‘সকাল থেকে ৩টা পর্যন্ত বসে আছি, একটা ভাড়াও মারতে পারি নাই’: তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা রাইড শেয়ারিং চালকদের আয়ে
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, রাজধানীর বিভিন্ন স্টপেজে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় বসে আছেন রাইড শেয়ারিং চালকেরা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও অ্যাপভিত্তিক রাইডের ভাড়া সে অনুযায়ী বাড়েনি। প্রতিদিনের জ্বালানি খরচের পাশাপাশি বেড়েছে ইঞ্জিন অয়েল ও মোটরসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। সবকিছু মিলিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চালকেরা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন স্টপেজে রাইড শেয়ারিং চালকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সকাল ১০টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে রাজধানীর প্রবেশমুখ সাইনবোর্ড স্টপেজে বসেছিলেন মোহাম্মদ আসিফ। লক্ষ্য ছিল কয়েকটি ট্রিপ করে দিনের খরচ তুলে নেওয়া। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বসে থেকেও একটি ট্রিপ পাননি তিনি।
হতাশ কণ্ঠে আসিফ বলেন, 'সকাল ১০টা বাজে বাসা থেকে বের হইছি। এখন বাজে হচ্ছে প্রায় ৩টা। একটা টাকার ভাড়া মারতে পারি নাই। যাত্রী যে কয়জন-ই এসেছে ভাড়া মিলে না।'
তিনি আরও জানান, এখন তাদের দিন কাটছে যাত্রীর অপেক্ষায়। তেলের দাম বাড়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ভাড়া একটু বেশি চাইলে অনেক যাত্রী রাজি হন না, আবার কেউ কেউ ভাড়া শুনেই চলে যান।
আসিফের পাশেই বসে যাত্রীর অপেক্ষা করছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। তার পরিবারে তিনি ছাড়া আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই; সন্তানসহ পুরো পরিবারই তার বাইকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তৌহিদুল বলেন, 'আগে সারাদিন সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১,৫০০-২,০০০ টাকা হাতে থাকত। এখন ১,০০০ টাকা আয় করতেই দিন শেষ হয়ে যায়।'
অ্যাপের ভাড়ার সঙ্গে চালকের হিসাব মেলে না
চালকেরা জানান, বাজারে তেলের দাম বাড়লেও রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে ভাড়া বাড়েনি। এছাড়া অ্যাপে একবার কোনো গন্তব্যের ভাড়া দেখলে যাত্রীর মাথায় সেটিই নির্ধারিত ভাড়া হয়ে যায় বলে জানান তৌহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, 'অ্যাপে ১৭০-১৮০ টাকা দেখালে আমরা ২০০ টাকা চাই। কিন্তু একজন স্টুডেন্ট ১২০ টাকা ভাড়া বললেই যাত্রী নিয়ে চলে যায়। সে ১২০ টাকায় নিয়ে গেলে ওই যাত্রীর কাছে আমি পরবর্তীতে ১৫০ টাকা নিতে পারি না, তার মাথায় ১২০ টাকা গেঁথে যায়।'
আরেক রাইড শেয়ারিং চালক মাহমুদুর রহমান শাহিন সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরের বাসিন্দা। জীবিকার টানে প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাইড শেয়ার করেন। বুধবার দুপুরে তিনি ছিলেন সায়েদাবাদ এলাকার জনপথের মোড়ে।
শাহিন বলেন, তেলের দাম বাড়লে সরকার বাসভাড়া সমন্বয় করে। রাইড শেয়ারিং চালকদের জন্যও সরকার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করতে পারে।
তার প্রস্তাব, 'প্রতিটি স্টপেজে আমাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঘোষণা করতে পারে। শহরের ভিতরে যাতায়াতের জন্য আমাদের ভাড়াও নির্ধারণ করে দিতে পারে। একটা নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা করে দিলে চালক ও যাত্রী সবার জন্যই সুবিধা হবে। যাত্রীদের সঙ্গেও আমাদের কোনো বাগ্বিতণ্ডা হবে না।'
মবিল ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, সার্ভিসিংয়ে ১০ হাজার
তৌহিদুল জানান, আগে ৬৫০ টাকায় যে মবিল কিনতেন, এখন সেটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। আবার ৮৫০ টাকার মবিলের দাম বেড়ে হয়েছে ১,১৫০ টাকা। এছাড়া একটি বাইক গ্যারেজে সার্ভিসিং করাতে ৮-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
রাইড শেয়ারিং চালক সাগর মিয়ার হিসাবও একই। আগে একটি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন তিনি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি কমে যাওয়ায় দুই-তিন মাসের বেতন আটকে যায়। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে রাইড শেয়ারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
বর্তমান আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে সাগর বলেন, 'আগে প্রতিদিন ১,৫০০-২,০০০ টাকাও থাকতো। এখন ১,০০০ টাকা মিলাইতে গেলেই অনেক কষ্ট। শুধু তেলের দাম বাড়েনি; মবিল, কাগজপত্র ও গাড়ির অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কিন্তু আয় সে তুলনায় বাড়েনি।'
যাত্রীও কমেছে, আয়ও কমেছে
আসিফ জানান, পরিবার চালাতে তার প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু ১,০০০ টাকা হাতে রাখতে হলে তাকে অন্তত ১,৫০০ টাকার ট্রিপ করতে হয়, কারণ এর মধ্যে জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বাদ যায়।
নিজের গণিত তুলে ধরে তিনি বলেন, '১,০০০ টাকা ইনকাম করতে হলে আমার ১,৫০০ টাকার ভাড়া মারতে হবে। ১,৫০০ ভাড়া মারলে ৫০০ চলে যাবে, ১,০০০ থাকবে। এই ১,৫০০ টাকা দিনের বাকি সময়ে মারা সম্ভব নয়।'
তিনি আরও বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর যাত্রী কমেছে। একই সঙ্গে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতেও আগ্রহী নন। দিনের শুরুতে যে আয়ের আশা নিয়ে চালকেরা রাস্তায় বের হন, দিন শেষে সেই আশা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাইড শেয়ারিং চালকদের অনেকেই নিজেদের মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বলে মনে করেন। আয় কমলেও তাদের সামাজিক ও পারিবারিক খরচ কমেনি।
তৌহিদুল বলেন, 'আমরা দরিদ্র না যে ভিক্ষা করমু বা হাত পাতমু, আবার মধ্যবিত্ত হওয়ায় কারো কাছে বলতেও পারি না। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে কিংবা বড় ধরনের কোনো কাজ লাগলে তখন আমাদের একমাত্র ভরসা হয় কিস্তি। এরপর খাইয়া না খাইয়া আবার সেই কিস্তি শোধ করি। আমারও চাহিদা আছে, অভিযোগ আছে। কিন্তু দিনশেষে সংসার তো চালাতে হবে—এই চিন্তায় সব বাদ দিতে হয়।'
বাইক থামিয়ে রাখার সুযোগ নেই
রাইড শেয়ারিং ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতাও নেই অনেক চালকের। এ বিষয়ে তৌহিদুল বলেন, চাকরি করতে গেলে টাকা বা রেফারেন্স লাগে, আবার ব্যবসা করতে গেলেও পুঁজি দরকার। কিন্তু রাইড শেয়ারিংয়ের আয় দিয়েই বর্তমানে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তার।
আরেক চালক সাগরের ক্ষেত্রেও চাকরি হারানোর পর রাইড শেয়ারিং ছিল প্রধান বিকল্প। এখন এই পেশাতেও আয় কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তিনি।
তাদের কাছে বাইক শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বন। তাই খরচ বাড়লেও বাইক নিয়ে রাস্তায় নামা ছাড়া তাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার সম্প্রতি সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। একই সময়ে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন অয়েলের দামও বেড়েছে ১৫০-২০০ টাকা। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব তাই শুধু পাম্পে গিয়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; রাইড শেয়ারিং চালকদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কম ট্রিপ, যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিতে অনিহা, বাইকের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং মাস শেষে সংসারের খরচ সামলানোর সংগ্রাম।
