বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ, প্রস্তুত করা হচ্ছে হাসপাতাল
কোনো একটি বিষয় ইউরোপকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
চলতি সপ্তাহে সুওয়ালকি গ্যাপের কাছাকাছি বড় পরিসরে সামরিক মহড়া চালিয়েছে রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র বেলারুশ। সংকীর্ণ এই করিডোর বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে ন্যাটোর বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘকাল ধরেই সুওয়ালকি গ্যাপ ন্যাটোর অন্যতম দুর্বল বিন্দু হিসেবে বিবেচিত।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের এক গোপন গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের জন্য তলব করেছিলেন। এরপর তিনি ক্রমবর্ধমান রুশ হাইব্রিড আক্রমণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আরও একধাপ এগিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটো দেশগুলোর ওপর ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেগুলোকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করার পাশাপাশি টিনজাত খাবার ও সুপেয় পানি মজুত করতে বলেছে। দেশটির প্রতিরক্ষাপ্রধান বলেছেন, ব্রিটেন গত কয়েক দশকের মধ্যে 'সবচেয়ে বিপজ্জনক' সময়ের মুখোমুখি।
জার্মানি সম্ভাব্য রুশ হামলার জন্য হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস 'আমাদের মহাদেশের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষার' ক্ষেত্রে 'নির্ণায়ক মুহূর্তের' বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
এমনকি নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতা ও বৃহত্তর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎই পোল্যান্ডে একটি স্থায়ী মার্কিন সেনাঘাঁটি স্থাপনের কাজে অগ্রগতির কথা ঘোষণা করেছেন। দুই সপ্তাহ আগেই তিনি সিআইএ পরিচালককে এক গোপন মিশনে পাঠিয়েছিলেন, ন্যাটো অঞ্চলে হামলা চালাতে মস্কোকে সতর্ক করার জন্য।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো শিগগিরই ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে পারেন—এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় প্রান্তের দেশগুলো।
বড় হচ্ছে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র
সম্প্রতি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করার অভিযোগে পাঁচজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, এই চক্রটি ইউরোপীয় দেশগুলোতে বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার নির্দেশ দিয়েছিল।
ইউরোপীয়রা বছরের পর বছর ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আক্রমণের অভিযোগ করে আসছে। গত মাসে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্যও জার্মানি রাশিয়াকে দায়ী করেছিল।
ন্যাটোর জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হলো, প্রথাগত যুদ্ধের সীমারেখা স্পষ্টভাবে অতিক্রম না করেই রাশিয়া এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
ন্যাটোর আকাশসীমায় ড্রোন ওড়ানো, বিমানবন্দরে ব্যাঘাত ঘটানো, অবকাঠামোতে নাশকতা চালানো, অপরাধী চক্রের মাধ্যমে গুপ্তহত্যা সংঘটিত করা—এসবই হলো অস্বীকার করার মতো 'গ্রে জোন' অপারেশন।
পশ্চিমাদের অভিযোগ, পুতিন অস্পষ্টতা ও অস্বীকার করার প্রবণতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি ন্যাটোর সংকল্পের পরীক্ষা নেন। একই সঙ্গে তিনি এ-ও বোঝেন, এর সর্বোত্তম প্রতিক্রিয়া কী হবে বা আদৌ কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হবে কি না, তা নিয়ে ন্যাটোর ভেতরেই বিভক্তি রয়েছে।
কিন্তু পুতিন যদি আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন কী হবে?
সুওয়ালকি গ্যাপ এর একটি উত্তর হতে পারে।
এটি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত। ন্যাটোভুক্ত বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর—লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া—সঙ্গে ন্যাটোর বাকি অংশের একমাত্র স্থল যোগাযোগ এই করিডোর।
এমন এক সংকটের কথা কল্পনা করা যাক, যেখানে রাশিয়া, হয়তো বেলারুশকে সঙ্গে নিয়ে, এই করিডোরের একাংশে সেনা মোতায়েন করেছে। পুতিন হয়তো দাবি করবেন, এটি সীমিত পরিসরের অনুপ্রবেশ ছিল। এমনকি তিনি এ-ও বলতে পারেন, রাশিয়া সংঘাত বাড়াতে চায় না।
রাশিয়া হয়তো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমগুলোর সাহায্যে এমন দাবিও করবে, ন্যাটোর কোনো প্রতিক্রিয়ার কারণে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য সুওয়ালকি গ্যাপ দখল করা বা ন্যাটোর বাল্টিক প্রান্তকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং ন্যাটো ও এর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিগুলোকে পুরোপুরি দুর্বল করে দেওয়া।
একটুকরো ছোট ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য ন্যাটোর ৩২টি দেশ কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সম্মত হবে? লিথুয়ানিয়ার জন্য একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি নেবেন? জার্মানি বা ফ্রান্স কি তা করবে?
নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারে না, আর এই বিষয়টিই পুতিনকে সুবিধা করে দিচ্ছে।
সুওয়ালকি করিডোরের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ঠিক এ ধরনের পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি 'ওয়ার গেম' বা সামরিক মহড়া সম্পর্কে এ বছর ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ন্যাটো নিয়মিত এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য মহড়া করে এবং যেকোনো আক্রমণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া হবে ধ্বংসাত্মক।
পুতিন কি তার কথা বিশ্বাস করেন? কানাডাসহ নিকটতম মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যে বিরোধ চলছে, তাতে উত্তরটি সম্ভবত 'না'।
আধুনিক যুদ্ধে কী কী প্রয়োজন, ইউরোপীয়দের তার নির্মম পাঠ দিয়েছে ইউক্রেন।
শুধুই সামরিক সরঞ্জামের চেয়ে আরও বেশি কিছুর প্রয়োজন দেশগুলোর। যেমন, আক্রমণ সহ্য করে টিকে থাকার মতো বৈদ্যুতিক গ্রিড প্রয়োজন। এছাড়া বিপুলসংখ্যক হতাহতের পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হাসপাতাল, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা, সচল পরিবহন নেটওয়ার্ক ও নিরবচ্ছিন্ন চাপের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম সরকার প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউরোপের এমন সমাজ ব্যবস্থা দরকার, যা ভেঙে না পড়ে বা মেরুকরণের শিকার না হয়ে যেকোনো ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে সক্ষম।
চলতি সপ্তাহে ন্যাটো জনসমক্ষে জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য হালনাগাদ প্রয়োজনীয়তাগুলো প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে 'সংকট ও সংঘাতের' সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সরকার ব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ থেকে শুরু করে খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইউক্রেনীয়রা রাশিয়ার অবিরাম হামলার মুখেও কীভাবে জরুরি নাগরিক সেবাগুলো সচল রাখতে পেরেছে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ন্যাটোর কর্মকর্তারা।
এ এক অভাবনীয় পটপরিবর্তন। ইউক্রেন এখন আর ন্যাটোর কাছ থেকে ক্যাবল সামরিক পাঠই নিচ্ছে না—ন্যাটোও এখন ইউক্রেনের কাছ থেকে শিখছে।
ইউরোপের এই তৎপরতার পেছনে 'আমেরিকান ফ্যাক্টর' বা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে ইউরোপে সেনা মোতায়েন রেখেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে আটকে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, নৌবাহিনী, গোয়েন্দা নজরদারি ও ক্রমহ্রাসমান গোলাবারুদের মজুত দিয়ে একসাথে সব ফ্রন্টে কার্যকর থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ট্রাম্প ন্যাটোর শক্তি বাড়াতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি এখনও অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
আর এই বাস্তবতা মস্কোর অজানা নয়।
রাশিয়া এখনও ইউক্রেন যুদ্ধেই আটকে আছে। তবে ন্যাটোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পুতিনের কিন্তু ইউক্রেনের মতো এত বড় আকারের নতুন আগ্রাসন চালানোর দরকার নেই। তিনি ধাপে ধাপে সংঘাতের মাত্রা বাড়াতে পারেন।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের তিন দশক ধরে ইউরোপ তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রস্তুতিকে অনেকটাই ক্ষয় হতে দিয়েছে। যুদ্ধের ঝুঁকি তখন সুদূরপরাহত মনে হয়েছিল। ফলে সামরিক খাতে ব্যয় এবং সেনাবাহিনীতে নতুন সেনা নিয়োগ অনেক কমে যায়। বেসামরিক প্রতিরক্ষার প্রস্তুতিকে তখন অতীতের অবাস্তব স্মৃতি মনে করা হতো। আর ধরে নেওয়া হতো, যেকোনো বিপদে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে।
সেই সোনালী দিনগুলোর অবসান ঘটেছে।
যুদ্ধের বিস্তার ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে, তা অনিশ্চিত। তাই ইউরোপ এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
