নাৎসি বন্দিশিবিরে অপরাধের অভিযোগে জার্মানিতে তদন্তের মুখে ১০৫ বছর বয়সী ব্যক্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর একটি যুদ্ধবন্দী শিবিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে ১০৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে জার্মানি। অভিযুক্ত ব্যক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে উত্তর-পশ্চিম জার্মানির সেনে এলাকায় অবস্থিত 'স্তালাগ ৩২৬ ভিআই কে' নামক নাৎসি যুদ্ধবন্দী শিবিরের প্রহরী ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডর্টমুন্ডের পাবলিক প্রসিকিউটর সোনিয়া ফ্রোডারম্যান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সেনে ক্যাম্পের অপর এক প্রহরীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের তদন্ত চলছিল, তবে ৯৯ বছর বয়সী ওই অভিযুক্ত ব্যক্তি কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। সাবেক এই দুই প্রহরীর বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
তবে ৮০ বছরেরও বেশি সময় পর নাৎসি আমলের অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে আইনজীবীরা যে প্রতিকূলতার মুখে পড়ছেন, এই দুটি ঘটনাই তার প্রমাণ—কারণ জীবিত থাকা বাকি অভিযুক্তদের প্রায় সবাই এখন বয়সের ভারে মারা গেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত লাল ফৌজের (রেড আর্মি) প্রায় ৫৩ লাখ সেনাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটকে রেখেছিল নাৎসি বাহিনী, যাদের অর্ধেকেরই মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেনে এলাকার এই যুদ্ধবন্দী শিবিরটি ছিল নাৎসিদের বৃহত্তম কেন্দ্রগুলোর অন্যতম।
ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে নাৎসি জার্মানিতে প্রবেশ করা প্রতি তিনজন সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীর একজন এই ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাদের দিয়ে জোরপূর্বক শ্রমের কাজ করানো হতো।
এই বন্দিশিবিরের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত অমানবিক। মারাত্মক অপুষ্টি ও চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে সেখানে নিবন্ধিত প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কয়েক হাজার মারা যান এবং কয়েক হাজার বন্দীকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। সোভিয়েত সেনাদের পাশাপাশি ফ্রান্স, পোল্যান্ড, সার্বিয়া এবং বেলজিয়ামের যুদ্ধবন্দীদেরও এই ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে মিত্রবাহিনীর হাতে মুক্ত হওয়ার সময় ক্যাম্পটিতে ৯ হাজারেরও বেশি সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী জীবিত ছিলেন।
প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেছেন যে ১০৫ বছর বয়সী ওই সাবেক প্রহরীর বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহায়তার নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাৎসি আমলের অপরাধীদের বিচারের আওতায় রাখতে ১৯৭৯ সাল থেকে জার্মানিতে হত্যা বা হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো তামাদি আইন (স্ট্যাটিউট অব লিমিটেশনস) রাখা হয়নি। এছাড়া 'হেমার স্তালাগ ৬ এ' ক্যাম্পের শতবর্ষী আরেক সাবেক প্রহরীর বিরুদ্ধেও বর্তমানে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধের আট দশক পর অপরাধীদের সাজা দেওয়া অত্যন্ত জটিল হলেও অতীতে এমন কিছু নজির দেখা গেছে। চার বছর আগে জাক্সেনহাউজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ১০১ বছর বয়সী সাবেক প্রহরী জোসেফ শুৎসকে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যিনি ছিলেন বিচারের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ নাৎসি অপরাধী। তবে সাজা কার্যকরের বিরুদ্ধে আপিল চলাকালীন ২০২৩ সালে কোনো দিন কারাগারে না গিয়েই তিনি মারা যান।
এ ছাড়া ২০২২ সালে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সাবেক এক নারী সচিবকেও হত্যাকাণ্ডে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, যিনি গত বছর ৯৯ বছর বয়সে মারা যান। জার্মানির লুডভিগসবার্গে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয় নাৎসি অপরাধের প্রাথমিক অনুসন্ধান সম্পন্ন করার পর ডর্টমুন্ডের পাবলিক প্রসিকিউটররা আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলাগুলো পরিচালনা করছেন।
