ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দুই পাইলটের ‘মারামারি’, জরুরি অবতরণ: ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে সেদিন যা ঘটেছিল
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে ককপিটের ভেতরে সম্প্রতি দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। উড্ডয়নরত অবস্থায় এক পাইলট অপর পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে উড়োজাহাজটি আছড়ে ফেলার চেষ্টা করে। তবে সহকর্মীর প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েও আহত অন্য ক্যাপ্টেনের প্রতিরোধে ককপিট আনলক করলে যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন। এতে রক্ষা পান বিমানে থাকা ১৭৪ জন আরোহী।
গতকাল বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবগামী এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে এই ঘটনা ঘটে। পরে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক আঞ্চলিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়।
ইতোমধ্যে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য বা পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল।
মাঝআকাশে যেভাবে দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, দুবাই থেকে উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর জর্ডানের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় উড়োজাহাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ওমানি বংশোদ্ভূত কো-পাইলট (ফার্স্ট অফিসার) আকস্মিকভাবেই ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রধান ক্যাপ্টেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে একাধিক আঘাত করে রক্তাক্ত করেন। এরপর তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে তা দ্রুত নিচের দিকে নামিয়ে দিতে থাকেন।
মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ে বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। বিমানটিতে মারাত্মক ঝাঁকুনি শুরু হলে যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার ও কান্না শুরু করেন। জিএমটি ০৫:৩১ মিনিটে বিমান থেকে জরুরি সংকেত '৭৭০০' সম্প্রচারিত হওয়ার পর ০৫:৩৮ মিনিটে তা ছিনতাই বা অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের সংকেত '৭৫০০'-এ পরিবর্তন করা হয়। ককপিটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সংকেত পেতেই ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে।
ককপিটের দরজা খোলা ও উদ্ধার
শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাত নিয়ে ককপিটের মেঝেতে রক্তে ভেসে যাওয়া অবস্থাতেও প্রধান ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি কোনোমতে হাত বাড়িয়ে ককপিটের দরজার স্বয়ংক্রিয় আনলক বোতামটি চেপে ধরেন।
দরজা খোলা মাত্রই বিমানের কেবিন ক্রু এবং সামনের সারিতে থাকা বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি যাত্রী ভেতরে ঢুকে পড়েন। ককপিটের পদ্ধতিগুলো অকেজো করার চেষ্টাকালে তারা হামলাকারী কো-পাইলটকে ধরে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন।
ঘটনাচক্রে ওই বিমানে যাত্রী হিসেবে ফ্লাইদুবাইয়ের আরও দুজন পাইলট অবস্থান করছিলেন। তারা দ্রুত ককপিটের দায়িত্ব নেন এবং শেষ পর্যন্ত গ্রিনিচ মান সময় ০৬:৪৫ মিনিটে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটিকে সফলভাবে জরুরি অবতরণ করান।
আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার ও হামলাকারীকে চিকিৎসার জন্য তাবুকের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সৌদি আরবে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। পরবর্তীতে তাবুক বিমানবন্দর থেকে একটি বিকল্প বিমানে সব যাত্রীদের নিরাপদে তেল আবিবে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঘটনাপ্রবাহ ও সময়ক্রম
০৩:০৫ – এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা দেয়।
০৫:২১ – উঁচুতে থাকা অবস্থায় বিমানে অস্বাভাবিক ওঠানামা শুরু হয়।
০৫:২২ – মাত্র ৩০ সেকেন্ডে বিমানটি ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি নিচে নেমে আসে।
০৫:৩১ – বিমান থেকে সাধারণ জরুরি বার্তা ইমারজেন্সি কোড ৭৭০০ পাঠানো হয়।
০৫:৩৮ – জরুরি বার্তার কোড পরিবর্তন করে ছিনতাই বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের বার্তা কোড ৭৫০০ দেওয়া হয়।
০৬:৪৫ – সৌদি আরবের তাবুক আঞ্চলিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি নিরাপদে অবতরণ করে।
হামলার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা জানা গেছে
ককপিটে ঘটা এই হামলার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
বুধবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা এই হামলাকারীর মূল উদ্দেশ্য খুঁজে বের করব—তার কোনো সহযোগী ছিল কি না, কিংবা এর পেছনে ইরানের কোনো হাত রয়েছে কি না। আশা করি খুব শীঘ্রই তা জানা যাবে।'
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানান, প্রাথমিক তথ্যে মনে হচ্ছে হামলাকারী বিমানটি ধ্বংস করে সবাইকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তিনি ঘটনাটিকে একটি 'জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা' বলে উল্লেখ করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত হামলাকারী ওমানের নাগরিক।
উল্লেখ্য, সৌদি আরব বা ওমানের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। মাস্কাট ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি, অন্যদিকে সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের শর্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নীতি বজায় রেখেছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল যার কয়েকদিন পরই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার তিন বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হয়েছিল, যার পর গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় 'যুদ্ধবিরতি' কার্যকরের পরও প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন।
ফ্লাইদুবাইয়ের দ্বিতীয় কোনো বিমান কি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
না। এর আগে দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের দ্বিতীয় একটি ফ্লাইট এফজেট১০৮১-এর পথ ঘুরিয়ে দেওয়ার যে খবর হিব্রু গণমাধ্যমে এসেছিল তা ভুল ছিল বলে 'টাইমস অফ ইসরায়েল' নিশ্চিত করেছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। বিমানটি কোনো জরুরি সংকেত পাঠায়নি এবং এটি নিরাপদে তেল আবিবের পথে ছিল।
আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
রয়টার্স জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিড অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সঙ্গীরা এই ঘটনাকে ব্যবহার করে ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে নিজেদের নিরাপত্তার দাবির সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এক্স-এ লাপিড লেখেন, 'বিদেশে হুমকির বিষয়টি সুনির্দিষ্ট এবং তা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান, যার সঙ্গে বিমানের আজকের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।'
নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে লাপিড আরও বলেন, 'তিনি সেই সাহসী ইসরায়েলিদের ওপর ভর করে সস্তা রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন, যারা এমন একটি বিপর্যয় রোখেছেন যার জন্য তার সরকার মোটেও প্রস্তুত ছিল না।'
