বার্ড ফ্লুতে অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম দ্বীপে ১৩ হাজারের বেশি সিল শাবকের মৃত্যু
অস্ট্রেলিয়ার দূরবর্তী অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে হাজার হাজার সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিলের শাবকের মৃত্যু হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের দ্বীপগুলোতে পেঙ্গুইন, সিল ও পেট্রেল পাখির মধ্যে প্রাণঘাতী এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে।
পার্থ থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং অ্যান্টার্কটিকা থেকে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হার্ড দ্বীপে সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিলশাবকদের ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা দেখা গেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি বিজ্ঞানীরা ড্রোন ও সরেজমিন জরিপ পরিচালনা করে এ তথ্য পান।
প্রিপ্রিন্ট গবেষণাপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হার্ড দ্বীপজুড়ে গড়ে ৭৬ শতাংশ সিলশাবক মারা গেছে। একটি স্থানে মৃত্যুহার ছিল ৯৭ শতাংশ। একই গবেষণায় ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপেও সিলশাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষণাপত্রটির সহ-প্রধান লেখক ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিজ্ঞানী ড. জ্যারড হজসন বলেন, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমরা দ্বীপ ত্যাগ করার সময়ও মৃত্যুর ঘটনা চলছিল। ব্যাপক এই প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ছিল, তবে আমরা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম।'
তিনি জানান, অন্যান্য বছরে সিলশাবকের মৃত্যুহার সাধারণত ৫ শতাংশের নিচে থাকে।
হার্ড দ্বীপের নয়টি প্রজাতির মধ্যে ছয়টিতে এখন পর্যন্ত এইচ৫এন১ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিল, কিং পেঙ্গুইন, জেন্টু পেঙ্গুইন, অ্যান্টার্কটিক ফার সিল এবং সাউথ জর্জিয়া ডাইভিং পেট্রেল।
এ ছাড়া কয়েক শ' প্রাপ্তবয়স্ক কিং পেঙ্গুইনের মৃতদেহও দেখা গেছে।
হজসন বলেন, সাব-অ্যান্টার্কটিক এসব দ্বীপে ১০ লাখের বেশি প্রজননকারী সিল ও সামুদ্রিক পাখির আবাস রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রজাতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত তালিকাভুক্ত।
অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের বার্ড ফ্লু সমন্বয়ক, বন্যপ্রাণী পশুচিকিৎসক ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. ট্রিস্টান বার্গেস বলেন, দক্ষিণ গোলার্ধে অন্যান্য প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রেও এলিফ্যান্ট সিলের ওপর একই ধরনের গুরুতর প্রভাব দেখা গেছে।
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফরাসি সাব-অ্যান্টার্কটিক ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জ থেকে বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে এই প্রাণঘাতী ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসটি এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের আগস্টে এটি সেখানে পৌঁছায়।
গবেষণাপত্রটির আরেক সহ-প্রধান লেখক ও বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ড. জুলি ম্যাকইনেস বলেন, 'হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপে এইচ৫ বার্ড ফ্লু শনাক্ত হওয়া অস্ট্রেলিয়ার কোনো বহিরাগত অঞ্চলে এ ভাইরাসের প্রথম উপস্থিতি। এটি সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে ভাইরাসটির পূর্বদিকে বিস্তার অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।'
অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রাম অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক টেরিটরি ও ম্যাককুয়ারি দ্বীপে বার্ড ফ্লুর লক্ষণ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে। সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজন সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি।
বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার জানায়, মূল ভূখণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ দেশীয় প্রাণীপ্রজাতির ওপর এইচ৫এন১-এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ১ কোটি ১২ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রী মারে ওয়াট বলেন, 'এ মুহূর্তে আমরা গুরুতর ও অত্যন্ত সংক্রামক এইচ৫ বার্ড ফ্লু থেকে মুক্ত আছি। তবে এটি যেহেতু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তাই অস্ট্রেলিয়ায় ভাইরাসটির প্রবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে।'
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ড. মিশেল উইলে বলেন, জরিপের ফলাফল 'সত্যিই বিধ্বংসী'। তবে তার মতে, সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে বার্ড ফ্লুর যে প্রভাব দেখা গেছে, এই ফলাফল তার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষণাপত্রটির সঙ্গে যুক্ত নন ড. উইলে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার জন্য প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়নে উত্তর দিক থেকে এইচ৫এন১ প্রবেশের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে দীর্ঘ দূরত্বে ভাইরাসটির বিস্তার দক্ষিণ দিক দিয়েও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি বলেন, জনসাধারণের মাধ্যমে তথ্য জানানো এখনও 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ'। 'কেউ যদি অসুস্থ বা মৃত পাখি কিংবা সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখতে পান, তাহলে জরুরি প্রাণীরোগ হটলাইনে (১৮০০ ৬৭৫ ৮৮৮) তা জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
