মানুষের অনুভূতি হারিয়ে যায় না, মাঝে মাঝে চাপা পড়ে যায়
নানা কারণে মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাদের অনুভূতি বোধহয় কমে যাচ্ছে বা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন চারপাশে যে কত ধরণের দুঃখজনক, মর্মন্তুদ ও নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে যে, তার হিসাব রাখা কঠিন হয়ে গেছে। কোনো ঘটনায় কয়েক দিন খুব কষ্ট হয়, মন ছটফট করে; অথচ দেখা যায় কোনো ঘটনাই দু-এক দিনের বেশি আমাদের বিষণ্ণ করে রাখতে পারছে না। কারণ, তার চেয়েও ক্রূর বা বেদনাদায়ক অন্য কোনো ঘটনা এসে সেই জায়গা দখল করে নেয়। যখন ক্রমশ কষ্টকর ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।
অনুভূতি মানে হলো কোনো কিছু উপলব্ধি করা বা অনুভব করা; যা শারীরিক হতে পারে, যেমন স্পর্শ বা ব্যথা। আবার তা মানসিকও হতে পারে, যেমন আনন্দ, দুঃখ কিংবা ভালোবাসা। সুখ-দুঃখের বোধ বা কোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে মানসিক প্রতিক্রিয়াকেও অনুভূতি বোঝায়। এই বোধ কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের ভেতরের উপলব্ধি বা ধারণাও হতে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়, মানুষের সুখ ও দুঃখের অনুভূতি পাশাপাশি কাজ করে। যেমন, গত ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এত বিশাল জানাজা অতীতে কেউ কখনো দেখেননি। এই জানাজায় রাজনীতির চেয়ে আবেগই বেশি কাজ করেছে। দূরদূরান্ত থেকে সর্বস্তরের মানুষ নিজের ইচ্ছায় শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন।
আবার সেই রাতেই দেখা গেল, সব নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভয়াবহভাবে আতশবাজি ও পটকা ফুটিয়ে নতুন বছরকে বরণ করছেন একদল মানুষ। এখানে কেবল তাদের নিজেদের আনন্দের অনুভূতি কাজ করেছে। বাকি মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু কিংবা পশুপাখিদের কী অসুবিধা হচ্ছে, সেই অনুভূতি কাজ করছেনা।
মানুষের শারীরিক ও মানসিক অনুভূতি পরস্পর নির্ভরশীল। মন খারাপ থাকলে শরীর খারাপ লাগে, আবার শরীর খারাপ হলে মনও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। যেমন, যে রাতে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়, সেদিন যারা গণমাধ্যমে সেই দৃশ্য দেখেছেন, তারা ভয়াবহভাবে আতঙ্কিত, শোকার্ত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন। সারা রাত তারা কেউ ঘুমাতে পারেননি। রাতেই অনেকে ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েন, কারও কারও রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল।
এর পাশাপাশিই আমরা দেখলাম দীপু দাসকে গাছে ঝুলিয়ে পেটানো হচ্ছে এবং তার শরীরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হলো। নিচে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ সেই দৃশ্য দেখলেন, ভিডিও করলেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করলেন। ভয়ে বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, কেউ কোনো প্রতিবাদ করলেন না বা বাধা দিলেন না। এর মাধ্যমেই আমাদের অনুভূতির শূন্যতা বা আবেগকে অবদমিত করে রাখার বিষয়টি বোঝা গেল।
মনোবিজ্ঞানে 'অনুভূতি' শব্দটি আবেগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটি সাধারণত আবেগের সচেতন বিষয়গত অভিজ্ঞতাকে বোঝায়। এখন প্রশ্ন ওঠে, আমাদের আবেগ কি কমে গেছে, নাকি হারিয়ে গেছে? কেন তবে আমরা নিস্পৃহভাবে ভয়াবহ বা মর্মান্তিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি?
আমাদের ভেতরে এখনও যে আবেগ ও অনুভূতির তীব্রতা আছে, তা সেদিন ছায়ানটের সামনে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে গিয়ে বুঝলাম। সংস্কৃতির ওপর সহিংস আক্রমণের বিরুদ্ধে অনেকেই সমবেত হয়েছিলেন ছায়ানট ভবনের সামনে। যারা সেখানে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই বেশ কিছুদিন ধরে উপলব্ধি করছিলেন যে, বাঙালি সংস্কৃতির ওপর হামলা জোরদার হচ্ছে, কিন্তু আমরা প্রতিবাদ জানাতে পারছি না।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ছায়ানটের সেই আয়োজনে যখন 'ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা' গানটি শুরু হলো, বুঝলাম দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার পর আবার সেই কান্না দেখতে পেলাম। এটাই হলো আবেগ, অনুভূতি। এই আবেগ নানা কারণে অবদমিত হয়ে ছিল; উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে তা প্রকাশিত হয়েছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় আমাদের 'এমপ্যাথি' বা সমানুভূতি পড়ানো হয়েছিল। তখন এমপ্যাথি আমাদের কাছে নতুন বিষয় ছিল। 'সিমপ্যাথি' বা সহানুভূতি বুঝতাম, কিন্তু সমানুভূতি ছিল নতুন অনুভব ভাবনা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমানুভূতি হচ্ছে 'অন্যের জুতো পায়ে দিয়ে হাঁটা'।
সমানুভূতি মানে হলো অন্যের আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও কষ্টকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করা এবং তার অংশীদার হওয়া। এটি কেবল সমবেদনা নয়, বরং নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে তাদের অনুভূতি অনুভব করার ক্ষমতা; যা মানুষকে অন্যের প্রতি সংবেদনশীল ও সহযোগী করে তোলে। মানুষ যতক্ষণ অবিকল সেই পরিস্থিতিতে না পড়ে, ততক্ষণ সে বুঝতে পারে না, ব্যক্তির প্রকৃত কষ্টটা কী ও কতখানি।
আমার খুব কাছের এক বন্ধুর সন্তান জন্মের দুদিন পর মারা গেল। বন্ধুটি পাগলের মতো কাঁদছিল। আমরা ওর পাশে বসে কাঁদছিলাম এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সন্তান হারানোর পর একজন মায়ের কতটা কষ্টের অনুভূতি হতে পারে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তখনো আমার সন্তান হয়নি।
এর কয়েক বছর পর যখন আমার সন্তান জন্ম নিল এবং তাকে আমার কোলে দেওয়া হলো, সেই মুহূর্তে আমি প্রথম অনুভব করলাম সন্তান হারানোর কষ্ট কতটা মর্মান্তিক হতে পারে। বুঝলাম, বন্ধুর সন্তান বিয়োগের পর তার যে যন্ত্রণা হয়েছিল, তা আমি আমার নবজাতক সন্তানের মুখ দেখে আজ অনুভব করতে পারছি।
তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়েছিল, আমার এই সন্তানটি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়, তাহলে কী হবে, কতটা কষ্ট পাবো আমি, আমার বন্ধু সেদিন ঠিক সেই কষ্টটাই পেয়েছিল। ওর সন্তানের মৃত্যুর পর আমরা পাশে বসে সহানুভূতি জানিয়েছিলাম; আর আমার সন্তান জন্ম নেওয়ার পর সন্তান হারানোর কথা ভেবে যে অনুভূতিটা আমার হলো, সেটাই সমানুভূতি। নিজেকে ঠিক সেই দুঃখী মানুষটার জায়গায় বসিয়ে তার দুঃখ অনুভব করাই হলো সমানুভূতি।
সমানুভূতি উপলব্ধি করা এতটাই কঠিন যে, আমরা তা ঠিক কতটা বুঝতে পারি, সে বিষয়েও আমাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। মানুষ মানুষের কষ্টের বা আনন্দের অনুভূতি কীভাবে ও কতটা বুঝতে পারে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে অন্যদের অনুভূতি গ্রহণ করে, মনোবিজ্ঞানীরা সেটাও জানার চেষ্টা করছেন।
অনুভূতি গ্রহণ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে মাঝেমধ্যে অসাড়তা দেখা যায়। কেন এমনটা হয়, তা বোঝাতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা নানা মত দিয়েছেন। ট্রমা, সহিংসতা ও বারবার দুঃসংবাদ দেখলে মানুষ দুঃখ কম অনুভব করতে শুরু করেন।
মনোবিজ্ঞানীরা একে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেসের সাধারণ লক্ষণ বলে মনে করেন। থেরাপি, মাইন্ডফুলনেস,সোশ্যাল সাপোর্ট, ভ্রমণ, পরিপূর্ণ বিশ্রাম এবং স্বজন ও বন্ধুদের কাছে থাকার মাধ্যমে মানুষ তার আবেগ-অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
একই ধরনের ভয়ংকর বা দুঃখজনক ঘটনা বারবার দেখলে মানুষের মন ও মস্তিষ্ক সবসময় আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। একে মানুষের উদাসীনতা বলা ঠিক হবে না, বরং একে বলা যেতে পারে 'অভ্যাসজনিত প্রতিক্রিয়া হ্রাস'।
আসলে ঘটনার প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের আবেগই যখন কম অনুভূত হয়, তখন বুঝতে হবে এটি একধরনের বিষণ্ণতা। এই অবস্থায় আনন্দ বা দুঃখ কোনোটিই মনের ওপর প্রভাব ফেলে না।
মানুষ যখন মনে করে যে কিছুই বদলানো যাবে না বা বদলানো কঠিন হবে, তখন তার অনুভূতিও নিস্তেজ হয়ে যায়। নৃশংস বা দুঃখজনক ঘটনার প্রতিও তার আগ্রহ, প্রতিবাদ বা সহমর্মিতার ভাব কমে যায়। মব কালচারের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। মানুষ যখন দেখে যে বাধা দিয়ে বা অভিযোগ করে কোনো লাভ হচ্ছে না, তখন সাধারণ মানুষ চুপ থেকে দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
যারা প্রতিদিন অন্যের দুঃখ বা সংকটের মুখোমুখি হন যেমন, ডাক্তার; তাদের মধ্যে সমানুভূতি কম দেখা যায় বলে সাধারণ মানুষ মনে করেন। কারণ, একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন রোগীর কষ্ট ও মৃত্যু দেখতে হয়, শুনতে হয় মানুষের আহাজারি। এমনকি যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকেন, তাদের মধ্যেও অনুভূতি কম দেখা যায়।
মনোবিজ্ঞান এ-ও বলে যে, খারাপ খবরের অবিরাম প্রবাহ মানুষের আবেগতাড়িত হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। বর্তমানে দেশে প্রায় প্রতিদিন একাধিক মর্মান্তিক ঘটনার কথা শুনছি; আমরা কি প্রতিটির প্রতি একইভাবে সাড়া দিতে পারছি?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন চাপ, ভয় বা খারাপ খবরের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্ক নিজেকে বাঁচাতে অনুভূতিকে ধীরে ধীরে 'নিঃশব্দ' করে দেয়। মানুষের অনুভূতির এই বোধ স্থায়ী নয়। অনুভূতি কমে যাওয়া মানেই মানুষ রূঢ় হয়ে যাচ্ছে বা অনুভূতি হারিয়ে ফেলছে—তা নয়; বরং এটি একধরনের মানসিক আত্মরক্ষা।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ হিসেবে আমরা মৌলিকভাবেই সহানুভূতিশীল। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা অন্য মানুষের অনুভূতি স্পষ্ট টের পাই। আধুনিক মানুষ অনেক সময় মনে করেন তারা এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না যে, আমাদের ওপর আশপাশের মানুষের কতটা গভীর প্রভাব রয়েছে। সেই মাত্রা মাঝেমধ্যে এতটাই বেশি হয় যে, মানুষ নিজেকে আর বিচ্ছিন্ন ভাবেন না, বরং পরিবেশ ও সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে দেখেন।
অনুভূতি কমে যাওয়া বা আবেগ অসাড় হয়ে যাওয়া মনের এক জটিল অবস্থা। তবে আশার কথা হলো, বড় কোনো মানবিক ঘটনায় মানুষ এখনো রাস্তায় নামেন, রক্তদান করেন, বিপদে ত্রাণ নিয়ে ছোটেন এবং ব্যক্তিগত শোকে আগের মতোই ভেঙে পড়েন। অর্থাৎ মানুষের অনুভূতি আছে, কিন্তু সব ঘটনার জন্য আলাদা করে অনুভব করার মতো মানসিক শক্তি নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অনুভূতি হারিয়ে যায় না, মাঝে মাঝে চাপা পড়ে যায়। ঘন ঘন রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রতিবাদ, মব হামলা, খুন, ডাকাতি ও অস্থিরতা মানুষকে ট্রমাটাইজড করে। মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা শোকের কারণে অনুভূতি কমে যেতে পারে। এমন অবস্থায় মানুষ আনন্দ, দুঃখ বা অন্য কোনো আবেগকে সঠিকভাবে অনুভব করতে পারে না। এ ছাড়া আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, বা সম্পর্কের অবনতিও এর অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে আবেগ প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। নিজেদের প্রয়োজনেই এই আবেগকে ধরে রাখতে হবে। নতুবা অন্যায়ের প্রতি সহনশীলতা বেড়ে যাবে; 'অন্যের ক্ষতি হচ্ছে হোক, তাতে আমার কী'—এই মনোভাব তৈরি হতে পারে। এতে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাই আমাদের উচিত ছোট ছোট পরিসরে মানুষকে সাহায্য করা। কোনো কিছু গোপন না করে নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলা শুরু করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা না দেখে মানবিক গল্পগুলো সামনে আনতে হবে। বাঁচতে চাইলে আবেগ ও অনুভূতিকে চেপে রাখা যাবে না।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
