জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে পরিবহন, বন্দর ও কারখানার ব্যয়; চাপে রপ্তানিকারকেরা
জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিকতম মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও কারখানার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে চড়া উৎপাদন ব্যয় ও দুর্বল চাহিদার কারণে আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা রপ্তানিকারক ও শিল্প খাতগুলোর ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
পরিবহন মালিকেরা এরইমধ্যে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামের বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) চার্জ বাড়িয়েছে ৯.৮৫ শতাংশ। ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ কভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ টিবিএসকে বলেন, আগে ঢাকা-রুটে প্রতি যাত্রায় ২০-২২ হাজার টাকা ভাড়ায় প্রাইম মুভার চালানো যেত। এখন নূন্যতম ২৬ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইভ মুভারে প্রতি ট্রিপে (আপ-ডাউন) জ্বালানি, ড্রাইভার ও হেলপারের বেতনসহ ব্যয় বেড়ে এখন ৩০-৩২ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
জাফর আরও বলেন, 'পরিবহন খরচ বাড়লে উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে শেষপর্যন্ত এর চাপ সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়তে পারে—যা নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।'
নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বাড়তে চলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশের ৩৪টি নৌরুটে ১ হাজার ২০০-র বেশি লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহন করে।
চলতি বছরের এপ্রিলে আগের দফায় জ্বালানির দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর লাইটার জাহাজের ভাড়া ৬.৫ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছিল নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। এবারও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সমন্বয় কমিটির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের বর্ধিত দামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পণ্য পরিবহনের ভাড়া সমন্বয় করা প্রয়োজন।
আইসিডি চার্জ বাড়ল ৯.৮৫ শতাংশ
চট্টগ্রামের ২৩টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও অফ-ডকে বিভিন্ন কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ ৯.৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)।
বিকডা জানিয়েছে, কনটেইনার পরিবহনকারী প্রাইম মুভারসহ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সব ধরনের যন্ত্র ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। সরকার ডিজেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করার পর বাড়তি পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
বর্ধিত এই চার্জের আওতায় রয়েছে বন্দর ও আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন ও ওঠানো-নামানো, রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও হ্যান্ডলিং, ভেরিফাইড গ্রস ম্যাস (ভিজিএম) ওজন পরিমাপ এবং আমদানি পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ।
রপ্তানিমুখী প্রায় ৯৩ শতাংশ পণ্য এবং আমদানি কনটেইনারের ২০-২৩ শতাংশ এসব বেসকারি অফ-ডকের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং হয়।
স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন খরচও বেড়েছে। বেনাপোল থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রাক ভাড়া একদিনের ব্যবধানে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
১৫ টন পণ্য নিয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকায় যাওয়ার ভাড়া ২১-২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৫-২৬ হাজার টাকা হয়েছে। বেনাপোল-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ২৭-২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৪-৩৫ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জেও ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক ফরিদুল আলম টিবিএসকে বলেন, দুই দিন আগেও ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ২৭ টনের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ২৬ হাজার টাকা। কিন্তু এখন ২ হাজার টাকা বাড়তি দিতে হয়েছে।
'পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেও এর অনিবার্য প্রভাব পড়বে,' বলেন তিনি।
ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন রপ্তানিকারকেরা
রপ্তানিকারকদের জন্য লজিস্টিকস, জ্বালানি ও কাঁচামালের বর্ধিত খরচের ওপর সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন আঘাত হয়ে এসেছে।
এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ-র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম টিবিএসকে বলেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়ানোর প্রভাব শিল্পের সব স্তরে পড়েছে। ট্রাক ভাড়া, লজিস্টিক চার্জ বেড়েছে। বেড়েছে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ও।
তিনি আরও বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালাতে হয়। তখন এমনিই উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন আরেক ধাপে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
'কিন্তু এই ব্যয় আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতা থেকে আদায় করা সম্ভব নয়। এটি তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতায়ও বাংলাদেশি উৎপাদককে পেছনে ঠেলে দিয়েছে,' বলেন তিনি।
করভো বাইসাইকেল লিমিটেড ও ট্রাইডেন্ট সাইকেলস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বখতিয়ার জামাল জানান, পরিবহন, বন্দর ও আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত সব খরচই বাড়ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে বাইসাইকেল খাত দীর্ঘদিন নিম্নমুখী ছিল। এখন তা ঊর্ধ্বমুখী। এই সময় ব্যয় বাড়লে এ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব পড়বে।
বাড়তি চার্জ চাইছে বন্দর অপারেটররা
এদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে চার বছর আগের চুক্তিকৃত দর সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত বার্থ অপারেটররা। তারা বলছে, বর্তমান চার্জ চার বছর আগে নির্ধারণ করা হয়েছিল; সেটি দিয়ে বর্তমান পরিচালন ব্যয় মেটানো আর সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই দাবি জানায়।
বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থে ডিজেলচালিত কি-গ্যান্ট্রি করেন, রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্র্যাডাল ক্যারিয়ার, মোবাইল হারবার ক্রেন, রিচ স্ট্যাকার, ফর্কলিফট, টপ হ্যান্ডলার,, প্রাইম মুভার, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং করে থাকে বার্থ অপারেটররা।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির দরপত্র জমা দেওয়ার সময় লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ছিল ৮০ টাকা। এখন এর দাম ১৩০ টাকা। অর্থাৎ এ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৬৯ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক বার্থ অপারেটরের ৩০-৪০টি ট্রেইলার আছে। এছাড়া সব ভারী যন্ত্রপাতিই ডিজেলচালিত। মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই পরিবহন খাতে যায়। ফলে বিদ্যমান চুক্তিকৃত দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
কারখানাগুলোতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব শিল্প খাতগুলোকেও সইতে হচ্ছে।
পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সোহেল বলেন, ডিজেলের ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যন্ত—পুরো চেইনে পড়েছে।
কাচ তৈরির চুল্লি বা ফার্নেস অবিরাম চালিয়ে রাখতে হয়। ফলে চাহিদামতো গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ না পেলে কোম্পানিটিকে ডিজেল দিয়ে ফার্নেস চালু রাখতে হয়। এছাড়া কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য ডিজেলচালিত ক্রেন ও অন্যান্য সরঞ্জামও ব্যবহার করা হয়।
ইস্পাত উৎপাদনকারী বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত টিবিএসকে বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প হিসেবে কোম্পানিটিকে জ্বালানি তেল দিয়ে উৎপাদন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস না থাকলে ব্যয় আগে চারগুণ বেশি হতো; এখন তা পাঁচগুণ বেশি হবে। এছাড়া বিএসআরএমের উৎপাদিত পণ্য সারাদেশে পরিবহনের মাধ্যমে পৌঁছাতে হয়। পণ্য পরিবহনের ভারাও ১০ শতাংশ বাড়াতে হয়েছে।
