যেকারণে কলা ঝুলিয়ে সংরক্ষণ করা জরুরি
কলা অনেকটা যেন টিকিং টাইম বোমার মতো। বাজার থেকে দারুণ হলুদ, সতেজ আর চমৎকার একটা ফল কিনে আনার পর দিন কয়েক না যেতেই তা গলে নরম হয়ে পচন ধরে গেলো।
কলার আয়ু একটু লম্বা করতে চাইলে প্রথমেই একটি জিনিসে লাগাম টানতে হবে, আর তা হলো 'ইথিলিন গ্যাস'।
কলা যে এত তড়িঘড়ি করে পেকে নষ্ট হয়ে যায়, তার পেছনে এই গ্যাস বা 'ফল পাকানোর হরমোন'ই হলো মূল কারণ। এই ইথিলিন গ্যাসের কারণেই অ্যাভোকাডো বা আমের মতো ফল দ্রুত পাকাতে অনেকেই কাগজের ব্যাগে একটি কলা রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
কলার আসল সমস্যাটা হলো, এর পাকার প্রক্রিয়াটি একদম চক্রাকার। কলা যত পাকে, তার ভেতর থেকে তত বেশি গ্যাস তৈরি হয়; আবার যত বেশি গ্যাস বের হয়, কলা ঠিক তত দ্রুতই পাকে। আর এই চেইন রিঅ্যাকশন বা চক্র চলতেই থাকে। ফলে এক ছড়াতে থাকা একটি কলা নষ্ট হতে শুরু করলে, খুব দ্রুতই সেটি অন্য কলাগুলোকেও পচিয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির প্ল্যান্ট মলিকিউলার বায়োলজিস্ট জেমস জিওভান্ননি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'কলা এবং এর ইথিলিন গ্যাস নিয়ে কাজ করা রীতিমতো একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।'
তিনি আরও বলেন, 'কলা একবার হলুদ হতে শুরু করলেই তা প্রচুর পরিমাণে ইথিলিন গ্যাস ছাড়তে শুরু করে। আর ঠিক এই পর্যায়ে এসে আপনার হাতে আসলে করার মতো তেমন কিছুই থাকে না।'
তবে জিওভান্ননির মতে একটা ভালো খবরও আছে। কলা যদি শুরু থেকেই ঠিকমতো সংরক্ষণ করা যায়, তবে এই 'নীরব ঘাতক' ইথিলিন গ্যাসকে অনেকটাই দূরে রাখা সম্ভব।
কলা কেন ঝুলিয়ে রাখা উচিত?
ব্রঙ্কস শহরের বড় কলার পাইকারি প্রতিষ্ঠান 'টপ বানানা'-এর চিফ অপারেটিং অফিসার ড্যানিয়েল বারাবিনো কলার আয়ু বাড়ানোর তিনটি মন্ত্র জানিয়েছেন—পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, আঘাত বা দাগ লাগা থেকে বাঁচানো এবং সঠিক তাপমাত্রা।
তার প্রতিষ্ঠান প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক লাখ পাউন্ড বা সাড়ে ৪৫ হাজার কেজি কলা বিক্রি করে। তাই কলার নাড়িনক্ষত্র তার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে!
বারাবিনো জানান, 'টপ বানানা' মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তাদের কলা আনে। আর এই কলাগুলো পাকার অনেক আগেই গাছ থেকে কেটে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, 'আসার সময় কলাগুলো একদম পাথরের মতো শক্ত থাকে। সেগুলো ভীষণ কাঁচা এবং একদম গাঢ় সবুজ রঙের হয়।'
এরপর দোকানে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করতে কোম্পানিটি এই কলাগুলোকে একটি বিশেষ চেম্বারে বা কক্ষে নিয়ে রাখে। সেখানে ইথিলিন গ্যাস ব্যবহার করে খুব দ্রুত সেগুলোকে পাকানো হয়। বারাবিনোর ভাষায় যাকে বলে—'কলার ঘুম ভাঙানো'।
আর ঠিক এই জায়গাতেই বাতাস চলাচলের বিষয়টি চলে আসে। বারাবিনো ব্যাখ্যা করে বলেন, 'ইথিলিন গ্যাস বাতাসের চেয়ে হালকা হওয়ায় তা খুব সহজেই আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে।'
আর বদ্ধ জায়গায় এই ইথিলিনের মাত্রা বেড়ে গেলে কলা আরও দ্রুত পাকতে শুরু করে। তাই কলাকে দ্রুত পাকার হাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ ও দারুণ সমাধান হলো—কলা ঝুলিয়ে রাখা! তিনি বলেন, 'কলা যদি ফলের ঝুড়িতে চেপেচুপে না রেখে ঝুলিয়ে রাখেন, তবে এই ইথিলিন গ্যাস সহজে হাওয়ায় মিশে যাওয়ার অনেক বেশি জায়গা পায়।' এই সহজ পদ্ধতিতেই কলার সতেজতা আরও কয়েক দিন বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব।
কলা ঝুলিয়ে রাখলে সেটি অযথা ধাক্কা খাওয়া বা আঘাত পাওয়া থেকেও রক্ষা পায়।
আর দাগ লাগা থেকে বাঁচানো কলার আয়ু বাড়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বারাবিনো বলেন, 'বাইরে থেকে আঘাত বা দাগ চোখে না পড়লেও, ভেতরে ভেতরে কলার গায়ে ঠিকই ছোপ বা দাগ পড়তে পারে।' এই ধরনের সামান্য আঘাতেও কলার ভেতরের 'ক্ষত প্রতিক্রিয়া' সচল হয়, যার ফলে ইথিলিন গ্যাস উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়।
তাই কলা সবসময় সাবধানে রাখতে হবে এবং এগুলোকে নাড়াচাড়া বা ঝাঁকুনি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
কলার ক্ষত কেবল ধাক্কা লাগাতেই হয় না। যেমন বড় কোনো কাঁদি থেকে কলার একটি ছোট ছড়া আলাদা করে কাটলে, ওই মাথার দিকটায় একটা বড় ক্ষত তৈরি হয়।
আর এই কাটা অংশ দিয়েও হু হু করে প্রচুর ইথিলিন গ্যাস বের হতে থাকে। এ কারণেই সুপারমার্কেটে কলা কেনার সময় খেয়াল করবেন, কলার মাথার দিকটায় প্লাস্টিক বা পলিথিন মোড়ানো থাকে।
জিওভান্ননির মতে, এর মূল উদ্দেশ্যই হলো ইথিলিন গ্যাসকে আটকে রাখা। তাই দোকান থেকে কিনে আনা কলার মাথায় যদি প্লাস্টিক পেঁচানো না থাকে, তবে বাসায় এনে নিজেই সামান্য পলিথিন দিয়ে সেটির মাথা শক্ত করে মুড়িয়ে রাখা যায়।
সবশেষে আসে তাপমাত্রার ব্যাপারটি। কলা সবসময় সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় রাখা ভালো, ভুল করেও ফ্রিজে ঢোকানো যাবে না!
জিওভান্ননি সতর্ক করে বলেন, 'কলা মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল, অতিরিক্ত কম তাপমাত্রায় এদের বারোটা বেজে যায়।'
ফ্রিজের ঠান্ডা বাতাসের প্রভাবে কলার খোসা দ্রুত কালচে বা কালো হতে শুরু করে এবং সময়ের সাথে সাথে ভেতরের অংশটুকু একদম নরম হয়ে যায়।
বারাবিনোও তার ক্রেতাদের একই পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তার মতে, কলা সংরক্ষণের আদর্শ তাপমাত্রা হলো ৫৬ থেকে ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (বা ১৩ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস), যা সাধারণত আমাদের ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার একদম কাছাকাছি।
