মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বাড়ায় দুই সপ্তাহের সর্বনিম্নে তেলের দাম, বিপরীতে রেকর্ড গড়েছে ডিজেলের রিফাইনিং মার্জিন
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায়— আজ বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানির ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার খবরে, ডিজেলের রিফাইনিং মার্জিন (পরিশোধনের মুনাফা) রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স এই প্রতিবেদন লেখার সময় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ৩৭ সেন্ট বা ০.৩৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৯.৬২ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছিল। অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডাব্লিউটিআই) ফিউচার্স ৪৪ সেন্ট বা ০.৪৯ শতাংশ কমে ৯০.০৮ ডলারে নেমে আসে।
এর আগের লেনদেনের সেশনে ব্রেন্ট ক্রুডের দর কমে ৯৭.৩৬ ডলারে নেমেছিল, যা গত ৮ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন। আর ডাব্লিউটিআই-এর দাম বুধবার সকালে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখের পর থেকে সর্বনিম্নে নেমে যায়।
এদিকে, বিশ্বব্যাপী ডিজেল সংকটের কারণে দেশে জ্বালানির রেকর্ড মূল্য নিয়ন্ত্রণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন—এমন খবরের পর ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় ইউরোপীয় লো-সালফার গ্যাসঅয়েলের (ডিজেল) প্রিমিয়াম সর্বকালের রেকর্ড ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায়— ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল ও জেট ফুয়েল আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পণ্যবাজার বিশ্লেষক সংস্থা- স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারে—এমন নতুন উদ্বেগের মধ্যে গ্যাসঅয়েলের আকাশচুম্বী দাম ব্রেন্ট ক্রুডের দর ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।"
তবে বিশ্লেষক এবং বাজার পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা (ডিজেলের) উচ্চ মূল্য কমাতে তেমন কার্যকর হবে না, বরং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধ বিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সংলাপের আশাবাদ তৈরি হওয়ায়— চলতি সপ্তাহে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, তিনি ইরানকে "ধ্বংস" করে দিতে পারেন, তবে তিনি এটাও জানান যে, যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে তার প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
হ্যানসেন বলেন, "দাম কমার ক্ষেত্রে একমাত্র ইতিবাচক যে খবরের দিকে চোখ রাখা দরকার, তা হলো সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়া।"
রয়টার্স সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, লোহিত সাগরের দিকে থাকা নিজেদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে মঙ্গলবার তেল পরিবহন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে সৌদি আরব।
এর আগে ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার কারণে গত ১১ সেপ্টেম্বর পাইপলাইনটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল রিয়াদ, যার ফলে ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল জাহাজে লোডিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে মঙ্গলবার সৌদি আরব এশীয় রিফাইনারদের হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত বিকল্প স্থানগুলো থেকে অতিরিক্ত তেল লোডের প্রস্তাব দিয়েছে।
একই সময়ে ইরাকও তাদের তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে বলে মঙ্গলবার দেশটির তেলমন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি জানান, ইরাক বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করছে এবং তুরস্কের হয়ে রপ্তানির মাধ্যমে তা প্রতিদিন আরও ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি বাড়াবে বলে আশা করছে।
এদিকে সরবরাহের দৃশ্যপট ইতিবাচক হওয়ার আভাস দিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে— আগামী সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দিতে পারে তেহরান।
তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেলের মজুত বৃদ্ধির তথ্যও ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন জ্বালানি শিল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৮ লাখ ব্যারেল বেড়েছে, যদিও রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকরা মজুত হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
