সাখাওয়াত স্যার শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন বহুজনের অভিভাবকও
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন আমার শিক্ষক। শিক্ষক হওয়ার আগে থেকে উনি ছিলেন আমার বাল্যবন্ধু সুমির বাবা। সুমি 'বাবু' ডাকতো বলে সুমির বন্ধুরাও বাবুই ডাকতাম, মাঝেমধ্যে খালুও ডাকতাম।
১৯৭৪ সালে আমরা আসাদগেট নিউকলোনিতে যাওয়ার পর থেকেই সুমি আমার বন্ধু। ওদের ৯ নম্বর বিল্ডিং, আমাদেরটা ছিল ১০। প্রতিবেশী, খেলার সাথী তাই নিত্য আসা-যাওয়া ছিল ওদের বাসায়। ক্রমে ওই বাসাটাও আমার বাসার মতো হয়ে গেল।
নিউকলোনিতে সুমিদের ওই ছোট বাসাটি ছিল অনেকটা হোস্টেলের মতো। সুমির মা মালেকা খালার ১১ ভাইবোন অসময়ে বাবাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। মালেকা খালাই ছিলেন তখন কর্মরত এবং বিবাহিত। কাজেই ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন খালা এবং তাঁর স্বামী সাখাওয়াত আলী খান। খালুকে ওরা সবাই ডাকতো সাখাওয়াত দাদা। খালু আসলে ওদের বড় ভাই-ই ছিলেন। সেই বাসাতেই থাকতেন সুমির দাদু এবং আপু (নানিমা)।
নিউকলোনির বাসায় মামা–খালাদের বন্ধুবান্ধব, সুমির বন্ধুরা, খালুর সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী, খালার সহকর্মী, ব্যবসার পার্টনার, বিভিন্ন কারুশিল্পীদের আসা-যাওয়ায় যেন লেগেই থাকতো সকাল থেকে রাত অব্দি। সেখানেই আমাদের কবিতার দল স্বগতোক্তির রিহার্সেল চলতো, ক্যাবের মিটিং হতো।
আবার এরমধ্যেই কত মানুষ আসতেন থাকার জন্য, সাহায্য নেয়ার জন্য। মালেকা খালার কাছে আসা মানুষজনেরই পাল্লা ভারি ছিল। বাবু ছিলেন একমাত্র ছেলে এবং নিয়ম মেনে চলা মানুষ। তাঁর গল্পগুজব আড্ডা দেয়ার মানুষও ছিল লিমিটেড।
সেই বাসায় যখন-তখন কেউ একজন এসে ভাতের থালা নিয়ে বসে পড়াটা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় ছিল। ভাবটা এমন যেন এটা তাদের বাড়ি। খালু চাইলেই একা একা নির্বিবাদী একটা জীবন কাটাতে পারতেন। পারতেন সুমি-উপল এই দুই সন্তানকে নিয়ে বিলাসী জীবন কাটাতে। কিন্তু না, খালু সাখাওয়াত দাদা হিসেবে মালেকা খালার সব ভাইবোনকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। ওদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে চাকরি জীবন এবং বিয়ে দেয়ার দায়িত্বও পালন করেছেন অভিভাবকের মতো, কাউকে হারিয়ে যেতে দেননি। মালেকা খালার পরিবার যেন ছিল তাঁর নিজের পরিবার। নিজের সুখ-শান্তির চেয়ে দায়িত্বপালনই বড় হয়ে উঠেছিল।
সেই সময়ের, অর্থাৎ ৭০/৮০ দশকের পুরুষ ছিল আরো বেশি আধিপত্যবাদী। স্ত্রীর কথা ভাবা, স্ত্রীকে সম্মান করা, স্ত্রীর কাজকে নিজের কাজ মনেকরা বা স্ত্রীর এতবড় পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার মতো মানসিক অবস্থা ছিল খুব অল্প কিছু মানুষের। অথচ সাখাওয়াত স্যার ছিলেন সেই মানুষ, যিনি সবসময় খালার সব কাজে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। খালা আর খালুর সম্পর্কের রসায়নটা ছিল খুব সহজ, সুন্দর বন্ধুর মতো। খালাকেও দেখেছি খালুর সুবিধা-অসুবিধার দিকে দৃষ্টি দিতে। কাজের প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে ঘুরে এলেও বাবুর খোঁজ রাখতেন পুরোদস্তুর। স্যারের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মালেকা খালাই ছিলেন খালুর সবচেয়ে কাছের সাথী।
সাংসারিক জীবনে মালেকা খালা ছিলেন খানিকটা অগোছালো মানুষ, যেকোন সিদ্ধান্ত নিয়ে হুট করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়াটা ছিল তাঁর স্বভাব। অন্যদিকে সাখাওয়াত স্যার ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ, গোছানো ও ঠান্ডা মাথার মানুষ। তাড়াহুড়া করা ছিল স্যারের স্বভাববিরুদ্ধ। কঠিন নিয়ম মেনে চলতেন বলে ডায়েবেটিসের মতো অসুখ নিয়েই উনি ৩৭ বছর সুন্দরভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন। স্যারের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মাপা।
খালু বাসার ওই হৈচৈ এর মধ্যে বসেই তাঁর পিএইচডি'র কাজ করেছেন। ডাইনিং টেবিলের ওপর জমা করা ছিল অসংখ্য বই, পেপার আর কাগজপত্র। আমি তখনো স্যারের ছাত্রী হয়নি, সুমির বন্ধু হিসেবেই কাজ পেলাম পিএইচডি থিসিসের সাহায্যকারী হিসেবে। তখন কম্পিউটারের ব্যবহার ছিল খুব সীমিত, তাই আমরা হাতেই লিখতাম। স্যারের ছাত্ররা আসতেন বাসায়, পরবর্তীকালে তাঁদের কাউকে কাউকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকের পাশে থাকতে থাকতে, সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার ইচ্ছাটা মনে হয় আমার তখনই জেগেছিল।
বর্তমানে ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র মোস্ট টিচার ছিলেন স্যার। তিনি ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অবসরে যান। এরপর তিনি সেখানে পাঁচ বছর সুপার নিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বয়স হয়ে গেলেও টানা দুই ঘণ্টা বা তার চাইতেও কিছু বেশি সময় স্যার ক্লাস চালিয়ে যেতেন এবং ছাত্রছাত্রীরা ক্লান্ত হতো না। শিক্ষক হিসেবে সাখাওয়াত স্যার কতটা সফল ছিলেন, এটা তাঁর সব ছাত্রছাত্রীরা জানেন এবং তারা লিখেছেনও।
তাই আমি শিক্ষক সাখাওয়াত আলী খানকে নিয়ে বেশি আলোচনা না করে একজন অভিভাবক, পরামর্শক, পরোপকারী, সৎ, মর্যাদাবান ও উদার মানুষের ব্যক্তিগত বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছি। স্যারকে সম্পর্কের বাইরে গিয়ে একজন বাবা ও দায়িত্বশীল সংসারী মানুষ হিসেবে ছোটবেলা থেকে যেভাবে দেখেছি, সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
মালেকা খালার খুব ইন্টারেস্টিং একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। একদিন নতুন একটি জামা পরে ক্লাসে গেলাম। মনটা বেশ খুশি খুশি, কারণ সেইসময়ে নতুন জামা পাওয়াটা ব্যাপক আনন্দের একটা ব্যাপার ছিল। দুই ঈদ, জন্মদিন আর তেমন কোনো উৎসব ছাড়া নতুন জামা-কাপড় পাওয়া হয়ে উঠতোনা। মালেকা খালা আমাকে এই জামার কাপড়টা উপহার দিয়েছিলেন। সাদার মধ্যে ফ্লাওয়ারি প্রিন্টের এই কাপড়টা বন্ধুমহলে বেশ প্রশংসিত হলো বলে একটু বেশি খুশি হলাম।
১১টার দিকে ক্লাস থেকে বের হয়ে সেমিনার রুমে গিয়ে দেখলাম ওখানে সুমি বসে আছে এবং পরণে একই কাপড়ের জামা। সুমি তখন ওই বিভাগেরই তৃতীয় বর্ষে পড়তো। মালেকা খালা যখন কিছু কিনতেন, তখন সুমির বন্ধু, আর ওই বাসার অলিখিত সদস্য হিসেবে আমিও একটা ভাগ পেতাম। বুঝলাম খালা আমাকে আর সুমিকে একই কাপড় দিয়েছেন।
দুপুরে এডিটিং ক্লাসে গিয়ে দেখি সাখাওয়াত স্যার, মানে সুমির বাবাও ওই একই কাপড়ের শার্ট পরে ক্লাস নিতে এসেছেন। এবার কিন্তু আমার ফিট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সবাই আমার আর স্যারের দিকে তাকিয়ে কেইসটা বোঝার চেষ্টা করছে। ওরা ভাবছে সুমি আপা আজকে এই প্রিন্টের জামা পরেছে, রঞ্জনাও পরেছে ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে সাখাওয়াত স্যারও একই প্রিন্টের শার্ট পরে আসলেন কীভাবে?
যাহোক অন্য কোনো উপায় ছিল না আমার—ক্লাস বাদ দেয়ার বা জামা বদলানোর। স্যার হয়তো এই ম্যাচিং জামা ও শার্টের ব্যাপারটা ধরতেও পারলেন না, অবশ্য ধরতে পারার কথাও না।
বিকেলে 'চৈতালি' বাসে বাসায় ফিরবো বলে আমি আর সুমি ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ওই রুটের বাকিদের জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা অনেকেই একসাথে বাসে ফিরতাম। হঠাৎ দেখলাম চারতলা থেকে নেমে এলো আমাদের কুটি খালা, মানে সুমির ছোট খালা। ও ফিন্যান্স-এ পড়তো সুমির আগের ব্যাচ। ও এসেছে আমাদের সাথে বাসায় ফিরবে বলে। পরণে সেই একই কাপড়ের জামা!
এবার সত্যিই আমি আর সুমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। তিনজন একই কাপড়ের জামা পরে কীভাবে এখন বাসে যাবো এবং আসাদগেটে গিয়ে নামবো?
ওহ না, মালেকা খালাকে এর জবাব দিতে হবে। তিনি কেন আমাদের চারজনকে একই প্রিন্টের কাপড় দিলেন? কেন আমরা একই দিনে জামা আর শার্ট পরলাম? সম্ভবত সেদিন আমরা অন্য কোনো উপায়ে আলাদা আলাদাভাবে বাড়ি ফিরেছিলাম। পরে আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে পেরেছিলাম সুমির ভাই উপলেরও ওই একই কাপড়ের শার্ট আছে।
ঘটনা কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। প্রতিদিনের মতই ব্যাগটা বাসায় রেখে সুমিদের বাড়ি গেলাম আড্ডা দিতে। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। খালা শুধু আমাদের একই কাপড় পরিয়ে খান্ত হন নাই, ওনার ঘরের বিছানার চাদর, বালিশের কভার সব ওই একই কাপড়ের তৈরি।
সন্ধ্যায় খালা বাড়ি ফিরে এলে আমরা তাঁর কাছে জানতে চাইলাম এর মানে কী খালা? আপনি আমাদের সবাইকে জামা বানানোর জন্য একই প্রিন্টের কাপড় দিয়েছেন, ভালো কথা কিন্তু স্যারকেও কেন ওই কাপড়ের শার্ট বানিয়ে দিলেন? আজকে আমরা চারজন এক প্রিন্টের কাপড় পরে ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছি, এরমধ্যে তিনজন একই ডিপার্টমেন্টের।
উনি খুব নিরীহ একটা হাসি দিয়ে বললেন, "তোমাদের নূরজাহান খালা দোকান চালানোর জন্য এই কাপড়ের লট এনেছিলেন, সবটা কাপড় কাজে লাগেনি। ওর লস হচ্ছিল, তাই আমি একটা লট কিনে নিলাম, যাতে ওর উপকার হয়। এত কাপড়, তাই তোমাদের সবাইকে দিয়েছি।"
আমরা হতবাক, এর কি কোনো উত্তর হয়!
এইভাবেই জীবন এগিয়ে গেছে। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানকে দেখছি সেই ১৯৭৪ সাল থেকে—কখনো সুমির বাবা হিসেবে, কখনো আমাদের শিক্ষক, অভিভাবক হিসেবে। এরপর লম্বা একটা সময় অর্থাৎ ১৯৮৯ সালের পর স্যারের ক্লাস না করলেও, স্যারকে শিক্ষক হিসেবেই সম্মান করে গেছি। স্যার তাঁর ন্যায্যতা নিয়ে যেখানে গেলেন, সেখানেও তিনি সম্মানিত হোন এই প্রার্থনা করি।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
