এত আন্দোলন করেও ভোটের মাঠে নারী প্রার্থী নেই কেন?
আর মাত্র কয়েক দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেমন হবে? কোন দল কতটি আসন পাবে? কোন পরাশক্তি কোন দলকে সমর্থন জানাতে যাচ্ছে—এসব নিয়ে চলছে এন্তার জল্পনা-কল্পনা। শুধু এই নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
চব্বিশের রাজপথে খুবই সক্রিয় ছিলেন নারীরা। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরেই বোঝা গেল, নারী কীভাবে কায়া থেকে ছায়া হয়ে গেল। সরকারে, দেশ বাঁচানোর কমিশনে, মতামত প্রদান অনুষ্ঠানে ক্রমশই অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকলেন রাজপথে আন্দোলনকারী নারীরাই।
এক মাস পরে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে মাত্র ৪ শতাংশ। একটি 'গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে' নারীদের এত কম অংশগ্রহণ সমাজের সেই চিরচেনা পিতৃতান্ত্রিক রূপকেই তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, মোট ২,৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ১০৯ জন। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, অথচ নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৪ শতাংশ। এটা কি চরম ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি নয়?
রাজপথের সেই নারীরা কোথায় গেলেন? জাতীয় নির্বাচনে নারীর এত কম উপস্থিতি কি ভবিষ্যতে নারী অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আরও দুর্বল করে তুলবে না? অবশ্য দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে আমরা সব সময়ই পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখে আসছি। এখানে নারীকে টিকে থাকতে দেওয়া হয় না। আবার এও সত্য, নানাবিধ কারণে নারী পরাস্ত হন। শুধু নির্বাচনেই নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও নারীর কণ্ঠ দুর্বল হয়ে যায়। ভবিষ্যতে এই কণ্ঠ আরও দুর্বল হবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, অন্যদিকে মাঠে থাকা নারীদেরও ঠেলে সরিয়ে দিতে তারা একবারও ভাবে না। ঘোষিত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহারই বহিঃপ্রকাশ। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
বিএনপির খুব সক্রিয় নেত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর তিনি এমন কিছু বিপ্লবী বক্তব্য দিয়েছেন, যা আলোচনায় এসেছে। ঠিক নির্বাচনের আগে এসে রুমিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো। তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগও সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও তাই করেছিল। আইভীর বদলে তারা বেছে নিয়েছিল বিতর্কিত একজন পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচিত প্রথম নারী মেয়র আইভী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, নিজে রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। নারী বলেই হয়তো দৌড়ে পিছিয়ে পড়লেন।
সমাজে নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি খুব প্রবল। সেখানে রাজনৈতিক দলের সমর্থন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নারীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে কতটা সহজবোধ করবেন? এছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্ন। শুধু কি রাজনৈতিক দলে স্থান না দেওয়া, নারীকে একা করে ফেলা হচ্ছে সর্বত্র। যাঁরা নারীকে পাশে নিয়ে একদিন রাজপথ কাঁপিয়েছেন, সেই ছেলেরাই ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর চেহারা পাল্টে ফেলেছেন। সবাই যার যার মতো 'বয়েজ ক্লাব' তৈরি করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, সাইবার স্পেসে নারী প্রার্থীদের প্রতি সহিংসতার মাত্রা তত বাড়ছে। ডাকসু, চাকসু, রাকসুসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তাদের নির্বাচনি পোস্টের নিচে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য থেকে শুরু করে ইনবক্সে অশ্লীল বার্তা পাঠানো, এমনকি ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারা, কেন এসব করছে? বাইরের কেউ নয়, সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই এসব কাজ করছে বলে ভুক্তভোগীরা মনে করেন। কারণ সামনাসামনি আজেবাজে কথা বলে ঘায়েল করার চেয়ে সাইবার বুলিং করে হেনস্তা ও দুর্বল করা সহজ।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি ও রাজনীতির উত্থান হয়েছে। কাজেই নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সামাজিক পরিসরে হেনস্তার ঘটনাও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী প্রার্থীর সমর্থক-কর্মীরা নারী প্রার্থীদের ভোটের মাঠ থেকে হটিয়ে দিতেও চাইছেন।
আমাদের দেশের নারী অধিকার সংগঠনগুলো নারী নির্যাতনের বিচারের দাবিতেই শক্তভাবে মুখ খুলতে পারছে না, সেখানে নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তারা কী বলবেন? অথচ আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নারীর স্বাধিকার ও অধিকার আন্দোলনগুলোর পাশাপাশি ভূমি আন্দোলন, নারী শিক্ষার আন্দোলন, শিল্প ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং গণমাধ্যমে টিকে থাকার সংগ্রামে অনেক নারী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
এমন অনেক নারী নেত্রীকে আমরা পেয়েছি, যারা এমন এক সময় ও অবস্থান থেকে কাজ করে আসছেন, যখন সমাজে নারীর অবস্থান ছিল অধস্তন। শিক্ষা-দীক্ষাহীন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশে ছিল নারীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এই অবস্থার মধ্যেও যারা একটু সুযোগ পেয়েছেন, তারাই সামাজিক প্রতিরোধ ভেঙে বের হয়ে এসেছিলেন। তাঁরা যে শুধু নিজেরাই বের হয়ে এসেছেন তা নয়, আলোকবর্তিকা হাতে পথ দেখিয়েছেন আরও অনেক নারীকে। ব্রিটিশ আমলে মুসলিম নারীরা অনেক পেছন থেকে নানা রকম রক্ষণশীলতার বেড়ি চূর্ণ করে তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। ইলা মিত্র থেকে জায়েদা খাতুন—প্রত্যেকেই আন্দোলন করেছেন পুরুষের পাশাপাশি ভূমির ওপর ন্যায্য অধিকারের দাবিতে।
তবে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের রাজনৈতিক ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধে নারীরা ছিলেন বড় শক্তি। স্বাধীনতার পর শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও রাজনীতির পরিসরে নারীর অবস্থান জোরালো হলো না। যদিও সত্তরের দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন দাবিতে অত্যন্ত সক্রিয় ও শক্তিশালী নারী আন্দোলন হয়েছে। দাবিগুলো অর্জিত হয়েছে নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম, তাঁদের আত্মত্যাগ, কাজ, অবদান ও সাহসের ফলে। নারীর মুক্তি সংগ্রামের ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমরা পেয়েছি অসংখ্য প্রগতিশীল নারী নেত্রীকে, যাঁরা নিজেরা আলোকিত হয়েছেন এবং অন্যদের পথ দেখিয়েছেন।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে রাজপথের আন্দোলনে বা নারীর অধিকারবিষয়ক দেনদরবারে এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় নারীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণ ক্রমেই কমে আসছে। অতীতে অধিকার আদায়ে বা মানবাধিকারের দাবিতে, ছাত্র আন্দোলনে, রাজনৈতিক সংগ্রামে নারীকে যতটা এগিয়ে আসতে দেখেছি, আজ সেই গতিতে কোথায় যেন একটা টান পড়েছে।
আজকের দিনে 'জুলাই সনদ' খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কিন্তু নারীর মনোনয়নের বিষয়ে জুলাই সনদে কী বলা হয়েছে? সেটা কি মানা হচ্ছে? কেন রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থী মনোনয়নে দায়সারা ভাব দেখাচ্ছে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কেন কিছু বলছে না? নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে যেকোনো নির্বাচনী নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্ত হওয়া উচিত।
আমাদের দেশে রাজনীতিতে নারীর অগ্রযাত্রা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সময় যত সামনে এগোচ্ছে, নারী শক্তি তত পিছিয়ে পড়ছে। তাদের সক্রিয়তাকে বাধাগ্রস্ত করছে সমাজ। রাজপথের আন্দোলনে ঠিক এর উল্টো চেহারা ছিল। তখন নারী ছিলেন সহযোদ্ধা, আর এখন নারী প্রার্থীর মনোনয়নকে দেখা হচ্ছে কোনো অনুগ্রহ ও প্রতীকী হিসেবে। এ কেমন কথা? কেন রাজনীতির মাঠে দলগুলোর কাছে নারী করুণার পাত্রীই হয়ে রইলেন? রাজনৈতিক দলগুলোর আলাদা 'নারী শাখা' মূলধারার রাজনীতি থেকে নারীকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে এবং রাখবে।
অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব এসেছে পরিবারতন্ত্র থেকে। কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এও ঠিক, শুধু বাংলাদেশ নয়—ভারত ও পাকিস্তানেও এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে। বাংলাদেশে যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীর উঠে আসার সুযোগ খুবই কম। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো পুরোনো দলেও দেখা যায় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রতিনিধিরা বঞ্চিত হয়েছেন। নারীরা ছাত্র রাজনীতি ও বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়, কিন্তু মূল নেতৃত্বে নারীকে দেখা যায় কম। এর অন্যতম কারণ নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা। মনে করা হয়, পুরুষের অনুগ্রহ ও সমর্থন নিয়ে নারী রাজনীতি করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চার সীমাবদ্ধতার কারণেই নারী নেতৃত্ব এগিয়ে আসতে পারছে না।
পূর্বের নির্বাচনগুলোতে বেশ অনেক নারী প্রার্থী ছিলেন। ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিএনপির নারী প্রার্থী এত কম কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন এ বিষয়ে বিবিসিকে বলেছেন, "বিএনপি মনে করছে, মাঠের রাজনীতিতে এখন শক্তিশালী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নির্বাচনে তাদের কোনো নারী প্রার্থী নেই। যখন জামায়াতে ইসলামীর বিপরীতে নারী প্রার্থী দেওয়া হবে, তখন আসলে ধর্মের ব্যবহার চলে আসবে। তাই সেই আসনে ওই নারীর হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটাই বাস্তবতা।"
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম ও নারী ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "গত দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলো নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছে, বেগম রোকেয়ার ছবিকে অবমাননা করা হয়েছে, নারী সংস্কার কমিশনকে জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে গালাগাল দিয়েছে। তখন কোনো দল তার প্রতিবাদ করেনি। বরং, নারী সংস্কার কমিশনকে গালাগালি দেওয়ার সময় এনসিপি উপস্থিত ছিল।"
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমরা কীভাবে আশা করছি রাজনীতির মাঠে নারীর সচল পদচারণা দেখতে পাব? জুলাই আন্দোলনে নারীরা যতটা ক্ষমতা দেখিয়েছেন, তাঁরাই যখন বাদ পড়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বা সংস্কার বিষয়ক আলোচনায়, তখন হতাশ হতেই হয়। সবগুলো আলোচনা ছিল নারী-বিবর্জিত। নারী বিষয়ক সিদ্ধান্তেও নারী ছিলেন না।
গত দেড় বছরের নারীবিহীন রাজনীতির ফল হতে যাচ্ছে এই নারীবিহীন ইলেকশন বা নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চা যদি এভাবেই নারীকে বাদ দিয়ে হয়, তবে ভবিষ্যৎ সুন্দর হতে পারে না; কারণ দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাই নারী।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
