা কাজ করেন, তারা প্রতিবছরই নতুন নতুন প্রাণীর সন্ধান দিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের প্রাণীবৈচিত্র্যের একটি অংশ এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি অনাবিষ্কৃত, বিশেষ করে মাছ, উভচর, সরীসৃপ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে। নদী–নালা, হাওর–বাঁওড়, চর ও উপকূলীয় অঞ্চলের জলজ বাস্তুতন্ত্রে বহু জলজ প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে, যাদের সঠিক পরিচয় ও শ্রেণিবিন্যাস এখনও অসম্পূর্ণ। একইভাবে বনভূমি, কৃষিজমি ও জলাভূমিতে অসংখ্য পতঙ্গ প্রজাতি বসবাস করলেও এদের অধিকাংশই গবেষণার বাইরে রয়ে গেছে। সীমিত ট্যাক্সোনমিক গবেষণা, বিশেষজ্ঞের অভাব এবং পর্যাপ্ত জরিপের ঘাটতির কারণে এই অজানা বৈচিত্র্য অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে। অথচ এসব অজানা প্রজাতি পরিবেশগত ভারসাম্য, খাদ্যজাল ও বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাংলাদেশের প্রাণী বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে ও সংরক্ষণ করতে হলে মাছ ও পতঙ্গকেন্দ্রিক বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।

সংরক্ষিত এলাকার বাইরে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ছিলো উপেক্ষিত। আমরা একটি ধারণা নিয়ে বড় হই, যে বন্যপ্রাণী বনে থাকে। কিন্তু সারাদেশের সকল ধরনের আবাসস্থল জুড়ে যে বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে তা একেবারে আমাদের দেশের বড় একটি অংশের অজানা। আমার একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সংরক্ষিত এলাকার বাইরে মোট বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বন্যপ্রাণীর প্রজাতির অর্ধেক সংখ্যক বন্যপ্রাণী বসবাস করে তা একেবারে উপেক্ষিত। 

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রম মূলত সংরক্ষিত এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকায় সংরক্ষিত এলাকার বাইরের বিস্তীর্ণ ভূভাগে এটি ক্রমেই উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে। গ্রাম, কৃষিজমি, নদী–খাল, চর, হাওর ও নগর প্রান্তিক অঞ্চলেও বিপুল সংখ্যক বন্যপ্রাণী বসবাস করলেও সেগুলো সংরক্ষণ নীতিমালায় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। আবাসস্থল ধ্বংস, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অবৈধ শিকার এসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও সচেতনতার অভাবও সংরক্ষণ উদ্যোগকে দুর্বল করে তুলছে। অথচ সংরক্ষিত এলাকার বাইরের এসব ল্যান্ডস্কেপই বহু প্রজাতির প্রধান আবাস ও সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। তাই বাংলাদেশের কার্যকর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষিত এলাকার পাশাপাশি সমগ্র ভূদৃশ্যভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক সংরক্ষণ কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য।

সবথেকে ঝুঁকিতে জলাভূমি কেন্দ্রিক বন্যপ্রাণীরা। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ আর এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করে অসংখ্য জলাভূমি। যাদের অনেকে একেবারে অজানা আমাদের কাছে। আর এই জলাভূমি গুলো একেবারে উপেক্ষিত। তবে, বাঁওড়, বিল, আন্তঃদেশীয় সীমানা এলাকার জলাভূমির বন্যপ্রাণী নদীর চর, উপকূল একেবারে উপেক্ষিত। বাংলাদেশে বাওড়ে প্রথম বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ আমার হাত ধরে। পাশাপাশি গঙ্গা প্লাবনভূমিতেও সর্বপ্রথম কাজ ছিলো আমার। কিন্তু নিজের চোখে ধীরে ধরে বিপন্ন হতে দেখেছি এই জায়গা গুলোর বন্যপ্রাণী। 

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে জলাভূমিনির্ভর বন্যপ্রাণীরা, অথচ এই খাতেই প্রয়োজনীয় গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগের ঘাটতি সবচেয়ে স্পষ্ট। হাওর, বাওড়, বিল, চর ও উপকূলীয় জলাভূমিতে বসবাসকারী মাছ, উভচর, জলচর পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তন, দখল, দূষণ ও অতিরিক্ত আহরণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এসব প্রাণীর প্রকৃত অবস্থা, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য ও জনসংখ্যা প্রবণতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনও অপ্রতুল। পরিকল্পিত জরিপ ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার অভাবে কার্যকর সংরক্ষণ কৌশল প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ জলাভূমি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তাই জলাভূমিভিত্তিক গবেষণা জোরদার করা এবং সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের জলাভূমিগুলো ক্রমশ জলচর পাখিশূন্য হয়ে পড়ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আবাসস্থলের গুণগত মানের অবনতি ও পরিবর্তন। হাওর, বিল, বাওড় ও উপকূলীয় জলাভূমিতে পানির স্বাভাবিক গভীরতা, জলপ্রবাহ ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পাখিদের খাদ্য ও আশ্রয় সংকট দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, আগ্রাসী জলজ উদ্ভিদের বিস্তার, কীটনাশক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ জলাভূমির পরিবেশকে পাখির জন্য অনুপযোগী করে তুলছে। ফলে আবাসিক ও পরিযায়ী জলচর পাখির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু পাখির জন্য নয়, পুরো জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের জন্যই হুমকি। তাই জলাভূমির গুণগত মান পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।

হারিয়ে যাচ্ছে আবাসস্থল বিশেষায়িত প্রাণীরা। একটু যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখবো, গত দশ বছরে আবাসস্থল বিশেষায়িত প্রাণীদের বাস্তুতন্ত্রে এক বিশেষ পরিবর্তন। বিশেষ করে জলাভূমি, ঘাসভূমি এবং নির্দিষ্ট ফলভূগী পাখিরা অনেক দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ থেকে। 

গত এক দশকে আবাসস্থলের দ্রুত ও অপ্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে habitat specialist বন্যপ্রাণী প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বন, জলাভূমি, ঘাসভূমি বা নদীনির্ভর পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল এসব প্রজাতি সামান্য পরিবেশগত পরিবর্তনেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের চাপ এদের আবাসস্থলকে খণ্ডিত ও সংকুচিত করেছে। সাধারণত অভিযোজনক্ষম প্রজাতি টিকে থাকলেও বিশেষায়িত প্রজাতিগুলো দ্রুত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। এই প্রবণতা দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। তাই আবাসস্থল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।

বিপন্ন ঝিরি বা ছড়া কেন্দ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশ 

২০১৭-তে আমি সর্বপ্রথম কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে যাই। তখন যেই জীববৈচিত্র্য ছিলো, বা তখন সাতছড়ি, লাউয়াছড়া তে যে জীববৈচিত্র্য ছিলো, তার অনেকটাই হারিয়েছে। কারণ নষ্ট হয়েছে ছড়ার প্রাকৃতিক গুনাগুন আর বাস্তুতন্ত্র। 

শহরের জীববৈচিত্র্য ক্রমেই ধ্বংস হয়েছে

গত দশবছর আগেও ঢাকা শহর এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে যে জীববৈচিত্র্য ছিল, সময়ের সাথে সাথে তা বিলীন হয়েছে। একটা সময় কার্জন হল, ঢাবি ক্যাম্পাস, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, উত্তরা, দিয়াবাড়ি, পূর্বাচল, আফতাবনগরে শহরের আবাসিক এলাকা গুলোতে যে পরিমাণ জীববৈচিত্র্য ছিল ২০২০ সালের পর অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে আবাসস্থল বিশেষায়িত বন্যপ্রাণীরা সব থেকে বেশি হারিয়ে গিয়েছে। জলাভূমি নির্ভর বন্যপ্রাণীদের অনেকেই আর নেই। দখল, দূষণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, শহরে সবুজ বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ধ্বংস ইত্যাদি কারণে কমেছে শহরের জীববৈচিত্র্য। 

ট্যুরিজমের নামে ধ্বংস হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাস

গত এক দশকে বাংলাদেশে ট্যুরিজমের বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের বদলে বন্যপ্রাণীর আবাস ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, কক্সবাজার উপকূল ও হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের ফলে বন উজাড়, শব্দ ও আলো দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, জলাভূমি ক্ষয় এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটেছে। ইকো-ট্যুরিজমের নামে অনেক জায়গায় ভারী অবকাঠামো, হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ এবং অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশ বন্যপ্রাণীর আবাস সংকুচিত করেছে, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট করেছে এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটন যেটি হওয়ার কথা ছিল সংরক্ষণ ও সচেতনতার সহায়ক মাধ্যম, তা নীতিগত দুর্বলতা, পরিবেশগত সক্ষমতা নির্ধারণের অভাব এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে বহু ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অনুঘটকে পরিণত হয়েছে।

সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে

২০১৭ সালে সেন্টমার্টিন্সকে যতটা সৌন্দর্যময় দেখেছিলাম, যে পরিমাণ সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর দেখা পেয়েছিলাম, ২০২৩-এ গিয়ে তার কিছুরই দেখা পাইনি। মৃতপ্রায় এক সেন্টমার্টিন্স ছিল তখন। সেন্টমার্টিন্স বাদেও সোনাদিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সন্দীপ, নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, চরকুকরি মুকরি, পটুয়াখালী, বরগুনা, পাথরঘাটা থেকে সুন্দরবন সব জায়গার একই অবস্থা। অনেকটাই বিপন্নতার মুখে পড়েছিল জীববৈচিত্র্য। 

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়টি মূলত ঘটেছে প্রকল্পকেন্দ্রিক, যার ফলে সামগ্রিক এবং সময়নির্ভর সংরক্ষণ বিষয়গুলো কখনোই ফুটে ওঠেনি এবং উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে প্রতন্ত্য অঞ্চল। আর সংরক্ষণের বাইরেই থেকে গিয়েছে গুরুত্ব পাওয়ার মতো বিষয়গুলো। 

বেড়েছিল প্রাণীর প্রতি সহিংসতা 

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাণির প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা, অসহনশীলতা, নির্দয়তা, বা ভ্রান্ত বা ভুল ধরণা, ক্রমেই বন্যপ্রাণী এবং মানব সংঘাত বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিরূপ ধারণা ক্রমেই বাড়িয়েছে। যার ফলাফল স্বরূপ ক্রমেই মানুষের প্রাণীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। পাশাপাশি আবাসস্থল কমার কারণে তৈরী হয়েছে প্রাণীর আশ্রয়স্থলের অভাব। সংঘাতের ফলে প্রাণীও যেমন আক্রান্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি মানুষও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। 

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃতি সংরক্ষণের উপর আছে প্রতিশ্রুতির অভাব এবং নতজানু হয়ে সংরক্ষণকরার কারনে বিগত সময়ে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ব্যপকহারে কমে গিয়েছে। 

বিগত সময়গুলোতে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকারের অভাবে মূলত প্রকল্পকেন্দ্রিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ ছিল। দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণই প্রধান প্রবণতা হয়ে ওঠে, যেখানে প্রকৃত সংরক্ষণের চেয়ে বরাদ্দ, ব্যয় ও অবকাঠামো নির্মাণ অধিক গুরুত্ব পায়। প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন, প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং বহু ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থলের বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বিশেষজ্ঞদের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সংরক্ষণ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে ফলপ্রসূ না হয়ে বরং প্রকল্পনির্ভর সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গড়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত করেছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তরুণদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই খাতের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাব এবং নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণরা বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা সহায়তা ও নীতি–সমালোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রনির্ভর থাকা সংরক্ষণ কার্যক্রমে এই তরুণ অংশগ্রহণ নতুন শক্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি যুক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে আরও গণমুখী ও টেকসই করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ–সংক্রান্ত গবেষণা ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবশালী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিদ্যমান অন্তর্দ্বন্দ্ব তরুণ গবেষকদের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অন্যতম অন্তরায়। রাজনৈতিক মতাদর্শ, গবেষণার ধরণ, গবেষণার বিষয়বস্তু, প্রজাতি অগ্রাধিকার, পদ্ধতি নির্বাচন কিংবা তথ্যের মালিকানা নিয়ে পারস্পরিক বিরোধের কারণে একটি সুস্থ ও সহযোগিতামূলক গবেষণা পরিবেশ গড়ে উঠছে না। এর ফলে তরুণ গবেষকরা নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক চর্চার বদলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা সুযোগ, প্রকাশনা বা ফিল্ডওয়ার্কে অংশগ্রহণ যোগ্যতার পরিবর্তে পক্ষপাত ও আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তরুণদের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব নতুন গবেষণা উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করে, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে দমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তরুণদের বন্যপ্রাণী গবেষণা ও সংরক্ষণ ক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গুটি কয়েক তৎকালীন সময়ে প্রভাবশালী শিক্ষকদের এরূপ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ হারিয়েছে মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনেক সম্ভবনাময় তরুণ যারা বহির্বিশ্বে গবেষণায় নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ খাতে বেশ কিছু বিশেষ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের প্রকল্পকেন্দ্রিক দুর্নীতি তরুণদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বহু ক্ষেত্রে গবেষণা ও সংরক্ষণ প্রকল্পগুলো বাস্তব সংরক্ষণ চাহিদার বদলে বরাদ্দ, ভাতা ও ব্যক্তিগত লাভকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত হয়। এতে প্রকল্পে অংশগ্রহণ, গবেষণা সহকারী নির্বাচন কিংবা প্রশিক্ষণের সুযোগ যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচিতি ও আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ আগ্রহী ও সক্ষম তরুণরা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা ও পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রকল্পনির্ভর দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও সংরক্ষণ খাতের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশকে দক্ষ বন্যপ্রাণী গবেষক ও সংরক্ষণকর্মী থেকে বঞ্চিত করে। 

তবে আশার কথা হলো, গত জুলাই, ২৪ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের এই সেক্টরটি আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বহুদিন ধরেই অবহেলিত একটি খাত ছিল। প্রকল্পনির্ভর কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বন বিভাগের মূলধারার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহিত করা এবং পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা ছিল কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সেই অবস্থান থেকে বের হয়ে বন বিভাগকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার।

এই সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো বন বিভাগের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমকে পৃথক, শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র একটি উইং-এ পরিণত করা। শুরু থেকেই মাননীয় উপদেষ্টা এই কাঠামো পুনর্গঠনে গুরুত্ব দেন এবং আধুনিক ধারণা অনুযায়ী স্বতন্ত্র একটি উইং গঠনের উদ্যোগ নেন, যা গত ২৩ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।

এর মাধ্যমে দেখা গেল বন বিভাগে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ-কেন্দ্রিক অনেকগুলো পদ তৈরি হয়েছে। যদি সঠিক ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা হয় তাহলে এটি হয়তো হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আগ্রহী সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য এক নতুন দুয়ার।

অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানগুলোতে পিকনিক নিষিদ্ধসহ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। লাউয়াছড়া এবং সাতছড়িকে আনা হয়েছে বিশেষ মনিটরিংয়ের আওতায়। ঢাকার কিশোর-তরুণদের প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করতে পূর্বাচলে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে দেশের প্রথম ন্যাচার লার্নিং সেন্টার।

সংরক্ষিত এলাকার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সরকার ইতোমধ্যে একটি জলাভূমিকে প্রাণী অভয়ারণ্য এবং দুটি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলকে বিশেষ সুরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। আরও ছয়টি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বের প্রথম ওয়াইল্ডলাইফ অলিম্পিয়াড আয়োজন করেছে বাংলাদেশ।

বৃক্ষ-প্রাণের তথ্যসমূহ নথিবদ্ধ করতে প্রথমবারের মতো তৈরি করা হচ্ছে বৈচিত্র্য নিবন্ধন (Biodiversity Register)। পাশাপাশি নতুন করে হালনাগাদ করা হচ্ছে বন্যপ্রাণীর লাল তালিকা।

মানুষের বসতভিটা ও জলাভূমির আশপাশে থাকা বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। সচেতনতা ভ্যান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মানুষকে বন্যপ্রাণী রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে। শিক্ষাক্রমে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আকাশমণি ও ইউক্যালিপ্টাসের মতো আগ্রাসী বিদেশি বৃক্ষ দেশি বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করছিল। বর্তমান সরকার এসব গাছের চারা উৎপাদন, রোপণ ও বিপণন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে, ফলে দেশি বৃক্ষরাজি ও তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীরা নতুন করে আশ্রয় পাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শতবর্ষী, প্রাণীবান্ধব গাছগুলোকে ঘোষণা করা হয়েছে 'স্মারক বৃক্ষ' হিসেবে।

প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষার্থী এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বন্যপ্রাণী গবেষণা উৎসাহিত করতে সরকারি অর্থায়ন চালু হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করতে শুরু হয়েছে বন বিভাগের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম।

প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ অবহেলা করে কোনো দেশই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না এই উপলব্ধি থেকেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দিয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।

গত ১৩ মাসে মোট ৫,০৯৩.৪৪ একর অবৈধ দখলমুক্ত বনভূমি উদ্ধার করে বনায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া ১৪,৪৪৬.৬৩ একর বনভূমির বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শালবন পুনরুদ্ধারে সরকার কাজ শুরু করেছে। আগ্রাসী বিদেশি গাছ অপসারণ করে পুনরায় রোপণ করা হচ্ছে শাল ও শাল-সহযোগী বৃক্ষ। চট্টগ্রামের চুনতি, শেরপুর, সোনাদিয়া এসব অঞ্চলে শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম।

দেশে বিলুপ্তপ্রায় 'দেশি ময়ূর' পুনঃপ্রবর্তনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষের সঙ্গে হাতি, মেছোবিড়ালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সংঘাত নিরসনে গৃহীত হয়েছে সচেতনতামূলক কর্মসূচি। পূর্বে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। আবাসস্থল ধ্বংস, পানির উৎস নষ্ট হওয়া, খাদ্যস্বল্পতা ও আগ্রাসী উদ্ভিদের বিস্তারের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছিল। বর্তমান সরকার হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে শেরপুর, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও টেকনাফে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

মেছোবিড়ালসহ অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; উদযাপন করা হয়েছে দেশের প্রথম বিশ্ব মেছোবিড়াল দিবস। পাশাপাশি গঠন করা হচ্ছে ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট ফান্ড।

ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটকে শক্তিশালী করা হয়েছে; প্রাণী পাচার এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। সাফারি পার্ক থেকে হারিয়ে যাওয়া লেমুর উদ্ধার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। সাফারি পার্কগুলোতে প্রাণীর কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পুনর্গঠিত হয়েছে।

২০২৪ সালের শুরুতে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী আমদানির অনিয়মের কারণে CITES বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বর্তমান সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং তা বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

টাঙ্গুয়ার হাওড়, মারজাত বাওড়, সোনাদিয়া, জাফলং-ডাউকি, হালদা নদী, কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল এবং সেন্ট মার্টিনসসহ পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলো রক্ষায় নেওয়া হয়েছে কার্যকর পদক্ষেপ। সেন্ট মার্টিনে পর্যটন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় অধিবাসীদের বিকল্প জীবিকায় সহায়তা করা হচ্ছে। দ্বীপে পুনরায় ফিরছে প্রাণের স্পন্দন। 

সুন্দরবনের ইসিএ এলাকায় নতুন প্রকল্প নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বাঘ, হরিণ ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষায় বাড়ানো হয়েছে নিয়মিত টহল।

বন, পরিবেশ, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত নীতি, বিধি ও আইনগুলো সময়োপযোগী করে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইনকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠবে।

সবকিছু মিলিয়ে একটি বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ক্ষেত্রটি পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। পরবর্তী সরকার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিলে এবং এই জাগরণের ধারাকে অব্যহত রাখলে তা হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য আশাজাগানিয়া।


  • আশিকুর রহমান সমী: বন্যপ্রাণী পরিবেশবিদ, গবেষক ও লেখক

Related Topics

বন্যপ্রাণী / বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ / বন্যপ্রাণ

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • জামায়াতে ইসলামী ও শফিকুর রহমানের বিভিন্ন পোস্টের স্ক্রিনশট। কোলাজ: টিবিএস
    শফিকুর রহমান: এক স্বঘোষিত বিরোধী দলীয় নেতার অদ্ভুত কাহিনি
  • ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দুই উপদেষ্টা বাম থেকে- স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ছবি: গেটি/ ভায়া দ্য নিউ রিপাবলিক
    কুশনার, উইটকফ দুজনেই নির্বোধ, তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প
  • জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
    জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
  • ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
    ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নির্মম বোমাবর্ষণ চলছেই, ২০ বছরে ভিয়েতনামে ফেলা হয় ৭৫ লাখ টন
  • বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। ফাইল ছবি: বাসস
    '২০৪২ সালেও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকবেন' বক্তব্য, জয়নুল আবদিনকে সতর্ক করল বিএনপি
  • মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর গত ৭ মার্চ ওমানের মাস্কাট উপকূলে নোঙর করে আছে ‘লুওজিয়াশান’ তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: বেনোয়া তেসিয়ের/রয়টার্স
    যুদ্ধ 'শিগগিরই' শেষ হবে, ইরানে হামলা করার মতো 'কার্যত আর কিছুই বাকি নেই': ট্রাম্প

Related News

  • বাংলাদেশ হবে মেছোবিড়ালের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
  • দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১২ ‘হিমালয় গৃধিনী’ শকুন উদ্ধার, পাঠানো হলো হবিগঞ্জ পুনর্বাসন কেন্দ্রে
  • সৌন্দর্যই যে পাখিদের জীবনে বিপন্নতার ছায়া
  • কুড়িগ্রামে বিরল প্রজাতির হিমালয় গৃধিনী শকুন উদ্ধার
  • গাজীপুরে মানুষ ও শিয়ালের বিরল বন্ধুত্ব, নাম ধরে ডাকলেই জঙ্গল থেকে ছুটে আসে ‘লালু’

Most Read

1
জামায়াতে ইসলামী ও শফিকুর রহমানের বিভিন্ন পোস্টের স্ক্রিনশট। কোলাজ: টিবিএস
মতামত

শফিকুর রহমান: এক স্বঘোষিত বিরোধী দলীয় নেতার অদ্ভুত কাহিনি

2
ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দুই উপদেষ্টা বাম থেকে- স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ছবি: গেটি/ ভায়া দ্য নিউ রিপাবলিক
আন্তর্জাতিক

কুশনার, উইটকফ দুজনেই নির্বোধ, তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প

3
জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ
বাংলাদেশ

জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ, বিভাগীয় শহরে বিক্রি ১৫% কমানোর নির্দেশ

4
ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস
ফিচার

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নির্মম বোমাবর্ষণ চলছেই, ২০ বছরে ভিয়েতনামে ফেলা হয় ৭৫ লাখ টন

5
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। ফাইল ছবি: বাসস
বাংলাদেশ

'২০৪২ সালেও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকবেন' বক্তব্য, জয়নুল আবদিনকে সতর্ক করল বিএনপি

6
মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর গত ৭ মার্চ ওমানের মাস্কাট উপকূলে নোঙর করে আছে ‘লুওজিয়াশান’ তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: বেনোয়া তেসিয়ের/রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ 'শিগগিরই' শেষ হবে, ইরানে হামলা করার মতো 'কার্যত আর কিছুই বাকি নেই': ট্রাম্প

EMAIL US
contact@tbsnews.net
FOLLOW US
WHATSAPP
+880 1847416158
The Business Standard
  • About Us
  • Contact us
  • Sitemap
  • Privacy Policy
  • Comment Policy
Copyright © 2026
The Business Standard All rights reserved
Technical Partner: RSI Lab

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net