বাংলাদেশে কেন বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে চার শিশুর শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৫এন১) বা বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর দেশে এ সংক্রমণের চতুর্থ মানব কেসটি শনাক্ত হয়। আক্রান্ত চার শিশুর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ 'ইনফ্লুয়েঞ্জা অ্যাট দ্য হিউম্যান-অ্যানিমেল ইন্টারফেস: সামারি অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট' প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাঁস ও মুরগির সংস্পর্শে আসার সঙ্গে এসব সংক্রমণের যোগসূত্র রয়েছে। গত ৮ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছরে আবারও এ ধরনের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের গৃহপালিত হাঁস-মুরগির সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সর্বশেষ আক্রান্ত শিশুটি রংপুর বিভাগের। গত ১৫ আগস্ট তার জ্বর, কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়ার উপসর্গ দেখা দেয়। দুই দিন পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আক্রান্তের বিষয়টি যখন জানা যায়, তখন শিশুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল বলে জানান চিকিৎসকরা।
শিশুটি সাম্প্রতিক সময়ে কোথাও ঘুরতে যায়নি। তবে নিজ বাড়ি ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে হাঁস-মুরগির সংস্পর্শে এসেছিল সে। এর মধ্যে অসুস্থ হাঁস-মুরগিও ছিল।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী টিবিএসকে বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে শনাক্ত হওয়া এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার সব সংক্রমণই শিশুদের মধ্যে হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমরা সংক্রমণের সঙ্গে হাঁস-মুরগির সংস্পর্শে আসার যোগসূত্র পেয়েছি। হাঁস-মুরগির মাংস বা অন্যান্য পণ্য খাওয়ার চেয়ে সরাসরি সংস্পর্শ থেকেই সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।"
ডা. জাকী বলেন, আক্রান্ত বা অসুস্থ হাঁস-মুরগি ধরার সময়, জবাই করার সময় কিংবা সরাসরি সংস্পর্শে এলে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তিনি বলেন, "ভালোভাবে রান্না করা হাঁস-মুরগির মাংস খেলে সংক্রমণের ঝুঁকি নেই।"
এইচ৫এন১ একটি জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। তিনি বলেন, "তাই খামার ও হাঁস-মুরগির নিয়মিত নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।"
ডা. জাকী বলেন, "হাঁস-মুরগির নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। সংক্রমিত পাখি শনাক্ত হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে তাদের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎসেই ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে না।"
২০০৩ সালের পর ১৭ জন আক্রান্ত
২০০৩ সালের পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১৭ জনের এইচ৫এন১ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন—একজন ২০১৩ সালে এবং অন্যজন চলতি বছরের শুরুতে। ২০২৫ সালে তিনজন আক্রান্ত হলেও কারও মৃত্যু হয়নি। আর ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ঘটনা শনাক্ত হয়নি।
২০২৬ সালে এইচ৫এন১-এ প্রথম মারা যায় চট্টগ্রাম বিভাগের এক শিশু। গত ১ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়। পরে ৭ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষায় তার এইচ৫এন১ সংক্রমণ নিশ্চিত হয়।
রংপুরের সর্বশেষ ঘটনাটির আগে সিলেট বিভাগের আরও দুই শিশুর এইচ৫এন১ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল।
শিশুদের হাঁস-মুরগি থেকে দূরে রাখার পরামর্শ
চলতি বছর চার শিশুর এইচ৫এন১ এ সংক্রমিত হওয়ায় মহামারি পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করছে। এ কারণে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন।
ডা. মুশতাক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এইচ৫এন১ একটি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং আমরা এটিকে মহামারির ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করি। মানুষের মধ্যে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি এটাও দেখায় যে আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা কাজ করছে—অন্তত আমরা আক্রান্তদের শনাক্ত করতে পারছি।"
তিনি বলেন, আগে কোনো খামারে সংক্রমণ শনাক্ত হলে হাঁস-মুরগি মেরে ফেলা হতো। তবে এখন অনেক ক্ষেত্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু টিকা দিলেও ভাইরাস নির্মূল হয় না।
তিনি বলেন, "টিকা দিলে মুরগির মৃত্যু কমে, কিন্তু ভাইরাসের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এতে ভাইরাসের ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।"
তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে শিশুরা প্রায়ই গৃহপালিত হাঁস-মুরগির সঙ্গে খেলা করে বা সেগুলো ধরে। এতে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, "শিশুদের গৃহপালিত হাঁস-মুরগি স্পর্শ করা থেকে বিরত রাখতে হবে।"
হাঁস-মুরগির খামারের কর্মী ও জীবন্ত হাঁস-মুরগি বিক্রেতাদের জন্য মাস্ক ও গ্লাভস পরা এবং কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক করারও পরামর্শ দেন তিনি।
প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারেন
ডা. মুশতাকের মতে, এইচ৫এন১ ভাইরাসে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারেন। ভাইরাসটি মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় বেশির ভাগ মানুষের শরীরে এর বিরুদ্ধে আগে থেকে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নেই।
তিনি বলেন, "শিশুদের মধ্যে এ সংক্রমণ বেশি শনাক্ত হতে পারে, তবে প্রাপ্তবয়স্করাও ঝুঁকিতে রয়েছেন। যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।"
ডা. মুশতাক বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে আরও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা উচিত। দেশে মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা চালুর বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৩ থেকে ২০২৬ সালের সম্মিলিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (এইচ৫এন১) সংক্রমণের ১ হাজার ৩টি কেস নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৭৯ জনের।
