মোটরে সোলার বসান, মহিষ কিনুন: দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার সহজ গাইড
চলতি বছর তৃতীয়বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার, আর এতেই যেন তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। গত এপ্রিলে প্রথমবার দাম বাড়ানোর আগে যে অকটেন প্রতি লিটার ১২৫ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়।
আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন, হতাশায় চিৎকার-চেঁচামেচিও করতে পারেন। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। ইরানে যুদ্ধ চলছে—ইসরায়েল ছাড়া যে যুদ্ধ কেউ চায়নি, অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প এটাকে 'পানির মতো সোজা' ভেবে শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প নিজের দেশের ভোটারদেরই পরোয়া করেন না, সেখানে আপনার মতো একজন ক্ষুব্ধ বাংলাদেশি কী ভাবছেন, তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতে যাবেন কেন?
কে জানে, হয়তো আগামীবার সরকার প্রতি লিটার তেলের দাম ২০০ টাকাও করে দিতে পারে। ট্রাম্প যদি ইরানে 'ফ্যাট বয়' (পারমাণবিক বোমা) ফেলতে সেই লাল বোতামে চাপ দেন, তবে এমনটা ঘটতেই পারে। আপনি বলতে পারেন, 'আরে, এসব তো পাগলামি!' আমিও একমত। এটা সত্যিই পাগলামি। ট্রাম্প পাগল হয়ে গেছেন। তিনি এতটাই উন্মাদ হয়ে গেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ডজনখানেক বার এই ইরান যুদ্ধে জিতেছে বলে দাবি করলেও, তার কাছে তা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না।
মূল বিষয়টা হলো, এই সমস্যা আমাদের হাতে নেই। কান্নাকাটি বা প্রতিবাদ করে এর সমাধান হবে না। তাই আসুন, আমরা একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি।
প্রথমত, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে? ধরুন, কাশেম তার মোটরসাইকেল নিয়ে ৫০০ টাকার অকটেনে প্রায় তিন দিন শহরে ঘুরে বেড়াতে পারতো। এখন একই পরিমাণ তেলের জন্য তাকে পকেট থেকে অতিরিক্ত আরও ৬০ টাকা গুনতে হবে।
আমরা যেসব খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনি, তার সবই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিংবা বিদেশ থেকে পরিবহনের মাধ্যমে আসে। ট্রাক ও বাস মালিকরা ইতোমধ্যে ভাড়া ২০-২৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর মানে দাঁড়ায়, কাশেম যা কিছুই কিনতে যাবে, তার জন্য তাকে ২০-২৫ শতাংশ বেশি দাম দিতে হবে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম। তার কথার সহজ অর্থ দাঁড়ায়—ভবিষ্যতে 'অন্যান্য অনেক দেশের' সঙ্গে মেলাতে গিয়ে তেলের দাম আরও বাড়ানো হতে পারে।
কিন্তু কাশেমের আয় তো বাড়ছে না। ফলে কাশেম আজ পুরোপুরি অসহায়।
তাই হইচই বা কান্নাকাটি না করে, আসুন আমরা নিজেদের মতো করে আধুনিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি।
প্রথমত, কাশেমের উচিত মোটরসাইকেল ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া। হাঁটুন, লাফান, গাছে বা পাহাড়ে উঠুন। পৃথিবীর মানুষ আর অন্যান্য স্থলচর প্রাণীরা তো হেঁটেই, লাফিয়েই আর গাছে চড়েই জীবন কাটিয়েছে। আমরা যদি সবাই এই জ্বালানিখেকো যানবাহনগুলো ছেড়ে দিই, তবে আমরা একটি ধীরগতির অথচ সুস্থ শহরের জীবনকে আপন করে নিতে পারব। এতে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। এমনকি এটি দুর্নীতিও কমিয়ে দিতে পারে; কারণ তখন একটি দামি গাড়ি বা ওই জাতীয় কিছু কেনার ইচ্ছা অন্তত একজনের মন থেকে কমে যাবে।
কাশেমের যদি এই ধারণা পছন্দ না হয়, তবে সে একটি ইলেকট্রিক বাইক (ই-বাইক) বেছে নিতে পারে। তাতে তার জীবনযাত্রা আগের মতোই থাকবে। এখন আপনি যদি লোডশেডিংয়ের অজুহাত দেন, তবে আপনি চাইলে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করে নিজেই নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। আগ্রহ থাকলে আপনি সোলার প্যানেলযুক্ত একটি বাইক হেলমেট বানিয়ে নিতে পারেন অথবা মোটরসাইকেলের ওপর সোলার প্যানেলের একটি ছাউনি বসিয়ে নিতে পারেন। স্বাবলম্বী হোন, নিজেই নিজের বিদ্যুৎ তৈরি করুন। আজ ইলেকট্রিক যানবাহনে আপনার করা বিনিয়োগ আপনাকে মুক্ত করবে। একবার এটি করে ফেললে আগামী ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে আপনাকে পেট্রোল বা অকটেন নিয়ে ভাবতে হবে না—কারণ এই প্যানেলগুলো ২৫ বছর পরও সচল থাকে।
জ্বালানিচালিত গাড়ির মালিকদেরও একই কাজ করা উচিত। এসব তেল নির্ভর ইঞ্জিন ডাস্টবিনে ফেলে দিন এবং ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বেছে নিন।
এখন আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন: আমাদের খাদ্য সরবরাহের কী হবে? উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে খাদ্যসামগ্রী, মুরগি কিংবা গবাদিপশু কীভাবে পরিবহন করব? সেখানেও ইভি ব্যবহার শুরু করুন।
যদি ইভি খুব বেশি ব্যয়বহুল হয়, তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা ভ্যান ব্যবহার করুন—সব ডিজেলচালিত ট্রাক ও বাস নিষিদ্ধ করে দিন। অসংখ্য রিকশা ভ্যানের ফলে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কে জানে, রাতারাতি হয়তো এক কোটি বা তারও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে যাবে, যা বিএনপি সরকারের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক আগেই কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে!
উপরি পাওনা হলো, সরকার তো কোনোভাবেই ব্যাটারিচালিত রিকশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পাচ্ছিল না! এভাবে সরকার সেগুলোকে সানন্দে গ্রহণ ও কাজে লাগাতে পারবে।
আর ট্রেনের ক্ষেত্রে? আমাদের ইলেকট্রিক ট্রেন না আসা পর্যন্ত আমরা ট্রেন টানার জন্য মহিষের শক্তি ব্যবহার করতে পারি। এটি মহিষ পালনে উৎসাহ জোগাবে এবং নতুন আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
আর ঠিক তখনই আমরা অবশেষে নির্মল বাতাসের একটি দেশ উপহার পাব!
আমার এই পরামর্শগুলোকে কেউ তামাশা মনে করবেন না যেন। প্রতিটি সংকটই একটি সুযোগ—সমস্যাটি আপনি কীভাবে সমাধান করতে চান, তা কেবল আপনার ওপরই নির্ভর করে।
