ব্র্যান্ড ‘টক্সিক’ হয়ে উঠেছে, তাই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ট্রাম্প টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল
অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো 'ট্রাম্প টাওয়ার' নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল মাত্র তিন মাস আগে। কিন্তু এরই মধ্যে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাম্প ব্র্যান্ড এখন 'টক্সিক' হয়ে উঠেছে।
আলটাস প্রপার্টি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডেভিড ইয়াং সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, 'সোজা কথায় বলতে গেলে, ইরান যুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাম্প ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা ক্রমশ কমছে।'
গত ফেব্রুয়ারিতে আলটাস এই চুক্তির ঘোষণা দিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, গোল্ড কোস্ট শহরে ৯১ তলার এই ভবনটি নির্মাণ করা হবে। এটি হবে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে উঁচু ভবন। ট্রাম্পের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৮৫ কক্ষের একটি বিলাসবহুল হোটেল, শপিং প্লাজা, রেস্তোরাঁ এবং আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট থাকার কথা ছিল এতে।
আলটাস এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের ঘোষণা আসার পরপরই অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের মালিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেও, এটি পরিচালনা করেন তার দুই ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র এবং এরিক।
সমুদ্রতীরের এই বিলাসবহুল ভবনটি ছিল অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের 'প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকল্প'—সে সময় এমনটাই বলেছিলেন এরিক ট্রাম্প। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।
এই প্রকল্প বন্ধের দাবিতে করা একটি পিটিশনে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন। ট্রাম্প সমর্থকদের রোষানল থেকে বাঁচতে সিকে ছদ্মনামে এই পিটিশন শুরু করেছিলেন এক নারী।
ফেব্রুয়ারিতে সিএনএনকে তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের 'অভিবাসনবিরোধী সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজনের' দৃশ্য দেখে তিনি নিজেকে খুব অসহায় মনে করছিলেন। তাই এর প্রতিবাদ জানানোর একটি উপায় খুঁজছিলেন তিনি।
নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ডেভিড ইয়াং জানিয়েছেন, টাওয়ার নির্মাণের কাজ চলবে—তবে সেখানে ট্রাম্পের নাম থাকবে না।
মঙ্গলবার লিঙ্কডইনে দেওয়া এক পোস্টে আলটাসের সিইও ট্রাম্প টাওয়ার নিয়ে এমন সমালোচনাকে 'অন্যায্য' বলে মন্তব্য করেন। তবে তিনি এ-ও স্বীকার করেন, 'অস্ট্রেলিয়ার মানুষের কাছে এই ব্র্যান্ড এখন টক্সিক হয়ে উঠেছে।'
ইয়াং বলেন, 'ট্রাম্প অর্গানাইজেশন একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এটি প্রেসিডেন্ট পরিচালনা করেন না, বরং এরিক ও ডোনাল্ড জুনিয়র এটি অত্যন্ত সফলভাবে চালাচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে তাদের ১৩৬টিরও বেশি রিসোর্ট ও টাওয়ার রয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় গণমাধ্যম এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান নিছক সস্তা প্রচারণার জন্যই ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে।'
এ সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে তার কোনো তিক্ততা সৃষ্টি হয়নি বলেও জানান ইয়াং।
২০০৭ সালে ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে একটি 'কোল্ড কল' বা সরাসরি ফোন করার মাধ্যমেই এই টাওয়ার নির্মাণের প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু করেছিলেন ইয়াং। আলটাসের ওয়েবসাইটের একটি ব্লগ পোস্ট থেকে এই তথ্য জানা যায়।
ইয়াং স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি ট্রাম্পের মেয়ের কাছে নিজেকে অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রপার্টি ডেভেলপার হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন, যিনি সার্ফার্স প্যারাডাইস এলাকায় 'অস্ট্রেলিয়ার সেরা পর্যটন স্থাপনা' তৈরি করতে চান।
প্রায় ২০ বছর পর যখন এই চুক্তি সই হয়, তখন ইয়াং বলেছিলেন, এই টাওয়ারটি 'আমেরিকান নয়, বরং একটি অস্ট্রেলীয় প্রকল্প হবে।' তিনি আশা করেছিলেন, ২০৩২ সালের ব্রিসবেন অলিম্পিকের আগেই ভবনটি প্রস্তুত হয়ে যাবে।
গোল্ড কোস্টের মেয়র টম টেট একসময় মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজ করেছিলেন এবং এই প্রকল্পের একজন প্রবল সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তিনি জানান, সিটি কাউন্সিলের কাছে কখনো এই ভবন নির্মাণের কোনো আবেদনই জমা দেওয়া হয়নি।
সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মেয়র টেট বলেন, 'এই প্রকল্পটি দুটি বেসরকারি পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। বিবেচনা করার মতো কোনো প্রস্তাবই আমাদের হাতে আসেনি।'
মেয়রের মতে, এই চুক্তি বাতিলের পেছনে অর্থের বিষয়টিও একটি বড় কারণ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে টেট বলেন, 'ট্রাম্প অর্গানাইজেশন তাদের ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার এবং পরিচালনার জন্য মুনাফার একটি বড় অংশ দাবি করেছিল। অন্যদিকে নির্মাণকারী হয়তো ভেবেছেন, "আমি আমার সব টাকা বিনিয়োগ করছি, আর আপনারা লাভের একটা বড় অংশ নিয়ে যাবেন!" আমার মনে হয়, এই কারণেই তারা আলাদা হয়ে গেছে।'
