‘দ্য গুড মহারাজা’: ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ৭৪০ পোলিশ এতিম শিশুর ‘বাবা’ হয়েছিলেন যে ভারতীয় রাজা
১৯৪২ সালের দিকের কথা। আরব সাগরের বুকে ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে একটি জাহাজ। জরাজীর্ণ জাহাজটিকে দেখলে মনে হবে যেন কোনও 'ভাসমান কফিন'। জাহাজটিতে গাদাগাদি করে বসে আছে ৭৪০টি শিশু। সবাই পোলিশ।
সেই বছরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোল্যান্ডের মধ্যে সিকোরস্কি-মাইস্কি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে সোভিয়েত গুলাগ (শ্রমশিবির) ও অন্যান্য ক্যাম্পে বন্দী হাজার হাজার পোলিশ যুদ্ধবন্দী মুক্তি পান, যাদের মধ্যে ছিল অসংখ্য শিশু, যার অনেকেই যুদ্ধে মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম।
মুক্তি পেলেও এই শিশুদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। নাৎসিদের দখলে থাকা পোল্যান্ডে ফিরে যাওয়া ছিল অসম্ভব, আবার সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের রাখতে নারাজ।
ক্ষুধা, রোগ, অবসাদ, সাথে দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি ওদের চোখেমুখে। ইরান হয়ে পালিয়ে আসা এই শিশুগুলোর আশা ছিল, জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় তারা পেছনে ফেলে এসেছে। সামনের দিনগুলোতে হয়তো আর কোনো কষ্ট পেতে হবে না।
কিন্তু বাস্তবতা এতোটাও সহজ ছিল না।
স্টালিনের সঙ্গে সিকোরস্কি-মাইস্কি চুক্তির পর সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পাওয়া প্রায় ৪০ হাজার পোলিশ নাগরিক গঠন করেছিল 'অ্যান্ডার্স আর্মি'। মিত্রশক্তির হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু যুদ্ধের আসল বলি হয়েছিল পোলিশ শিশুরা—যাদের মধ্যে ছিল ক্যাথলিক ও ইহুদি দুই-ই।
এদের অনেকের বাবা-মাকে হত্যা করেছিল সোভিয়েত বাহিনী। কুখ্যাত কাতিন গণহত্যার শিকার হয়েছিল প্রায় ২২ হাজার পোলিশ সেনা ও নাগরিক। এই শিশুগুলো তাদেরই সন্তান। ক্যাম্প আর অস্থায়ী এতিমখানায় পড়ে থাকা এই 'অবাঞ্ছিত' শিশুদের অনেকেই ক্ষুধা আর রোগে মারা যাচ্ছিল।
মানবিক এই বিপর্যয়ের দায় শেষমেশ গিয়ে পড়ে নির্বাসিত পোলিশ সরকার ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাঁধে। অনেক দেশই তাদের আশ্রয় দিতে রাজি ছিল না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, শিশুদের ভারতে পাঠানো হবে।
ভারতের উপকূল ধরে একের পর এক বন্দরে ভিড়তে চাইল জাহাজটি। কিন্তু সব জায়গাতেই জুটল প্রত্যাখ্যান।
তৎকালীন ভারত তখন ব্রিটিশ শাসনে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিল, 'এদের দায়িত্ব আমাদের নয়। জাহাজ সরাও।'
জাহাজে খাবার ফুরিয়ে আসছে। ওষুধও নেই। প্রতিটি মুহূর্ত যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। ডেকের এক কোণে ১২ বছরের মারিয়া তার ৬ বছরের ছোট ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে আছে। মৃতশয্যায় মাকে কথা দিয়েছিল সে, ছোট ভাইকে আগলে রাখবে। কিন্তু যখন গোটা পৃথিবীই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন ছোট্ট একটি মেয়ে কীভাবে রক্ষা করবে তার ভাইকে?
দূরে গুজরাটের এক প্রাসাদে খবরটি পৌঁছাল। এমন পরিস্থিতিতে যখন তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন ভারতের এক ছোট্ট করদ রাজ্যের শাসক।
তিনি জাম সাহেব দিগ্বিজয় সিংজি, নবনগরের মহারাজা। পোল্যান্ডের ইতিহাসে যিনি পরিচিত 'গুড মহারাজা' নামে। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বালাচাদির নিজস্ব এস্টেটে ঠাঁই পায় ঘরহারা এই শিশুরা।
বন্দর, সেনাবাহিনী, বাণিজ্য—সবই তখন ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। মহারাজা দিগ্বিজয় সিংজি ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ইম্পেরিয়াল ওয়ার ক্যাবিনেটের সদস্য। রাজনৈতিকভাবে চুপ থাকার সব যুক্তিই মহারাজার কাছে ছিল। কিন্তু সাগরে ভাসা শিশুদের কথা শুনে তিনি উপদেষ্টাদের শুধু একটি প্রশ্নই করলেন,
'সেখানে কতজন শিশু আছে?'
'সাতশ চল্লিশ জন, মহারাজ।'
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর শান্ত গলায় বললেন, 'ব্রিটিশরা আমার বন্দর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু আমার বিবেক নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তো তাদের নেই। শিশুদের নবনগরে নিয়ে এসো।'
উপদেষ্টারা সতর্ক করলেন, ব্রিটিশদের অমান্য করলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু মহারাজা সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। জাহাজে বার্তা পাঠানো হলো—'এখানে তোমাদের স্বাগত।'
আগস্ট মাসের তপ্ত দুপুরে জাহাজটি নবনগর বন্দরে ভিড়ল। জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে একে একে নেমে এল শিশুরা। এতটাই দুর্বল যে অনেকে হাঁটতেও পারছিল না। আশা করাও ভুলে গিয়েছিল তারা।
ফাদার পিওতর আরও বলেন, 'বালাচাদিতে পোলিশ এতিম শিশুদের স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা আর শরণার্থী নও। আজ থেকে তোমরা নবনগরের সন্তান, আর আমি তোমাদের বাপু—তোমাদের বাবা।' কথাগুলো তিনি কেবল লোকদেখানোর জন্য বলেননি, বরং সবচেয়ে অসহায় শিশুদের দায়িত্ব নেওয়ার অঙ্গীকার হিসেবেই বলেছিলেন।'
তিনি ওদের কোনো অস্থায়ী ক্যাম্প বা তাঁবুতে রাখেননি। তিনি তাদের জন্য তৈরি করলেন একটি আস্ত বাড়ি। বালাচাদিতে গড়ে তুললেন এমন এক আশ্রয়, যা পরে পরিচিতি পেল 'লিটল পোল্যান্ড' বা 'ছোট্ট পোল্যান্ড' নামে।
শিশুদের শিক্ষার জন্য পোলিশ শিক্ষক আনা হলো। তৈরি হলো পোলিশ খাবার। পামগাছের নিচে বসে ওরা গাইত নিজেদের দেশের গান। ক্রিসমাসে সাজানো হলো ক্রিসমাস ট্রি।
শিশুদের প্রথমে পালক পরিবারের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই শিশুদের একে অপরের কাছ থেকে আলাদা করতে চায়নি পোলিশ সরকার। স্কুল বা কনভেন্টগুলোতে রাখার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
অবশেষে ভারতের ভাইসরয় 'পোলিশ চিলড্রেনস ফান্ড' গঠন করেন। দিল্লির আর্চবিশপ এবং কনভেন্ট অব জিসাস অ্যান্ড মেরির মাদার সুপিরিয়রের সহযোগিতায় টাটা পরিবারসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করা হয়।
শিশুরা আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করল। আবার খেলাধুলা শুরু করল। হাসি ফুটল ওদের মুখে।
অনুরাধা ভট্টাচার্য তাঁর 'দ্য সেকেন্ড হোমল্যান্ড: পোলিশ রিফিউজিস ইন ইন্ডিয়া' বইয়ে লিখেছেন, ভারত তখনো পরাধীন ছিল। ছিল না তেমন কোনো সচ্ছলতাও। কিন্তু তারপরও এই দেশই ছিল বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা ঘরহারা ও পরে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া পোলিশদের বুকে টেনে নেয়। তাও আবার নিজেদের খরচে।
তিনি লেখেন, 'ব্রিটিশ ভারতের অন্য কোথাও যখন শিশুদের জায়গা হচ্ছিল না, তখন নবনগর রাজ্য তাদের আশ্রয় দেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ নেয়। এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত-অধিকৃত পোল্যান্ডে তাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়।'
মহারাজা প্রায়ই দেখতে আসতেন। তিনি শিশুদের নাম মনে রাখতেন, জন্মদিন পালন করতেন, স্কুলের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। বাবা-মায়ের জন্য কেঁদে বুক ভাসানো শিশুদের বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিতেন। নিজের রাজকোষ থেকে খরচ করতেন ওদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা আর পড়াশোনার জন্য।
টানা চার বছর ধরে যখন বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবী জ্বলছিল, তখন এই ৭৪০ শিশু শরণার্থী হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য হিসেবে বেড়ে উঠল। যুদ্ধ শেষে যখন ফিরে যাওয়ার সময় এল, তখন অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। কারণ, বালাচাদিই ছিল তাদের মনে থাকা একমাত্র শান্তির নীড়।
সেই শিশুরা বড় হয়েছে। কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী হয়েছে। তারা নিজেরা বাবা-মা হয়েছে, দাদা-দাদি হয়েছে। কিন্তু এই গল্পটি তারা বয়ে বেড়িয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
শিশুদের দেখভাল করতেন ফাদার ফ্রান্সিসজেক প্লুটা এবং স্কাউটমাস্টার জদজিস্লাভ পেসকভস্কি। পরে ফাদার প্লুটাকে কিছু শিশুকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার কারণে কমিউনিস্টরা 'আন্তর্জাতিক শিশু অপহরণকারী' হিসেবে নিন্দা করেছিল।
অন্যদিকে পেসকভস্কি ছিলেন কাতিন গণহত্যার একজন বেঁচে যাওয়া সাক্ষী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি যাজক হন এবং আমৃত্যু কাতিন হত্যাকাণ্ডের সত্য উদ্ঘাটনের জন্য লড়াই করে গেছেন। পোলিশ বংশোদ্ভূত পোপ দ্বিতীয় জন পলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি।
বালাচাদির এই ক্যাম্পে শিশুরা খোলা আকাশ, সমুদ্রসৈকত আর সেখানকার আবহাওয়া দারুণ উপভোগ করত। ফুটবল, হকি আর ভলিবল খেলায় মেতে উঠত তারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও পোলিশ শিশুদের দুর্দশা কাটেনি। সাইবেরিয়ায় সোভিয়েত জমানার নির্বাসন ও কঠোর অত্যাচারের স্মৃতি তাদের মনে গেঁথে ছিল। ফলে অনেকেই কমিউনিস্ট শাসিত পোল্যান্ডে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিল। কেবল যারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চেয়েছিল, তাদেরই পাঠানো হয়।
বাকিদের মধ্যে ৮১টি শিশুকে ক্যাথলিক মিশনারিদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় নতুন জীবন গড়ার জন্য। আর ১৯৪৩ সালে ১২টি ইহুদি শিশুকে পাঠানো হয়েছিল হাইফায় (তৎকালীন ফিলিস্তিন, বর্তমান ইসরায়েল)।
১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের পতনের পর মহারাজা দিগ্বিজয় সিংজির সেই উদারতা ও মহানুভবতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় পোলিশ সরকার।
২০১২ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে একটি পার্কের নামকরণ করা হয় 'গুড মহারাজা স্কয়ার'। সেখানে তাঁর স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভও স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া মরণোত্তর পোল্যান্ডের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা 'কমান্ডার্স ক্রস অব দ্য অর্ডার অব মেরিট'–এ ভূষিত করা হয় এই ভারতীয় রাজাকে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফেসবুক
