আমদানি নিষেধাজ্ঞার পরও দেশে ঢুকছে ভারতীয় ইলিশ—দাবি মৎস্য সমিতির, অস্বীকার কোস্টগার্ডের
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তের পরও অবৈধ পথে ভারতীয় ইলিশ দেশে ঢুকছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন। তবে কোস্টগার্ড জানিয়েছে, সম্প্রতি তাদের নজরদারিতে এমন কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ধরা পড়েনি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ১০৩টি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাতিল করে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি স্থগিত করে মৎস্য অধিদপ্তর। এর ফলে বেনাপোল দিয়ে দেশে ইলিশ আসার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, যার মাধ্যমে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৩৫ টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছিল।
অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ আবিদ হোসেন দাবি করেন, এনওসি বাতিলের পর ২৩ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের সীমান্ত নদী ভেটখালীর নিকটবর্তী হাড়িয়াভাঙ্গা নদী দিয়ে প্রায় ৭৪ টন ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিনি জানান, পরবর্তীতে এসব মাছ কুয়াকাটা, আলীপুর, মহিপুর, পাথরঘাটা, ভোলা, চরফ্যাশন, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামসহ ঢাকার কারওয়ান বাজারের মতো বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়।
আবিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার সুনির্দিষ্টভাবে ইলিশ আমদানির অনুমতি স্থগিত করার পর অন্যান্য পণ্যের চালানের আড়ালে এসব মাছ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
তবে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সম্প্রতি অবৈধভাবে ভারতীয় ইলিশ প্রবেশের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন বা উপকূলীয় নৌপথ দিয়ে অবৈধভাবে ইলিশ প্রবেশের যে দাবি সমিতি করেছে, সে বিষয়ে কোস্টগার্ড অবগত নয়।
তিনি জানান, আমদানি স্থগিতের পর থেকে উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল, নজরদারি ও অভিযান জোরদার করেছে কোস্টগার্ড। এর মধ্যে সীমান্ত নদী ও জলপথে বিশেষ নজরদারি এবং দুর্গম ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
আমদানিকৃত ভারতীয় ইলিশকে 'পদ্মার ইলিশ' বলে চালিয়ে দিয়ে চড়া দামে বিক্রির উদ্বেগের মধ্যেই এই অনানুষ্ঠানিক সরবরাহের অভিযোগ সামনে এল। খাত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আমদানিকৃত যেসব ইলিশের প্রতি কেজির মূল্য প্রায় ৫০০ টাকা, সেগুলো স্থানীয় বাজারে পদ্মার ইলিশ হিসেবে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ ক্রেতারাও মাছের উৎস নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
ঢাকার বাসিন্দা তৌহিদুল আলম বলেন, যারা নিয়মিত ইলিশ কেনেন তারা চেহারা ও স্বাদ দেখে পদ্মার ইলিশ চিনতে পারেন, কিন্তু বিক্রেতাদের উপস্থাপনের কৌশলে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্ত হতে পারেন। চট্টগ্রামের একটি বাজার থেকে ভারতীয় ইলিশ কেনা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, এর স্বাদ পদ্মার ইলিশের চেয়ে স্পষ্টভাবেই আলাদা।
সমুদ্র ও জাহাজ চলাচল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সি ফোর্স অ্যালায়েন্স লিমিটেডের পরিচালক সাজিদ বিন সোলায়মান জানান, অবৈধ চালানের অভিযোগ নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন কোনো তথ্য তার কাছে নেই। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের গুজরাট ও বাংলাদেশের মধ্যে দামের যে বড় ব্যবধান রয়েছে, বাংলাদেশে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ থাকলে তা অনানুষ্ঠানিক বা চোরাই বাণিজ্যের একটি প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
চলতি অর্থবছরে সরকার মোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমোদন দিয়েছিল। তবে আমদানিকৃত ইলিশের মূল্য ও বাজারজাতকরণ নিয়ে উদ্বেগ এবং ভারতীয় মাছ পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগের মুখে পরবর্তীতে অনাপত্তিপত্রগুলো বাতিল করা হয়।
সরকারিভাবে আমদানি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সমিতির দাবি অনুযায়ী অনানুষ্ঠানিক পথেই বাজারে ভারতীয় ইলিশের জোগান অব্যাহত রয়েছে; যদিও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার থাকায় কোনো অবৈধ চালান ঢুকতে পারছে না বলেই দাবি করছে কোস্টগার্ড।
