ফুরাচ্ছে সংরক্ষণ ট্যাঙ্কের মজুত, ডিজেলের বৈশ্বিক সংকট গড়াতে পারে ২০২৭ সাল পর্যন্ত
ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ডিজেল সংকট–- আগামী বছরের আগে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানাচ্ছে জ্বালানি বাজার-সংক্রান্ত বিভিন্ন সূচক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী মহল। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিরম ওপরও তৈরি হচ্ছে গভীর চাপ।
চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল ডিজেল আটকা পড়ে আছে, যা বৈশ্বিক মজুতকে ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছে। ফলে এই পরিশোধিত জ্বালানির দামও রেকর্ড উচ্চতায় উঠছে। কৃষি, উৎপাদন এবং পরিবহনখাতে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এই সংকট সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ করে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি মাসে প্রথমবারের মতো খুচরা পর্যায়ে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। দেশটির কৃষক ও ট্রাক চালকদের ওপর তীব্র আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে এই মূল্যবৃদ্ধি। আর আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের মজুতাগার বা স্টোরেজ বাজারেও— অব্যাহত সরবরাহের ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। স্টোরেজ ব্রোকার 'দ্য ট্যাংক টাইগার'-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকা জুড়ে রিফাইনারি (শোধনাগার) এবং ব্যবসায়ীরা ডিজেল রাখার স্টোরেজ লিজ চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন; কারণ সেখানে মজুত করে রাখার মতো পর্যাপ্ত ডিজেলই নেই।
দ্য ট্যাংক টাইগার-এর চিফ অপারেটিং অফিসার স্টিভেন বারসামিয়ান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্টোরেজ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র—উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে—আগামী অক্টোবরে মজুতের জন্য খালি থাকা ডিজেল স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলোর ধারণক্ষমতা ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যাারেলে পৌঁছেছে, যা কিনা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত জুনে খালি থাকা ট্যাঙ্কের সক্ষমতা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মোট মজুত কমে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। ১৯৮২ সাল থেকে ডিজেল মজুতের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে আসছে ইআইএ। তখন থেকে বছরের এই সময়ের সর্বনিম্ন মজুত রয়েছে বর্তমানে।
দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ইঙ্গিত
বারসামিয়ান জানান, মার্কিন স্টোরেজ থেকে দ্রুত ডিজেল তুলে নেওয়ার ঘটনাই বলে দিচ্ছে যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাজারে তেলের সরবরাহ কতটা সীমিত ছিল। আর ভাড়া দেওয়ার মতো খালি ট্যাঙ্কের প্রাপ্যতা বাড়াও পাওয়া প্রমাণ করছে, এই সংকট কতোটা দীর্ঘ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মজুত কমে যাওয়া এবং খালি ট্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধির মিলিত তথ্যেই স্পষ্ট হয়েছে যে, অন্তত আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত— (ডিজেলের) সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকবে। আর এমন ধারণাই করছেন বাজারের ব্যবসায়ীরা। সাধারণত স্টোরেজ ট্যাংকগুলো ছয় মাস থেকে এক বছরের চুক্তিতে ভাড়া দেওয়া হয়।
"স্টোরেজ ট্যাংক খালি পড়ে আছে কারণ পুরোনো চুক্তিগুলো কেউ নবায়ন করতে চাইছে না। রাখার মতো ডিজেলই যদি না থাকে, তবে খামোখা ট্যাংকের ভাড়া কে গুনবে?" বলেন বারসামিয়ান।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান– ইকোবক্স ডাম্পস্টারস তাদের জ্বালানি খরচ কমাতে যেখানে সম্ভব ছোট আকারের ট্রাক ব্যবহার করছে, একই এলাকায় পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ একসঙ্গে সারছে এবং অপ্রয়োজনীয় ট্রিপ এড়াতে সময়সূচি মেনে চলাচল নিশ্চিত করছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডেভিড গ্যারেগাস বলেন, "ট্রাকের প্রতিটি অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় ট্রিপের জন্য এখন আমাদের বিশাল মাশুল গুনতে হচ্ছে।"
একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ
ইআইএ-ও মনে করছে, জ্বালানির এই মজুত ঘাটতি অব্যাহত থাকবে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইআইএ এক বিবৃতিতে বলেছে, "আমরা পূর্বাভাস দিচ্ছি সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ডিস্ট্রিলেট ফুয়েল অয়েল)—যা সাধারণত ডিজেল হিসেবে বিক্রি হয়—মজুত ১০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে আসবে এবং ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত ও ২০২৭ সালের অধিকাংশ সময়জুড়ে পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে কম থাকবে।"
ইউরোপেও ডিজেলের মজুত বেশ কম। ইনসাইটস গ্লোবালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের প্রধান ট্রেডিং হাব আমস্টারডাম-রোটারডাম-অ্যান্টওয়ার্পে জুলাই মাসে ডিজেলের মজুত পাঁচ বছরের গড় হারের চেয়ে ১৬ শতাংশ নিচে ছিল।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে গত কয়েক সপ্তাহে মোট পরিশোধিত তেলের গড় মজুত ছিল ৮২ লাখ ব্যারেল, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি হলেও—২০২৫ সালের গড় (৯৬ লাখ ব্যারেল) থেকে বেশ কম।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক পেট্রোলিয়াম কনফারেন্সে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-প্রধান আন্দ্রেয়া পেসকাতোরি বলেন, "এশিয়ার উদীয়মান অনেক দেশের বাজার এই সংকটে বেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা যেখানে
জ্বালানি খাতের নির্বাহীরা মনে করছেন, পুরো শীতকালজুড়ে বৈশ্বিক ডিজেল সরবরাহ সীমিত থাকবে—বিশেষত যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল রপ্তানি ব্যাহত হতে থাকে এবং অক্টোবর মাসজুড়ে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। রুশ দৈনিক ভেদোমোস্তি আজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, মস্কো আগামী অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ডিজেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ বাড়াবে।
আন্তর্জাটিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান– স্টোনএক্স-এর জ্বালানি বাজার-কৌশল বিষয়ক পরিচালক অ্যালেক্স হেডস জানান, শীতকালীন হিটিং মৌসুমের আগে মার্কিন পূর্ব উপকূলের ক্রেতারা ডিজেল কেনা শুরু করায়, দাম সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর আগে আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রেকর্ড পরিমাণ রিফাইনিং মার্জিনের (পরিশোধন মুনাফা) কারণে উৎপাদকরা আরও বেশি উৎপাদনে উৎসাহিত হতে পারেন, যা দামের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি কিছুটা ঠেকাবে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল্ট্রা-লো সালফার ডিজেলের ক্র্যাক স্প্রেড (অপরিশোধিত তেলের মূল্যের তুলনায় পরিশোধিত ডিজেল বিক্রিতে বাড়তি মূল্য বা লাভ) রেকর্ড প্রতি ব্যারেলে ১১৮.৬২ ডলারে পৌঁছায়।
জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ফিলিপ ভারলেগার চলতি মাসে বলেন, চীনে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজেল রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে, যা বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে।
এরপরও ইরান বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির যেকোনো ধরনের তীব্রতা, অথবা কোনো বড় শোধনাগার বন্ধ হলে তেলের বাজারে নতুন করে মূল্যের বড় ধরনের লাফ দেখা যেতে পারে।
হেডস স্পষ্ট করেই বলেন, "বাজারের বর্তমান ভিত্তিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই চড়া দাম আরও কিছুদিন আমাদের সঙ্গেই থাকছে।"
